Sunday, November 4, 2018

পুলিনবাবুর রাগ

-- না পুলিনবাবু, আপনাকে রাগ কমাতে হবে। নাহলে আপনার প্রেশার কমবে না।
-- কিন্তু আমি তো রাগ করিনা।
-- কেন মিছে কথা বলছেন বলুন তো? আপনার স্ত্রী, ছেলে, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই জানে আপনার রাগের কথা। আচ্ছা, শেষ কবে রেগেছিলেন বলুন।
-- শেষ কবে? এই ধরুন আজ সকালে ক্রিকেট দেখতে গিয়ে?
-- কেন? কারেন্ট গেছিল?
-- না না, এই দেখুন না শচীনটা ৯৩ এ ব্যাট করছিল, দিল ওকে রান আউট করে। রাগ হবে না বলুন?
-- না হবে না। আপনার কি মশাই শচীনের ১০০- র সাথে? ও ১০০ করলে কি আপনার আয়ু বাড়বে? দেখুন আপনার বয়স হয়েছে। রিটায়ার করেছেন। এবার এসব রাগ থামান। রাগ হলেই মনে করবেন এই রাগ করে কি আপনার আয়ু বাড়বে? বুঝেছেন?
-- হ্যাঁ ডাক্তারবাবু।

ডাক্তারখানা থেকে বেরিয়ে রিক্সা ধরলেন পুলিনবাবু।
-- কত ভাড়া নেবে?
-- সাড়ে ছয় টাকা দেবেন।
পুলিনবাবু জানেন পাঁচ টাকা ভাড়া। খানিকক্ষণ আগেও সেই ভাড়াতেই এসেছেন। তবে আজ তিনি রাগ করবেন না।
-- কেন বাবা, পাঁচ তাকাই তো ভাড়া।
-- সাড়ে ছয়ের নিচে যাব না। যেতে হলে উঠুন নইলে ছাড়ুন।
মনের মধ্যে রিক্সাওয়ালাকে দুটো গালাগাল দিলেন পুলিনবাবু। কিন্তু না, দেড় টাকার চেয়ে বেঁচে থাকা জরুরী।
-- ঠিক আছে চল।

পরদিন সকালে চা খেয়ে কাগজের জন্য অপেক্ষা করছেন পুলিনবাবু। কলকাতা থেকে কাগজ আসতে আসতে  সাতটা বেজে যায়।
-- কি গো। হাঁ করে বসে থাকবে নাকি? আমি কি আঙুল কেটে রান্না করব?

গিন্নীর ধমকে চমকে উঠলেন পুলিনবাবু। বলতে যাচ্ছিলেন তাই কর, কিন্তু না, রাগ করবেন না তিনি।

-- যাচ্ছি, যাচ্ছি, এই কাগজটা আসুক।
-- তাহলে কাগজই খেয়ো।

অগত্যা থলে নিয়ে বাজারে বেরোলেন। বাজারে হরেন মাছওয়ালা বরফের রুইকে "টাটকা, জ্যান্ত" বলে চালাচ্ছিল। অন্যদিন হলে মিনিট পাঁচেক ঝগড়া করে যান। আজ ও পথ মাড়ালেন না পুলিনবাবু। মাছ টাটকা থাকার চেয়ে তাঁর বেঁচে থাকা জরুরী।

বাড়ি ফেরার বেশ খানিকক্ষণ বাদে, সাড়ে আটটা নাগাদ কাগজ এলো। কাগজওয়ালাকে ডাকলেন পুলিনবাবু

-- কি রে আজ এত দেরী?
-- তো আমি কি প্রেসে গিয়ে কাগজ ছাপাব? 

