Wednesday, July 28, 2021

ঈশ্বর দর্শন

 আয সকাল থেকেই দিনটা খারাপ যাচ্ছে সন্তুর। সকালে মা রোজ তাকে এক গ্লাস দুধ খাওয়ান। দুধটা যে খেতে খুব একটা ভালো লাগে তা না, কিন্তু ইদানীং মা তাতে চকোলেট ফ্লেভারের একটি মিক্স দেন বলে, সেটি খেতে অতি উত্তম হয়। আজকেও সকালে মনের আনন্দে সেই চকোলেট রঙের দুধ পান করতে যাচ্ছিল সন্তু, এই সময় তার দুধে এসে পড়ে একটা মাছি। অতএব দুধ খাওয়া মাঠে মারা গেল। 

স্কুলে যাওয়ার সময় দত্তপাড়া কালীমন্দিরের সামনে তার সাইকেলের চেনটা পড়ল। যা হয়, হাতে কালি মেখে স্কুলে ঢুকতে হল। জামাতেও একটু কালির দাগ পড়েছিল। সুযোগ বুঝে ভূগোল স্যার নৃপতিবাবু দুটো কথাও শুনিয়ে দিলেন। পরের পিরিয়ডে বাংলা ক্লাসে বই আনেনি বলে কান ধরে বসে থাকতে হল সন্তুকে। রোজ মনে করে বইটা নিয়ে আসে সন্তু। আজকে যে কীভাবে ভুলল সেই জানে!! বলছি না, দিনটাই খারাপ!! 

টিফিনের সময় দিন আরো খারাপ গেল। কালি মাখা হাতে টিফিন খাওয়া যায়না, তাই বাথরুমে হাত ধুতে গিয়েছিল সন্তু। ফিরে এসে দেখে তার টিফিন বক্স হাওয়া। আজকে টিফিন আনতে ভুলে গেছে নাকি? খেয়াল হতেই ব্যাগের ভিতরটা খুঁজতে লাগল সে। একটু বাদেই অবশ্য চোখ গেল সামনে স্যারের টেবিলে রাখা তার খালি টিফিন বক্সটা। মানে বক্সটা বন্ধই ছিল। সন্তু গিয়ে সেটা খুলেই বুঝতে পেল ভিতরে কিচ্ছু নেই। সে যখন হাত ধুতে গেছে, তখনি এই কাণ্ড। নির্ঘাত রবির কাজ এটা। অনেকদিন ধরেই সন্তুর টিফিনের জন্য ওঁত পেতে থাকে রবি। এবার মাথা গরম হয়ে গেল সন্তুর। ছুটে গিয়ে রবিকে ধাক্কা দিল। রবিও ছাড়বার পাত্র নয়। শুরু হয়ে গেল শুম্ভ নিশুম্ভের লড়াই। মাঝে অঙ্ক স্যার অমিয়বাবু সেটি দেখে ফেলে দুজনকে আলাদা করেন। তারপর হেডস্যারের কাছে নিয়ে যান। কোন প্রমাণ ছাড়া সন্তু রবিকে আক্রমণ করেছে। তাই সন্তুকে সেদিনের মত স্কুল থেকে বার করে দিলেন হেডস্যার। পরেরদিন বাবাকে নিয়ে আসতে হবে। 

এখন বাড়ি গেলে মায়ের রোষের মুখে পড়বে সন্তু। বাবা বাড়ি ফিরতে দেরী আছে। বাবা অতটা মারেন না তাকে। তাই বাবা ফেরার পর বাড়ি ঢোকাই মঙ্গল। কিন্তু এই সময়টা কি করবে সন্তু? তাদের পাড়ার কাছেই হাইওয়ে। সাইকেলটা নিয়ে হাইওয়ের ধারে এলো সে। এখানে একটা বড় বটগাছ আছে। তার ছায়ায় বসে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগল সন্তু। এই হাইওয়েটা খুব ভয়ঙ্কর। ভীষণ জোরে গাড়ি যায়। তাই বাবা তাকে বার বার বারণ করেছেন এই হাইওয়ের কাছে যেতে। সবচেয়ে বেশী ভয় করে লরিগুলিকে। তবু বাড়ির কাউকে না জানিয়ে মাঝে মাঝেই এই হাইওয়ের ধারে এসে বসে সন্তু। কত লোক দেখা যায়। উল্টোদিকে একটি চায়ের গুমটি। সেখানে কত লোক খেতে আসে। কারুর হাতে বড় ব্যাগ। কারুর সঙ্গে বাঁধা ছাগল। সন্তুর বেশ লাগে। আচ্ছা এই যে রাস্তাটা, এটা কতদূর গেছে? কলকাতা? দিল্লী? বম্বে? মাদ্রাজ? নাকি আরো দূর!! লন্ডন? প্যারিস? বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। বড় হলে সন্তুও এরকম রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাবে। অনেক দূর দূর যাবে। 

এই সময় আচমকা একটি গাড়ি এসে থামল সন্তুর সামনে। দুধ সাদা একটা আম্ব্যাসাডর। গাড়ির সামনের জানালা দিয়ে ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল 

-- এই যে খোকা, এটা কি দয়ালপুর? 

-- না এটা তো খনা। সামনেই স্টেশন পাবেন। 

-- ওহ খনা, তাহলে কাছেই আছি। 

এই বলে ড্রাইভার ভদ্রলোক গাড়ি চালু করছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে পিছনে বসে থাকা ব্যাক্তিকে দেখে ফেলেছে সন্তু। শুধু দেখেছে না, চিনেও ফেলেছে। আরে ইনি যে শচীন। আনন্দে কিছু না ভেবেই চিৎকার করে উঠল সন্তু 

-- শচীন, শচীন। 

ড্রাইভার গাড়ি থামালেন। পিছনের জানালা খুলে গেল। এবার জানালা দিয়ে বেরিয়ে এলো একটি হাত। 

-- হাই।

ছুটে গিয়ে সে হাত ধরল সন্তু। তার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল 

-- আই এম বিগ ফ্যান। 

-- থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্ক ইউ ফর হেল্পিং আস উইথ দ্য ডিরেকশন। গড ব্লেস ইউ। 

এবার হাত ছাড়িয়ে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালেন বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার। জানালার কাঁচ আসতে আসতে বন্ধ হয়ে গেল। গাড়িটিও গা ঝাড়া দিয়ে চলতে লাগল। যতক্ষণ গাড়িটি দেখা গেল, সন্তু হাত নেড়ে গেল। 

সন্তু সেদিন বাড়িতে প্রচণ্ড বকা খেল। আজকে বাবাও ছাড়লেন না। ভুলের মধ্যে সন্তু বলে ফেলেছিল শচীনের সঙ্গে দেখা করার কথাটি। বাবা বিশ্বাস তো করলেনই না, উল্টে সন্তু কেন হাইওয়ের ধারে গিয়েছিল তাই নিয়ে বকা খেল। পরেরদিন স্কুলের বন্ধুদের সবাইকে বলল সন্তু। প্রথম প্রথম দু- একজন বিশ্বাস করলেও বাংলার স্যার নির্মলবাবু -- "বাহ সন্তু, তুমি তো খুব গুছিয়ে গল্প বলতে পারো। বড় হয়ে শরৎচন্দ্র হবে?"

বলায় সমস্ত ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়েছিল। চোখ ফেটে কান্না এল সন্তুর। নাহ, আর কাউকে বলবে না সন্তু এই কথাটি। 



আজ বহুবছর বাদে ছেলের জন্য রচনা লিখতে বসলেন তন্ময়বাবু ওরফে সন্তু। রচনার বিষয় -- "জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন"। লিখতে বসেই সেই বহুবছর আগের দিনটির কথা মনে পড়ে গেল। আচ্ছা, সত্যি কি সেদিন শচীনকে দেখেছিলেন তিনি? 

Saturday, May 8, 2021

প্রবাসীর ডায়রি ৫ঃ ক্যালিফোর্নিকেশান

 ইন্টার্নশিপের অফারটা পেলাম ২০০৮-এর ফেব্রুয়ারির শেষে। এতদিন সেলফোন ছিলোনা। এবার নিলাম। একটা ক্রেডিট কার্ড-ও এপ্লাই করেছিলাম। সেটা পেলাম। বলা হয়নি এর মধ্যে আমার একটি পেপার এক্সেপ্টেড হয়েছে। সেটি পড়তে যেতে হবে অরল্যান্ডো। আমরা যেখানে থাকতাম, অর্থাৎ গেন্সভিল থেকে অরল্যান্ডো মাত্র ২ ঘণ্টা দূর। মে মাসে আমি আর আমার গাইড গেলাম পেপার পড়তে। সেই প্রথম এরকম স্তরের কনফারেন্স আমার। কত লোক। দূর দূরান্ত থেকে এসেছে। আলাপ হল। পেপার পড়লাম। প্রশ্ন করল লোকজন। উত্তরও দিলাম। সেখানে আলাপ হল দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ডঃ সংযুক্তা ভঞ্জর সাথে। উনি আমার নাম শুনে বললেন -- "আরে আমার ছেলের নাম-ও তো কণাদ!!" 

বিকেল বেলা কনফারেন্স করে ফিরে এলাম। পড়ন্ত বিকেলের আলোতে গাড়িতে বসে বসে সবুজ ফ্লোরিডা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, আর তো কয়েকদিন, তারপর আমার যাত্রা সোনালি রাজ্যে -- ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে কী এই সবুজ বনানী, এই বিস্তীর্ন জলভূমি দেখতে পারব? এর মধ্যে একটা মজার কথা বলি। ইন্টেলের নিয়ম ছিল ইন্টার্নদের জয়েন করার আগে ড্রাগ টেস্ট করতে হবে। তো সেই মত আমি গেলাম হাসপাতালে। জানতাম না ড্রাগ টেস্ট কাকে বলে। গিয়ে শুনলাম মূত্র বিসর্জন করতে হবে। এবার আমার সেই সময় মূত্র ত্যাগের মত অবস্থা না। রিসেপ্সনিস্ট বলল -- "জল খাও, পাশেই ফিল্টার আছে।" এবার আমেরিকানদের একটা খুব বিরক্তিকর স্বভাবের কথা বলি। এরা জল বলতে ঠাণ্ডা জল খায়। আমি আবার বেশী ঠাণ্ডা জল খেতে পারিনা। অতএব প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শৌচালয় যাত্রা করলাম। 

আমার ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্লাইট ছিল অরল্যান্ডো -- ডেনভার -- স্যাক্রাম্যান্টো। আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম ওখানে এক তামিল ছেলের সঙ্গে থাকব। নাম দশরথারামান চন্দ্রমৌলী, সংক্ষেপে দশা। দশা আমার এক সপ্তাহ আগেই জয়েন করবে। সে উত্তর ক্যারোলিনা রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নির্দিষ্ট দিনে আমার রুমমেট অনিদা আমাকে অরল্যান্ডো বিমানবন্দরে পৌঁছে দিলো। সেখান থেকে লম্বা ফ্লাইট করে ডেনভার। কলোরাডো রাজ্যটা কি সুন্দর সেটি প্লেন থেকেই দেখতে পেলাম। কলোরাডোতে আমার প্রায় ৩ ঘণ্টা মত সময় ছিল। এয়ারপোর্টে ঘুরতে লাগলাম। এক জায়গায় দেখলাম জুতো পালিশ চলছে। ব্যাপারটা খুব মজা লাগল দেখে। বেশ কিছু উঁচু উঁচু চেয়ারে লোকে বসবে, জুতো খুলবেও না। আর কিছু লোক সেটা পরিষ্কার করে দেবে। মনে পড়ল ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে বিরজু আসত প্রতি রবিবার জুতো পরিষ্কার করতে। কতদিন বিরজুর খবর পাইনা। বেঁচে আছে কিনা কে জানে। আমার জীবনের অনেক কিছুর মতই বিরজু একদিন না বলে হারিয়ে গিয়েছিল। বলেও যায়নি আর দেখা হবে না। 

একটা আইসক্রিমের দোকান দেখে এগোতেই এই ভারতীয় ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল। নাম হিতেশ লাথ। গুজারাটের লোক। স্যান হোশেতে চাকরি করেন। অনেকক্ষণ গল্প হল। একসাথে আইসক্রিম খেলাম। দেশের কথা, ক্যালিফোর্নিয়ার কথা, কলেজের কথা, চাকরির কথা, শাহরুখ খান, কুমার শানু, কিছুই বাকি রইল না। মনে হচ্ছিল সেই সময়, শুধু সেই কয়েক ঘণ্টার জন্য উনি একমাত্র আমার পরিচিত, আর কেউ না। অবশেষে বিদায়ের সময় এল। উনি আমাকে নিজের একটা কার্ড দিলেন। পরে ওনাকে একদিন মেল করেছিলাম, উত্তরও দিয়েছিলেন। কিন্তু যা হয়, বিরজুর মত হিতেশবাবুও আমার জীবন থেকে একদিন হারিয়ে গেলেন। অথচ সেদিন উত্তর আমেরিকার এক পাহাড়ি শহরের বিমানবন্দরে উনি ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের। 


ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানী স্যাক্রাম্যান্টো। যখন পৌঁছালাম তখন রাত প্রায় ৭:৩০। এয়ারপোর্টেই খেয়ে নিয়েছিলাম। একটা শাটল বলা ছিল। তাতেই উঠলাম। কিন্তু শাটল একে এলো দেরী করে। তার উপর আমি শেষ স্টপ। অতএব সবাইকে নামাতে নামাতে যখন আমার বাড়ি পৌঁছাল তখন রাত ৯:৩০। দশাকে ফোন করতেই দোতলা থেকে নেমে এলো। আমার ব্যাগ নিয়ে ওপরে উঠতে সাহায্য করল। বাড়িতে পিতজা আছে, খাবো কিনা জিজ্ঞেস করলো। আমি না বললাম, এয়ারপোর্টে খেয়ে এসেছি জানালাম। আমরা যে জায়গাটায় থাকছি সেটি স্যাক্রাম্যান্টোর শহরতলি। নাম র‍্যাঞ্চো কর্দোভা। পশ্চিমবঙ্গ ও ফ্লোরিডা কাটিয়ে মরুভূমির দেশে এসে বুঝতে পারলাম গরম কাকে বলে। রাত ১০টা তেও প্রায় ৩৮ ডিগ্রী। অতএব স্নান করে শুতে গেলাম। মনে মনে ভাবছিলাম -- আর তো ক'দিন বাদেই আমার জন্মদিন। গতবছর ঐ দিনে আমার যাদবপুরের পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। সকালে অয়ন, সপ্তর্ষি, সোমসুভ্রদের সঙ্গে কাটিয়ে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। আর এবার, একা একা এই প্রবাসে সোনালি রাজ্যে কাটাব।  

Friday, April 2, 2021

বাড়ির খোঁজে

 আচ্ছা, আপনাদের কারুর বাড়ি হারিয়ে গেছে?  মার্কিন দেশের নেভাডা রাজ্যের এম্পায়ার শহরের ফার্নের হারিয়ে গিয়েছিল। এম্পায়ারে একটি কন্সট্রাকশন কোম্পানি ছিল। প্রায় ৭৫০ লোক থাকত। কোম্পানির বাড়িতে ছিল। একদিন কোম্পানি উঠে যায়। চাকরির খোঁজে সবাই এম্পায়ার ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। এম্পায়ার খালি হয়ে যায়। ফার্ন বেছে নেয় এক যাযাবর জীবন। নিজের ক্যারাভানে চেপে দেশের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে এমাজনে কাজ করে। একদিন সে ফিরে আসে এম্পায়ারে। নিজের পুরনো বাড়িতে যায়। কেউ নেই। দরজা খোলা। বেডরুম খালি। আলমারি খোলা। এক শূন্যতা তাকে পেয়ে বসে। খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে সে ফিরে যায়। এতক্ষণে হয়ত অনেকেই বুঝে ফেলেছেন আমি কার কথা বলছি। হ্যাঁ, এটি এবছরে ছয়টি অস্কারের জন্য মনোনীত সিনেমা "নোমাডল্যান্ড"। 

কিন্তু এ কী শুধুই মার্কিন দেশের গল্প? আমাদের দেশে কি নেই? আমার শ্বশুরমশাই চাকরি করতেন আসামে হিন্দুস্তান পেপার মিলসে। উনি অবসর নিয়েছেন বহয় আগে। বহুদিন হল সেটি বন্ধ। ইতিমধ্যেই প্রায় ৮০ জন আত্মহত্যা করেছে। আমার স্ত্রী এবং অন্যরা যারা ঐ মিলের হাউজিং-এ বড় হয়েছে, তাদের সেই বাড়ি কি আর থাকবে? ঐ মিল যদি না খোলে কোনদিন, তাহলে ও বাড়িও হারিয়ে যাবে। 

অনেক বাড়ি অচেনা হয়ে যায়। আমার তারাবাগের যে কোয়ার্টারে থাকতাম, যেটা জীবনের প্রায় ১১ বছর আমার বাড়ি ছিল, আজ সেখানে আমি চাইলেই ঢুকতে পারবনা। কে থাকেন চিনি না, দুম করে "এটা আমার বাড়ি ছিল, দেখব" বলে যাওয়া যায়না। অথচ সত্যি ওখানে আমি থাকতাম। আই সি এস ই, উচ্চমাধ্যমিক, জয়েন্ট সব ঐ বাড়িতে থাকতেই দেওয়া। ২০০১ এ অসুস্থ হয়ে নার্সিং হোম থেকে ফিরে ঐ বাড়িতেই উঠেছিলাম। সাইকেল চালাতে শিখে পড়ে গিয়ে পা কেটে ঐ বাড়িতেই গেছিলাম। আজ সেই বাড়ি আমার অচেনা। তবে হারিয়ে যায়নি। আমি তারাবাগ গেলেই বাড়িটি দেখতে পাই। হয়ত ঢুকতে পারিনা। 

