Sunday, February 7, 2016

সুমিতের স্বপ্ন

সুমিতের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ক্লাস সিক্স থেকে। সেই যে স্যার সেবছর আমাকে আর সুমিতকে পাশাপাশি বসতে বললেন, আর সারা বছর আমরা ক্লাসরুমের দ্বিতীয় সারির চতুর্থ বেঞ্চে বসলাম। সুমিতকে বয়সের তুলনায় একটু বড়ই লাগত। অন্তত আমার থেকে তো বড়ই। তখন সবে সাইকেল চালানো শিখেছি। মফস্বলের ছেলেদের কাছে এ এক অন্য স্বাধীনতা। তবু স্কুলে সাইকেলে করে আসার অনুমতি পাওয়া যায়নি। ছোটকার বাইকের পেছনে চেপে স্কুলে আসতে হত। সুমিত কিন্তু সেই বয়সেই নিজে সাইকেল করে স্কুলে আসত। হিংসা করতাম ওকে। আমি অনুমতি পেয়েছিলাম পাক্কা এক বছর বাদে, যখন আমি ক্লাস সেভেন-এ । তাও তো আমাকে ছোটকা নিজে হাতে ধরে সাইকেল চালাতে শিখিয়েছে; সুমিত নিজে নিজেই হাফ প্যাডেল মারতে মারতে শিখেছে। একদিন ক্লাস শুরু হওয়ার আগে বলে, "জানিস, কাল আমি সাইকেল চালিয়ে গাংপুর গেছি।"
   আমাদের বর্ধমানের পরের স্টেশন গাংপুর। তেমন কিছু দূর নয় হয়ত। কিন্তু একটা ক্লাস সিক্সের ছেলে একা একা সাইকেল চালিয়ে সেখানে যাওয়াটা আমার কাছে তার আগের বছর কলকাতায় গিয়ে দেখা "হোম এলোন" সিনেমার সেই ছেলেটার চেয়ে কম অ্যাডভেঞ্চার কিছু মনে হয়নি। খালি ভাবতাম কবে আমিও সাইকেল চালিয়ে গাংপুর যাবো। দুঃখের কথা, আজও সে সাধ অপূর্ণ রয়ে গেছে। সুমিতের যে কথাটা প্রায়ই মনে পড়ে ওর বড় হওয়ার স্বপ্ন। "বড় হয়ে কী হতে চাস?" জিজ্ঞেস করলেই সুমিতের জবাব ছিল, "আমি ট্রেন চালাতে চাই।"
"ট্রেন চালাবি?"
"হ্যাঁ, ট্রেন চালাব। মজা না? ট্রেন চালিয়ে সারা দেশটা ঘুরব। দিল্লী, বম্বে, ম্যাড্রাস, সব যাব। আর তুই কি চাস আগে বল?"
"কাউকে বলবি না তো?"
"না, মা কালীর দিব্যি। বল।"
"আমি মহাকাশচারী হব।"
"রাকেশ শর্মার মত?"
"না, নীল আর্মস্ট্রং-এর মত। উনি যেমন প্রথম মানুষ চাঁদে গেছিলেন, আমিও মঙ্গল গ্রহে পা রাখা প্রথম মানুষ হব। কাউকে বলবি না কিন্তু।"
"আরে না না, বলব না বলছি তো।"
"তুই কি ট্রেন চালাবি? আমাদের কর্ড লাইন সুপার?"
"ফু, আমি তুফান মেল চালাব। পূর্বা চালাব, কালকা চালাব।"
"রাজধানী এক্সপ্রেস চালাবি না।"
"না, ওটা বাজে ট্রেন।"
"সে কি রে? রাজধানী তো সবচেয়ে জোরে চলে।"
"চলুক, যে ট্রেন আমার বর্ধমানে থামে না, সেটা বাজে ট্রেন।"