নাহ,  জলদি কাগজ পড়ার চেয়ে বেঁচে থাকা জরুরী।

একটু বাদে ছেলে বান্টি তাঁর ঘরে এলো।

-- বাবা, গোটা পঞ্চাশেক টাকা দাও তো।
-- কেন? এই তো সেদিন একশ নিলি।
-- গিটারটা খারাপ হয়েছে। সারাব।
-- আর কতদিন গিটার নিয়ে চালাবি বাবা? এবার একটা চাকরি বাকরি দেখ।
-- উফ, বাবা, তোমার মত আমিও ঐ দশটা- পাঁচটার কেরানীগিরি করে চালাতে পারব না। আমি আর্টিস্ট। জলদি টাকাটা ছাড়ো। আজ জ্যাম আছে আমাদের।

এই কথাটা কদিন আগে বললে ছেলের গালে চড় পড়ত। আজ সামলে নিলেন। চড় মারার চেয়ে বেঁচে থাকা জরুরী।

-- আজ টাকা নেই। পরে আসিস।
-- তুমিও না বাবা। তোমার মত বাবা থাকলে ডিলান ডিলান হত না।

বিকেলে বাড়িতে হাজির হল পুলিনবাবুর মেয়ে শম্পা। সঙ্গে শম্পার ছেলে সানি। শম্পার শ্বশুরবাড়ি কলকাতায়। মাস দু-তিন অন্তর আসে বাবা মায়ের কাছে। অন্যসময় জামাই সত্যব্রতও আসে। এবার জামাই ছুটি পায়নি।

শম্পাদের দেখে খুশীতে ভরে উঠল পুলিনবাবুর মুখ। সানিকে কোলে নিয়ে বারান্দায় গেলেন খেলা করতে।

-- বল তো দাদুভাই, আমি কে?
-- দাদু রাগী।
-- ঠিক করে বল দাদুভাই, আমি কে?
-- তুমি রাগী দাদু।

আসলে হয়েছে কি সানি ভীষণ দুষ্টু। শম্পা তাই রাস্তায় বলতে বলতে এসেছে
-- দাদু কিন্তু ভীষণ রাগী। একদম দুষ্টু করবে না ওখানে গিয়ে।

এবার একটু বিরক্ত হয়ে পুলিনবাবু আবার বললেন
-- না দাদুভাই, আমি রাগী  নই। আমি তো তোমার দাদু।
-- না, তুমি রাগী। রাগী দাদু।

এভাবে বার দশেক চলার পর আর সহ্য  করতে পারলেন না পুলিনবাবু।
-- কি? আমি রাগী? সারাদিন রাগ চেপে আছি। আর আমি রাগী!!! 

তাঁর চিৎকারে  বারান্দায় ছুটে এল শম্পা।
-- সানি, আবার বাঁদরামো করেছিস? কতবার বলেছি দাদু রাগী, দুষ্টু করিস না।

Friday, November 2, 2018

সত্যসুন্দর

(ও হেনরির একটি গল্প নিজের মত করে লিখলাম।)

নাহ, এভাবে হবে না। এবার মোহনপুরে যা ঠাণ্ডা পড়েছে, তাতে এভাবে বেঞ্চে  শুয়ে চলবেনা। গতবছর অবধি এক বুড়ি পিসী ছিল হারুর। এবছর সেই পিসীও নেই। পিসতুতো ভাইরা জেল খাটা কয়েদিকে বাড়িতে আশ্রয় দিতে নারাজ। অগত্যা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই পার্কের বেঞ্চেই কাটাচ্ছে হারু। পুজো - কালীপুজো সব শেষ। এবার আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা পড়ছে। কলকাতায় লোকে বোধহয় এখনো ফ্যান চালাচ্ছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের এই ছোট জেলা শহরে এরমধ্যেই লোকের পরনে হাতকাটা সোয়েটার। কি করা যায় এই ঠাণ্ডায় ভাবতে ভাবতে হারু ঠিক করল -- নাহ, জেলেই ফিরে যাই। যে জেলে যাওয়ার জন্য তার এত বদনাম, সেই জেলই তাকে এই ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাবে। আর কিছু না হোক, দু'বেলা খাবার পাবে, এমনকি চাইলে হয়ত একটা কম্বলও দিতে পারে।