আমার জীবনে একটি বাড়ি হারিয়ে গেছে। খুবই গুরুত্বপূর্ন বাড়ি। আমি ২০০৭ সালে প্রথম বাড়ি ছাড়ি। এই দেখুন, এতবার বাড়ি বলছি, আপনি হয়ত বুঝতে পারছেন না আমি কিসের কথা বলছি। আমি ২০০৭ এ প্রথম মা বাবাকে ছেড়ে আলাদা থাকি। ততদিন আমার বাড়ি ছিল কখনো বর্ধমানের কোয়ার্টার, কখনো শকুন্তলা পার্কের ফ্ল্যাট। ২০০৭ এ আমার বাড়ি হয় ফ্লোরিডার গেন্সভিলের এক টাউনহাউস। বিশ্বাস করুন, আমিও জানতাম না টাউনহাউস মানে কি। আমাদের কমপ্লেক্সের নাম ছিল সান হার্বার। বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার দুটি বাস ছিল -- ১৬ আর ১৭। দোতলা বাড়ি। একতলায় রান্নাঘর, একটি ছোট শৌচালয়, এবং বাইরের ঘর বা লিভিং রুম। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলে দুটি বেডরুম এবং একটি স্নানঘর। আমি থাকতাম পশ্চিমমুখী ঘরে। আমার রুমমেট সায়ক থাকত পূর্বমুখী ঘরটিতে। আমরা যখন প্রথম যাই, আমাদের সঙ্গে অনিরুদ্ধদাও থাকত। ২০০৭ এ বাড়িটির রং ছিল সাদা, আর লাল দরজা।

আমার যেন রোজকার রুটিন হয়ে গিয়েছিল সকালে বাড়ির তালা লাগিয়ে হেঁটে রাস্তা পেড়িয়ে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বাস ধরা। ফেরার সময় আবার বাস স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরা। আপনাদের হয়ত মনে হতে পারে এই ক্লিশে রোজকার যাতায়াত নিয়ে কেন লিখছি। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ ক্লিশে জিনিসটাই যদি আবার ফেরত পেতাম। 

মনে আছে, আমাদের দরজার একটু দূরে একটি ময়লা ফেলার জায়গা ছিল। রাত্রিবেলা সেখানে র‍্যাকুনের দল আসত। কয়েকবার ছবি তুলতে গিয়ে পারিনি। আমরা গাড়ি কেনার পড় বাড়ির সামনে রাখতাম। গবেষণার শেষদিকে কাজের প্রচণ্ড চাপ চলছিল। বাধ্য হয়ে রাত করে ফিরতাম ল্যাব থেকে। বাড়ির সামনে গাড়িটি যখন পার্ক করতাম, মনে হত যাক বাড়ি ফিরেছি, সারাদিনের ঝক্কি শেষ। পাঁচ বছরে আমি বাড়ি পাল্টায়নি। ঐ বাড়িতেই আমার বহু বন্ধু এসেছে, থেকেছে। জন্মদিনে কেক কাটা, একসাথে সিনেমা দেখা, ওয়ার্ল্ড কাপ, ইউরো কাপ দেখা কত স্মৃতি। 

২০১২-তে আমি যখন ব্যাঙ্গালোর ফিরি, ঐ বাড়িটা বার বার মিস করতে থাকি। কতবার যে গুগল ম্যাপ্সে গিয়ে স্ট্রিট ভিউ করে বাড়ির সামনে ঘুরে আসি। ২০১৬ নাগাদ বাড়িটি ভাঙা হয়। ওর জায়গায় নতুন লাক্সারি কমপ্লেক্স তৈরি হয়। আমি ভাবিনি আবার কোনদিন গেন্সভিল যেতে পারব। ২০১৮-তে যাই। প্রথমেই নিজের পুরনো বাড়ির কাছে যাই। বাড়ি আর নেই। আমার সেই বাড়ি হারিয়ে গেছে। আর কোনদিন চাইলেও আমি ফিরতে পারবনা। এখন শুধুই স্মৃতি আর গুগল ম্যাপ্সের টাইমলাইন স্ট্রিট ভিউ। তবু মনে হয় টাইম মেশিন পেলে একবার ফিরে যেতাম সেই ২০১০ এর গেন্সভিল। সেই ১৬ নম্বর বাসে চেপে বাস স্ট্যান্ডে নেমে বাড়ির দিকে হাঁটতাম। 

Sunday, March 14, 2021

নারী দিবস

 "মা বলছিল পুজোর ছুটিতে বেনারাস নিয়ে যেতে, ভালোই হবে বলো?" গাড়িতে উঠেই তপনের প্রশ্ন। 

"হুঁ, গেলেই হয়।" -- একটু অন্যমনস্ক গলায় বলল সঞ্চিতা। তার এই ব্যাপারটা একেবারেই নাপসন্দ। এর আগে যতবার শাশুড়ির সঙ্গে বেড়াতে গেছে ততবারই পুরো প্ল্যানটা উনিই ঠিক করেছেন। সঞ্চিতার যেন কোন মতামতই নেই। আর তপনও মায়ের কথা শুনে চলা ছেলে। আর সত্যি কথা বলতে সেভাবে বেনারাস যাওয়ারও তেমন শখ নেই সঞ্চিতার। বরং কতদিন সমুদ্র দেখেনি। পুরী গেলে হত। 

"তুমিই তো সেদিন বলছিলে কতদিন বেড়াতে যাওয়া হয়না।" 

"হুম, যাওয়া যায় পুজোয়।" এই বলে মিষ্টির প্যাকেটটা শক্ত করে ধরল সঞ্চিতা। ট্যাক্সি ততক্ষণে অনেক দূর চলে এসেছে। তারা যাচ্ছে নিউটাউন। তপনের বন্ধুর বাড়ি। স্কুলের বন্ধু। আজ সেখানে তিন বন্ধুর পরিবার নিয়ে নিমন্ত্রণ। এরা বলে পার্টি। আজকাল কথাগুলো কত পাল্টে যাচ্ছে না? আগে যাকে বলা হত নিমন্ত্রণ, আজ তার নাম পার্টি। আগে যাকে বলত ক্যাপ্সিকাম, আজ তাকে বলে বেল পেপারস। 

জানালার দু ধারে বসে আছে তপন আর সঞ্চিতা। মাঝখানে তাদের মেয়ে রুমা। ভীষণ মিষ্টি দেখতে এই সপ্তম বর্ষীয় বালিকা। নিজের মেয়ে বলে মনে করে না সঞ্চিতা, আসে পাশে পাড়া প্রতিবেশীরাও বলে। তবে সঞ্চিতার একটাই চিন্তা। তার মেয়ে যেন ঠিক ভাবে মানুষ হয়। প্রতি সপ্তাহে যখন তপন মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে তার গায়ে হাত তোলে, তখন হাঁ করে তাকিয়ে দেখে রুমা। কার জন্য কাঁদবে বুঝতে পারেনা। বিয়ের আগে সঞ্চিতা ভাবেনি এরকম হবে। তার ধারণা ছিল সমাজের নিম্নস্তরে এগুলি হয়। কবে যে এর অবসান হবে তার দিন গোনে সঞ্চিতা। দায়িত্ব । বড্ড বড় একটা শব্দ। আচ্ছা, দায়িত্ব কি তার একার? আর কেউ সঙ্গ দেবে না তাকে? কতদিন, আর কতদিন এই প্রতীক্ষা চলবে? 

সঞ্চিতার মিষ্টির প্যাকেট যেভাবে তপনের বন্ধুর বউ তাচ্ছিল্য করে টেবিলে রেখে দিল তাতে সঞ্চিতার বুঝতে বাকি রইল না ওটি আনা ঠিক হয়নি। আসলে এরা সমাজের উঁচু স্তরের। সঞ্চিতারা যাকে বলে নেহাতই মধ্যবিত্ত। সঞ্চিতা নিজে হুগলীর একটা স্কুলে ইতিহাস পড়ায়। তপন একটা প্রেসে চাকরি করে। যে বন্ধুর বাড়ি নেমতন্ন, তার নিজস্ব গ্যারেজের ব্যবসা আছে। 

খানিকক্ষণ বাদেই শুরু হল মদের ফোয়ারা। দুই বন্ধু এবং তাদের স্ত্রীরাও মদ্যপানে ব্যস্ত। তপন একটু বাদেই মাতাল হয়ে গান গাইতে শুরু করল। এর মধ্যে চটুল হিন্দি গান চালিয়ে নাচছে সবাই। সোফার এক কোণে চুপ করে বসে ছিল সঞ্চিতা। তাকে তপনের বন্ধুর স্ত্রীরা মাদক রসে বঞ্চিত করতে চায়না। কিন্তু আজ কঠোর সঞ্চিতা। নিজেকে সংযত রেখেছে। নাচতে নাচতে মাঝে মাঝেই তপনের বন্ধুরা তার হাত ধরে টানছিল। একজন তো বার বার গায়ে পরে যাচ্ছে। রুমা বাচ্চা। সে এসব বোঝে না। সবাই নাচছে দেখে সেও মাঝখানে নাচতে লাগল। মাতালের দল নিজেরা নাচা বন্ধ করে রুমাকে হাততালি দিতে শুরু করে। নিজের মেয়েকে রেয়াত দেয়না তপনও। লজ্জায় কান কট কট করছিল সঞ্চিতার। ইচ্ছে করছিল গিয়ে রুমার গালে কষে একটা থাপ্পড় মারে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে রুমার হাত ধরে টেনে আনল  সে। 


রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ৩ টে বাজল। তপনের বন্ধুরাই ট্যাক্সি ডেকে দিল। তপন মাতাল অবস্থায় অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে। বাড়িতেও কষ্ট করে উঠল। এখন বাবা-মেয়ে শুয়ে আছে। সঞ্চিতা আর ঠিক করল শোবে না। সাতটার ট্রেন ধরতে হয় তাকে। এখন আর শুয়ে লাভ নেই। একা একা বারান্দায় এসে দাঁড়াল সঞ্চিতা। গত তিনদিন বৃষ্টি হয়নি। আকাশটা কেমন থমথমে। সঞ্চিতার মনে পড়ে যাচ্ছিল বহুদিন আগে সে একবার মরুভূমি দেখেছিল। সেই মরুভূমির সামনে দাঁড়িয়ে তার যেন মনে হয়েছিল সকল মানব সভ্যতাই মিথ্যা। এক দীগন্ত বিস্তীর্ন জমি যা কাউকে পরোয়া করেনা। কত শত শতাব্দী জুড়ে এই মরুভূমি এখানে অবস্থিত। যেন বলছে দেখ, আমিই সত্য, আমি ধ্রুব, আমি ঈশ্বর। কলকাতার বাড়ির ভিড়ে সেই মরুভূমির অসীম স্পর্ধা যেন হারিয়ে গেছে। 

এসব ভাবতেই ভাবতেই সঞ্চিতার ফোন বেজে উঠল। নম্বরটা দেখা যাচ্ছেনা। 

"হ্যালো" 

"শোন,  তৈরি হয়ে নাও। আধ ঘণ্টার মধ্যে আমরা আসব। জিনস আর একটা টপ পরে চলে এস। জিনিসটা আছে তো?" 

"হ্যাঁ, কিন্তু মাত্র আধ ঘণ্টা।" 

"হ্যাঁ, আর শোন, মেয়েকে আদর করতে যেও না। ওর ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমরা সমস্যায় পড়ব। আমাদের হাতে সময় নেই।" 

"একবারও না?" 

"না, একবারও না। চিন্তা করো না। তোমার মেয়ে ভালো থাকবে, আমরা দায়িত্ব নেব।" 

"আচ্ছা, আমি তপনকে একটা শাস্তি দিয়ে যেতে চাই।" 

"না, আমরা চাই না এসবের মধ্যে পুলিশ কেস হোক। কথা দিচ্ছি, যদি তুমি আমি দুজনেই বেঁচে থাকি, প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ তোমায় দেব। এবার রাখছি, আমাদের হাতে সময় নেই। তোমার বাড়ির সামনে একটা হিরো হোন্ডা বাইক থাকবে। উঠে পড়।"

চটজলদি নিজের পোশাক পরিবর্তন করল সঞ্চিতা। উফ, অবশেষে মুক্তি। এবার নিজের আলমারির গয়নার বাক্সটা খুলল সে। এই জায়গায় শাশুড়ির অধিকার নেই। জড়োয়ার সেটের বাক্সটা খুলল। তার বিয়েতে এটি উপহার দেওয়া হয়েছিল। সবাই অবাক হয়েছিল এত দামী গয়না কে দিল, কেউ বুঝতে পারেনি, নাম লেখা ছিলোনা। শুধু সঞ্চিতা জানত। উপরের  ডালাটা সরাতেই নিচের খালি জায়গাটাই দৃশ্যমান হল একটি মসকিউটো। মশা না, বন্দুক। 

বেরিয়ে আসার সময় রুমার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখে জল এল সঞ্চিতার। স্যার যখন বলেছেন, রুমা ঠিক থাকবেই। 

বাইকটা তাকে নামিয়ে দিল একটা বড় বাসের সামনে। বাস না বলে ভ্যানও বলা যায়। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন সেই মানুষটি যাকে এতবছর বাদে দেখে আবার চোখে জল এল সঞ্চিতার। 

"স্যার কেমন আছেন?" প্রণাম করল সঞ্চিতা। 

"ভালো, এতদিন আন্ডার কভার ভালো লাগল?"

"আপনি তো সবই জানেন।" 

"জানি, বেশ, আলাপ করো। এরা হল সুমেধা, আলম, তমাল আর অঙ্কিতা।" 

"হাই।" 

"বেশ সঞ্চিতা, এবার তো তোমাকে ঘুমোতে হবে।"

"স্যার, আমার ঘুম পাচ্ছে না। " 

"তোমার ঘুম না পেলেও ঘুমোতে হবে সঞ্চিতা। 'অগ্নীশ্বর"-এ উত্তমবাবু যেমন বলেছিলেন, 'দেশের আগে কিচ্ছু না'। ঘুমও না। কাল তোমার অনেক কাজ। দাঁড়াও একজনের সাথে তোমার দেখা করাই। দেখো তো চিনতে পারছ কিনা?"

"আরে ডাক্তার সেন?" 

"হ্যাঁ, সেই রেশমি সেন। রেশমি, সঞ্চিতাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও। সবাই গাড়িতে ওঠো। অনেকটা পথ যেতে হবে।" 

গাড়ির মধ্যেই একটা বিছানা ছিল। ইনজেকশন পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত হল সঞ্চিতা। গাড়ী তখন দিল্লী রোড ধরে ছুটেছে। 


সঞ্চিতার ঘুম ভাঙ্গল এক বিছানায়। কোন একটা ঘরে সে শুয়ে আছে। এখানে কী করে এল সে নিজেও জানে না। নিশ্চয় স্যার এনেছেন। ঘরের বাইরেই একটা বারান্দা। বারান্দায় এসে দেখল সূর্য মধ্যগগন থেকে অস্তগামী। হাতঘড়ি দেখে বুঝল এক দিন হয়ে গেছে। গতকাল এই সময় সে স্কুলে মেয়েদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজীর ভূমিকা পড়াচ্ছিল। আর আজ এ কোথায় সে। 

পাশেই সিঁড়ি। নিচে নামল সঞ্চিতা। একটা বড় দালান মত জায়গায় সকলে বসে চা খাচ্ছে। 

"গুড আফটারনুন, তুমি কখন উঠেব সেটাই ভাবছিলাম।"

"এটা আমরা কোথায় স্যার?"

"এটা, মাই ডিয়ার সঞ্চিতা হচ্ছে বেনারাস।" 

Friday, February 5, 2021

শিমুলতলা

 আজ ঠাণ্ডাটা একটু কম। তাই বারান্দায় এসে বসলাম। নইলে রোজ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। ডাক্তার বারণ করেছে। কবিতা বিকেলে এসে আমাকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখলে বকা দেয় --  

"দাদাবাবু, আপনাকে কতদিন বারণ করেছি এভাবে একা বসে থাকতে?"

হাসি পায়। মনে হয় যেন কবিতা আমার গুরুজন। হাসি। বলি -- 

"কি আর হবে, খুব বেশী হলে কয়েকদিন কম বাঁচব তাই তো?" 

"তুমি এসব কথা বলবে না দাদাবাবু, দুপুরে ওষুধ খেয়েছিলে?" 

