Tuesday, July 26, 2016

স্বপ্ন



"ছোটকা, তুমি?”

"ওঠ, আর কতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকবি? নাটক তো শুরু হয়ে যাবে।”
"নাটক! কিসের নাটক?"
"আরে আজ আম্রকুঞ্জে নাটক আছে, কিছুই জানিস না দেখছি।" 
"কিন্তু তুমি? তুমি কোথা থেকে এলে? তুমি তো ...। "
"আমি তো কি?"
"তবে যে শুনেছিলাম এই বর্ষায় সাপের কামড়ে তুমি ...।"
"ঠিকই শুনেছিলি, পরে সেসব বোঝাব। এখন চল।"
"না মানে বাবা তো এসেছিল সেই সময়। ঠাম্মা ভীষণ কান্নাকাটি করছিল মনে আছে। বাবা বলছিল দিল্লিতে আমাদের সঙ্গে থাকলে এটা কখনওই হত না। তোমার বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে রাগারাগি করছিল।" 
"এসব বলেছে নাকি মেজদা? ছোটবেলা থেকে শুধু গুড বয় হয়েই জীবন কাটাল।"
"কিন্তু তুমি কি করে এলে এখানে?"
"আরে দেরি হয়ে যাচ্ছে। চ, রাস্তায় যেতে যেতে বলি।" 
"চল। দাঁড়াও, সোয়েটারটা পরে নি।"
"হুঁ, পরে নে, বাইরে ঠাণ্ডা আছে, আর ফিরতে রাতও হতে পারে।"
"আমি রেডি, বল, কিভাবে যাবে? রিকশা নেবে?"
"আরে ধুর, হেঁটেই চলে যাব। কাছেই তো।"
"কাছে কি গো? রিকশা করেই তো পনের কুড়ি মিনিট লেগে যায়।"
"হা হা, আয় আমি একটা শর্টকাট চিনি।"
"আরে, এটা তো বাড়ির পিছনদিকের রাস্তা, পুকুরপাড়ে চলেছে।"
"হ্যাঁ, ওখান দিয়েই যাব, চল।"
"তোমরা নাকি এই পুকুরে সাঁতার কাটতে?"
"শুধু তোর বাবা কাটত না।"
"তুমি এখন বাবার ওপর রেগে আছ?" 
"আরে না, সত্যিই কাটত না। তুই শিখেছিস?"
"হ্যাঁ, আমাদের পিতামপুরার সুইমিং পুলেই শিখি।"
"তাও ভাল, আমি তো ভেবেছিলাম মেজদা তোকে সাঁতার শেখাবেই না।"
"আরে পুকুরের পাশের এই রাস্তাটা কি? আগে দেখিনি তো।"
"হুঁ হুঁ বাবা, সব যদি জানবে তাহলে তো হয়েই গেল। তোর বাবাও এই রাস্তাটা চেনে না।"
"আমি কাল সকালে বাবাকে এটা চিনিয়ে দেব।"
"পারবি না। কাল সকালে এই রাস্তা আর থাকবে না।"
"কেন?"
"তুই বড্ড প্রশ্ন করিস। চল, ওই দেখ আমরা আম্রকুঞ্জ এসে গেছি।"
"নাটক কোথায়?"
"হবে, একটু বস।" 
"এখানে ঘাসেই বসব ?"
"বাকিরাও তো তাই আছে, তুইও বস।"
"আচ্ছা।" 
"ওই দেখ, উনি কে বলত?"
"কে? কার কথা বলছ?"
"ওই দেখ চেয়ারে বসে আছেন।"
"আরে কেউ একটা রবি ঠাকুর সেজে এসেছে দেখছি।"
"উফ, কি উজবুক তুই। কেউ সেজে আসেননি। উনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।"
"যাহ কি যে বল? রবি ঠাকুর তো সেই ১৯৪১ সালে মারা গেছেন।"
"আর আমি? আমি কি বেঁচে আছি?"
"মানে? ছোটকা, তুমি কি বলছ?"
"পরে বোঝাবো, আপাতত নাটক শুরু হচ্ছে, মন দিয়ে নাটক দেখ।"