এরপর একদিন ক্লাস সিক্স শেষ হয়ে সেভেনে পা দিলাম আমরা। সুমিত নয়, আমার পাশে বসল ধীমান। ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত ধীমান আমার পাশেই বসত। অন্যান্য বন্ধুদের মাঝে সুমিত যেন কোথায় হারিয়ে গেল। আসলে আমাদের অনেক ফারাক। সুমিত আমার মত ক্রিকেট খেলতে বা ফেলুদা পড়তে ভালবাসত না। আমি, ধীমান, তন্ময়, দেবাঞ্জনরা যখন মিত্তিরদের মাঠে চুটিয়ে ক্রিকেট খেলছি, বা খেলা শেষে অপ্সরা থিয়েটারের মামলা নিয়ে আলোচনা করছি, সুমিত হয়ত তখন রেল লাইনের পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে কোথাও যাচ্ছে। তারপর একদিন আমিও বর্ধমানের পাট চুকিয়ে দিলাম। কলকাতা, কানপুর ঘুরে এই মার্কিন দেশে এসে থিতু হলাম। বাবার চাকরিও কলকাতার ব্যাঙ্কে। তাই নতুন ফ্ল্যাট কিনে বাবা মাও চলে এল লেকটাউনে। ছোটকাও বেশিদিন থাকল না বর্ধমানে। কাজের সূত্রে চলে গেল দিল্লী। শুধু রয়ে গেল মেজকা আর কাকিমণি। মেজকার মেয়ে পুতুলদিদির বিয়ে হল দুর্গাপুরে, তাই মেজকা শত অনুরোধেও বর্ধমান ছাড়ল না।
   আমার এই বহু বছর বাদে বর্ধমান আসার কারণটা কিন্তু আলাদা। রূপসার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আর ও দেশে থাকতে ইচ্ছে করল না। প্রথমে তো ভেবেছিলাম চাকরি বাকরি ছেড়ে দেব। কিন্তু আমার সহকর্মী প্রোফেসর গিবস বারণ করলেন। তাই আপাতত স্যাবাটিকাল নিয়ে ভারতবর্ষে। ভাবলাম অনেক বছর বর্ধমান যাইনা। তাই মা-বাবা-আমি তিন জন মিলেই এবার বর্ধমানে। মেজকা তো ভীষণ খুশি। কাকিমণি রোজ নিত্য নতুন রান্না খাওয়াচ্ছে। একটা ভালো, এই বাড়িটা বিশাল। তাই মাঝে মাঝেই আমি তিনতলার কোন ঘরে একা একা থাকি। কেউ ডাকতেও আসে না। দেখছেন আবার বাজে বকছি, গল্পটা তো আমার একা থাকা নিয়ে নয়, গল্পটা তো সুমিতকে নিয়ে।
   সুমিতের সঙ্গে আমার আবার দেখা হল পরশু বিকেলে। বর্ধমান গত কয়েক বছরে এত পাল্টে যাবে আমি ভাবতেও পারিনি। আগে যেমন ছিল শুধুই সাইকেল রিক্সা, এখন পুরো শহরে টোটো ছেয়ে গেছে। টোটো এক ধরনের ব্যাটারি চালিত রিকশা। উঠলেই দশ টাকা ভাড়া, যতদূর খুশি যেতে পারেন। বর্ধমানে বিগ বাজার, ডমিনোজ পিতজা, আইনক্স সিনেমা সব হয়েছে দেখলাম। পুরনো সিনেমা হলগুলি প্রায় সব বন্ধ হয়ে গেছে। সেদিন আইনক্স থেকে একটা সিনেমা দেখে বেড়িয়ে ভাবলাম হেঁটেই বাড়ি ফিরি। সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে, তেমন গরমও নেই। মিনিট দুয়েক হাঁটার পর একটা সাইকেল যেন ঘাড়ের কাছে এসে থামল।
"চিনতে পারছিস? তোকে আইনক্সের সামনেই দেখেছিলাম। ডাকলাম, শুনতে পারিসনি বোধহয়।"
চিনতে পারিনি। তবে সাইকেলটার দিকে চোখ যেতেই পারলাম।
"সুমিত না?"
"আরে, তুই চিনতে পেরেছিস। আমি সত্যি ভাবিনি পারবি?"
"তোর সাইকেল দেখে পারলাম। এখনও বদলাসনি?"
"নো স্যার, গত ২০ বছর ধরে সেই সাইকেল। অনেকবার সারাতে হয়েছে। চল, ওই চায়ের দোকানে গিয়ে বসি। তুই এখানকার চা খাস তো?"
"কেন খাব না? চল।"
"না তুই এখন বিদেশি মানুষ ভাই।"
"ধুর, চল, চা খাওয়া যাক। তুই কি এখনও সেই পুরনো বাড়িতেই আছিস, নার্স কোয়ার্টারের কাছে?"
"একদম। কতদিন আছিস, একদিন চলে আসিস। আমার গিন্নী, মেয়ের সাথে তোর আলাপ করিয়ে দেব।"
"তোর মেয়ে আছে? বাহ, কত বড়?"
"এই ৪ বছরের। তোর কি খবর? বিয়ে থা করিসনি?"
বুঝলাম সুমিত জানে না। ইচ্ছে করেই মিথ্যে কথা বললাম।
"নাহ করিনি।"
"কর কর, বুড়ো হয়ে গেলি তো? এই কৃষ্ণ, এদিকে দুটো স্পেশাল চা দে।"
"তা তুই কি চাকরি করছিস?"
"হ্যাঁ রে ভাই, আমার তো জানিস। রেলে আছি।"
"ওহ, কোন স্টেশনে? বর্ধমানেই?"
"আরে না রে ভাই, আমি ড্রাইভার। ট্রেন চালাই। মনে আছে তোকে বলতাম স্কুলে পড়তে। আজই তো সকালে দুন এক্সপ্রেস নিয়ে ফিরলাম। হে হে হে ... এই নে চা।"
গরম চা টা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত যেন থমকে দাঁড়ালাম। এই সুমিত, যে ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখত ট্রেন চালাবে, আজ নিজের স্বপ্ন সত্যি করেছে। আর আমি, আমি যেন সেই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়া এক সাধারণ মানুষদের একজন, যারা কোন আরামের অবস্থান পেলেই নিজেদের স্বপ্ন ত্যাগ করতে দুবার ভাবে না, বা নিজেদের স্বপ্নটা পাল্টে ফেলে।