সম্মতি জানাই। কবিতাও জানে আমি আর বেশিদিন নেই। শুধু কবিতা কেন, পাড়ার সকলেই জানে। ডাক্তারবাবু বলতে চাননি, কিন্তু একদিন বলে ফেলেছিলেন। আর খুব বেশী হলে মাস দুয়েক। আমার বাড়ির সামনে একটা শিমুলগাছ আছে। আর কয়েকদিন বাদেই ফুল হবে। খুব সুন্দর লাগে যখন শিমুলফুল ফোটে। আমাদের বাড়ির চারিদিকটা যেন  রাঙিয়ে যায়। কেন যে আমাদের বললাম কে জানে? তনিমাও নেই, আমিও আর কিছুদিন বাদে থাকব না। এই  বাড়িটার কি হবে কে জানে!! হয়ত সরকার নিয়ে নেবে। আমার কোন উইল করা নেই। ডাক্তারবাবুর কাছ থেকে শোনার পর ইচ্ছে হয়েছিল করি। কিন্তু তারপর মনে হল কেন করব? কে দেখবে? ধুর। এবার যখন শিমুলফুল ফুটবে, আমি থাকব না। 

পাড়ার লোকে আমাকে আমার অসুখের জন্য দয়া করেনা। অসুখের কথা খুব বেশীদিন জানেনি সকলে। এরা আমাকে দয়া করে তনিমার জন্য। তনিমা আর নেই আমার সঙ্গে। কোথায় আছে, কেন নেই এরা কেউ জানে না। আমার এই অসুখের মধ্যেও আমাকে ফেলে চলে গেছে এটা শুনে পাড়ার লোকে নিন্দা করে। শুনি।  এক দু'বার বলতে গেছি -- "থাক না, আর বলে কি হবে?" পরে দেখেছি এরা বলতে ভালোবাসে। আমার প্রতি সহমর্মী হয়ে নয়, যেন নিজেদের ভালোবাসা থেকেই বলে। তাই আমি আর আজকাল প্রতিবাদ করিনা। সকলের জীবন আমার মত শান্ত নয়। কারুর চাকরিতে অশান্তি। কারুর ছেলে বখে যাচ্ছে। কারুর বাড়িতে জলের সমস্যা। এসবের থেকে শান্তি পেতে যদি কাউকে গালাগাল করতে হয়, করুক না। যতই সে আমার ভালোবাসার পাত্রী হোক। 

এই শীতের বিকেলে বারান্দায় বসে থাকতে বেশ লাগে।  স্কুলে পড়া ছেলে মেয়েরা সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরে। কেউ কেউ হয়ত এখন টিউশানে বেরোবে। কি  অদ্ভুত না, আমি যখন ছোট ছিলাম, কেউ  টিউশানে পড়লে সেটাকে খারাপ ভাবে দেখা হত। আর এখন টিউশানে না পড়লে নাকি চলবেই না। আচ্ছা আমি টিউশানে পড়লে খরচা কে দিত? বাবার তো আমার স্কুলের টাকা দিতেই কষ্ট  হত। জলপানি পেয়ে শেষের চার বছর চালিয়েছি। তারপর যখন কলেজে ভর্তি হলাম, তখন নেহাত কিছু টিউশানি  শুরু করেছিলাম। যাদের পড়াতাম, কেউ পদের না। তাই সবসময় মনে হত টিউশানি যারা পড়ে, তারা নেহাতই নির্বোধ। তবে টিউশানিতে খুব সুবিধা হত। শুধু কলেজের মাইনে আর হাতখরচা না, রোজ বিকেলে ভালমন্দ জলখাবার পেতাম। তবে তখনও শীতে পড়িয়ে ফিরতে খুব কষ্ট হত। আমাদের এই জেলা শহরে ভালোই ঠাণ্ডা পড়ে। মাথা দিয়ে মাফলার জড়িয়ে সাইকেলে তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরতাম। বাড়ি ফিরেই গরম গরম চা। তখন জীবনে কত উৎসাহ, কত স্বপ্ন। তখন কি জানতাম জীবন মানে রোজ বিকেলে জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ভাবা -- কালকে এ দৃশ্য দেখা হবে তো? 

এই বাড়ির একতলার ঘরগুলি বন্ধ আজ বহু বছর। মাঝে মাঝে কাউকে দিয়ে পরিষ্কার করাই। আবার বন্ধই থাকে। সেদিন সিঁড়ি দিয়ে নেমে কষ্ট করে শিমুলগাছের তলায় গেলাম। পরে কবিতা জানতে পেরে ভীষণ রাগ করেছিল। একা একা গাছটাকে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ডাকলাম 

"কোথায় তুমি? এসো।" 

কেউ এলোনা।  দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ি ফিরলাম।  প্রায় ন্যাড়া এই শিমুলগাছটার দিকে বার বার চেয়ে থাকি। প্রতিদিন ভাবি সে এসবে। সে এসবে আমাকে নিয়ে যেতে। তাহলে আমার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হবে। হয়ত শিমুলগাছে ফুল  দেখা হবেনা এবার। দরকার নেই। সে এলেই আমার মুক্তি। কিন্তু সে আসেনা। 


কেন তনিমা? কেন আসোনা?  আমাকে কবে মুক্তি দেবে? আমি যে নিজের হাতে তোমাকে ঐ শিমুলগাছের নিচে পুঁতে দিয়েছিলাম। তুমি কেন আসছ না। আমাকে নিয়ে যাবে না তোমার কাছে? 


Sunday, January 17, 2021

স্বাধীনতা

 এ এক অন্য সময়ের গল্প। যখন বিজন ভট্টাচার্যর নবান্নের চরিত্ররা শহরের পথে ঘাটে ঘুরে বেড়াত। যখন কলকাতার রাস্তায় "ফ্যান দাও" বলে লোকে ডাক দিত। যখন হয়ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় "কেড়ে খায়নি কেন" লিখছিলেন। যখন স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে হিটলার পরাজয় স্বীকার করছিলেন। যখন চার্চিল সাহেব বার বার ভারতীয়দের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করেছিলেন, যাতে ইউরোপীয়দের বাঁচানো যায়। যখন প্লুটোনিয়াম তৈরি করতে তামাম মার্কিন দেশের বিজ্ঞানীরা প্রাণপাত পরিশ্রম করছিলেন। 

এমতবস্থায় তমলুক শহরে একদল বাঙালির একদিন সভা বসল। সভাপতি শ্রী তপন সেন। কলকাতায় পড়াশুনো করতে করতে গান্ধীজীর দলে নাম লেখায়। তারপর একদিন গান্ধীজীর আদর্শে তার বিশ্বাস চলে যায়। মনে হয় নেতাজী সুভাষ বোসের দলে নাম লেখাবে। কিন্তু ততদিনে সুভাষবাবু জাপানে। এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই সিঙ্গাপুরে প্রথম স্বাধীন ভারত সরকার গড়ে ওঠে। তপন কিন্তু এই সভায় অন্য কারণে এসেছে। তার দলে আজ গোটা বিশেক বাঙালি ছেলে। সকলেই দেশ স্বাধীন করায় উদগ্রীব। 

"বন্ধুগণ, আজ দেশের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন। একেই আমরা পরাধীন। তার উপর ব্রিটিশ সরকারের নিয়মে দেশে হাজার হাজার মানুষ অনাহারে মরছে। কলকাতার রাস্তাঘাট পুরো শ্মশান। আমাদের গ্রামে গ্রামে লোক মরছে। গান্ধীজীর অহিংসার নীতি কাজ করছে না। ব্রিটিশরা এখন যুদ্ধে ব্যস্ত। ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেবার কথা ওরা কল্পনাও  করতে পারবেনা। নেতাজী সুভাষ বোস  জাপান থেকে চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাও হয়ত সময় লাগবে।"

এবার একটু থামল তপন। একবার চোখ বুলিয়ে নিল সকলের উপর। সবাই এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে।  

"আমাদের এখন প্রথম দায়িত্ব দেশের লোকের ক্ষুধা নিবারণ করা। দেশের লোককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। লোকে না বাঁচলে দেশ কোনদিন স্বাধীন হবেনা। আপনারা কি এই প্রকল্পে আমার সঙ্গে আছেন? মনে রাখবেন, আপনারা সকলে মেদিনীপুরের ছেলে। আমাদের গায়ে ক্ষুদিরামের রক্ত, বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনীর রক্ত। আমরা কখনো চুপ করে বসে থাকিনি, আজও থাকবনা।"

তারপর তপন  নিজের পরিকল্পনার কথা জানাল সকলকে। প্রথমে কয়েকজন চমকে উঠল। কয়েকজন ভিমড়ি খেল। কয়েকজন পরিষ্কার বলে দিল তারা দলে থাকবেনা। 

"আমি ব্রাম্ভন সন্তান হয়ে এ কাজ করতে পারব না।" --  জানাল সূর্য মুখুজ্যে। 

"বন্ধুগণ, আপনাদের সকলকেই আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল আজকে এলে আপনাকে দলের সঙ্গেই থাকতে হবে। কারণ আমাদের অত্যন্ত সবাধানী হতে হবে। আপনারা দলে না থাকতে চাইলে বাইরে গিয়ে সবাইকে বলে দিতে পারেন।  আমরা সেই ঝুঁকি নিতে পারবনা। তাই দেশের স্বার্থে  আপনাদেরকে আর বেঁচে থাকতে দেওয়া যাবেনা। এবং..." 

"না।"  এবার চমকে উথল সূর্য। 

অবশেষে কুড়িজনই একমত হল। এরপর  একদিন পরিকল্পনা মাফিক মেদিনীপুর থানার সামনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকল তপনের দল। পুলিশের গাড়ি করে বাড়ি ফিরছিলেন সুপার গিবসন, ইন্সপেক্টর রায় ও দুজন কনস্টেবল। গাড়ির চাকা আগে থেকেই পাল্টে দেওয়া ছিল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই চাকা ফেটে গাছে ধাক্কা মারল গাড়ী। রায় তৎক্ষণাৎ মারা গেলেন। গিবসন ও দুই কনস্টেবল বেরিয়ে আসা মাত্রই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তপনের দল। তাঁদের আয়ু বেশিক্ষণ থাকলনা। 

"তপনদা, এরা বাঙালি মনে হচ্ছে। এদের অন্তত ছেড়ে দাও।"

"কি লাভ?" 

সূর্য আর প্রশ্ন করতে পারেনি। 

পরেরদিন যখন নন্দীগ্রামের বহু পরিবার অনাহারে প্রায় মরতে বসেছে, তাদের কাছে খাদ্য নিয়ে গেল তপনরা। ভাত খুব বেশী জোগাড় করতে পারেনি। তবে প্রচুর মাংস। অনাহারে জীর্ণ, কঙ্কালসার মানুষগুলি  যেন জন্তুর মত খেতে লাগল। তপনের চোখে জল। 

সেই সময় মোট ৫০ জন মত পুলিশকর্মী মেদিনীপুরে গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন। কোন বিপ্লবী দল তাদের মারছে কিনা বোঝার জন্য কলকাতা থেকে সি আই ডির এক পুলিশ আসেন। পরে তাঁকেও পাওয়া যায়না।  

একদিন সিধু তপনকে প্রশ্ন করে -- "তপনদা, এটা অন্যায় হচ্ছে না?" 

"মানুষ বাঁচলে তবে তো ন্যায়। মনে রাখিস, সবার আগে  বেঁচে থাকা।" 


Thursday, December 17, 2020

মফঃস্বলের প্রেম -- ৩

 ট্রেন থেকে নেমে আস্তে আস্তে হেঁটে ওভারব্রিজের কাছে এলেন অভয়বাবু। বহুদিন পরে এলেন। আগে হলে তরতরিয়ে উঠে যেতেন। এখন আর পারবেন না। এক ধার ধরে ধীরে ধীরে ওঠাই শ্রেয়। সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। আজ আকাশ ফরসা। বর্ষা শেষ। ক'দিন বাদেই পুজো। কলকাতার রাস্তাঘাটে পুজোর বাজারের ভিড়। এই মফঃস্বলে কি অবস্থা কে জানে? 

সুবিনয় ছাড়া আর কোন বন্ধু এখানে থাকে না। সুবিনয় নিজের পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছে। বলেই দিয়েছে -- "স্টেশনে নেমে রিক্সাকে বলিস ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউজ। ঠিক নিয়ে এসবে। দোকানের পাশেই বাড়ি। আমি তোকে নিয়ে যাব। তবে তুই সকালে আয়। বয়স হয়েছে। রাতে অসুবিধা হবে না?"

"না  না, চিন্তা করিসনা। ঠিক পৌঁছে যাব।"

আসলে সকালে যে আসতে পারতেন না তা নয়। সকালে তেমন কাজ ছিলনা। কিন্তু তিনি এই সন্ধ্যাবেলাই আসতে চেয়েছিলেন। তিনি তো সন্ধ্যাবেলাই আসতেন। কলেজে ক্লাস না থাকলে দুপুরের দিকে বাসে চড়ে সোজা হাওড়া স্টেশন। তারপর ট্রেনে নিজের বাড়ির স্টেশন আসতে আসতে সন্ধ্যা নামত। তখন মোবাইল ছিল না। রওয়ানা হওয়ার আগে শুক্রবার বিকেলে বাস স্ট্যান্ডের পাশের বুথ থেকে ফোন করে দিতেন। 

ট্রেন থেকে নেমে যখন ওভারব্রিজে উঠতেন, তখন আকাশে  আলো নেই। কিন্তু তাঁর জন্য মুখ আলো করে দাঁড়িয়ে থাকতেন আলোদেবী। আলো রায়। পাশের পাড়ায় বাড়ি। তখনো ক্লাস টুয়েলভে পড়েন। সারাদিন ক্লাস, বাস জার্নি, ট্রেন জার্নির ক্লান্তি এক নিমেষে মুছে যেত অভয়বাবুর। 

আলোদেবী লেবু লজেন্স খুব ভালোবাসতেন। তাই ট্রেনে কিনে রাখতেন অভয়বাবু। ওভারব্রিজে উঠেই সেই  প্যাকেটটি হস্তরান্ত হত। একসাথে হাঁটতেন দু'জনে স্টেশনের বাইরে রাখা সাইকেল স্ট্যান্ড অবধি। মনে আছে আজও হাত ধরতেন না। পাছে কেউ দেখে ফেলে। কিছু বলে। কেউ শোনে। যদি আর  দেখা না হয়। 

সাইকেল নিয়ে দুজনেই চলে আসতেন বিলুদার দোকানে। এই দোকানে জোড়ায় জোড়ায় কপোত কপোতী আসত। তাই তাঁদের আলাদা করে চিনতে পারা  শক্ত। দুজনে দুটো এগ রোল নিয়ে বসতেন। মনে পড়ে সেই দিনটার কথা, যেদিন তিনি এক অন্য স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন -- 

"জানো, জয়েন্ট নিয়ে খুব চিন্তায় থাকি। যদি না পাই, তোমার মত ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবনা।"

"কেন পাবে না? তুমি তো সুধীনবাবুর কাছে অঙ্ক করছ। উনি যখন বলেছেন তুমি পাবে,  তখন পাবেই। আরে তুমি গার্লস স্কুলের সেকেন্ড। তুমি পাবে না?"

"যদি না পাই?"

"পরের বছর চেষ্টা করবে। তোমার যখন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছে, নিশ্চয় হবে।"

"কে জানে। দেখি।"

"দেখো তুমি ইঞ্জিনিয়ার হলে না আমরা দুজনে একই কোম্পানিতে চাকরি করব। তারপর অনসাইটে যাব।"

"সেটা কি?"

"আরে আমিও নতুন শিখলাম। অনসাইট মানে হচ্ছে বিদেশ যাওয়া। জান আমার ইচ্ছে আমরা প্যারিস যাব। আইফেল  টাওয়ারের ছবি দেখেছ তো?"

"না  বাবা,  আমি অত দূরে যাব  না। আমি বলে আজ পর্যন্ত কলকাতাই গেছি জীবনে একবার। ওখানে গিয়ে পড়তে হবে শুনলেই  ভয় করে। আমি প্যারিস যাব না। তার চেয়ে বরং দেখো না, এখানেই যদি কোন চাকরি পাওয়া যায়, আমরা রোজ অফিসের পর বিকেলে বিলুদার দোকানে রোল খেয়ে ঐ অজয়ের  ধারে গিয়ে  বসব।" 

"ধুর, কোথায় আইফেল আর কোথায় অজয়!!"

"আমার এই ভালো লাগে জানো, এই রিক্সা, সাইকেল, বিলুদার দোকান,  অজয় নদী, তোমার পাশে থাকা।" 


বিলুদা আজ বহুদিন মারা গেছেন। গতবছর স্ত্রীর মৃত্যুর পর অভয়বাবু বুঝতে পারলেন আস্তে আস্তে তার স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেক ঘটনাই মনে পড়ে না। পাছে এই ওভারব্রিজের ঘটনাগুলি ভুলে যান, তাই তড়িঘড়ি করে এলেন এতদিন বাদে। যদি কিছু মনে পড়ে। এরম করে আস্তে আস্তে তো সারা জীবনটাই একদিন ভুলে যাবেন। 

অনেকক্ষণ  ওভারব্রিজের উপর ধীরে ধীরে হাঁটলেন অভয়বাবু। কেউ কেউ ধাক্কা মারল। "একটু সরুন দাদু" থেকে "এক্সকিউজ মি", সবই শুনলেন।  তবু কিছুতেই মনে পড়লনা। অথচ খবরটা শুনে এই ওভারব্রিজেই এসেছিলেন অভয়বাবু, সেটা মনে আছে। আলোদেবী বিয়ের পর ঘাটশিলা না বালুরঘাট কোথায় গিয়েছিলেন, একদম মনে পড়ল না। 


Monday, November 23, 2020

অপুর সংসার ও বিকেলবেলা

 অপুর সংসার দেখছিলাম। সৌমিত্রবাবু চলে গেছেন বলে আর একবার। অত্যন্ত প্রিয় সিনেমা এটি। যাই হোক, লক্ষ্য করলাম  সিনেমার বেশিরভাগ বড় ঘটনাই  বিকেলবেলা। কিছু কিছু আমি নিজের মনে কল্পনা করে নিয়েছি। সাদা কালো ছবি, তাই বিকেলবেলা ভাবতেই পারা যায়। 

প্রথম যখন অপুর সাথে পুলুর দেখা হয়। মনে করে  দেখুন। কলকাতায় নিজের ভাড়া বাড়িতে ছেঁড়া গেঞ্জি পরে বসে ছিল অপু। হয়ত তখন এক গরমের বিকেল। বিকেলে তেমন হাওয়া নেই, ভ্যাপসা গুমোট। ছাদেও হাওয়া ছিলনা নিশ্চয়। নাহলে অপু তো ছাদে থাকত। এই সময় পুলুর আগমন। 

আবার খুলনায় সেই বিকেলটার কথা। সেটি বিকেল না হয় অবশ্য দুপুরে হতে পারে। তবে কিনা বিয়েবাড়ির মধ্যে দুপুরে খেয়ে দেয়ে ঘুমোতে গেলে বিকেল হয়েই যায়। অপর্ণার বরও তো সেই সময় এসেছিল। অপু নদীর ধারে একটি বই মাথায় দিয়ে শুয়ে। হাতে বাঁশী। হয়ত খানিকক্ষণ আগেই বাজাচ্ছিল। এমনি খুলনায় কলকাতার মত অত লোকজন নেই। তায় নদীর ধার। সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। গাছের স্নিগ্ধ ছায়ায় শুয়ে অপুর হয়ত নিশ্চিন্দপুরের কথা মনে পড়ছিল। নদীতে মাঝির গান শুনতে শুনতে হয়ত ভাবছিল নিজের পরিবারের কথা, ছোটবেলার বন্ধুদের কথা। এই সময় পুলু তার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। 