পার্কে এই বিকেলবেলা বেশ কিছু লোক ঘুরতে এসেছে। কয়েকজন বৃদ্ধ নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছেন। কিছু বাচ্চা বল নিয়ে খেলছে। মাঠে পাতা পড়ে আছে অনেক। হয়ত পরিষ্কার করার লোক আজ আসেনি। হয়ত বা লোকই নেই। আকাশের দিকে চেয়ে হারু দেখল সন্ধ্যা নামতে চলেছে। এইবেলা বেরিয়ে পড়া ভালো।

জেলে যাওয়ার জন্য প্রথমেই যেটা দরকার সেটা হল একটা গুণ্ডামি, বা চুরি, বা ডাকাতি, বা খুন। খুন অবশ্য হারু কোনদিন করেনি। ডাকাতিও না। ইচ্ছে আছে একবার ব্যাঙ্ক ডাকাতি করার। চুরি করতেই পারে। তবে আজ একদমই সেসব ইচ্ছে করল না। "যাই একটু হুজ্জুত করি, আমাকে জেলে ঢোকাবেই।"

প্রথমেই বাসে উঠল হারু। এই জেলা শহরে বাস বেশ কম। তাও আছে কতিপয়। বাস প্রায় ফাঁকাই ছিল। উঠেই একটা সিট পেয়ে গেল হারু। জানালার ধারে নয় অবশ্য। পাশে এক বয়স্কা মহিলা বসে ঢুলছিলেন। খানিকক্ষণ বাদেই কন্ডাক্টার এসে টিকিট চাইলেন। হারু "দিচ্ছি দিছি" বলায় এগিয়ে গেলেন কন্ডাক্টার।  এভাবে বেশ কয়েকবার হওয়ার পর কন্ডাক্টারবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন

"আর দাদা, অনেক তো দিচ্ছি দিচ্ছি করলেন, এবার দিন।"
"না আসলে, আমার কাছে টাকা নেই।"
"নেই মানে? তাহলে এতক্ষণ ধরে ভণ্ডামি করছিলেন। জানেন বাসের ভাড়া না দিলে জেল হতে পারে?"
"হোক না, মানে  ..."

এই সময় পাশের সিটের ঘুমন্ত মহিলা বলে উঠলেন -- "কত ভাড়া,  আমি দিচ্ছি।"

উনি যে কখন ঘুম ছেড়ে উঠেছেন হারু খেয়ালই  করেনি। বোধহয় কন্ডাক্টারের চেঁচামিচিতে।

"না,  না, আপনি কেন?" -- হারু জেলে যাওয়ার এরম সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ।

"তা কেন বাবা, তুমি তো আমার ছেলের বয়সী। জানো আমার ছেলে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আমায় ছেড়ে কোথায় চলে গেল, আর ফেরেনি..."

একেই টিকিট কেটে দেওয়ায় রাগ, তার উপর এই গল্প। হারু বাধ্য হয়ে পরের স্টপেজে নেমে পড়ল। নাহ, খিদে পেয়েছে। একটা কিছু খেতে হবে। হ্যাঁ, ভালো প্ল্যান এসেছে মাথায়। আগে খাওয়া যাক। তারপর নাহয় টাকা নেই বললে যদি জেলে দেয়।

প্রথমেই শহরের সবচেয়ে নামী রেস্তোরাঁতে গেল হারু। সেখানে অবশ্য তার ছেঁড়া কাপড় দেখে দারোয়ান তাড়িয়ে দিল। এবার পাশের একটা ভাতের হোটেলে গেল হারু। এখান থেকে জেলে যাওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু আগে খাওয়া তো যাক।

ঢুকে বেয়ারাকে জিজ্ঞেস  করল হারু -- "মাছ কি কি আছে?"