একবার চট করে আকাশের দিকে চোখ গেল। মঙ্গল গ্রহে এখনও মানুষের পা পড়েনি।

   

Friday, January 29, 2016

জাফর পানাহীকে

প্রাপক:
শ্রী জাফর পানাহী,
তেহরান, ইরান।

প্রিয় জাফরবাবু,

সালাম।
প্রথমেই বলি আমি কোন সিনেমার ছাত্র নই, কোন পেশাদারী চলচ্চিত্র সমলোচক বা সাংবাদিক ও নই। আমি নিতান্ত এক ছাপোষা চলচ্চিত্র প্রেমী। আপনার সিনেমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় বছর ৫-৬ আগে। তখন আমি সবে পারস্য সিনেমা দেখা শুরু করেছি। মাজিদ মাজিদির "বাচ্চা-এ-আসমান" বা "রঙ্গ-এ-খোদা" দেখা শেষ হয়েছে। এক বন্ধুর কাছে শুনলাম আপনার সিনেমা "অফসাইড" এর নাম। ফুটবল নিয়ে সিনেমা। ইরানে নাকি মেয়েদের ফুটবল মাঠে খেলা দেখতে যাওয়া বারণ। ইরান-বাহরিন এর ফুটবল খেলায় কিছু মেয়ে খেলা দেখতে যায় ছেলে সেজে, এবং ধরা পরে, তাদের নিয়েই সিনেমা। দেখলাম সে সিনেমা। মন ছুঁয়ে গেল। তারপর একে একে দেখলাম "ওয়াইট বেলুন", "আয়না", "ক্রিমসন গোল্ড"। প্রতিটি সিনেমাই মুগ্ধ করে। একদিন শুনলাম আপনাকে নাকি ইরান সরকার আর সিনেমা করতে বারণ করেছে। নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে আপনার ওপর। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। তারপর বহুদিন হয়ে গেছে। এর মধ্যে পারস্য দেশের অন্যান্য সিনেমা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সমীরা মখমল্বাফের "আপেল" দেখে অবাক হয়ে ভেবেছি, একটি উনিশ বছরের মেয়ে কি করে এর'ম সিনেমা বানায়!! কিওরাস্তামির "উইন্ড উইল ক্যারি আস", মোহসেন মখমল্বাফের "কান্দাহার" দেখে বার বার ভেবেছি ইরানের মত একটা রক্ষণশীল সমাজে যদি এই সিনেমা তৈরী হয়, আমরা কেন পারি না?
  শুনেছিলাম নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নাকি আপনি আরও দু খানা সিনেমা বানিয়েছেন। দেখা হয়নি একটাও। কাল রাত্রে আপনার সাম্প্রতিকতম ছবি "ট্যাক্সি" দেখলাম। সেই কারণেই এই চিঠি। শুনেছি আপনার বাকি দুই সিনেমা নাকি গৃহবন্দি অবস্থায়, এই প্রথম নাকি আপনি বহিরদৃশ্য করলেন। সিনেমা দেখতে দেখতে যেন অনুভব করছিলাম কতটা কষ্ট, কতটা বেদনা দিয়েছে আপনাকে এই নিষেধাজ্ঞা। ছত্রে ছত্রে আপনি তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। এই সিনেমায় আপনি এক ট্যাক্সিচালক। ট্যাক্সির সহযাত্রীদের কথায় বার বার প্রকাশ পায় ইরানের সরকারের প্রতি আপনার তীব্র আক্রোশ। যে দেশে মেয়েদের জীবন মাছের জীবনের সঙ্গে তুলনীয়, যে দেশে অপরাধের তারতম্য না দেখেই লোককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; সেই দেশ, সেই সমাজকে আপনি বার বার আক্রমণ করেছেন।