"কি নাটক হবে?"
"কবিগুরুর লেখা গীতিনাট্য কালমৃগয়া।"
"এটার নাম শুনিনি তো? গল্পটা কি? জানো ছোটকা, গতবছর পুজোতে আমাদের চিত্তরঞ্জন পার্কে তাসের দেশ গীতিনাট্য হয়েছিল।"
"বাহ, তুই কিছু করেছিলি?"
"নাহ, বড়রা করেছিল, তাই আমাকে নেয়নি। বললে না কালমৃগয়ার গল্পটা কি?"
"গল্পটা তোর জানা, দেখতে থাক।"
"যারা করছে, তারা কারা?"
"পাঠভবনের ছাত্র ছাত্রীরা।"
"আরে এই গানটা তো চেনা। এটা তো পূরানো সেই দিনের কথা, তাই না? তাহলে এরা অন্যভাবে গাইছে কেন?"
"এটা আলাদা গান। রবি ঠাকুর অনেক সময়ই একিই গানের সুর দুবার ব্যাবহার করেছেন। এই 'কাল সকালে উঠব মোরা, যাব নদীর কূলে' আর 'পূরানো সেই দিনের কথা' গান দুটির সুর এক। জানিস কি এই সুরটি কবিগুরু এক স্কটিশ লোকসঙ্গীত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পেয়েছিলেন?"
"না তো, কি গান?"
"১৭৮৮ সালে স্কটিশ কবি রবার্ট বার্নসের লেখা 'Auld Lang Syne'। এই লোকসঙ্গীতটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, ১৯৪০ সালে বিখ্যাত হলিউড সিনেমা ওয়াটারলু ব্রিজ সিনেমায় গানটি ব্যবহৃত হয়।"
"এই গানটা তো আমি জানি। 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে' -- এটি কি এই গীতিনাট্যের গান?"
"হ্যাঁ, কিন্তু আর বকবক না, এবার মন দিয়ে দেখ।"
"ঠিক আছে, শুধু একটা জিনিস, ওই সাহেবটি কে?"
"উনি ইনস্পেকটর জেমস, এই অঞ্চলের ইনস্পেকটর ছিলেন। মারাত্মক রবীন্দ্রভক্ত।"
"উনি বাংলা বোঝেন?" 
"হ্যাঁ, এত ভালবাসতেন কবিগুরুর লেখা, কষ্ট করে বাংলা শিখেছিলেন। এবার নাটক শেষ না হওয়া অবধি একদম চুপ।"
"ছোটকা, গল্পটা আমি জানি, এটা তো রামায়ণের গল্প। দশরথ শ্রবণ নামক এক ঋষিকুমার কে হত্যা করেন জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে। শ্রবণের অন্ধ পিতা অভিশাপ দেন দশরথকেও পুত্রশোক ভোগ করতে হবে। তার কারণেই নাকি ওনাকে রামচন্দ্রের থেকে আলাদা হতে হয়।" 
"একদম। এবার ভাব এই গল্পটিকে কি সুন্দর একটি গীতিনাট্যের রূপ দিয়েছেন কবিগুরু।"
"সত্যি, সবার জানা গল্প, অথচ কি সুন্দর ভাবে কবিগুরু সাজিয়েছেন এটা।"
"আর কত অল্প বয়েসে!!"
"ভাবাই যায় না।"
"নে বাড়ি এসে গেছে। তুই যা ওপরে গিয়ে শুয়ে পর।"
"তুমি আসবে না?"
"নাহ, আমি কি করতে যাব? তুই আবার যেদিন স্বপ্ন দেখবি, আমি চলে আসব।" 
"তার মানে আমি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম, তুমি স্বপ্নে এসেছ।" 
"ঠিক তাই। আসি রে বাবুল।"



ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কি স্বপ্ন!! গত এক সপ্তাহ ধরে বার বার ছোটকার কথা মনে হচ্ছিল, তাই বোধহয় আজ... 
আচ্ছা, বিছানার ধারে কে যেন বসে আছে না? চোখটা রগড়ে নিলাম। তাকিয়ে দেখি ছোটকা। প্রচণ্ড অবাক হলাম --
"ছোটকাতুমি?”

"ওঠআর কতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকবিনাটক তো শুরু হয়ে যাবে।”



গল্পটি বর্ণদূত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
বর্ণদূত পত্রিকা- দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা।তারিখ - ১২ই আষাঢ় ১৪২৩।

Friday, July 15, 2016

লে জায়েঙ্গে

-- এই দাদা, লন্ডন যাবি?
-- চুপচাপ সিনেমা দেখ।
-- চল না, কি সুন্দর দেখ।
-- উফ, এত কথা বলিস কেন। তোকে না আনাই উচিত ছিল।
-- হেঁ, যেন আমাকে না আনলে মা তোকে ছাড়ত।
-- কেন ছাড়ত না, আমি বড় হয়েছি। সবে উচ্চমাধ্যমিক দিলাম। মা'র অনুমতির কি দরকার?
-- পয়সা পেতি কোথায়? বাবাকে যদি বলতিস হিন্দি সিনেমা দেখতে যাবি, পাতি অপসংস্কৃতি বলে বকে দিত।
-- সেটা ঠিক। যাকগে, বাজে না বকে সিনেমা দেখ।
-- বল না, লন্ডন যাবি?
-- আচ্ছা যাব।
-- আমাকে নিয়ে যাবি?
-- হুঁ।
-- লন্ডনের ট্রেনগুলো কি সুন্দর না রে, আমাদের কর্ড লাইন লোকালের মত না?
-- হুঁ।
-- ওদের স্টেশনেও বাবার মত মাস্টারমশাই থাকে?
-- হুঁ।
-- খালি হুঁ হুঁ করছিস কেন? আমরা গেলে ঐ রকম ট্রেনে চাপব?
-- হ্যাঁ চাপব।
-- ওগুলো লোকাল না এক্সপ্রেস রে?
-- এক্সপ্রেস।
-- ওদের লোকাল ট্রেন হয় না? মালগাড়ি?
-- হয়।
-- সেগুলো দেখাচ্ছে না কেন?
-- ভীষণ মার খাবি বুলি। চুপচাপ দেখ না।
-- তুই আমাকে মারবি?
-- আচ্ছা না মারব না। সিনেমা দেখ। এই না তোর শাহরুখকে এত ভালো লাগে।
-- দেখ দেখ কি সুন্দর গাড়ি চালাচ্ছে। কেমন গাড়িটার মাথা নেই।
-- হ্যাঁ একে হুড খোলা গাড়ি বলে।
-- আমাদের ডাক্তারবাবুর সাদা গাড়িটার চেয়ে ভালো তাই না?
-- ধুর, ওটা তো একটা এম্ব্যাসাডর।
-- যাহ, গাড়ি খারাপ হয়ে গেল যে।
-- হুঁ।
-- এর চেয়ে বাবার সাইকেলই ভালো তাই না? মাঝে মাঝে চেন পড়ে যায়, তবে সে তো তাড়াতাড়ি লাগিয়ে নেওয়া যায়।
-- হুঁ।
-- আবার হুঁ হুঁ করছিস? আচ্ছা যা, আমি তোর সঙ্গে আর কথাই বলব না।
-- সেনিওরিটা।
-- কি বললি?
-- সেনিওরিটা।
-- ওহ যেটা শাহরুখ কাজলকে বলল?
-- হুঁ, বেশ সুন্দর না ডাকটা?
-- হ্যাঁ, তুই বার বার বলছিস কেন? প্র্যাকটিস করছিস? কাল সঙ্গীতাদিকে বলবি?
-- বুলি? কি বললি?
-- হে হে, আমি সব জানি।
-- কি করে? কবে থেকে? মা বাবাকে বলেছিস?
-- চুপচাপ সিনেমা দেখ না দাদা, এত কথা বলছিস কেন? তোকে না আনাই উচিত ছিল।