অপর্ণার সঙ্গে অপুর শেষ দেখাও পড়তি বিকেলে। প্রায় সন্ধ্যাবেলা। তখন সবে সূর্য ডুবেছে। ট্রেন ছাড়ছে। স্টেশনের ভিড়, লোকের ঠেলা, চা-ওলার আওয়াজ, কয়লার গন্ধ, সব মিলিয়ে এক আলাদা বিকেল যেন। তার মধ্যে অপুর চোখে আটকে আছে অপর্ণার কাজল কালো চোখ। 

অপর্ণার মৃত্যুসংবাদটিও অপু পায় এক বিকেলবেলা। সারাদিন অফিস করে অপর্ণার চিঠি পড়তে  পড়তে  হাসি মুখে বাড়ি এসে দরজা খুলতে গিয়ে দেখে ছাদে মুরারি দাঁড়িয়ে। সেটা বোধহয় শীতকাল। মুরারি শাল গায়ে দিয়েছিল। শীতের বিকেল বড় হয়না, বড্ড কষ্ট দেয়। ফাটা ঠোঁট, শুকনো গা, তার উপর অপর্ণার বিয়োগ, যেন সব কিছুতেই এক অনুপস্থিতিকে  প্রকট করছিল। শীতকালে চড় খেলে লাগে বেশী। বেচারি মুরারি। 

এরপর আসা যাক নাগপুরের কয়লাখনিতে। পুলু যখন অপুকে নিজের ছেলের কথা বলতে আসে। সেটি শীতকাল। তার উপর নাগপুরের ঠাণ্ডা। কেন নিজের ছেলেকে দেখতে পারেনা বলতে গিয়ে সেই  অনুপস্থিতি বার বার যেন অপুকে বিঁধছিল। জানে ভুল  করছে, যা করছে তার কোন যুক্তি নেই। তাও করছে।  পুলু চলে যাওয়ার পর যখন ঐ শীতের মধ্যে ঐ উপত্যকায় একা একা পুলুকে ডাকছিল,  যেন মনে হচ্ছিল কারোর অনুপস্থিতি না, কোন দোষ না, শুধু যেন একাকীত্ব তাকে বার বার গ্রাস করছে। দিদি, বাবা, মা, স্ত্রী, এই একাকীত্ব তাকে যেন ছাড়ছেই না। 

খুলনায় আর এক বিকেল।  অপু এসেছে নিজের ছেলেকে দেখতে। ছেলে শুয়ে আছে। জ্বর। অপু বিছানার পাশে এক কেদারায় বসল। জানালা খোলা। ভাটিয়ালি গানের সুর ভেসে আসছে নদী থেকে। ছেলেটিকে দেখে অপুর কী মনে পড়ল কে জানে। হয়ত নিজের ঐ বয়সের কথা। নিশ্চিন্দপুরে দিদির সাথে খেলত। অথবা নিজের স্কুল জীবনের কথা। যখন ছুটি হলে অপু বাড়ি ফিরতে পারতনা। একা বোর্ডিং-এ বসে থাকত।  

বিয়োগব্যথা, অনুপস্থিতি, একাকীত্ব, অপুর সকল অভিমান যেন মিশে গেছে বিকেলবেলায়। 

Wednesday, October 28, 2020

একাকীত্ব আর মেঘলা আকাশ

 গত ক'দিন ধরে ডালাসের আকাশ মুখ গোমড়া করে আছে। তার মধ্যে বেশ ঠাণ্ডা আর সঙ্গে বৃষ্টি। গতকাল তো সকালে -১ সেলসিয়াস ছিল। দুপুরে মিটিঙের ফাঁকে কফি নিয়ে সোফায় বসে বাইরের দিকে চেয়ে থাকি। ঠাণ্ডায় বারান্দায় যেতে পারিনা। পর্দা সরানো থাকে। কাঁচের ফাঁক দিয়ে তাকাই। বৃষ্টি থেমে গেলে চারদিক কেমন যেন থম থম করে। বাড়ির সামনে লাল হয়ে যাওয়া পাতা যেন ভয়ে কাঁপছে। আশেপাশে লোকজন কম। শুধু কিছুই গাড়ি। তার মধ্যে আরোহীকে দেখা যায়না। তাই  মনে হয় যেন এক রোবট যুগে আছি, যেখানে শুধুই যন্ত্র। 

এই মেঘলা দিনে একাকীত্ব কিন্তু বেশী করে দানা বাঁধে। প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা সেই কষ্টকে বাড়িয়ে দেয়। কোথাও যেন ভালোবাসা আর অধিকার এক হয়ে যায়। পুরোন স্মৃতি, কিছু অনুশোচনা, আর বার বার ভুল শুধরে নেওয়ার ব্যর্থ ইচ্ছে। মায়া। ভালোবাসা, অধিকার না মায়া। ছোটবেলায় এক টাকার মৌরি লজেন্সের সঙ্গে পাওয়া প্লাস্টিকের স্কুটারের চাকা ভেঙ্গে গেলে কেঁদে ভাসাতাম। আজ হেলায় এক বছরের পুরনো দামী মোবাইল ফোন পাল্টে ফেলি। 

মেঘলা দিনে একা হতে চাওয়ার আকাঙ্কা সবার হয়না। কেউ কেউ আবার এর থেকে বেরোতে চায়। মন  খারাপ লাগলে চেষ্টা করে কীভাবে ভিড়ে মিশে যাওয়া যায়। নিজের অস্তিত্বের বৈধতা রক্ষার দায় এসে যায় মনের গভীরে। তাও ভালো এখন সোশাল নেটোয়ার্ক আছে। নিজেকে ভেঙ্গে, নতুন করে সংগঠন করে, একা না হতে চাওয়া, সবাইকে বলা "এই দেখো, আমি আছি, আমাকে দেখো"  -- নিজের জীবনের প্রতিপাদন দরকার পরে। 

তবু আমাদের মত লোকেরা বাঁচে, ভাবে কবে ঐ মেঘলা আকাশ এসবে। কারুর কাছে না, নিজের কাছে নিজের কষ্ট মেলে ধরবে। একা থাকবে। একাকীত্বের সুখ সকলে বোঝেনা। 

Tuesday, October 6, 2020

পাতাঝরা বিকেলবেলা

 ডালাস শহরে এক বছর হয়ে গেল। যা বুঝেছি, এই মরুভূমির দেশে মে আর অক্টোবার হচ্ছে সবচেয়ে বাসযোগ্য। এখানে গরমটা একটু দেরী করে আসে, তাই মে মাসটা বেশ সুন্দর। এদিকে মে মাসে নীল রঙের একটি ফুল হয় -- নাম ব্লুবনেট। অক্টোবারে গরমটা চলে যায়, কিন্তু শীত আসেনা। হাল্কা একটা ঠাণ্ডা হাওয়া দেয়। রাতে একটা হাল্কা চাদর গায়ে দিয়ে শুতে হয়। বেশ লাগে। 

আমাদের কমপ্লেক্সে একটা বড় হাঁটার জায়গা আছে -- যাকে এদেশে বলে ওয়াকিং ট্রেল। আমি রোজ বিকেলে সেখানে হাঁটতে যাই, মাস্ক পরে। আজ সকালে একটু সময় ছিল বলে গেলাম। হাল্কা মিঠে একটা রোদ ছিল। বেশ লাগছিল গায়ে রোদের আমেজ। ওদিকে একটি ডগ পার্ক আছে। এক ভদ্রলোক তাঁর পোষা কুকুরটাকে নিয়ে এসেছিলেন। কুকুরটি আমাকে দেখেই পার্কের ভিতর থেকে চেঁচিয়ে উঠল, আমার সঙ্গে খেলতে চায়। আমি হাঁটছি দেখে পার্কের ভিতরে দৌড়াতে আরম্ভ করল। 

পার্কের হাঁটার রাস্তাটা সোজা নয়। সর্পিল। পাশের মাঠে কিছু ছোট ছোট ফুল হয়েছে। কী ফুল নাম জানিনা। একটু দূরে একটা কাঠবেড়ালি ছুটে গেল। ক'দিন আগে হলে খরগোশ-ও দেখতাম। আজকাল ওগুলি আর আসেনা। ঠাণ্ডা পড়ছে বলে বোধহয়। উত্তরের মত এখানে পাতায় এখনো তেমন রং আসেনি। তাও কিছু কিছু পাতায় হাল্কা লাল আভা। আমাদের এই পার্কের পিছনে একটা রেললাইন। তেমন কোন ট্রেন যায়না, দিনে ১-২ বার শুধু মালগাড়ি যায়। আজকে আমি যখন হাঁটছিলাম, একটা মালগাড়ি গেল। মনে পড়ে গেল, বর্ধমানে দূর্গামাসিদের বাড়ি যখন যেতাম, আমি ট্রেন দেখার জন্য পাগল ছিলাম। ওনাদের বাড়ির খুব কাছেই ট্রেন লাইন। ছাদ থেকে পরিষ্কার দেখা যেত। একবার আমি মালগাড়ি দেখছি, মেসো বললেন -- "এটা তো শুধুই মালগাড়ি।" আমার তাতেই আনন্দ। কত বড় মালগাড়ি, শেষ আর হয়না। 

বিকেলবেলা পড়ার ফাঁকে একটু চা নিয়ে বারান্দায় গেলাম। পাতাঝরার দিনে আমাদের কমপ্লেক্সের যাঁরা মেন্টেনেন্সের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের কাজ বেড়ে যায়। রোজ বিকেলবেলা পাতা পরিষ্কার করেন। এই সময়টা সূর্য ঘুরে যায়। গাছের একদিকে আলো আসে, অন্যদিকে ছায়া। বেশ লাগে দেখতে। মনে আছে, এইরকম হাল্কা শীতের দুপুরে বর্ধমানে মা আমাকে কমলালেবু খেতে দিত। শীত পড়লেই বাড়িতে কমলা হাজির। যখন খুব ছোট মা একটা জুসারে কমলার জুস বানিয়ে দিত। তখনকার দিনে একটা ছোট টিফিন বক্সের মত জুসার পাওয়া যেত। উপরটা ত্রিকোণের মত। মাঝে খাঁজ। টক লেবু হলেই বলা হত ওগুলো নাগপুরের। আজও বুঝি না নাগপুরে কি শুধুই টক লেবু পাওয়া যায়? 

পরশু সুপারমার্কেট থেকে কিছু কমলা কিনেছিলাম। বলা বাহুল্য একটাও নাগপুরের না। একটা খেলাম। পোস্টম্যান ভদ্রলোক চলে গেলেন দেখে মাস্ক পরে লেটারবক্স থেকে চিঠি আনতে গেলাম। দেখি একটা ছেলে বেরোচ্ছে। আমাদের কমপ্লেক্সে অনেক ছাত্র ছাত্রীরাও থাকে। এই ছেলেটির মুখ দেখে মনে হল আমাদের দেশের কেউ। বাচ্চা ছেলে, হাল্কা হাল্কা দাড়ি মুখে। হাতে দেখলাম একটা নীল খাম। একবার চোখ যেতেই দেখি খামের উপর লেখা, "ফ্রম মধুছন্দা রায়।" 

Wednesday, July 29, 2020

মফঃস্বলের প্রেমঃ ২

সকালবেলা হাওড়া যাওয়ার লোকাল ট্রেন যখন আওয়াজ করে রওয়ানা দেয়, কুসুম বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে শব্দ শোনে। তারপর ঘরে এসে পেপারে চোখ বোলাতে বোলাতে রত্না এসে যায়। রত্না তাদের বাড়ি কাজ করে। সকালটা রত্নার সঙ্গেই কেটে যায় কুসুমের। রত্নার বাসন মেজে, ঘর ঝাড় মোছ করে, কাপড় কেচে, ফার্নিচার মুছে যেতে যেতে প্রায় বেলা এগারোটা-বারোটা। কুসুম তার আগেই রান্না বসিয়ে দেয়।  রত্না আবার বিকেলে আসে। তার মাঝে তার গল্প চলতে থাকেই। আড়ালে রত্নাকে শেওড়াফুলি গেজেট বলে ডাকে পার্থ। রত্না গেলে স্নান খাওয়া করে পেপার নিয়ে বসে। কোন কোনদিন বাড়িতে মাকে চিঠি লেখে কুসুম। দুপুরে ঘুমোয় না। দুপুরে ঘুমোলে সকালে উঠতে দেরী হয়। পার্থর অফিস যাওয়ার আগে সকালের জলখাবার করে দেওয়া হয়না। লাঞ্চটা পার্থ অফিসেই খায়। বহুদিনের অভ্যাস। কুসুম যে সকালে উঠে রান্না করতে পারেনা তা নয়, কিন্তু পার্থর ঐ শক্তিদা, রঘুদাদের সঙ্গে অফিস ক্যান্টিনে বসে না খেলে নাকি হয়না।

সদ্য দু'মাস হল বিয়ে হয়েছে কুসুমের। তার বাড়ি অন্ডাল। বিয়ের পর পার্থর সঙ্গে সংসার করতে এই শেওড়াফুলিতে এসেছে কুসুম। স্টেশনের কাছে সরকারপাড়ায় বাড়ি। বাড়িটি তৈরি করেছিলেন পার্থর বাবা। ছোট একতলা বাড়ি। তিনটি ঘর। এ ছাড়া আছে একটি রান্নাঘর ও দুটি বাথরুম। হাল্কা গোলাপি রঙের বাড়ি। সামনে ছোট পাঁচিল (যার উপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পোস্টার পড়েছে)। হলুদ রঙের গেট। গেট থেকে একটা ছোট ইঁটের রাস্তা ঢুকে গেছে বাড়ির দিকে। রাস্তার দু'ধারে ফুলের বাগান ছিল একসময়। কুসুম সেগুলি ঠিক করবে ভেবেও করে ওঠা হয়নি। আসলে সত্যি কথা বলতে, কুসুমের সেরকম ফুলের শখ নেই। বাড়িতে ঢুকলেই এক ফালি বারান্দা। সেখানেই পার্থর সাইকেল থাকে। রোজ সকালে সাইকেল করে স্টেশন যায় পার্থ। স্টেশনে শঙ্করের দোকানে সাইকেল জমা রাখে। বারান্দায় দুটি বেতের মোড়া আছে। রোজ বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে পার্থ মুড়ি খায়। মুড়ির সঙ্গে কোনদিন তেলেভাজা, কোনদিন ঘুগনি বানায় কুসুম। মুড়ি খেয়ে একটু বাইরে এসে ঐ মোড়ায় বসে পার্থ আর কুসুম। ততক্ষণে গোধূলি লগ্ন। আকাশে একটা হাল্কা আলোর রেখা কুসুমের মনে এক প্রসন্ন ভাব এনে দেয়। সামনেই একটা পুকুর আছে। ভালো হাওয়া দেয়। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেরা ক্রিকেট খেলে বাড়ি ফেরে। পার্থ মাঝে মাঝে গুন গুন করে গান ধরে। নিজের বাড়িতে পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে মানুষ কুসুম যেন এই সময়টুকুর জন্য সারাদিন অপেক্ষা করে। এই সময়টুকু যেন তার জীবন থেকে কোনদিন না চলে যায়।

পাঠক নিশ্চয় খেয়াল করেছেন কুসুমের দিনের একটা সময়ের কথা আমি এখনও বলিনি। হ্যাঁ দুপুরে পেপার পড়া আর বিকেলবেলা পার্থ ফেরার আগে পর্যন্ত। এই সময়টুকুর মধ্যে হাজির হন পাড়ার দুই "দিদি"। বয়সে তাঁরা কুসুমের মায়ের চেয়ে কিছু ছোট হলেও তাঁদেরকে দিদি বলেই ডাকতে বলেছেন।  এনারা নাকি কুসুমের শাশুড়ির খুব কাছের মানুষ ছিলেন। আজ ওনার অভাব পূর্ণ করতেই বোধহয় এনারা রোজ কুসুমের খোঁজ নিতে আসেন। অবশ্য রোজ খোঁজ নেয়ার কিছু থাকেনা, মানে থাকা সম্ভব হয়না। যেটা চলে সেটা হল রত্নার শেওরাফুলি গেজেটের সরকারপাড়া ভার্সান।
"জানো তো, কবিতার সঙ্গে ওর ছেলের বউয়ের আবার ঝগড়া হয়েছে কাল।"
"রমার মেয়েটাকে দেখেছো, কি কালো। কে ওকে বিয়ে করবে বাবা?"
"ঘোষবাবুর ছেলে এবারো মাধ্যমিকে ফেল করেছে।"

তবে যেটা ভালো দিক হচ্ছে এনারা রোজ যাওয়ার সময় কুসুম কত ভালো, পাড়ার অন্য বউদের কুসুমের মত হওয়া উচিত, তাই বলে যান। প্রথম প্রথম এনারা পার্থ আসার আগেই চলে যেতেন। কখনো কখনো পার্থর সাইকেলের আওয়াজ শুনেই বেরিয়ে পরতেন। আজকাল সেটাও করেন না। এরকম অনেকদিন হয়েছে পার্থ এসে একা ঘরে বসে মুড়ি খেয়েছে। এনারা যেতে যেতে গোধূলি পেড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে। আর বারান্দায় গিয়ে বসা হয়নি। কুসুম মুখে কিছুই বলতে পারেনি। পার্থকেও বলেনি। সত্যি করে বলতে কি এই দুমাসে মানুষটিকে সেভাবে চিনে উঠতে পারেনি কুসুম। তাই এই কথাটা বললে পার্থর কেমন লাগবে বোঝেনি।