     একসময় ট্যাক্সিতে উঠেছে আপনার ভাগ্নি হানা ( ইংরেজিতে নিস লেখা, ভাইঝি বা ভাগ্নি দুইই হয়, আমি ভাগ্নি ধরলাম)। হানার স্কুলের প্রোজেক্ট একটি সিনেমা বানানো। কিন্তু স্কুলের শিক্ষক বলে দিয়েছেন কিরম সিনেমা বানাতে হবে। আর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা যাবে না, ছেলেদের টাই পরানো যাবে না, চরিত্রের নাম ধার্মিক নাম হতে হবে। একসময় গাড়ি চালাতে চালাতে সে সব আর শুনতে চাইলেন না আপনি, বিরক্ত হয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। আসলে এই শিক্ষক যে ইরান সরকার, যারা এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেয় পরিচালকদের ওপর। কিছু পরে আপনার পুরনো সিনেমার অভিনেত্রী ও একিই অভিযোগ করেন। এবং হানাকে বলতে শোনা যায় "ওরা নিজেরাই তো দুঃখ তৈরি করে, তবে তা দেখাতে দেয় না কেন? আমি গুলিয়ে ফেলেছি কোনটা বাস্তব আর কোনটা কল্পনা।" ব্যাথা দেয় জাফরবাবু, হানার কথা আমাদেরও ব্যাথা দেয়। সিনেমার শেষে তো আপনি সেই কথাই বলেন, "সরকার মনে করে না আমার সিনেমা জনসাধারণকে দেখানোর যোগ্য।"
     এবার বলি সিনেমায় আমার প্রিয় দৃশ্যের কথা। আপনি ট্যাক্সিতে হানাকে রেখে বেড়িয়েছেন। হানা জানালা দিয়ে দেখে এক সদ্য বিবাহিত দম্পতি গাড়িতে উঠছে, এবং এক পেশাদারী ফোটোগ্রাফার হ্যান্ডিক্যাম দিয়ে তাদের ছবি তুলছে। হানা পুরো দৃশ্যটি নিজের স্কুলের প্রজেক্টের জন্য নিজের ছোট ক্যানন ক্যামেরাতে তুলে রাখছে। হঠাৎ দেখে একটি ছেলে কাঁধে এক বড় বস্তা নিয়ে সেখান দিয়ে যেতে গিয়ে রাস্তা থেকে একটি টাকা কুড়িয়ে নেয়। ঘটনাক্রমে টাকাটি খানিক্ষন আগেই বরের পকেট থেকে পরেছে। ছেলেটি এরপর যখন একটি ডাস্টবিন এর মধ্যে কাজের জিনিস খুঁজতে যায়, হানা তাকে ডাকে আর বলে টাকাটি ফেরত দিয়ে আসতে। তাহলে আত্মত্যাগের মত একটি দরকারি গুণ প্রকাশ পাবে, এবং এটি হানার সিনেমায় কাজে দেবে। হানা ছেলেটিকে নিজের সিনেমার নায়ক করারও প্রস্তাব দেয়। ছেলেটি বলে ওঠে -- "আত্মত্যাগ, দানধ্যান, এসব কি ফালতু জিনিস।" গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে জাফরবাবু, খানিক্ষণের জন্য সিনেমাটা থামাই। অবশেষে ছেলেটি যখন রাজি হয় টাকাটি ফেরত দিতে, তখন ওই পেশাদারী ফোটোগ্রাফার তাকে সরিয়ে দিতে থাকে গাড়ির সামনে থেকে। কি অপূর্ব দৃশ্য। ফোটোগ্রাফারের বড় ক্যামেরাতে ধরা পড়ছে শুধুই দম্পতি, দূরে গাড়ির মধ্যে বসে ছোট ক্যামেরাতে হানা তুলে নিচ্ছে পুরো দৃশ্য। কার ক্যামেরা বড়, কার ছবি বড়। সারাজীবন ওই দৃশ্যটা ভুলতে পারব না জাফরবাবু।
     শুনলাম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে "গোল্ডেন বেয়ার" জেতার পর ট্যাক্সি সম্বন্ধে বিখ্যাত পরিচালক ড্যারেন আফ্রোন্সকি নাকি বলেছেন এই সিনেমা হচ্ছে প্রেমপত্র, এই শিল্প, সমাজ, দেশ, দর্শকের প্রতি আপনার প্রেমপত্র। আমার এই চিঠি হয়ত আপনার কাছে কোনদিন যাবে না, গেলেও হয়ত আপনি বাংলাভাষা বুঝবেন না। তা হোক, আপনি যে ভাষা বোঝেন, যে ভাষায় কথা বলেন, সেই সিনেমার ভাষা, সেই প্রেমের ভাষায় আমাদের মত দর্শকদের সঙ্গে কথা বলুন। আর আমরা মুগ্ধ হয়ে আপনার কথা শুনি।