Sunday, June 26, 2016

ঘরে ফেরার গান

বাড়ি ফেরার গল্প কিন্তু কেউ খুব একটা করে না। রাবণবধের পর শ্রীরামচন্দ্র কিভাবে বাড়ি ফিরেছিলেন বা কংস হত্যার পর শ্রীকৃষ্ণের বাড়ি ফেরার কথা কেউ তেমন বলে না। অথচ এই বাড়ি ফেরার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দ আছে। সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে যেন আরামের জায়গায় ফেরা। লক্ষ্য করে দেখবেন, এই সময় কোন বিঘ্ন ঘটলে ভীষণ রাগ হয়। ধরুন আপনি অফিস যাচ্ছেন, রাস্তায় জ্যাম পেলেন, যতটা না মাথা গরম হবে, বাড়ি ফেরার সময় জ্যাম পেলে আরো বেশী হবে।
   মনে পরে ছোটবেলায় স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় বেশ হুল্লোড় হত স্কুল বাসে। আমার সবচেয়ে ভালো লাগত বাস স্টপ থেকে নেমে বাড়ি অবধি হেঁটে যাওয়াটা। তখন স্কুল ছুটি হত বিকেল ৪টে। তারপর বিকেলবেলা পশ্চিমের সূর্যের আলোয় বাড়ি ফেরার আনন্দই ছিল আলাদা। গ্রীষ্মকাল হলে বাড়ি ফিরে প্রচুর সময় থাকত হাতে। শীতকালে কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। খানিকক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নামবে, তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেই তৈরি হওয়া খেলতে যাওয়ার জন্য। আবার যেদিন পরীক্ষার নম্বর বেরত, মনে হত বাড়ি ফেরার পথটা কত বড়। মা যেন জানতেন আমি কখন আসব। বা হয়ত আমাদের স্কুল বাসের আওয়াজ শুনতে পেতেন। তখন এমনিতেও বর্ধমানে বাস বেশী চলত না। তাই রুক্ষ চুল, ঘামে ভেজা বা বোতাম খুলে যাওয়া জামা পরিহিত আমি নিচ থেকে সবসময় দেখতে পেতাম মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।
   যাদবপুরে পড়াকালীন বাড়ি ফেরাটা বেশ কষ্টকর ছিল। আমাদের বেহালায় প্রায়শয় জ্যাম হত। তারপর তো থাকত চৌরাস্তা থেকে অটোর লাইন। কোনকোনদিন তার মধ্যেও জলদি অটো পেয়ে গেলে ভীষণ আনন্দ হত। তৃতীয় বর্ষ থেকে জি আর ই-র কোচিঙে যখন ভর্তি হলাম, বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হত। তবে কদিন বাদেই এক সঙ্গী পেলাম। সঙ্গিনী বললে বোধহয় ঠিক হবে। কোহিনুরদি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিবিজ্ঞানের ছাত্রী। দু'জনে একসাথে ফিরতাম যোধপুর পার্ক থেকে বেহালা। প্রচুর আড্ডা হত। কোহিনুরদি কয়েক বছর বাদে আমার বর্ধমানের পাড়াতুত দাদা বাবানদাকে বিয়ে করে। পৃথিবীটা বড়ই ছোট।
   গেন্সভিল থাকাকালীন ল্যাব থেকে ফিরতাম ১৬ বা ১৭ নম্বর বাসে। রাত হয়ে গেলে বাস কমে যেত। তাই অনলাইন দেখে নিতাম বাস কতদূর, সেই দেখে ল্যাব থেকে বেরোতাম। অনেক সময় এরকম রাত বিরেতে বাস স্ট্যান্ডে কোন বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যেত। আড্ডা মারতে মারতে বাস ভ্রমণ চলত। শেষের দিকে অবশ্য গাড়ি থাকার দরুন ফেরার অভ্যাসটা পালটে গিয়েছিল। মনে আছে রাত ২-৩ টের সময় ল্যাব থেকে ফেরার সময় দেখতাম কেউ কেউ রাস্তার ধার দিয়ে দৌড়াচ্ছে, কানে আই পড। অধ্যাবসয় দেখে অবাক হতাম। রাতের গেন্সভিলে গাড়ি চালাতে এক আলাদা আনন্দ ছিল। চারিদিক চুপচাপ, সকাল বা বিকেলের ভিড় নেই রাস্তায়; তার মধ্যে গাড়ি চালান, নিজের ছন্দে, নিজের গতিতে, চেনা রাস্তাগুলোকে যেন অন্যরকম লাগত।
     মনে আছে একবার শিকাগো এয়ারপোর্টে বসে আছি দিল্লীর বিমানের প্রতীক্ষায়। দেখি এক প্রবাসী বাঙালী দম্পতিও নিজেদের ছেলে মেয়েকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আলাপ হল। ভদ্রলোকের বাড়ি হুগলী। ভদ্রমহিলার কসবা। ছেলে মেয়ে দু'জনেরই জন্ম মার্কিন দেশে, তাই তাড়া সেই দেশেরই নাগরিক। মেরিল্যান্ডে এক স্কুলে পড়ে। ভদ্রলোক  খুব খুশি, বহুদিন বাদে বাড়ি ফিরছেন। এক মাসের ছুটি, এইসব বলছিলেন আমায়। আমি শুধু ভাবছিলাম ছেলে মেয়ে দুটির কথা। তারা কি ভাবছে? তাদের কাছে এটা নিশ্চয় বাড়ি ফেরা না? ভদ্রলোকের এখন যা মনের ভাব, হয়ত এক মাস বাদে তাদের সেটা হবে। আবার ভাবলাম, ভদ্রলোকেরও কি সেটা হবে না? মার্কিন দেশের বাসস্থানটাও তো ওনার বাড়ি? কে জানে কি ভাবছেন উনি? আগেও বলেছি, বাড়ি কাকে বলে সেটাই আমি বুঝি না। হয়ত কোনদিন বুঝবো না। কিন্তু এই বাড়ি ফেরার আনন্দটা সবসময়ই উপভোগ করব। 