আজও দিদিরা এসে হাজির হয়ে গল্প শুরু করলেন। সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ব্যানার্জিবাবুর মেয়ে কেন নিচু জাতে বিয়ে করল তাই নিয়ে আলোচনা শুরু হচ্ছিল, এই সময় বাইরে সাইকেলের শব্দ শুনে অবাক হয়ে বারান্দায় এল কুসুম। গেট দিয়ে সাইকেল ঢোকাচ্ছে পার্থ। চমকে গেল কুসুম। পার্থ যেন বুঝতে পেরেই বলল -- "আজ তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। তাই আগের ট্রেনেই চলে এলাম। শোন না, উদয়নে নবাব এসেছে। যাবে? তুমি তো সেদিন বলছিলে রঞ্জিত মল্লিককে তোমার ভালো লাগে। চলো না।"

ভিতরে যে দিদিরা বসে আছেন, সেটা কি খেয়াল করেনি পার্থ? লজ্জায় লাল হয়ে গেল কুসুম। দিদিরা শুনতে পেলেন পার্থর গলা। তাড়া আছে, পরে আসবেন ইত্যাদি বলে তখনি সেখান থেকে বিদায় নিলেন। "সত্যি যাবে?"
কুসুমের বিস্ময় কাটেই না। পার্থ স্রেফ মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।

সেই সময়, যখন পাড়ার ছেলেরা ব্যাট নিয়ে মাঠে যাচ্ছিল, যখন কলেজ ফেরতা মেয়েটি গাছের তলায় প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল, যখন ধর্মতলার অফিসে বসে কেউ কাজ শেষ করে হাওড়া স্টেশনে আসার পরিকল্পনা করছিল, যখন তার সাধের গোধূলি আসতে ঢের দেরী, তখন ঐ সাইকেল স্ট্যান্ড করানোর শব্দে, দেওয়ালের লাল সবুজ রাজনৈতিক দলের স্লোগানে, রাস্তায় একা ডাকতে থাকা আইসক্রিমওয়ালার ডাকের মধ্যে দিয়ে কুসুম বুঝতে পারল সে না চিনলেও পার্থ তাকে ঠিক চিনেছে।



Friday, July 17, 2020

বহরমপুরের সুতপা

অফিসে কাজের ফাঁকে প্রায়ই অর্কুটটা চেক করে নেয় নিখিল। আর এখন তো বেশী করে করতে হয়। সুতপা মেসেজ করে এই সময়। রোজ বিকেলে এক ঘণ্টার জন্য সুতপা সাইবার ক্যাফে যায় শুধুমাত্র নিখিলের সঙ্গে দেখা করতে। কলেজ পাশ করে বহরমপুরে একটা স্কুলে পড়ায় সুতপা। বাবা নেই। বাড়িতে শুধু মা। হাল্কা শ্যামলা গায়ের রং, তন্বী। প্রথমবার ছবি দেখেই পছন্দ হয়েছিল নিখিলের। অর্কুটেই আলাপ সুতপার সঙ্গে। অনলাইনের মধ্য দিয়ে কলকাতার রাস্তার ভিড় আর বহরমপুরের লোডশেডিং যে কখন মিলেমিশে এক প্রেমকাহিনীর সূচনা করেছিল দু'জনে কেউই বোঝেনি। অনলাইনে এভাবে প্রেমে পড়া শুনলে লোকজন এই ২০০৬-এ অবাক হয় বইকি। তবে দুজনেই দুজনের ছবি দেখেছে। গলা শুনেছে। কাজেই একেবারে অচেনা নয়। সুতপা নতুন একটা মোবাইল ফোন নিয়েছে। তবে ওর বেশী টকটাইম নেই। তাই নিখিল-ই ফোন করে। সারা রাত্রি ধরে সুতপা বলে চলে তার স্কুলের খাতা দেখার গল্প, আর নিখিল তার অফিসের। নিখিলের গলায় সুর আছে। সুতপা বার বার বায়না করলে নিখিল গান শোনায়। কোনদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত, কোনদিন আধুনিক। সুতপা বলে নিখিলের গলা নাকি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত।

দু'মাস এভাবে অতিবহিত হওয়ার পর দুজনেরই মনে হল এবার সামনাসামনি দেখা হওয়া দরকার। সুতপা ঠিক করল কলকাতায় এসবে। কলকাতায় তার মাসীর বাড়ি। সেখানে উঠে নিখিলের সঙ্গে দেখা করবে। লালগোলা প্যসেঞ্জারে চেপে মাসীর বাড়ি এসে একদিন পর নিখিলের সঙ্গে দেখা করতে গেল সুতপা। ভিক্টোরিয়ার সামনে দেখা করার কথা। বাস থেকে নেমে সুতপা দেখল গেটের সামনে সাদার উপর লাল চেক জামা পরিহিত নিখিল। সুতপা নিজে পরেছে সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ। বেশী গয়না পছন্দ করেনা সুতপা। তাই সামান্য একটা গলায় হার আর কানে দুল। তাতেই নিখিল বলে উঠল -- "বিউটিফুল।"

সারাদিন ভিক্টোরিয়ায় ঘুরে, দুপুরে এক চাইনিজ দোকানে খেয়ে বিকেলবেলা নিখিলের নিউ আলিপুরের বাড়িতে এল সুতপা। ভিক্টোরিয়ার মাঠে সর্বসমক্ষে ঘনিষ্ট হতে আপত্তি ছিল সুতপার। নিখিল একাই থাকে। তাই ওর বাড়িতে আপত্তি নেই। নিখিলের বাড়িটা খুব একটা ছোট না। ওর বাবা বানিয়েছিলেন। বাবা মা দুজনেই এক এক্সিডেন্টে গত হন। তারপর থেকে একাই থাকে নিখিল। বাড়িতে ঢুকেই বাঁ দিকের বন্ধ ঘরটার দিকে এগোচ্ছিল সুতপা। নিখিল বারণ করে। ঐ ঘরটি নাকি নিখিলের বাবা মার। ঐ ঘরটি সে বন্ধই রাখে। নিখিলের লিভিং রুমের সোফায় বসতে যাচ্ছিল সে, এই সময় নিখিল তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মনে হল সুতপার গায়ে যেন শিহরন খেলে গেল। চকিতে নিখিলের দিকে ঘুরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আস্তে আস্তে নিখিলের ওষ্ট সুতপার অধর স্পর্শ করল। সুতপার হাট উঠে গেল নিখিলের কাঁধে। নিখিলের চোখ বন্ধ হল। সুতপারও।  নিখিল তৈরি ছিল। চট করে পকেট থেকে ইনজেকশনটা বার করে সুতপার হাতে তাক করল। এক মিনিটের মধ্যেই সোফায় অজ্ঞান হয়ে পরে গেল সুতপা। এবার নিখিল ফোন করল -- "আমি রেডি তন্ময়দা, আপনার নার্স নিয়ে চলে আসুন।"


কসবা থেকে নিউ আলিপুর আসতে সময় লাগে বলেই চেতলাতে এক বন্ধুর বাড়ি ছিলেন ডাক্তার তন্ময় সেনগুপ্ত। ফোন পাওয়া মাত্রই নিজের নার্স রুমাকে নিয়ে চলে এলেন নিখিলের বাড়ি। নিখিল ততক্ষণে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে রেখেছে। সেটি যেন এক পুরোদস্তুর অপারেশন থিয়েটার। সুতপার অবচেতন দেহটা সবাই মিলে ধরে নিয়ে এল। শুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল নিখিল। বাইরের ঘরে বসে টিভিটা চালাল। সৌরভ বোধহয় আবার টিমে ফিরবে।

খানিকক্ষণ বাদেই বেরিয়ে এলেন ডাক্তার সেনগুপ্ত। "নিখিল, এই মেয়েটির তো কিডনি নেই!"
"কিডনি নেই মানে? এটা হয় নাকি?"
"আরে দেখে যাও।"
"খারাপ করছেন তন্ময়দা, আমাকে শেয়ার দেবেন না বলে কিডনি লুকিয়ে এখন এসব বলছেন।"
"আরে তুমি নিজেই দেখো না।"

ঘরের ভিতরে তখনো হাল্কা আলোটা জ্বলছে। বেডের পাশে বাকি সব আলো যেন সুতপার কাটা দেহটাকে ঝলসে দিচ্ছে। নার্সটিকে দেখা যাচ্ছেনা। নিখিল এসে কিছুই বুঝলো না। "কোথায় কিডনি নেই তন্ময়দা?"

ঘাড় ঘুরিয়ে নিখিল দেখল তন্ময়দা পাশে নেই। ঘরের দরজাটিও এবার বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে কেউ যেন তালাটা ঘোরাচ্ছে। নিখিল ছুটে গেল দরজার দিকে। দু'বার ধাক্কা দিতেও দরজা খুলল না। আবার পাশ ফিরতেই নিখিলের চোখ গেল ঘরের অন্য কোণে। হাল্কা আলোতে এতক্ষণ খেয়াল করেনি। পাশাপাশি পরে আছে তন্ময়দা আর রুমা। দুজনের কারুর জ্ঞান নেই মনে হচ্ছে। নিখিল অবাক হয়ে এগিয়ে গেল তন্ময়দার দিকে।
"তন্ময়দা, তন্ময়দা।"
"ওরা কেউ বেঁচে নেই নিখিল।"
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে বেডের দিকে ফিরে তাকাল নিখিল। এই সেই গলা, যা রাতের পর রাত নিখিলকে বহরমপুরের গল্প বলেছে, হাজারদুয়ারী বেড়াতে যাবার কথা বলেছে, বিধবা মায়ের কষ্টের কথা বলেছে, স্কুলের বাচ্চাদের বাঁদরামোর কথা বলেছে। নিখিল এতদিন এই গলা শুনে চমকাত না। আজ চমকাল। এখন চমকাল।

নিখিল এবার অবাক হয়ে দেখল সুতপার কাটা দেহটা বেড থেকে নেমে আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসছে। নিখিল ভয়ে নড়তেও পারল না। কাটা দেহে কিডনি আছে কিনা, সে বোঝার মত ক্ষমতাও তার নেই। এবার একদম কাছে এসে নিখিলের সামনে ফিসফিসিয়ে সুতপা বলল -- "আমাদের চুম্বন তো শেষ হয়নি নিখিল। আমাকে চুমু খাবে না?"

বলেই নিজের ঠাণ্ডা ওষ্ঠ এবার নিখিলের অধরের উপর চেপে ধরল সুতপা। নিখিল ঠাণ্ডায় ছটফট করতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে সুতপার দুই হাত এসে গেছে নিখিলের মাথার পিছনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখিলের ধরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শুধু সুতপার কাটা দেহের হাতে ধরা থাকল নিখিলের চুম্বনরত মস্তক। নিখিলের চোখ এবার সত্যি বন্ধ।


Thursday, July 16, 2020

প্রশ্ন করা হয়নি

অফিসে বসে লেখাটা শেষ করছিলাম। এই সময় অফিসের পিওন রামদেব এসে জানাল আমার ফোন এসেছে। আমার ডেস্কে একটা বড় কাঁচের পেপারওয়েট থাকে। গোল, ভিতরে ডিজাইন। সেটা দিয়ে লেখাটা চাপা দিয়ে ফোন ধরতে এলাম। আমাদের অফিসে এখনো সেই মান্ধাতার আমলের কালো ফোন। গোল করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাম্বার ডায়াল করতে হয়। আমাদের বাড়িতেই এর চেয়ে আধুনিক ফোন আছে। এখন কি প্যাড লাগানো নতুন যে ফোন হয়, সেগুলি একটা কিনলে পারে অফিস।

"হ্যালো, অতনু বলছি।"
"চিনতে পারছিস?"
"না তো, কে?"
"আমি অসীম।"
"অসীম কে? অসীম বসাক?"
"ইয়েস স্যার।"
"আরে, কতদিন বাদে। কোথায় আছিস, আমার অফিসের নম্বর পেলি কোথায়?"
"আজ বিকেল পাঁচটায় কফি হাউসে আসবি? সব জবাব দেব।"
"ঠিক আছে, তবে তোকে চিনব কি করে?"
"ভাবিস না, ঠিক চিনতে পারবি। খুব একটা বদলাই নি।"

বিকেলে চিকেন স্যান্ডইউচ আর কফি খেতে খেতে আমি প্রশ্ন করলাম
"এবার বল, আমার অফিসের নম্বর পেলি কোথা থেকে?"
"খবর পেলাম তুই আজকের সংবাদে চাকরি করিস। ডিরেক্টরি থেকে নম্বর পেলাম।"
"তুই আছিস কোথায়?"
"আমি ব্যাঙ্গালোরে। ইসরোতে চাকরি করছি।"
"আইব্বাস। চাঁদে যাবি কবে?"
"এই তো কাল। চল তোকে নিয়ে যাই।"
"উফ, কতদিন বাদে তোর সাথে দেখা হল।"
"হ্যাঁ, প্রায় ১৫ বছর বাদে।"
"সত্যি। তুই তো মাধ্যমিকের পরই সুন্দরপুর ছেড়েছিলিস?"
"হ্যাঁ। বাবা তার আগের বছর চলে গেল।"
"হ্যাঁ রে, কাকুর কথা খুব মনে পড়ে। ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। কি ভালো ফুটবল খেলতেন! কীভাবে যে এমন ভাবে হার্ট এটাক হলো।"
"হুম। শোন না, তোর একটা সাহায্য দরকার।"
"বল।"
"তুই তো জানিস বাবা কিছুদিনের জন্য ইস্টবেঙ্গলে ট্রায়ালে গিয়েছিল।"
"হ্যাঁ, জানি তো।"
"হ্যাঁ, সেই সময় ইস্টবেঙ্গলের কোচ ছিলেন রবি সেন। এখন যিনি আবার ইস্টবেঙ্গলের কোচ হয়েছেন।"
"হ্যাঁ।"
"বাবা আমাকে বলেছিল উনি নাকি বাবাকে কিছু একটা বলেছিলেন যেটা বাবার সারাজীবন মনে থাকবে। আমি বড় হলে আমাকে বলবেন বলেছিলেন। কিন্তু আমি প্রশ্ন করার আগেই বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তো আমি ভাবছিলেন রবিবাবুকে জিজ্ঞেস করলে হয়না?"
"ওনার কি মনে থাকবে? এত ফুটবলার সামলেছেন।"
"জানি। তবুও। বলে দেখা যাক না। তুই তো ওনার সাক্ষাতকার নিয়েছিস নিশ্চয়। একবার আলাপ করাতে পারবি না?"
"তা আমি চিনি ওনাকে। ঠিক আছে দেখছি। ক'টা দিন সময় দে। সামনে ডার্বি। তুই লিগের খবর রাখিস?"
"না রে, আমি শধুই ক্রিকেট। এখন তো কলকাতার ছেলে ক্যাপ্টেন।"
"হ্যাঁ, সামনে ওয়ার্ল্ড কাপ। দেখা যাক। শচীন এবার জিততে চাইবে।"
"যাই বল, ভালো বোলার নেই। এই জাহির ছেলেটা খারাপ না..."


ডার্বির পরেরদিন অসীমকে ফোন করলাম। অসীম এখন কলকাতায় আছে ওর জ্যাঠার বাড়ি। সেখানে ফোন করে ডেকে দিতে বললাম
"কি রে, ব্যবস্থা হল? "
"তুই কি একদমই কাগজ পড়িসনা?"
"না মানে কি হয়েছে?"
"ডার্বি জিতে রাত্রে গাড়ির এক্সিডেন্টে রবিবাবু পরলোকগত।"
"যাহ।"
"হ্যাঁ, গতকাল।"
"বুঝলি, আমার প্রশ্নটা করাই হয়না কাউকে।"
"একজন জানতে পারে।"
"কে বলত?"
"লক্ষণদাকে তোর মনে আছে?"
"লক্ষণদা মানে যে মোহনবাগানে খেলত?"
"খেলত মানে দু'বছর খেলেছে। তারপর গোয়া গেল খেলতে। চোট পেয়ে আর খেলা বন্ধ। এখন বড়বাজারের পাশে একটা রোলের দোকান চালায়।"
"আচ্ছা। হ্যাঁ, ওনার সঙ্গে বাবার খুব ভাব ছিল। চল যাওয়া যাক সুন্দরপুর। কবে যাবি?"
"কাল চল?"

সুন্দরপুরে লক্ষণদার রোলের দোকানে একটা করে এগ চিকেন রোল খেতে খেতে আড্ডা হচ্ছিল। পাশে রেডিওতে "সেই যে হলুদ পাখি" গানটা বাজছিল। অসীম শোনেনি। ওকে জানালাম এটা ক্যাকটাস বলে একটা বাংলা ব্যান্ডের।
"লক্ষণদা, তোমার ফুটবল ছেড়ে ভালো লাগে?"
"কে বলল ছেড়েছি!"
"না তো, আজ তো রবিবার। চল একটু বাদে।"
"কোথায়?"
"মসজিদের পাশের মাঠে। আমরা বন্ধুরা মিলে রবিবার বিকেলে ফুটবল খেলি।"
"বন্ধুরা মানে? তোমার বয়সী সবাই?"
"ছোট বড় অনেকেই আছে। কলকাতায় অফিস করে। দুজনেই চলো আজ।"
এবার অসীম প্রশ্ন করল
"লক্ষণদা, তোমার সঙ্গে তো বাবা অনেক গল্প করতেন।"
"তা করতেন। তোমার বাবা এই সুন্দরপুরের একমাত্র স্পোর্টসম্যান ছিলেন, বুঝলে?"
"আচ্ছা বাবা কোনদিন তোমাকে বলেছেন ওনাকে ইস্টবেঙ্গল ট্রেনিং-এ রবি সেন কি বলেছিলেন?"
"না গো। মনে পড়ছে না। আমাকে এরকম কিছু বলেননি।"

অসীম আবার হতাশ হল। এবার লক্ষণদা বললেন
"চলো চলো খেলতে চলো। তোমার বাবা খুশী হবেন তুমি ফুটবল খেলছ দেখলে।"
"এই ফুল প্যান্টে?"
"আরে ধুর, প্যান্ট গুটিয়ে নিও।"

ভালোই খেলা হল। আমি যদিও বা একটু আধটু খেলালাম, অসীম একেবারেই পারল না। মিনিট দশেকের মধ্যেই হাঁপিয়ে বলল -- "আমি গোলকিপার হব।" তবে খেলা শেষের পর ওর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি দেখলাম।

মাসখানেক বাদে আবার কাজে সুন্দরপুর গিয়েছিলাম। লক্ষণদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল স্টেশনে। শুনলাম ব্যান্ডেল যাচ্ছেন বোনের সঙ্গে দেখা করতে। আমাকে দেখে একটু গল্প করে বললেন -- "জানো তোমার বন্ধু অসীমের বাবা আমাকে বলেছিলেন রবি সেনের কথা।"
"মানে আপনি জানতেন রবি সেন ওনাকে কী বলেছে?"
"হ্যাঁ।"
"অসীমকে বললেন না কেন?"
"ওর খারাপ লাগত।"
"কেন?"
"রবি সেন বলেছিলেন -- দেখ, তোমার ইস্টবেঙ্গল বা ময়দানের কোন বড় ক্লাবে তেমন ভবিষ্যৎ নেই। বরং ব্যাঙ্কে দেখ। ওখানে ভালো খেললে তোমার পাকা চাকরি হবে। সংসারে অসুবিধা হবে না।"
"সেকি।"
"সেই কথা শুনেই উনি ব্যাঙ্কে জয়েন করেন। পরে আক্ষেপ করতেন রবিবাবুর কথা না শুনে টিকে থাকলে হত। আমাকে বলতেন বার বার হাল না ছাড়তে। হয়ত অসীমকে ..."