ভালো থাকবেন। খুদা হাফিজ।

ইতি,

কণাদ




Friday, January 22, 2016

নেতাজী জয়ন্তী

- কোথায় চললি?
- এই তো আজ নেতাজী  জয়ন্তী, তাই ক্লাবের অনুষ্ঠানে। তুই?
- আমিও, চল, একসাথে যাওয়া যাক।
- ভালোই হল। আজ শুনেছিস প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে নাকি নেতাজীর অন্তর্ধানের গোপন তথ্য পাওয়া যাবে?
- শুনলাম। দারুণ ব্যাপার। অনেকদিন আগেই এটা উচিত ছিল।
- একদম, কটা নাগাদ করবে জানিস?
- হবে বিকেলবেলা করে, সরকারি ব্যাপার ভাই।
- বিকেলে তো আবার ডার্বি।
- ডার্বি আবার কি? আবার ৪ গোল খাবি, যতবার ডার্বি, ততবার হারবি।
- যাহ যাহ, আগে একবার আই লিগটা জিতে দেখা বুঝলি। মোহনবাগান ভারতসেরা।
- তাতেও তো আমাদের কাছে ৪-৫ গোল খেয়ে থাকিস।
- ৫ গোল নিজের চোখে দেখেছিস বাবু? বাজে বকছিস। আমি দেখেছি।
- ৫-০ আর ৫-৩ এক হল? যত অশিক্ষিত ঘটি।
- কোথাকার শিক্ষিত বাঙ্গাল এলো রে? একবারও এই লিগ জেতার মুরোদ নেই, সেই কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগে জাতীয় লিগ জিতেছে, এখন বাতেলা!!
- ভাগ শালা, তোর সাথে কোথাও যাবো না, তুই একাই ক্লাবে যা। তোর সঙ্গে নেতাজী জয়ন্তী পালন করলে নেতাজীর অপমান। বাড়ি যাই।
- আমারও বোয়ে গেছে তোর সাথে ক্লাবে যেতে, বাড়ি গেলাম। এক বাপের ব্যাটা হলে খেলা শেষের পর দেখা করিস।
- যা ভাগ
- দুর হ 

Saturday, January 16, 2016

থাপ্পড়

"স্যার ভালো আছেন?"
"আরে, কবে এলে? এস, এস, ভেতরে বস। আরে থাক থাক আর প্রণাম করতে হবে না।"
"পরশু রাত্রে এসেছি।"
"তোমার খবরটা পড়েছি কাগজে, বাড়িতে সবাইকে বলেছি দেখো এই ছেলেকে আমি নিজে হাতে অঙ্ক শিখিয়েছি, আজ সেই ছেলে অঙ্কে নোবেল মানে ফিল্ডস মেডেল পেয়েছে। তুমি তো বোধহয় প্রথম ভারতীয় তাই না? "
"না না স্যার, আমার আগে প্রফেসর ভারগভ পেয়েছিলেন ২০১৪-এ, আমি প্রথম বাঙ্গালি বলতে পারেন।"
"বেশ বেশ, ভাবা যায়, আমাদের এই স্কুলের ছেলে, সেই সাদা জামা, কালো প্যান্ট পড়ে স্কুলে আসতে সাইকেলে চেপে, সে আজ অঙ্কে নোবেল পেয়েছে। এই বিল্টু তোর মাকে বল চা করতে। "
"না না স্যার, চা লাগবে না।"
"আরে খাও খাও, শীতের দিন। তোমার সব খবর তো কাগজে পড়ি। সেদিন দেখি লিখেছে তোমার প্রিয় খাবার নাকি আলু পোস্ত। আমি তো শুনে হাসছি, আরে আমাদের বর্ধমানের ছেলে, তার প্রিয় খাবার আলু পোস্ত ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে নাকি?"
"আপনার কি খবর স্যার, কাকিমা কেমন? আর কৌশিকদা?"
"তোমার কাকিমার বড় বাতের ব্যাথা, নড়তেই পারেনা তেমন। আমার চলছে। এখনও রোজ সকালে দু মাইল হাঁটি। কৌশিক স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি করে। এই তো বিল্টুওরই ছেলে, আমার একমাত্র নাতি। এবছর ক্লাস থ্রিতে উঠল। তা তোমার সঙ্গে বহুদিন বাদে দেখা হল। এত সকালে কি মনে করে?"
"ইয়ে স্যার আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।"
"কি বলতো?"
"মনে আছে স্যার, ক্লাস নাইনে আপনি আমাকে একটা থাপ্পড় মেরেছিলেন?"
"মেরেছিলাম? মনে নেই তো। বয়স হচ্ছে তো। তা কেন মেরেছিলাম বলতো? তুমি তো ভালো ছেলে ছিলে? ক্লাসের ফার্স্ট বা সেকেন্ড বয়।"
"আমি একটা দ্বিঘাত সমীকরণ কষতে গিয়ে স্টেপ জাম্প করি, তাই। আপনি ভীষণ বকেছিলেন আর বলেছিলেন যেন কোনদিন আর স্টেপ জাম্প না করি। বিশ্বাস করুন, তারপর থেকে আর কোনদিন স্টেপ জাম্প করিনি। আই আই টি তে পড়তেও না, এম আই টি তে পড়তেও না, এখন যে হার্ভার্ড এ পড়াই, এখনও না। এমনকি যে কাজের জন্য এই ফিল্ডস মেডেলটা পেলাম, সেটা করতে গিয়েও না। যখনই স্টেপ জাম্প করার প্রলোভন জাগে, আপনার থাপ্পড়টা মনে পড়ে যায়।"