"আজ্ঞে, রুই, কাতলা, কই, ট্যাংরা, পাবদা।"

"যাও দেখি, ভাত আনো আর সঙ্গে এক প্লেট কই আর এক প্লেট ট্যাংরা।"

আহ, আজ ভালো করে খাওয়া যাবে। মালিকটা বেশ নাদুস নুদুস একটা  লোক। হয়ত একটু মারামারি করলে পুলিশ ডাকবে। টেলিফোনও আছে দেখছি দোকানে। মালিক কালো ফোন কানে নিয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে।

ভাত, আলুপোস্ত, ডাল, ঝিরঝিরে আলুভাজা আর দু প্লেট মাছ এল টেবিলে। সবে পোস্ত দিয়ে ভাত মাখতে যাবে হারু, এই সময় মালিক হঠাৎ ফোন রেখে তার দিকে এগিয়ে এলো। একিরে বাবা, এই লোকটা কি জানে হারু চোর?

"আপনি দাদা ঈশ্বর।" -- হারুর এঁটো  হাতদুটো জড়িয়ে ধরল  মালিক।

"সেকি? কেন?"

"আমার বউ পোয়াতি। কিন্তু কি এক অসুখের জন্য ডাক্তার  বলেছিল বাচ্চা নাও বাঁচতে পারে। এখনি আমার শালা ফোন করে জানাল আমার মেয়ে হয়েছে। বউ ভালো আছে। আমি তো দোকান ছেড়ে যেতে পারছি না। তাই ভীষণ চিন্তায় ছিলাম। আপনি এলেন আর শালার ফোন এল। ওরে, এই দাদার কাছ থেকে আর পয়সা নিস না। দাদা, শুধু মাছ খাচ্ছেন কেন? আমাদের এখানকার মাংস খেয়ে যান।"


রাতে এসে সেই পার্কের বেঞ্চে শুল হারু। দুনিয়াটাই শালা বেইমান। জেলে যাব, তাও যেতে দেবেনা। যাকগে ঘুম দি।

"সকালে ঘুম ভাঙল গানের আওয়াজে। পার্কের পাশেই মিশন স্কুল। সেখানে সকালবেলা প্রার্থনা সঙ্গীত হয়। গানটা চেনা চেনা না? হ্যাঁ এটা তো আনন্দলোকে, মঙ্গলালোকে। হারুর মা এই গানটা গাইতে ভীষণ ভালোবাসতেন। মায়ের একটা গানের স্কুল ছিল। বাবার ফ্যাক্টরি লক-আউট হওয়ায় বাবা যখন আত্মহত্যা করলেন, তখন মায়ের স্কুলটাও গেল, হারুর পড়াশুনাও। তাও পাড়ায় ছোটখাটো কাজ করে চলত হারুর। মা লোকের বাড়ি কাজ করতেন। কিন্তু এভাবে চলছিল না। তাই পাড়ার গুলেদার কাছে হারু  মহাবিদ্যার  ট্রেনিং নিল। প্রথমবার জেলে যাওয়ার সময় মায়ের সঙ্গে দেখা করেনি হারু। লজ্জায়। ফিরে এসে আর মায়ের  দেখা পায়নি হারু।

আজ এই পার্কের গেটে বসে মায়ের  কথা মনে পড়ে গেল হারুর। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল স্কুলের পাঁচিলের দিকে। মনটা আজ সকালে যেন কেমন শান্ত হয়ে পড়েছে। আচ্ছা, হারু কি সারাজীবন চোর হয়ে থাকবে? কেন, ভালো কিছু তো করতে পারে। শীত কাটানোর জন্য জেলে যাওয়ার কি দরকার? ঐ ভাতের হোটেলের মালিককে গিয়ে বললে হয় না বেয়ারার চাকরি দিতে। তেমন হলে রাতটা ঐ হোটেলের বেঞ্চিতেই কাটাবে হারু। মালিক তো কাল কত খাতির-যত্ন করলেন, হয়ত বললে এই চাকরিটায় দিয়ে দেবেন। বলেই দেখি না।

"কে  এখানে হারু চোর না?"