Sunday, June 28, 2020

একবারই এসেছিল নীরবে

এটিএম থেকে টাকা তুলে ট্রেন স্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগল অর্ক। নিউ জার্সির জার্সি সিটিতে থাকে সে। ওদিককার বেশিরভাগ দোকানেই ক্যাশ ওনলি। তাই সপ্তাহান্তের বাজার করতে তাকে টাকা তুলতে হয়। টাকা মানে ডলার। তামাম মার্কিন দেশের বাঙালিরা ডলারকে টাকা বলে। তাই আমরাও তাই বলব। এভিনিউ এইচ ষ্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল অর্ক। ওপরে ডিজিটাল বোর্ডে দেখাচ্ছে আর চার মিনিট বাদে ট্রেন। ফোনে ওয়াটস্যাপটা চেক করে নিল। নাহ, কোন নতুন মেসেজ নেই। ভেবেছিল শাল্মলী মেসেজ করবে। মেয়েটি লন্ডনে পড়াশুনো করছে। কালকেই ফেসবুকে একটা গ্রুপে আলাপ। দুজনেই উডি এলেন ফ্যান। অর্ক নিউ ইয়র্কে থাকে শুনে শাল্মলী বলে "হাউ লাকি ইউ আর।" যদিও অর্ক সত্যি সত্যি নিউ ইয়র্কে থাকেনা। থাকে নদী পেড়িয়ে নিউ জার্সিতে। কিন্তু বলতে তো ক্ষতি নেই। কে আর লন্ডন থেকে এতদূর আসবে দেখতে। অর্ক অম্লানবদনে বলে দেয় সে ব্রুকলিনের পার্ক স্লোপ অঞ্চলে থাকে। গতবছর একবার ওখানকার একটা পাবে এসেছিল। তাই কিছুটা হলেও বলতে পারবে। শাল্মলীর সঙ্গে ফেসবুকে অনেকক্ষণ চ্যাটের পর তার ফোন নম্বর পাওয়া যায়। ওয়াটস্যাপে যোগ করে অর্ক।

এবার ট্রেন এসে যায়। ট্রেন ফাঁকা। অর্ক জানালার ধারে বসতে পারে। ব্যাগ খুলে কমলকুমার মজুমদারের বই বার করে পড়ার জন্য। তার পাশে এক মহিলা এসে বসেন। ঘাড়  ঘুরিয়ে দেখা খারাপ, তাই পড়তে পড়তে আড়চোখে দেখে অর্ক। ভারতীয়। অথবা বাংলাদেশীও হতে পারে। নিউ ইয়র্কে এখন প্রচুর বাংলাদেশী। সত্যি কথা বলতে কি, পশ্চিমবংগের বাইরে ভারতবর্ষের অন্য কোন জায়গার চেয়ে নিউ ইয়র্কেই অর্ক বেশি বাঙালি পায়। এভিনিউ এইচ পেরোতেই হাল্কা গলার আওয়াজ পাওয়া গেল -- "আপনি কি বাঙালি?"
"হ্যাঁ, অর্ক সেনগুপ্ত। আপনি?"
"আমি চৈতালি রায়।"
একটু অদ্ভুত গলার স্বর মহিলার।
"আপনি কলকাতার কোথায় থাকেন? আমি পাটুলি।"
"আমি কলকাতার না। আমি মিলওয়াকিতে বড় হয়েছি। আমার বাবা মা এখানেই থাকেন।"
ওহ প্রবাসী বাঙালি! তাই এরকমভাবে বাংলা বলছে। শুনতে একটু অসুবিধা হচ্ছিল।
"আপনি এখানে বড় হয়েছেন? ভাবাই যায়না। আপনার বাংলা ভীষণ পরিষ্কার।"
"থ্যাংকস। আমার পেরেন্টসরা ছোটবেলা থেকে আমার সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলতেন।"
"ওহ, তা আপনি বুঝলেন কি করে আমি বাঙালি?"
"আপনার হাতের বই দেখে।"
"আপনি বাংলা পড়তে পারেন?"
"হ্যাঁ, পারি তো। আমি ফেলুদা, টেনিদা, মিতিনমাসী পড়েছি।"
"আচ্ছা। কমলকুমার পড়েছেন?"
"না। আমার বাবা বলতেন উনি ছোটবেলায় স্বপনকুমার বলে একজনের বই পড়তেন। এটা কি তিনি?"
"না না, স্বপনকুমার খাজা, আই মিন, পাল্প লেখক। কমলকুমার আলাদা। মনে হবে ফরাসী সাহিত্য পড়ছেন।"
"ওহ, আমি ফরাসী সাহিত্য পড়িনা।"
"তা আপনি যাচ্ছেন কোথায়?"
"আমি, জার্সি সিটি। ওখানেই থাকি। আপনি?"
এক মুহুর্ত ভেবে নিল অর্ক। ব্রুকলিনের ঢপটা দেওয়া উচিত হবেনা। জার্সি সিটিতেই তাকে যখন, ট্রেনে দেখা হবেই।
"আমিও ওখানেই। তাহলে ভালোই হল, একসাথে যাওয়া যাবে। আপনি এখানে কি পড়ছেন না চাকরি করছেন?"
"আমি ব্রুকলিনে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকায় চাকরি করি। আপনি?"
"আমি ব্রুকলিন কলেজে পড়াই। আর কিউনিতে পি এইচ ডি করছি।"
"ওয়াও। কোন বিষয় আপনার?"
"আমার ইকোনমিক্স।"
"নো ওয়ে, আমার আন্ডারগ্র্যাড ইকোনমিক্স ছিল।"
"তাই? কোন কলেজ?"
"মিলোয়াকি কমিউনিটি কলেজ।"
"আচ্ছা। আপনি কতদিন আছেন নিউ ইয়র্কে?"
"আমি তো জার্সি সিটিতে থাকি। আমি এই তিন মাস হল এসেছি। আপনি?"
"আমার তিন বছর হল। তা আপনি উইকেন্ডে নিউ ইয়র্কে আসেন নিশ্চয়?"
"নাহ সারা সপ্তাহ ট্র্যাভেল করে ক্লান্ত থাকি। তখন শুধু বাড়ি বসে নেটফ্লিক্স। আপনি?"
"আমি আসি মাঝে মধ্যে। আপনিও তার মানে সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন?"
"হ্যাঁ ভীষণ। আপনারও?"
"হ্যাঁ। আপনার প্রিয় নায়ক কে?"
"টম ক্রুজ। আপনার?"
"ম্যাক্স ভন সিডো।"
"সেটি কে? নাম শুনিনি। কোন সিনেমা বলুন?"
"সেভেন্থ সিল।"
"না দেখিনি। কার সিনেমা?"
"বার্গম্যান। দেখেননি?"
"আমি ক্যাসাব্লাঙ্কা দেখেছি। আচ্ছা, এটলান্টিক এভিনিউ এসে গেছে। চলুন নামা যাক।"
"না না, পরেরটায় নামব। ডি ক্যাব। ওখানে পাশের প্ল্যাটফর্মেই আর আসবে। সোজা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার।"
"আচ্ছা।"

সিনেমায় মিল পাওয়া না গেলেও মিল পাওয়া গেল গানে। চৈতালি গান শুনতে ভালোবাসে। অর্ক বিটেলসের বেশিরভাগ গান বাজাতে জানে শুনে খুব উৎসাহিত হল। বাকি রাস্তাটা অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে পাথ ট্রেনে চেপে জার্নাল স্কোয়ার স্টেশন অবধি বিটলস, ডিলান, সিনাত্রা, রোলিং স্টোন্স সঙ্গ দিল। গানের মাঝে আপনি থেকে তুমিতে নামতে খুব একটা অসুবিধা হলনা।

জার্নাল স্কোয়ারে নেমে চৈতালি বলল ওর বাড়ি ডানদিকে। অর্ক বামদিকে থাকে। তাই এবার আলাদা হতেই হবে। অর্ক এবার সাহস করে বলল -- "চৈতালি, তোমার সঙ্গে গল্প করে খুব ভালো লাগল। যদি কিছু মনে না কর, তোমার নম্বরটা পেতে পারি?"
"নিশ্চয়। (২০৮)...। তোমারটা দাও।"

নম্বর নেয়ার পর দুজন চলে যাচ্ছিল। চৈতালি এগিয়ে এসে অর্ককে আলিঙ্গন করল। এদেশে এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। তাই অর্কর প্রথমে কিছু মনে হয়নি। তারপর বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মনে হতে লাগল, "মেয়েটি নিজে থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরল। নিশ্চয় আমাকে ভালো লেগেছে। উফ, আর লন্ডন নিয়ে মাথা ঘামাবো না। এই মেয়েটি আমার জন্য পারফেক্ট।"

বাড়ির দরজা অবধি পৌঁছাতে পৌঁছাতে অর্ক স্বপ্ন দেখে ফেলল ভবিষ্যতে সে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হয়েছে। সকালে ক্লাস নেয়ার পর সে আর চৈতালি ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যায়। সেখানে আজ অর্ককে বিশেষ অতিথি করে আনা হয়েছে মায়াকোভস্কির আত্মহত্যার উপর কবিতা পাঠ করার জন্য।

বাড়ি ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে গিটারটা নিয়ে বসল অর্ক। একটু বাদেই দরজায় ধাক্কা। অর্কর রুমমেট সুমন। নাহ, সুমনকে এখন কিছু বলার দরকার নেই। সুমন বলল -- "বস, দুটাকা খুচরো দিবি, সিগারেট কিনতে যাব।"

গিটার ছেড়ে জিনসের পকেটে হাত দিয়ে অর্ক বুঝতে পারল তার মানিব্যাগটা নেই। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু পেলনা। একটা সন্দেহ হতেই চৈতালির দেওয়া নম্বরটায় ফোন করল। ফোনের কলার আই দিতে দেখাল এটি আইডাহো রাজ্যের ফোন নম্বর। কিন্তু, মিলওয়াকি তো উইস্কন্সিনে, তাই না? এবার উল্টোদিকে একজনের গলা শোনা গেল

"হ্যালো, বয়সি পুলিশ স্টেশন।" 

Sunday, June 14, 2020

রুকু-সুকু

আজকে বাইরে একটা মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। এই বাংলো বাড়িটার সামনে একটা ছোট বাগান। বাগানের মধ্যে দিয়ে লাল সুড়কির রাস্তা। দু'ধারে ছোট ছোট গাছ করেছেন রুকুর মা সাধনাদেবী। বাগান শেষ হয় একটি বেড়ায়। বেড়ার মাঝে লোহার গেট। রুকুর ঐ গেটের বাইরে যাওয়া মানা। সুকুর সাথে খেলতে গিয়ে বলটা বাইরে চলে গেলেও রুকু বাইরে যেতে পারেনা। বাড়িতে মাকে গিয়ে বললে মা এনে দেন। আসলে বাইরে বড় রাস্তা। মাঝে মাঝেই সেখান দিয়ে বড় লরি যায়।

সুকু হল রুকুর পোষা ল্যাব্রাডর। রোজ বিকেলে শুকুর সাথে এখানে খেলতে আসে রুকু। এ অঞ্চলে ওর আর কোন বন্ধু নেই। ওদের এই বাংলো বাড়িটা খুব সুন্দর। ওপরে আবার একটা চিমনি আছে। ওটা যদিও মিছিমিছি। মানে কাজ হয়না ওতে। বাংলো বাড়ি থেকে একটু দূরেই ট্রেন লাইন। এই অঞ্চলে খুব বেশী ট্রেন আসেনা। তবে রাত্রে মাঝে মাঝে ট্রেন এলে এই বাড়ি থেকেই আওয়াজ শোনা যায়। এই পাহাড়ি অঞ্চলে লোকজন বেশী নেই। তাই রাতের দিকে ট্রেনের আওয়াজ বড় স্পষ্ট। মনে পড়ে বছর দুয়েক আগে এই ট্রেনের আওয়াজে মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙ্গে যেত রুকুর।

বলা হয়নি, ঐ বেড়ার পাশেই একটা বড় গাছ আছে। কি গাছ সেটা অবশ্য রুকু জানেনা। গরমের দিনে মাঝে মাঝে এর ছায়াতে বসে পড়ে সুকু। তখন ওর গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে গান করে রুকু। রুকুর মা খুব ভালো গান জানেন। উনি রুকুকে গান শেখান। সে কত গান। "ছোট পাখি চন্দনা", "আতা গাছে তোতা পাখি", আরো কত গান। সুকু  খুব আদর খেতে ভালোবাসে। আদর করলেই নিজের লেজ নাড়াতে থাকে।

বাংলো বাড়ির জানালা দিয়ে রুকুর মা সাধনাদেবী ওদের দেখছিলেন। ওনার দৃষ্টি একটু অদ্ভুত। কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে পড়েছেন মনে হবে। এক দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখছেন। যেন মেয়ের উপর থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। একটু বাদেই সূর্য ডুবল। তখন চাঁপা ফুলের গন্ধে, ট্রেনের আওয়াজে, ফড়িং-এর ভনভনানিতে, আকাশের লাল রঙে আর সদ্য ওঠা চাঁদের আলোয় বাংলো বাড়িটিকে এক রূপকথার পরিবেশে রুপান্তিরত করেছিল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। রুকু সুকুকে নিয়ে বাড়ি এল।

বাড়ি ফিরতেই মা বকলেন জামা নোংরা করেছে বলে। "যাও, এক্ষুনি নোংরা জামাটা পাল্টে কাপড় কাচার জায়গায় রেখে এসো। কাল লক্ষ্মী কেচে দেবে।"

রুকু ঘরে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সাধনাদেবী। মেয়েটার কি হয়েছে কে জানে? কতবার স্বামীকে বলেছেন কলকাতা নিয়ে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু তাঁর স্বামী চিত্তবাবু কিছুতেই রাজি হন না। উনি যেন বিশ্বাসই করেন না রুকুর অসুখ আছে। অথচ সাধনাদেবী পরিষ্কার বুঝতে পারেন। আজ থেকে দু'বছর আগে সুকু মারা গেছে। খেলতে খেলতে বল বড় রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। সুকু বেড়া ডিঙ্গিয়ে বল আনতে যায়। একটি লরি এসে চাপা দিয়ে যায় সুকুকে। অথচ রুকু রোজ বলে ও নাকি সুকুর সাথে বিকেলে খেলতে যায়। আর পেরে উঠছেন না সাধনাদেবী। ওনার স্বামী বা শাশুড়ি কারুরই যেন এতে কিছু যায় আসেনা।

আজকেও বাইরের ঘরে গিয়ে দেখলেন মা-ছেলে বসে আছে। তাঁর শাশুড়ি এক মনে উল বুনছেন। আর চিত্তবাবু পেপার পড়ছেন। সাধনাদেবী বললেন -- "রুকু আজকেও জামা নোংরা করে এসেছে। বলছে নাকি সুকুর সাথে খেলতে গিয়ে এই হয়েছে। তুমি কিছু বলবে না?"
"বাচ্চা মেয়ে, আদরের বন্ধুকে ছাড়তে পারছে না। তুমি এতো চিন্তা করোনা। তোমাকে তো বলেছি, বড় হলেই ঠিক হয়ে যাবে।"
"দেখ এভাবে বেশীদিন ফেলে রাখা ভালো না। আর কয়েক মাসের মধ্যে না কমলে কিন্তু যেতেই হবে। তুমি না গেলে আমি একা নিয়ে যাব।"
"আচ্ছা, বেশ। কয়েক মাস দেখতে দাও।"

সাধনাদেবী রান্নাঘরে যেতেই নিজের মায়ের দিকে চাইলেন চিত্তবাবু। ক্লান্ত চোখে হতাশ দৃষ্টি ফেলে বললেন -- "কি করি বলো তো মা? দু' বছর আগে রুকুটাও কুকুরটার সাথেই চলে গেল। অথচ আজকেও ও মেয়েটার জামা পালটায়।" 

Tuesday, June 9, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ৪ঃ প্রথম দিন

যদি কেউ আমাকে বলে একটা টাইম মেশিন দিয়ে আমার জীবনের কোন একদিন ফিরে যেতে, আমি ফিরব ১৪ই আগস্ট ২০০৭। জীবনে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু ঐ দিনটি বোধহয় আমার জীবনের শেষ স্টেবল পয়েন্ট। যেখানে ফিরে গেলে আমি জীবনটাকে নতুন করে লিখতে পারি।