Friday, January 15, 2016

মধ্যবিত্ত ভীরু প্রেম

শীতকালে গোধূলিবেলা আসে না, ঝুপ করে অন্ধকার নামে। সাত ওভারের ক্রিকেট খেলায় দ্বিতীয় ইনিংস কেউ খেলতে চায় না, ব্যাটিং শেষ করা যায় না।

   এ তো আর গ্রীষ্মকাল না, সে লম্বা বিকেলবেলাও পাওয়া যাবে না। গ্রীষ্মের বিকেল দীর্ঘস্থায়ী, সে তুমি চাও বা না চাও। তোমার মন ভাল থাকলে তাকে উপভোগ করো; মন খারাপ থাকলে তাকে অভিশাপ দিয়ে সন্ধ্যার প্রতীক্ষা করো। এ বর্ষার বিকেলও না, যা তোমার মন খারাপ করে দেবে। এ শীতকালের বিকেল -- তোমার মনের তোয়াক্কা সে করে না, শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যাবে, তোমাকে খুশি করা বা তোমার মন খারাপ করা তার দায়িত্ব নয়।

  বুঝতে পারলাম ঠোঁটটা ফেটেছে। সদ্য শীতের প্রথম ঠোঁট ফাটা নয় যে নোনতা রক্তের স্বাদ লেগে থাকবে। শেষ পৌষের ছোঁয়ায় ঠোঁটটা সাদা হয়ে এসেছে। বাঁ হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে রেখে ডান হাতে মাফলারটা জড়িয়ে নিলাম ভাল করে। উত্তুরে শীতের হাওয়া যেন ঝাপটা মারছে। পুরো রাস্তায় দুটি সাইকেল। আর কোন যানবাহন বা মানুষও চোখে পড়ে না। আমার সবুজ রঙের হিরো জেটের সামনে এক তন্বী। প্রায় অনেকক্ষণ ধরেই আমার সামনে চলেছেন তিনি। পরনে সাদার ওপর গোলাপি ফুলের ছাপ চুড়িদার ও বাদামী সোয়েটার। লম্বা বিনুনি পিঠের ওপর এলিয়ে পরেছে। মাথায় কোন ওড়না বা স্কার্ফ নেই। ঠাণ্ডা লাগে না?
    চমকে উঠলাম। আচ্ছা, সেও তো মাথা ঢাকত না। সেদিন তারো পরনে ছিল এরকমই এক চুড়িদার ও সোয়েটার। এমনকি বিনুনিটিও ......। আমি যদি সেদিন মাফলার জড়াই নি। রক্ত গরম, ঠাণ্ডা লাগেনা, তাই মাফলারও লাগেনা -- এই কি বোঝাতে চেয়েছিলাম? গত কুড়ি বছরে আমার সাইকেলের পরিবর্তন না হলেও আমার শরীরের হয়েছে -- আজ আমি মাফলার পরিহিত।
     আচ্ছা, এগিয়ে যাবো? পাশে গিয়ে তাকাবো তার দিকে? এই মেয়েটি হয়ত সে নয় -- হতেও তো পারে সে!! তাহলে কি সেদিনকার মতই তাকাবে আমার দিকে? ডান চোখের কোনের তিলটির পাশের চামড়া কি একিই ভাবে কুঁচকাবে? ভ্রু পল্লবে কি দেখা দেবে চিন্তার রেখা? সোয়েটারের সঙ্গে সেফটিপিনে বাঁধা ওড়না কি ঠিক করে নেবে?
   সেই মুহূর্তে, যে মুহূর্তে পাড়ার মাঠের ছেলেরা ক্রিকেট ছেড়ে উইকেট তুলতে যায়, যে মুহূর্তে ট্রিঙ্কাসের গায়ক "মনে পড়ে রুবি রায়" ধরেন, যে মুহূর্তে লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রী মাঙ্কি ক্যাপটি জড়িয়ে চা ওয়ালার কাছে আর এক কাপ চা চায় "২ টো ডায়মন্ড" ডাক দিয়ে, যে মুহূর্তে পাড়ার ওষুধের দোকানের আলোগুলো জ্বলে ওঠে, রোলের দোকানের প্রথম ডিমটা ফেটানো হয়, যে মুহূর্তে অলস ভাবে শুয়ে শুয়ে পাশের বাড়ির তুলশিতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপের শিখা দেখে অপূর্বর অপর্ণার কথা মনে পড়ে -- সেই মুহূর্তে আমি সাইকেলটা এগিয়ে নিলাম, তার দিকে না তাকিয়েই বললাম -- "সেদিন চিঠিটা নিলেই পারতে, কস্তূরী।"