কখন পাশে এক পুলিশ এসে দাঁড়িয়েছে দেখতেই পায়নি হারু।

"কি করছিস স্কুলের গেটের বাইরে?"

"না, স্যার, মানে এই গান শুনছিলাম।"

"গান শুনছিলাম। গুল মারার আর জায়গা পাওনি। আজ স্কুলে রাজ্যপাল আসবেন শুনেই চলে এসেছ? ভিড়ের মধ্যে যদি কিছু গছানো যায়, তাই তো? চল, জেলে চল। ওটাই তোর যায়গা। ওখানে গিয়ে গান শুনিস। এই, কে আছিস, এটাকে গাড়িতে তুলে চালান দে।"


Wednesday, October 10, 2018

স্মৃতি

ট্রেনটা যখন হাওড়া স্টেশন থেকে গা ঝাড়া দিয়ে বেরোলো, তখন কামরায় রতনবাবু একা নন। তবে লোক খুব বেশি নেই। বেশ ফাঁকা ফাঁকা কামরা। তাঁর সিটের উল্টোদিকে এক বয়স্ক ব্যক্তি বসে। ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত। বেশ নোংরা জামাকাপড়। হয় ঠিক মত পরিষ্কার করেননা, অথবা সারাদিনের ধকল গেছে। ভদ্রলোকের সঙ্গে একটা চটের বড় থলে। তিনজনের সিটে তিনি একা। ওপাশের একদিকে এক মা-ছেলে বসে। ছেলেটির বয়স বড়জোর সাত-আট হবে। ছেলেটি বসে বসে এক মনে বই পড়ছে। কি বই কে জানে। তাঁদের উল্টোদিকে দুজন ছেলে। কলেজে পড়ে বোধহয়। ছুটিতে বাড়ি ফিরছে।

লোকাল ট্রেনের কামরা। বাদামী রঙের সিট। জানালার রেলিং-এ জং ধরেছে। দেওয়ালে লেখা "রেলের সম্পত্তি আপনার সম্পত্তি"। পড়ে হাসলেন রতনবাবু। তিনি যখন ছোট ছিলেন, প্রায়ই খবর আসত ট্রেনের পাখা, জানালার পাল্লা, এসব নাকি কেউ চুরি করেছে। একদিন তাঁর বাবা বলেছিলেন --

"আসলে কি বলতো, লেখা থাকে না, রেলের সম্পত্তি আপনার সম্পত্তি? লোকে ভাবে আমার সম্পত্তি তো এখানে কেন, বাড়ি নিয়ে যাই।"

হাওড়া পার করে ট্রেনটা কারশেডের পাশ দিয়ে চলল। এই ট্রেনের নিত্যযাত্রীরা এখানটাকে "হালুয়া" বলে -- মানে, হাওড়া আর লিলুয়ার মাঝে। অনেক আপ ট্রেনই এখানে থামে। কেউ কেউ এখানেই নেমে যান।

লিলুয়া এলে রতনবাবু এক কাপ চা কিনলেন। পার্স খুলে চায়ের দাম দিতে গিয়ে দেখলেন সেই ছোটবেলার একটা দুটাকার নোট। ভারতবর্ষের এক কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি দেওয়া।  ঐ নোটটা চাওলাকে দিয়ে চা খেতে লাগলেন। লিলুয়া থেকে একটি ছেলে উঠল। ছেলেটি তাঁর পাশেই বসল। পরনে স্কুল ইউনিফর্ম।

"কোন স্কুল তোমার?"
"ডন বস্কো, লিলুয়া।"
"কোন ক্লাস?"
"ক্লাস সেভেন।"
"বাড়ি কোথায়?"
"মধুসূদনপুর।"

ছেলেটার সঙ্গে আলাপ জমে গেল। ছেলেটির বাবা ডাক্তার। পড়াশুনোয় ভাল ছেলেটি। ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যেই থাকে নিয়মিত। বই পড়তে ভালোবাসে। প্রিয় লেখক অনিল ভৌমিক। শুকতারা নেয় প্রতি মাসে। গর্ব করে বলল