যাই হোক, সেদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুত ঝাঁকুনিতে। যে দাদার বাড়ি উঠেছিলাম গেন্সভিলে, সেই দাদার দু'বছরের ছেলে আমার বিছানায় উঠে পড়ে লাফাচ্ছে। উঠে পড়লাম। স্নান করতে যাওয়ার আগে দাদা দেখিয়ে দিল। এখানে বালতি নেই। শাওয়ারে স্নান করতে হবে। আবার পর্দা টানা আছে। পর্দা ভিতর দিকে টানা। জল যেন বাইরে না পড়ে। এ ছাড়া গায়ে মাখার সাবানের জায়গায় বডি ওয়াশ।

সকালে কর্ন ফ্লেক্স খেয়ে বেরোলাম। দাদা, বউদি, দাদার ছেলে আর আমি। দাদার ছেলেকে প্রথমে ডে কেয়ারে রাখা হবে। ডে কেয়ার জিনিসটা আমি আগে জানতাম না। দেখলাম প্রচুর বাচ্চারা রয়েছে। তাদের সকলের মা বাবারা বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। তাই তারা এখানে রয়েছে। দাদার ছেলেকে রেখে আমি বিশ্ববিদ্যালয় এলাম। এই প্রথম আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম। ইঁট বার করা বেশ কিছু বিল্ডিং। একটা বড় বাড়িতে দাদা গাড়ি রাখলেন। সেখানে দেখলাম শয়ে শয়ে গাড়ি। সেটি নাকি একটি পার্কিং স্ট্রাকচার। অর্থাৎ এখানে সবাই গাড়ি রাখে। অবশ্য সবাই না। ওখানে গাড়ি রাখতে একটা পারমিট লাগে। যেমন ছাত্র ছাত্রীরা ওখানে গাড়ি রাখতে পারেনা। বড় ক্যাম্পাসটা প্রথম দিন পুরো দেখতে পাইনি। চারদিকে বড় বড় গাছ যেগুলি থেকে একরকম অদ্ভুত তন্তর মত জিনিস ঝুলছে। পরে জেনেছিলাম ওগুলিকে স্প্যানিশ মস বলে। ওরকম গাছ নাকি ফ্লোরিডাতে পাওয়া যায়।

প্রথমেই আমার নিজের ডিপার্টমেন্টে গেলাম। সামনেই হলুদ রঙের বড় বড় আলুভাজার মত কিছু মূর্তি। পরে জানতে পেরেছি এই জেলাটির নাম এলাচুয়া, যেটির ইন্ডিয়ান ভাষায় মানে আলুভাজা। ডিপার্টমেন্টে আমাকে একটি চিঠি দিয়ে বলল ইন্টার্নেশনাল সেন্টারে যেতে। গেলাম। পাসপোর্ট, আই টুয়েন্টি, আর অন্যান্য সব কাগজপত্র দেখানোর পর ওরা আমাকে রেজিস্টার করল। তারপর কিছু বই আর একটা টি শার্ট দিয়েছিল। টি শার্টটি আমার খুব পছন্দের ছিল। ওর দু দিকে পৃথিবীর সকল দেশের পতাকা ছিল। এর পর গেলাম গেটর কার্ড বানাতে। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডেন্টিটি কার্ড। সব জায়গাতে এটি চলবে। মানে লাইব্রেরি থেকে বই ধার নিতে গেলে যাদবপুরের মত লাইব্রেরি কার্ড বানাতে হবেনা। এই আই ডি কার্ডেই সব কাজ হবে। ১৫ ডলার দিতে এক ভদ্রমহিলা ছবি তুলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাতে কার্ড দিয়ে দিলেন। তারপর বললেন -- "এই কার্ডটি তুমি এ টি এম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারো।" মানে বুঝলাম না। উনি হেসে বললেন -- "ব্যাঙ্কে যাও। বুঝিয়ে দেবে।"


এবার গেলাম ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলতে। এই প্রথম জীবনে ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলব। ব্যাঙ্কের নাম ওয়াকোভিয়া। পরে তা ওয়েলস ফারগো হয়ে গেছে। ব্যাঙ্কের লোক সব কাজ করে আমার আই ডি কার্ডটা নিয়ে কি একটা করে দিল। তারপর বলল "যতদিন না তোমার আসল কার্ড আসে, এটিকে এ টি এম কার্ড হিসেবে  ব্যবহার করতে পারো।" এবার খেয়াল করলাম আমার আই ডি কার্ডের পিছনে একটা ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ আছে।

দুপুরে আমার গাইডের সঙ্গে লাঞ্চে গেলাম। ওয়েন্ডিজ-এ বার্গার আর ফ্রাইস খেলাম। এই প্রথম জীবনে চৌকো প্যাটির বার্গার দেখলাম। দেশে মঞ্জিনিসে যেটা খেতাম সেটাও গোল হত। সেখানেই শুনলাম পরের সপ্তাহ থেকে নাকি কৃষ্ণ লাঞ্চ শুরু হবে। সেটা কি ভালো বুঝলাম না যদিও। দুপুরের দিকে প্রচণ্ড ঘুম পেল। তবু জেগে থাকলাম কষ্ট করে। এর মধ্যে গাইড একটা ল্যাপটপ দিয়েছেন। বিকেলবেলা দাদা বৌদি এলেন আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। দাদার ছেলেকে তুলে আমরা বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম। বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমলে বাঁচি। দাদারা কিন্তু বাড়ি গেলেন না। আমাকে নিয়ে গেলেন ওয়ালমার্ট বলে একটা দোকানে। কি বিশাল দোকান!! ঐ দেখেই আমার ঘুম গেল কেটে। কি না পাওয়া যায় সেখানে। জামা কাপড় থেকে শুরু করে বাড়ি সাজানোর জিনিস থেকে সাইকেল, ফুটবল, খাবার জিনিস, প্রায় সমস্ত কিছু। পরে জেনেছি দাদা ইচ্ছে করে আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। জানতেন ঐ দেখলে আমি জেগে থাকব। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হল। ফিরেই জলদি ডিনার করে শুয়ে পড়লাম।

সমস্যা হল তার পরের দিন। ঘুম ভাঙল সকাল সাড়ে চারটেয়। দাদারা তখন গভীর ঘুমে। আমেরিকাতে সূর্য ওঠে প্রায় সকাল ছ'টার পড়। অন্ধকারের মধ্যে কি করব বুঝে পেলাম না। ল্যাপটপ খুলে ইউটিউব চালিয়ে "শ্রীমান পৃথ্বিরাজ" দেখতে বসলাম।


Friday, June 5, 2020

'মিট' দ্য পেরেন্টস

-- মেট্রোতে ভিড় ছিল?
-- সবসময় থাকে। এতো আর করোনাভাইরাসের সময় না, যে ফাঁকা থাকবে।
-- তা বটে। এদিকে আয়।
-- আর কতদূর রে? ঘেমে গেলাম তো?
-- দেখুন ম্যাডাম, ঘামের দোষ আমাকে দেবেন না। তাহলে কলকাতায় না থেকে আমাদের দার্জিলিং-এ থাকা উচিত।
-- সবসময় মজা তোর। এই তোর মায়ের আপত্তি ছিল না, ঠিক বলছিস তো?
-- হ্যাঁ রে। মা তোর ছবি দেখে বেশ ইম্প্রেসড। তার উপর আমার কাছে তোর বাকি গুন শুনে তো কথাই নেই।
-- আর তোর বাবা কিছু বলবেন না বল?
-- দেখ বাবার কথা তো তোকে বলেছি। মাথার গণ্ডগোলটা আজকাল ভীষণ বেড়ে গেছে। এই লকডাউনের সময় বাড়ি থেকে থেকে আরো বেড়েছে। আমরা চিন্তায় থাকি রে। বাবা কিছু ভুল ভাল বললে প্লিজ মাইন্ড করিসনা।
-- আরে না না। তুই সঙ্গে থাকিস প্লিজ।
-- আমৃত্যু থাকব।

বাড়ির সবুজ দরজায় টোকা দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দরজা খুললেন সমরের মা। সমরের মোবাইলে ওনার ছবি আগেই দেখেছিল অনন্যা। কাজেই চিনতে অসুবিধা হলনা। পরনে সবুজ রঙের তাঁতের শাড়ি। চোখে চশমা।

-- এসো এসো, আসতে কষ্ট হয়নি তো? এত দূর থেকে এলে।
-- না না।
এই বলেই ওনাকে প্রণাম করল অনন্যা।
-- আহা থাক থাক, কি লক্ষ্মী মেয়ে।
অনন্যার দু গালে হাত বুলিয়ে চিবুক ছুঁয়ে আদর করলেন সমরের মা। এত সহজে আপন করে নেবেন ভাবেনি অনন্যা। যেন কতদিনের চেনা। এত নরম করে গালে হাত বুলোলেন যে দূরত্ব বোধহয় এক মূহুর্তে ঘুচে গেল।
-- এসো এসো বসো এখানে।
বাইরে ঘরে দু' সেট সোফা। বাদামী রঙের। সামনে কাঠের সেন্টার টেবিল। ওপরটা  কাঁচের। টেবিলের নিচে কিছু ম্যাগাজিন রাখা। একটা সানন্দা চোখে পড়ল অনন্যার। সামনে টি ভি। বন্ধ ছিল। ঘরের একদিকে একটা বড় বইয়ের র‍্যাক। এটির কথাই বোধহয় সমর বলেছিল। সমর ভীষণ বই পড়তে ভালোবাসে। অনন্যাও। সেভাবেই ওদের আলাপ অবশ্য।

সোফায় অনন্যার পাশে বসলেন সমরের মা। শুরু হল গল্পগুজব। বাড়িতে কে কে আছে, বাবা কোথায় চাকরি করেন, এসব। ভদ্রমহিলাকে ভীষণ ভালো লাগছিল অনন্যার। কথা বলতে বলতে বার বার ওর হাতে, পায়ে হাত রাখছিলেন। যেন আজকের আলাপ না।

এর মধ্যে হঠাত পাঞ্জাবী পাজামা পরা এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। ভিতরের কোন ঘরে ছিলেন হয়ত। এসেই সবার দিকে একবার ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থেকে

-- খাবার কই, খাবার। বাবু খাবার আনিসনি?

বলে চেঁচালেন। অনন্যা বুঝতে পারল ইনি সমরের বাবা। প্রণাম করবে বলে উঠছিল, কিন্তু সমর তার আগেই ওনাকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল। ওর মা বলতে লাগলেন

-- কি বলি বলো, আগে তবু বেরোত, আজকাল বাড়িতে বন্ধ থেকে থেকে মাথাটা একেবারে গেছে।

এবার নিজে থেকেই ওনার হাত ধরল অনন্যা।

-- না না কাকিমা, কিচ্ছু ভাববেন না। আমি শিওর কাকু সুস্থ হয়ে উঠবেন শিগগিরি।

-- তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক মা। দাঁড়াও আমি চা নিয়ে আসি। সমরের কাছে শুনেছি তুমি বই পড়তে খুব ভালোবাসো। সমরের বই দেখবে? ঐ দেখো র‍্যাকটা।

-- হ্যাঁ কাকিমা, আমি দেখছি।

এবার আস্তে আস্তে উঠে বইয়ের র‍্যাকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো অনন্যা। কত বই। তার পড়া বই যেমন আছে, না পড়াও আছে। ওটা কি, হেনরি ফ্রেড্রিকের সংস অব সলিটিউড। দেখি।

বইটা হাতে নিয়ে দেখছিল অনন্যা যখন ওর মাথায় আঘাত হানা হল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। বইটি হাত থেকে ছিটকে পড়ল। আরো বার কয়েক আঘাত করে থেঁতলে দিয়ে থামল সমর। এর বেশী মারলে বোধহয় ঘিলু বেরিয়ে আসবে।

ভিতর থেকে সমরের বাবার গলা শোনা গেল
-- বাবু, খাবার এনেছিস? খাবার কই বাবু?

সমর এবার বিরক্ত গলায় বলল

-- দাঁড়াও মাকে রান্না করতে দাও। 

Sunday, May 31, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ৩ঃ যাত্রাপথে

ইমিগ্রেশন করে যখন গেটের দিকে এগোলাম, পিছন থেকে একটা ডাক শুনলাম

-- তুই কণাদ না?

তাকিয়ে দেখি প্রাঞ্জলদা। প্রাঞ্জলদা আমার সঙ্গে ফ্লোরিডা যাচ্ছে অঙ্কে পিএইচডি করতে। অর্কুটে আলাপ ছিল। সামনে প্রথম দেখা। প্রাঞ্জলদা সঙ্গে যাচ্ছে জেনে মন ভালো ছিল বটে, কিন্তু একটু বাদেই জানতে পারলাম ও অন্য প্লেনে যাবে। মানে ফ্রাঙ্কফুর্ট অবধি একসাথে। তারপর আমি ওয়াশিংটন ডি সি। ও মায়ামি। তবু দুজনে কলকাতা এয়ারপোর্টে গেটের সামনে বসে আড্ডা দিলাম। তখন এয়ারপোর্টে একটি ফ্রি ফোন থাকত। শুধু লোকাল কল করা যেত ২ মিনিটের জন্য। একবার গিয়ে মা বাবার সাথে কথা বলে এলাম।

খানিকক্ষণ বাদেই হাজির হল ত্রিশিখিদি। বলেছিলাম আগেই, ত্রিশিখিদি আমাদের তারাবাগের কণিকাকাকিমার ভাইয়ের শ্যালিকা। তখন রাখি ছিল। দিদি তাই আমার জন্য এক বাক্স ক্যাডবারি সেলিব্রেশন নিয়ে এসেছিল। সেটা যদিও পরে আমাদের বেশ কাজে দিয়েছিল। যাই হোক, সে গল্প পরে। এ ছাড়াও এয়ারপোর্টে আলাপ হল আমার যাদবপুরের সিনিয়ার সোমদত্তাদি আর ওর মায়ের সঙ্গে। সোমদত্তাদি ওহায়োতে পড়ে। ২০১০-এ সোমদত্তাদির বাড়ি গিয়েছিলাম ম্যাসাচুসেটসে। ততদিনে ওর বিয়ে হয়ে গেছে। ওর বর ম্যাসাচুসেটসে আর্মহার্স্ট শহরে পিএইচডি করে।

এবার ঘোষণা হল প্লেনে ওঠার জন্য। বাবা যেমন বলেছিল, সেরকম এয়ারব্রিজের ভিতর দিয়ে আমি প্লেনে উঠলাম। এই প্রথম প্লেনে উঠলাম। বসার ব্যবস্থা ছিল ২-৫-২। আমি দু'জনের সিটে ধারে বসেছিলাম। পরে জেনেছি ওটাকে আইল সিট বলে। আমার পাশে এক অসমীয়া ভদ্রলোক বসেছিলেন। বললেন মেয়ের কাছে যাচ্ছেন। পোর্টল্যান্ড। তখন জানতামই না পোর্টল্যান্ড কোথায়। কে জানত আর চার বছর বাদে আমি ৩ মাসের উপর পোর্টল্যান্ডে থাকব।

প্লেনে ওঠার খানিকক্ষণের মধ্যেই খেতে দিল। বেশ খিদে পেয়েছিল বটে। সেই কখন ডিনার করেছি বাড়িতে। তবে খেতে গিয়ে মুস্কিল। জার্মান রুটি কি শক্ত। দাঁত ফোটানো যায়না। আর তার ক'দিন আগেই আমার দাঁতের অপারেশন হয়েছিল। কষ্ট করে খেলাম। ড্রিকন্স দিতে এসেছিল। কোকা কোলা নিলাম। প্লেনে তখন প্রতি সিটের সামনে টি ভি হতনা। কয়েকটা সিট ছেড়ে ছেড়ে মাঝে একটা করে বড় টিভি। সেই টি ভিতে শ্রেক দিয়েছিল। খানিকক্ষণ দেখলাম। তারপর ঘুমাতে গেলাম। যদিও ভালো ঘুম এলোনা। বার বার চিন্তা হতে লাগল আমার ব্যাগটা কেউ চুরি করে নেবে না তো?

সকালবেলা যখন ফ্রাঙ্কফুর্টে নামলাম তখন সকাল। উপর থেকে জার্মানিকে অসাধারণ লাগছিল। আমার সেই প্রথম বিদেশ দর্শন। ছোট ছোট বাড়ি। আর রাস্তা দিয়ে ছোট ছোট গাড়ি যাচ্ছে। পুরো মনে হচ্ছিল আমার ছোটবেলার হট উইলসের গাড়ি। ফ্রাঙ্কফুর্টে আমার ৬ ঘণ্টা স্টপ। ত্রিশিখিদির সাড়ে ৬ ঘণ্টা। কলকাতায় আলাপ হয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা দেবশ্রীদির সঙ্গে। দেবশ্রীদির সাড়ে ৫ ঘণ্টা। তিনজন মিলে ফ্রাঙ্কফুর্টে একসঙ্গে বসে আড্ডা দিতে লাগলাম। তবে ত্রিশিখিদি খানিকক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়ল। তখন আমি আর দেবশ্রীদি মিলে এয়ারপোর্ট ঘুরতে লাগলাম। একটা পে ফোন বুথ দেখে দেবশ্রীদি বলল -- "কণাদ, ফোন করবে বাড়িতে?"