Wednesday, October 28, 2015

পুনর্মিলন

"স্যার, চিনতে পারছেন?"
"না, ঠিক চিনতে পারলাম না, কে বলো তো?"
"আমি স্যার, অনির্বাণ, ২০০৩ মাধ্যমিক, ২০০৫ উচ্চমাধ্যমিক, টাউন স্কুল । "
"ও মনে পরেছে, খোসবাগানে বাড়ি না তোমাদের?"
"হ্যা স্যার, এই অবস্থায় আর আপনাকে প্রণাম করতে পারছি না। "
"আরে না না, ঠিক আছে, তা পায়ের এই দশা কি করে?"
"বাইক এক্সিডেন্ট স্যার, পা টাও গেছে।"
"ওহ, কোথায় হয়েছিল?"
"ওই গোলাপবাগ মোড়ের কাছে, পিছন থেকে লরির ধাক্কা। "
"সাবধানে চালাবে তো? হেলমেট ছিল না?"
"ছিল স্যার, তবুও  ..."
"হুম, কি দিনকাল পড়ল? তা তুমি চাকরি কি করতে? তোমার সঙ্গে তো মাধ্যমিকের পর আর দেখাই হয়নি বোধহয়। "
"দেখা হয়েছে স্যার, আমি তো স্কুলেই ছিলাম। তবে সায়েন্স নিইনি। তাই আপনার অঙ্কের ক্লাসে দেখেননি।"
"ওহ তাই হবে, ভুলে যাই।  তুমি কি কমার্স ছিলে ?"
"না স্যার, আর্টস। "
"তারপর কি করলে?"
"রাজ কলেজ থেকে বি. এ. পাস করে বসেই ছিলাম স্যার। টিউশন করছিলাম, ব্যান্ক, রেলের পরীক্ষা দিচ্ছিলাম, কিছুই পাচ্ছিলাম না।  অবশেষে বছর ৩ এক আগে এই ডমিনোজ পিত্জা তে চাকরি পেলাম।"
"বর্ধমানে ডমিনোজ আছে নাকি?"
"অনেক দিন তো স্যার, ৩ বছর হলো।  আপনি খাননি?"
"নাহ, আমি সেই আমেরিকায় গিয়ে ছেলের কাছে থাকার সময় খেয়েছিলাম। কলকাতা তে আছে জানি, বর্ধমানে আছে জানতাম না। তো সেখানে কি করতে? "
"এই স্যার, আমি বাড়ি বাড়ি পিত্জা ডেলিভারি করতাম। বাইক চালাতে পারি, ইংরেজি, হিন্দি দুটোই বলতে পারি, চাকরি পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।"
"সেই করতে গিয়েই কি এই এক্সিডেন্ট?"
"হ্যা স্যার।"
"তা তোমার ভাই বোন  আছে?"
"ভাই আছে স্যার, অর্ণব।  বম্বে তে চাকরি করে, ওই যে দেখুন এসেছে।"
"আচ্ছা, তোমার বাবা কি অবসর নিয়েছেন?"
"হ্যা স্যার, হেড পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন।"
 "তা তুমি সংসার করেছ?"
"না স্যার, এই চাকরি তে ..."
"হুম"
"আপনার কি হলো স্যার?"
"ক্যান্সার, যকৃতে।"
"এ বাবা, খুব কষ্ট শুনেছি ?"
"হ্যা তা কষ্টটা ভয়ানক-ই বটে। "
"আপনার ছেলে, মানে অতীনদা তো আমেরিকায় থাকে, ওখানে শুনেছি খুব ভালো চিকিত্সা, দেখাননি?"
"আরে ৩ মাস আগেই ধরা পড়ল, অতীন বলছিল আসবে আমাকে নিয়ে যেতে, ছুটিই পায়না বেচারা। এখন আবার কিসব গ্রিন কার্ড না কি করাচ্ছে, কে জানে কবে আসবে এদেশে।"
"ওহ, ওটা কে ওখানে দাঁড়িয়ে ? আমি তো ভাবলাম অতীনদা। "
"না না, ও আমার ভাগ্নে সুবিমল, পাশের বাড়িতে থাকে।"
"আচ্ছা আচ্ছা।"
"তোর কথা একেবারেই মনে পরছে না, তুই কি স্কুলে খুব দুষ্টু ছিলি ? তুই বলছি কেমন? "
"অবশ্যই তুই বলুন। হ্যা স্যার, সেই একবার আপনার ক্লাস কামাই করে আমরা স্টারে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম, আপনি জানতে পেরে আমাদের বেত দিয়ে মারেন।"
"ওহ মনে পরেছে, তুই সেই দলে ছিলি, তার মানে তুই বসন্তর বন্ধু?"
"ছিলাম স্যার, এখন বসন্ত এলাকার এম.এল.এ. আমাকে কি আর বন্ধু ভাবে?"
"জানি রে, গতবছর এসেছিল আমাকে বাড়ি ভোটের আগে।  সঙ্গী সাথীদের সামনে আমাকে এমন ভাবে স্যার স্যার করতে লাগলো, যেন খুব শ্রদ্ধা করে।  জীবনে তো ক্লাসে দেখলাম না। "
"জানেন স্যার, আপনার একটা ডাকনাম ছিল আমাদের মধ্যে?"
"শুনেছি মনে হয়, তবু বল। "
 "তুফান মেল।  আপনি খুব তাড়াতাড়ি অঙ্ক কসতেন , আমরা কিছুই বুঝতাম না।  ফ্যাল ফ্যাল করে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তাই এই নাম।  কিছু মনে করলেন না তো স্যার?"
"আরে ধুর, এখন আর মনে করে কি হবে? তা তুই সায়েন্স পড়লি না কেন?"
"স্যার, আমি মাধ্যমিকে কোনরকমে অঙ্কে ৫০ পাই।  ওই ত্রিকোনমিতি আমার মাথাতে কোনদিন ঢুকত না। "
"আরে বলবি তো, তোকে নাহয় আমি ক্লাসের পর আলাদা করে দেখিয়ে দিতাম। "
"হ্যা স্যার, সেটা ভুল হয়েছে।"
"আসি রে, আমার ডাক পরেছে, ওপারে গিয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করছি। "
"আপনার তাড়া থাকলে চলে যেতে পারেন।"
"আরে ধুর, কিসের তাড়া ? তুই আয়ে।  দেখা হচ্ছে?"
"ঠিক আছে স্যার। "