Friday, June 24, 2016

ধনক

অপু-দূর্গাকে নিশ্চয় সবার মনে আছে? বা আলি- জাহরাকে? সেই পারস্য দেশের সিনেমা "বাচ্চা-এ-আসমান"-এর দুই খুদে ভাই বোন, যারা এক পাটি জুতো নিয়ে স্কুল যেত! আসলে চলচ্চিত্রের পর্দায় ভাই-বোনের গল্প বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। বিখ্যাত পরিচালক নাগেশ কুকুনুর এবার এরকমই দুই ভাইবোনকে নিয়ে বানালেন তাঁর নতুন সিনেমা "ধনক"।
       দিদি পরি আর ভাই ছোটুর গল্প "ধনক"। অনাথ ভাইবোন থাকে নিঃসন্তান কাকা আর কাকিমার কাছে। কাকা তাদের নিজের ছেলে মেয়ের মত স্নেহ করলেও কাকিমা কিন্তু মেনে নিতে পারেন না। তার মধ্যে ছোটু আবার চোখে দেখতে পায়না। ছোটু কিন্তু জন্মান্ধ না। বছর চার আগে অপুষ্টিতে ছোটু দৃষ্টিশক্তি হারায়। পরির ইচ্ছা একদিন ছোটু নিজের দৃষ্টি ফিরে পেয়ে আকাশের সাতরঙা রামধনু দেখুক। এই রামধনুর নামেই সিনেমার নাম "ধনক"।
       রাজস্থানে থর মরুভূমির কাছে এক ছোট গ্রামে বাস পরি আর ছোটুর। পরি ছোটুকে চোখের বাইরে যেতে দেয়না। রোজ একসাথে স্কুলে যায় দু'জনে। নদী থেকে জল আনার সময় ছোটুর কোমরে নিজের ওড়না বেঁধে দেয় পরি, যাতে ভাই হারিয়ে না যায়। তাই বলে ভেবো না দু'জনের মধ্যে ঝগড়া হয় না। তোমরা তোমাদের দিদি বা ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করোনা? করো তো? তাহলে পরিরা কেন করবেনা? পরি শাহরুখ খানের ভক্ত আর ছোটু সালমান খানের। এই নিয়ে ঝগড়া লেগেই আছে দু'জনের। এমনকি পরি বেশিক্ষণ শাহরুখের প্রশংসা করলে ছোটু কানে হাত দিয়ে "মাফ করো সালমান ভাই" বলে। এহেন পরি একদিন জানতে পারে শাহরুখ খান রাজস্থানে এসেছেন নিজের নতুন সিনেমার শুটিং করতে। ভাইয়ের চোখের অপারেশনের জন্য যদি শাহরুখ পয়সা দেন, এই আশায়  ভাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালায় পরি। শুরু হয় দুই ভাইবোনের পদব্রজে রাজস্থান ভ্রমণ। পরি কি পারে শাহরুখ খানের সঙ্গে দেখা করতে? ছোটু কি রামধনু দেখতে পায়? এই প্রশ্নের উত্তর আর দিচ্ছি না। তোমরা সিনেমা হলে গেলেই এর উত্তর পেয়ে যাবে।
      আমাদের এই জটিল আর গতিময় জীবনে রূপকথার বড়ই অভাব। পরিচালক নাগেশ কুকুনুরকে ধন্যবাদ এত সুন্দর একটি গল্প উপহার দেয়াড় জন্য। বহুদিন বাদে এরকম একটি মিষ্টি, সহজ, সরল গল্প দেখলাম রূপোলী পর্দায়। পৃথিবীতে সবাই যে খারাপ মানুষ না, ভালো লোকেরা এখনও এই দুনিয়ায় আছেন; এই বক্তব্যটি যেন বার বার ফিরে আসে এই সিনেমায়। অভিনয়ের দিক থেকে পরির ভূমিকায় হেতল গাদা অসাধারণ। আশা করি হেতল বড় হয়ে একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হবেন। ছোটু হিসেবে কৃষ ছাবরিয়াও খুব ভালো অভিনয় করেছেন। এই সিনেমার আসল প্রাপ্তি হচ্ছে ক্যামেরার কাজ। রাজস্থানকে ভীষণ সুন্দর ভাবে দেখিয়েছেন পরিচালক মশাই। এই রাজস্থান কিন্তু প্রাসাদ বা রাজাদের রাজ্য নয়; এই রাজস্থান পরি-ছোটুর মত সাধারণ মানুষদের বাসস্থান; যেখানে পরিষ্কার বালির উপর দুই ভাইবোন বিকেল বেলা খেলা করে, যেখানে রাস্তায় মহিলারা রংবেরঙের পোশাক পরে গান গাইতে গাইতে চলেন, যেখানে মাঝে মধ্যেই বালির ঝড় ওঠে। সিনেমার গনগুলিও অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। তাহলে আর দেরি কিসের? তোমার বাড়ির কাছের সিনেমা হলে গিয়ে "ধনক" দেখে এসো; দেখ হয়ত তোমার মনের মধ্যেও রামধনু দেখতে পাবে!! 