দেবশ্রীদির কলিং কার্ড দিয়ে ফোন করলাম। মার সঙ্গে কয়েক সেকেন্ড কথা হল। তখন আমি বুঝতে অস্বীকার করেছিলাম যে ১২ সেকেন্ড কথা বলা আর ৫২ সেকেন্ড কথা বলার মধ্যে কোন তফাত নেই। একই দাম কাটবে। ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টে আমি অনেক ইহুদি লোকজনকে দেখলাম তাদের নিজস্ব পোশাকে। ঘুরতে ঘুরতে আমরা ফিরে এলাম ত্রিশিখিদির কাছে। ত্রিশিখিদি তখন ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। সবার খিদে পেয়েছে হাল্কা। অতএব সেই ক্যাডবেরি সেলিব্রেশন খোলা হল। সবাই মনের আনন্দে তাই ভক্ষণ করলাম।

এবার বিদায় নেয়ার পালা। দেবশ্রীদি আগে বিদায় নিল। তারপর আমি।

এবার প্লেনে খুবই খারাপ সিট পেলাম। এবারে বসার ব্যবস্থা ছিল ৩-৪-৩। আমি একটি তিনের মাঝখানে বসেছিলাম। আমার এক ধারে একটি পোলিশ ছেলে। আমার অন্য পাশে একটি ভিয়েতনামি মেয়ে। বর্ধমানে ছোটবেলা থেকে ভিয়েতনাম নিয়ে এত কথা শুনেছি বলে উচ্ছ্বসিত ছিলাম, কিন্তু মেয়েটি  প্লেন চালু হতেই নাক ডাকিয়ে  ঘুমাল। পোলিশ ছেলেটি যদিও গপ্পে। জানতে পারলাম ছেলেটি নেভিতে কাজ করে। ভার্জিনিয়া যাচ্ছে। আমি জানতে চাইলাম এতদিন বাড়ির বাইরে থাকতে তার মন খারাপ করেনা। ছেলেটি বলল -- "বন্ধু, জাহাজই আমার বাড়ি।" একটি পোলিশ মুদ্রা দিয়েছিল। বহুদিন সেটি আমার সঙ্গে ছিল। এরপর কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল আর খুঁজে পাইনি।

ওয়াশিংটনে নেমে ইমিগ্রেশন করে লাগেজ আইডেন্টিফাই করতে হল। লাগেজ জমা দেওয়ার সময় এক ভদ্রলোক আমাকে "হাউ আর ইউ ডুইয়ং মাই ফ্রেন্ড?" বলায় আমি কি বলব বুঝিনি। এরকম অপরিচিত লোক কেমন আছি আগে কোনদিন জানতে চায়নি।

টার্মিনাল পাল্টে নতুন বোর্ডিং পাস নিয়ে আমি গেটের সামনে এলাম। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। একটা মেক্সিকান দোকান দেখে খেতে গেলাম। কিন্তু মুস্কিল হল কোন খাবারই তো আমি চিনিনা। তাই কিছুটা ন্যাচোস নিলাম। সমস্যা হল টাকা দিতে গিয়ে। আমি একটা দশ ডলারের নোট দিতে মেয়েটি কিছু খুচরো করে দিল। কিন্তু আমি তো মার্কিন মুদ্রা চিনিনা। এদিকে কেউ আমাকে ঠকাক সেটাও চাইব না। তাই মেয়েটিকে বললাম আমাকে বোঝাও কোনটি কি। ভাগ্যিস আসে পাশে আর কোন খদ্দের ছিলনা।

এই প্লেনে সবচেয়ে খারাপ জায়গায় বসলাম। মাঝের তিন জনের সিটের ঠিক মাঝে। ২ ঘণ্টার প্লেন যখন অরল্যান্ডো এয়ারপোর্টে পৌঁছাল, তখন রাত ১০টা। গেন্সভিলের এক সিনিয়ার দাদার বাড়িতে এক সপ্তাহ থাকব ঠিক ছিল। দাদা এয়ারপোর্টে এসেছিলেন আমাকে নিতে। দাদার বাড়ি যখন পৌঁছালাম তখন মধ্যরাত। কোনওরকমে রাতের ডিনার করে শুয়ে পড়লাম। মার্কিন মাটিতে প্রথম রাতে আমার চোখে, মাথায়, শরীরে, মানে অনুপামদার গানে যেখানে যেখানে "তুমি মেখে আছো" হয়, সেসব জায়গায় শুধুই ঘুম ছিল। 

Sunday, May 10, 2020

লবাব

এ অনেকদিনের পুরোন গল্প। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। আমি তখন সবে বর্ধমান মেডিকাল কলেজের থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমি তারাবাগে বাড়িতে থেকেই যাতায়াত করি। আমাদের বাড়ির পাশেই একটা গ্রাম, নাম গোদাগ্রাম। ঐ গ্রাম থেকে লোকজন এসে আমাদের পাড়ার সকলের বাড়িতে সাহায্য করতেন। আমাদের বাড়িতে যিনি আসতেন তাঁর নাম কমলাদি। কমলাদির মেয়ে ফুচি। বয়স বছর ৭-৮। স্কুলে টুলে যায় না। বাড়ির কাজকম্ম করে। কমলাদিকে বললে বলে -- "কি হবে বাবু পড়াশুনা করে? তার চেয়ে বাড়ির কাজটা শিখুক। বিয়ে দিতে পারব।"

আমরা কয়েকজন মেডিকাল কলেজের ছাত্র মিলে ঠিক করলাম ছুটির দিনে এরকম ফুচির মত ছেলে মেয়েদের পড়াব। কাউন্সিলার চয়নবাবুর সাহায্যে সে আয়োজনও হয়ে গেল সহজেই। সামান্য অঙ্ক, টাকা পয়সার হিসেব, বাংলা লেখা, ইংরেজি সংখ্যা চেনানো, এসব হত আর কি। ফুচির কিন্তু শেখার ভীষণ আগ্রহ ছিল। আমার মতে প্রচণ্ড শার্প মেয়ে। কমলাদির বড় ছেলে রতন বোধহয় বর্ধমানে রিক্সা চালাত। একদিন মাথায় ভুত চাপে, সব ছেড়ে কলকাতা চলে যায় সিনেমার হিরো হতে। কমলাদি দুঃখ করেন  -- "আমার কপাল, ছেলেটা জলে গেল।" ফুচির কিন্তু দাদাকে নিয়ে ভীষণ গর্ব। "দেখবেন কানুদা, আমার দাদা একদিন প্রসেঞ্জিতের মত হিরো হবে। আপনি আমাকে দাদার সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবেন তো?"

একদিন কমলাদি আমাদের বাড়ি এলেন একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে। তাতে গোটা চারেক ছানার কেক। মা জিজ্ঞেস করে -- "কি হল কমলা?"
"আর বৌদি, কি বলবো। আমার ছেলে সিনেমায় চান্স পেয়েছে। রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে। পরের বছর বেরোবে।"
"সেকি গো? দারুণ খবর তো।"

ফুচি আমাদের ছুটির ক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে গেল। "জানেন, আমার দাদার সাথে দেবশ্রী রায় সিনেমা করতে চায়, কিন্তু দাদার শতাব্দীকেই পছন্দ।"
"সেকি? কেন? দেবশ্রী খারাপ কি?"
"নাহ, আমার শতাব্দীকে ভালো লাগে। আপনার কাকে ভালো লাগে কানুদা?"
"মাধুরী।"
"যাহ, আপনি তো আবার শুধু হিন্দি সিনেমা দেখেন।"

ক'দিন যেতে না যেতেই শুরু হল
"আর কয়েক বছর যাক, দাদা এবার বম্বেও যাবে। দেখুন না, দাদা, মিঠুন আর মাধুরী মিলে সিনেমা করবে। আপনি আমায় দেখাবেন কানুদা?"
"ফুচি, অনেক বকেছিস। এবার হাতের লেখা দেখা।"

এরকম করে একদিন ফুচির দাদার সিনেমা বেরোল। নাম "নবাব"। কমলাদি আমাদের বাড়ি এসে বললেন -- "বৌদি, জানো রতনের সিনেমা বেরোচ্ছে শুক্রবার। লবাব। এস্টার-এ আসছে। আমরা তো গ্রাম থেকে সবাই মিলে যাবো। আমাকে শুক্রবার দিন ছুটি দেবে?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। ফুচিও যাবে?"
"না বৌদি, ওর ঐটুকু বয়স, যদি হলে ঢুকতে না দেয়। আমি ওকে এসে গল্প বলব। রঞ্জিত মল্লিক আছে, সন্ধ্যা রায় আছে।"

ফুচির পরের দু'দিন ক্লাসে ভীষণ মন খারাপ। আমি শেষকালে বললাম "দাঁড়া এবার পুজোয় যখন পাড়ায় পর্দা ফেলে সিনেমা দেখানো হবে, তখন আমি নবাব নিয়ে আসব।"
"সত্যি কানুদা? আপনি লবাব আনবেন তো?"
"আনব। তবে ওটা লবাব না ফুচি, ওটা নবাব।"

শনিবার দিন কমালাদি সিনেমা দেখে এলেন। মা প্রথমেই জানতে চাইল -- "কেমন ছিল সিনেমা?"
"ঐ একরকম। যা হয় বাংলা সিনেমায়। শুধু মারামারি। বাদ দাও বৌদি। বলছি আজকে আলুগুলো কি ডুম ডুম করে কাটব না সরু সরু করে?"
মা যা বোঝার বুঝে গেল। সমস্যা হচ্ছে, মা আমাকে বলেনি। বললে আমি আমিয়বাবুকে হাতে পায়ে ধরে পুজোর সময় নবাব আনতে বলতাম না।

পুজোর সময় আমাদের পাড়ায় মাঠে পর্দা ফেলে সিনেমা দেখানো হয়। একই দিনে দুটো সিনেমা। এবার প্রথমে ছিল সপ্তপদী। তারপর হবে নবাব। সিনেমা শুরুর আগেই ফুচি এসে হাজির। একটা ফাঁকা চেয়ার দেখে ওকে বসতে বললাম। ফেবেছিলাম ওর পাশে বসেই সিনেমা দেখব। কিন্তু তার আগেই আমার অন্য বন্ধুরা টেনে নিয়ে গেল। সিনেমা শুরু হল। রতনকে আমি চিনি। আগে দেখেছি। তাই মুখ জানি। একটু বাদেই রতনকে দেখতে পেলাম পর্দায়। সৌমিত্র ব্যানার্জি একটা চায়ের দোকানে বসে কিছু ছেলের সঙ্গে মাস্তানি করছি। একটি মেয়ের শাড়িতে চা ফেলে ইভ টিজিং করে। এই ইভ টিজারদের দলে ছিল রতন। লাল সাদা ডোরাকাটা একটা টার্টলনেক গেঞ্জি পরিহিত রতন কিছুক্ষণ বাদেই লবাবরুপি রঞ্জিত মল্লিকের হাতে বেধড়ক মার খেল। সে দৃশ্য দেখেই ফুচির জন্য মন কেমন করল। ওর চেয়ারের দিকে তাকাতেই দেখি ফুচি কাঁদতে কাঁদতে চেয়ার ছেড়ে ছুটে পালাল।

বেশ কিছুদিন ক্লাসে আর আসেনি ফুচি। তারপর একদিন এলো। আমার সঙ্গে চোখে চোখ রাখতে লজ্জা পাচ্ছিল। আমি কিছুই হয়নি এরকম ভাব করে, "ফুচি, ৫ এর নামতা বল" বলে শুরু করলাম।

ক্লাসের শেষে ফুচি আমাকে ডাকল - "কানুদা, দাদা হয়ত বম্বে যেতে পারবে না, কিন্তু শতাব্দীর সঙ্গে সিনেমা করবে বলুন?" 

Thursday, May 7, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ২ঃ যাত্রা শুরু

টি ভি এফ-এর "ইয়ে মেরি ফ্যামিলি" সিরিজে একটি দামী কথা বলেছিলেন মোনা সিং। ছেলে কখন বাড়ি ছেড়ে চলে যায় বোঝাই যায় না। মনে হয় পড়তে গেছে, ক'দিন বাদেই ফিরবে। সেই ফেরাটা কোনদিনই আগের মত বাড়ি থাকা হয়না।

কলকাতা পৌঁছে আমি এরকম বাড়ি ছাড়ার জন্য তৈরি হতে লাগলাম। আমার জয় বাংলাটা এক-দু দিনের মধ্যেই সেরে গেল। তারপর একদিন আমরা গেলাম ব্যাগ কিনতে। এখন আমাদের পরিবারে আগে কেউ কোনদিন বিদেশ যায়নি। তাই চেক-ইন লাগেজ কি হতে পারে আমরা ভাবতে লাগলাম। কেউ কেউ বলল হার্ড লাগেজ নিতে, কেউ কেউ বলল সফট লাগেজ। একদিন আমার বড়মামার গাড়ি করে আমরা সকলে, মানে আমি, মা, বাবা, বড় মামা আর মামি মিলে প্যান্টালুন্সে গেলাম ব্যাগ কিনতে। সবাই বলেছিল ভালো ব্যাগ কিনতে -- এত বড় জার্নি, ব্যাগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অবশেষে আমেরিকান টুরিস্টারের একটা লাল সফট আর একটা নীল হার্ড লাগেজ কেনা হল। দুর্ভাগ্যের কথা, ঐ নীল ব্যাগটি আমেরিকা পৌঁছাতে পৌঁছাতেই ভেঙ্গে যায়। তাই ওটি আর কোনদিন ব্যবহার করতে পারিনি।

সেদিন ব্যাগ কিনে বাড়ি ফিরে বুঝতে পারলাম দাঁতে একটা অস্বস্তি হচ্ছে। পরেরদিন বেহালা চৌরাস্তায় ডাক্তারবাবুকে দেখালাম। উনি দেখে বললেন -- "সর্বনাশ করেছ। তোমার একটা আক্কেল দাঁত দুটো সুস্থ দাঁতের মধ্যে দিয়ে বেরোতে চাইছে; পারছে না। তাই এখানে ইনফেকশন  করেছে। দাঁত তুলতে হবে।"
"কিন্তু আমার যে আর ক'দিন বাদেই আমেরিকা যাওয়া।"
"অসম্ভব। তোমার সুস্থ হতে মিনিমাম এক সপ্তাহ লাগবে। টিকিট পাল্টাও।"

পাল্টানো হল। পার্ক স্ট্রিটের আল্পস ট্র্যাভেলসের মালকিন তাড়াহুড়ো করে একটা সস্তার টিকিট করে দিলেন বটে। কিন্তু আমার সব বন্ধুরা আলাদা চলে যাবে। আমি একা এত বড় যাত্রা করব। পাক্কা দু ঘণ্টা ধরে আমার দাঁতের উপর কসরত চালালেন ডাক্তার বর্মন। যার ফলে আমার নর্মাল খাওয়া দাওয়া পুরো বন্ধ হয়ে গেল ৪-৫ দিনের জন্য। আমি শুধু খেতে পেতাম আইসক্রিম আর রসগোল্লা। প্রথম প্রথম কথা বলাও বারণ ছিল। আসতে আসতে সেসব মিটল।

আমার বাবা কয়েক বছর আগে ইউ জি সির কাজে একবার প্লেনে দিল্লী গিয়েছিলেন। বাবা ফিরে এসে গল্প করেছিলেন। সিকিউরিটি চেকের পর একটা বড় ঘরে সবাইকে বসতে দেয়। তারপর একটা করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন প্লেনের ভেতরে ঢুকে পরা হয়।

১১ই আগস্ট ২০০৭ রাত্রে আমি মনে হয় এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমোতে গিয়েছিলাম। পরেরদিন বেলা করে উঠলাম। মা আমার জন্য দুপুরে আলুপোস্ত করে রেখেছিলেন। মাংস খাওয়ার মত দাঁতের অবস্থা নেই। রাত ১টায় প্লেন। আমাকে সবাই বলে দিয়েছিল -- বড় জার্নি, রেস্ট নে বাড়িতে, দুপুরে ঘুমিয়ে নিস। শুলাম। কিন্তু ঘুম এলো না। বাবা দেখি বাইরের ঘরে একা একা বসে আছে। বাবার কোলে মাথা দিয়ে শুলাম। টি ভি-তে "এই ঘর, এই সংসার" চলছিল। তাই দেখলাম দুজন মিলে। বিকেলবেলা তারাবাগ থেকে কণিকাকাকিমা ফোন করলেন। ওনার ভাইয়ের শালী, ত্রিশিখীদিও আমার সঙ্গে একই প্লেনে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট যাচ্ছে। তারপর উনি টরোন্টো যাবেন। ভালোই হল, চেনা জানা কেউ তো থাকল।

সন্ধ্যেবেলা গোপু মামা আর জয়া মাইমা এলেন আমাদের বাড়ি। ওনারা জানতেন না সেদিন আমাদের যাত্রা। গোপুমামা ঠিক করল রাত্রে এয়ারপোর্ট যাবেন আমাদের সাথে। রাত নটা নাগাদ আমরা বেরোলাম। বৃষ্টি পরছিল। প্রথমে গেলাম মামাবাড়ি। দিদাকে প্রণাম করলাম। দিদা জানতে চাইল পুজোতে আসব কিনা।

অবশেষে দুই গাড়ি ভর্তি বেহালাবাসী আমাকে সি অফ করতে দমদম ছুটল। এক গাড়িতে বাবা, গোপুমামা, আমার বড় মামা আর আমার সেজ মামা। অন্য গাড়িতে বড় মামি, ফুল মামির সঙ্গে মা আর আমি। মা পুরো সময়টা আমার হাত ধরে ছিলেন। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি তো বড় হয়ে গেছি। বাড়ির বাইরে, দেশের বাইরে পড়তে যাচ্ছি। দমদমে নেমে সব ব্যাগ গুছিয়ে আবার এক রাউন্ড প্রণাম সেরে আমি গেটম্যানকে টিকিট দেখিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সবাই বাইরে থেকে হাত নাড়ছিল। কথা দিয়েছিলাম আমার লাগেজ চেক ইন হয়ে গেলে আর একবার কাঁচের ভেতর থেকে হাত নেড়ে যাব। লাগেজের লাইনে আলাপ হল যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপিকা দেবশ্রী দত্তরায়ের সঙ্গে। লাগেজ চেক ইন করে যখন হাত নাড়লাম, সবাইকে দেখতে পেলাম। মায়ের চোখে জলটাও দেখতে ভুল করলাম না। আমার মোবাইল ফোনটা না আনার জন্য আক্ষেপ করলাম। অবশেষে আমি ইমিগ্রেশনের লাইনে অগ্রসর হলাম।