পুরুতমশাই বললেন, "সুবিমল, মামাকে শেষ বারের মত প্রণাম করে নাও।"









Saturday, September 19, 2015

তারাবাগ ডাইরিজ ২ ঃ আমার পুজো

শরৎকাল এলেই আমার ছোটবেলার পুজোর দিনগুলির কথা মনে পরে যায়। বর্ধমানে বড় হয়েছি, থাকতাম University Teachers' quarters তারাবাগে। আমার পুজোতে ঠাকুর দেখা বা জামাকাপড় কিনতে যাওয়া তেমন ছিল না। অনেকটাই ঘরকুনো, বা ঠিক ভাবে বলতে গেলে পাড়াকুনো পুজো হত। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম মা বেড়িয়ে গেছেন অঞ্জলি দিতে বা পুজোর জোগাড় করতে। অর্থাৎ লুচি নয়, জলখাবার হচ্ছে পাউরুটি আর ডিম সিদ্ধ, খুব একটা আপত্তি থাকত না। কারণ তারপর শুরু হত টানা ৩-৪ ঘণ্টার ক্রিকেট। খুব ছোটবেলা থেকেই নাস্তিক বলে কোনদিন পুজোয় অঞ্জলি দেয়ার কথা মাথায় আনিনি। দুপুরবেলা এসে পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা বা শুকতারা নিয়ে বসা। কাকাবাবু, বাবলু বা ফ্রান্সিস -এর সঙ্গে দুপুরটা কেটে যেত। বিকেল হলে দূরদর্শনের পরদায় পূজা পরিক্রমা দেখা। কলকাতা বা অন্যান্য জেলার বিভিন্ন মণ্ডপের পুজো টিভিতেই দেখতাম। সন্ধ্যে হলেই আমাদের পাড়ার প্যান্ডেলে চলে যেতাম। প্রসাদ খাওয়ার পর শুরু হত সাংস্কতিক অনুষ্ঠান। কোনদিন পাড়ার ছেলেরা মিলে নাটক করল, বা মেয়েরা নাচ/গান এর আয়োজন করল। কোনদিন বাইরে থেকে কোন magician এলেন। আবার কোনদিন পরদা ফেলে দেখান হত "Born Free" (এটা নিয়ে আমার ঘোর আপত্তি থাকত, কারণ প্রতিবারি ওই একিই সিনেমা দেখান হত)।
     কোন কোন বার পুজোর সময় বাড়ির বাইরে ঘুরতে যাওয়া হত। একবার মনে আছে শঙ্করপুর গিয়েছিলাম। বাবা কিন্তু চাইতেন দশমীর দিন তারাবাগে থাকতে। দশমীর দিন ভ্যানে করে ঠাকুর নিয়ে সারা পাড়া ঘোরান হত। তারপর বিসর্জন ও লাড্ডু বিতরণ। বাবা ফিরে ঠাকুরমা আর ঠাকুরদার ছবিতে মালা দিতেন। দুজনের কাউকেই আমি কোনদিন দেখিনি। ঠাকুমা চলে গেছেন যখন বাবার ২ বছর বয়স, আর ঠাকুরদা যখন বাবার বয়স ১০। একবার দেখেছিলাম দশমীর পর বাবা একা ঘরে চুপ করে ঠাকুমার ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন । জানি না, ঠিক এই কারণেই কি বাঙ্গালি বার বার শারদোৎসব করে?