Wednesday, May 4, 2016

ছেলে গেছে পড়তে

ছেলে গেছে পড়তে, সেই দূর শহরে,
গ্রামের আলের পথ ধরে,
নদীর পার দিয়ে পাঁচ ক্রোশ পথ হেঁটে গেলে
পঞ্চায়তের তৈরি পিচ ঢালা রাস্তা।
দিনে দু'বার বাস যায় স্টেশনের দিকে -
ট্রেনে করে কলকাতা, সেও কম করে আড়াই ঘন্টা।
তারপর বাসে চড়ে ঘন্টাখানেকের পথ,
একটা সরুগলিতে দোতলা বাড়ির একতলায়
চার বন্ধু মেস করে থাকে।
ঘুপচি ঘরে না ঢোকে সূর্যের আলো,
না আসে একটু বাতাস।
তবু তার মধ্যে হাত পুড়িয়ে সকালে ভাত আর
আলুসিদ্ধ; বিকেলে একটু ডাল বড়জোর।
কেই বা বাসনমাজা, রান্নার ঝক্কি পোহায়?
খরচাও তো অনেক।

আসলে গ্রামের সকলে বলল,
এত ভালো রেজাল্ট, এত বড় সুযোগ -
চার বছর কষ্ট করলেই বিরাট চাকরি।
চাকরি এখানেও ছিল না তা নয়!!
পঞ্চায়েতকে বললেই প্রাইমারী ইস্কুলে --
মায়ে ছেলে দিব্যি চলে যেত।
তবু, ঐ যে "গ্রামের সকলে বলল" -
এই পাসটা দিতেই হয়।


রোজ সন্ধ্যাবেলা তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে
মা আকাশপানে প্রার্থনা করেন।
সারাদিন এধার ওধার করে কেটে যায়,
কাটে না সন্ধ্যার পর, একটানা ঝিঁঝিপোকার শব্দ।
তারপর অনেকরাত্রে ঘুম আসেনা যখন,
জানালার ধারে চাঁদমাখা মাঠটার দিকে
তাকিয়ে ভাবেন --
"মোচার ঘন্ট আর পোস্তর বড়া
কি ভালোই না বাসত।"
তখন তিন বন্ধুকে ঘুমন্ত দেখে
ছাতে পায়চারি করে যায় একটি উনিশবছর
আর গুনগুন করে মুখস্ত বলে সন্ধ্যার পড়া।

পশ্চিমের আকাশে হেলে পরা চাঁদ
মুচকি হেসে মজা করে।
একবার দেখে মাকে,
আর একবার ছেলেকে, প্রতীক্ষায় আছে লড়াইয়ের।
আসলে চাঁদই মিলিয়ে দেয় দু'জনের প্রতীক্ষার,
মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনের সুতো।



~~~ সুকল্যাণ বসু (মে ২০০৮)

Thursday, April 21, 2016

সাধারণ জ্ঞান

- তোমার জন্য ছেলেটা উচ্ছন্নে গেছে।
- এটা আমার মাও আমার বাবাকে বলত, নতুন কিছু বল।
- ইয়ার্কি রাখো। ছেলেটার দিকে তো একবারও চেয়েও দেখোনা। কি করে না করে খবর রাখো?
- উফ, কি করেছে বল তো? সেই হাওড়া থেকে ৩ জনের সিটে ৫ জন বসে এলাম, ব্রিজে দুবার এল এস খেলাম, আর তুমি...
- সেই তো, তাস। ঐ তাস তোমার আপন হল? আর ছেলেটা কেউ না? কি অবস্থা হয়েছে জানো তুমি? ঈশ, ভাবলেই লজ্জা করে আমার।
- আবার কি করল? এই তো গত সপ্তাহে শুনলাম ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ঘোষবাবুদের জানালার কাঁচ ভেঙেছে। তাঁর দু'দিন আগে নাকি পাশের পাড়ার টুকটুকিকে দেখে "দেখা হে পেহেলি বার" গেয়েছে, দু'বারই আমি ভালো রকম পিটিয়েছিলাম। আজ আবার কি করল? বল, আবার পেটাই।
- পিটিয়ে যদি লাভ হত!! ছি ছি, ওর পরীক্ষার খাতাটা দেখ একবার।
- ফেল করল নাকি? এতদিন তো ফেল করত না, হ্যাঁ ক্লাসে স্ট্যান্ড করে না ঠিক-ই, কিন্তু ফেল করতে তো দেখিনি। আজ হচ্ছে।
- না ফেল করেনি বটে, তবে "সাধারণ জ্ঞান"-এর খাতায় কি লিখেছে জান? টিচার খাতার সামনে বড় করে লিখে দিয়েছেন "হোপলেস"। - কি লিখেছে?
- প্রশ্ন এসেছিল "আগ্রার সবচেয়ে বিখ্যাত বস্তুটি কি?"
- কি লিখেছে? পেঠা তো?
- ওহ, আমার আর কিছু বলার নেই। এই বাবা হলে, তার ছেলে আর কি হবে?
- রাগ করছ কেন? কি লিখেছে?
- হাত মুখ ধুয়ে খেতে এস, আমি "নগরপারের রূপনগর" দেখতে গেলাম। যেমন বাপ, তেমনি ...
- (একান্তে) যাক, ছেলেটা ঠিক ঠাক মানুষ হচ্ছে।


Tuesday, April 12, 2016

আগুন

-- এক প্লেট মাটন বিরিয়ানি।
-- হবে না।
-- হবে না মানে? আপনাদের মাটন বিরিয়ানি নেই?
-- না, জানেনি তো আজ আগুন লেগেছিল, আমরা মাটন করছি না।
-- ধুর বাবা, মাটন ছাড়া বিরিয়ানি হয় নাকি? নিন, চিকেন বিরিয়ানি আনুন নাহয়। দুধের স্বাদ ইত্যাদি...
-- হবে না।
-- মানে? চিকেনও হবে না?
-- না। চিকেন, মাটন, ডিম কিচ্ছু হবে না। আজ আমাদের কোন আমিষ বিরিয়ানি হবে না।
-- তবে কি হবে?
-- ভেজ বিরিয়ানি, পনীর বিরিয়ানি, আলু বিরিয়ানি, সয়াবিন বিরিয়ানি, আপেল বিরিয়ানি, মোচার বিরিয়ানি।
-- আপেল? মোচা? এসব কি? এটা আরসালান তো?
-- একদম স্যার, এ ছাড়াও পাবেন বিরিয়ানি পাও।
-- বিরিয়ানি পাও আবার কি?
-- ঐ যে স্যার, আপনি যেমন বম্বেতে খান, বড়া পাও বা মিসেল পাও, সের'ম। মানে পাও এর মাঝে থাকবে ভেজ বিরিয়ানি।
-- কি? কি বললেন, আমাকে কলকাতায় বসে পাও খাওয়াবেন? আমার পিস্তলটা কই?

*****

-- অভিদা ওঠো, আর কত ঘুমাবে? জেমস টেলরকে নিয়ে লেখাটা শেষ হল?
-- পার্থ? তুই? আমি আরসালানে নেই?
-- আরসালান? ধুর, তুমি তো বম্বেতে আমাদের অফিসে।
-- আরসালানে আগুন লেগেছে জানিস? ওরা আর মাটন বিরিয়ানি করছে না।
-- যত আজে বাজে স্বপ্ন দেখা তোমার। লেখাটা জলদি দাও।
-- দাঁড়া আগে একবার আরসালান কে ফোন করে নিই। হ্যালো আরসালান?