"জানেন, দাদুমনি আমার চিঠি ছেপেছিলেন।"
"বাহ, তুমি খেলাধুলা কর না?"
"করি তো। ক্রিকেট খেলি।"
"বাহ, ব্যাটসম্যান না বোলার?"
"বোলার। কপিল দেবের মত।"

রতনবাবু বুঝলেন ছেলেটির প্রিয় খেলোয়াড় কপিল।

"তোমার আর কি ভালো লাগে?"
 "আমার খুব ছবি আঁকতে ভালো লাগে।"
"কিসের ছবি?"
"এই জায়গার। পাহাড়, সমুদ্র, মাঠ।"
"তুমি সমুদ্র দেখেছ?"
"না, বাবা বলে প্রতিবার পুরী নিয়ে যাবে। যাওয়া আর হয়না। বইয়ে ছবি দেখেছি। আপনি দেখেছেন?"
"হ্যাঁ, তা দেখেছি।"
"ছবি এঁকেছেন?"
"না, আমি তো ভালো আঁকতে পারিনা।"

মধুসূদনপুরে ছেলেটি নামা অবধি রতনবাবু ওর সাথেই গল্প করে গেলেন। জনাই-এ এক ঝালমুড়ি ওয়ালা উঠেছিল। তিনি ছেলেটিকে ঝালমুড়ি কিনে দিলেন। নিজেও খেলেন। ছেলেটি খেতে চায়নি।

"বাবা বলেছেন, ট্রেনে অপরিচিত কারুর থেকে কিছু না খেতে।"
"সেটা তোমার বাবা ঠিকই বলেছেন। তবে কিনা, এটা তো কেনা ঝালমুড়ি। তুমি নিজেও পয়সা দিয়ে খেলে একই হত।"

ট্রেন নবগ্রাম পেরোতেই আকাশ অন্ধকার হতে শুরু করল। জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকলেন রতনবাবু। একটা ছেলে একদল গোরু চরিয়ে বাড়ি ফিরছে। ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে একটা লোক গান করতে করতে কোথায় হেঁটে গেল। বোধহয় আংটি চাটুজ্যের ভাই।

ওপাশের বাচ্চা ছেলেটার হাতের বই এবার দেখতে পেলেন রতনবাবু। গোলাপি মলাটের বই। "একের পিঠে দুই"। এখানেই "বোসপুকুরে খুনখারাপি" আছে, মনে পড়ল তাঁর। কলেজের ছেলে দুটো এক মনে কিসব বলে হাসছিল। উল্টোদিকের বয়স্ক মানুষটি ঘুমিয়ে কাদা।

শক্তিগড়ে ট্রেন থামতেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন রতনবাবু। নামবেন?

এই সময় তাঁর কাঁধে একটা হাতের ছোঁয়া পেলেন।

"বাবা, অনেকক্ষণ হয়েছে। এবার শুতে যাও।"

চোখ খুলে বুঝতে পারলেন তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়ার মিলপিটাসে। ছেলের বাড়ি। মাথা থেকে যন্ত্রটি খুলে ফেললেন রতনবাবু। এই যন্ত্রটি তাঁর ছেলে কয়েক মাস হল কিনেছে। মাথায় পরলে এটি পুরনো স্মৃতি তুলে এনে নিজের মত গল্প বানিয়ে দেয়। মনে হয় যেন রতনবাবু নিজেই সেই যুগে ফিরে গেছেন। অথচ তাঁর বয়স এখনকার মত।

"চল শুতে যাই, কটা বাজে?"
"রাত বারোটা। তুমি তো খাওয়ার পর থেকেই এই নিয়ে আছো। তাই সময়ের খেয়াল নেই। তা আজ কোথায় গেলে? শক্তিগড় না মধুসূদনপুর?"




Wednesday, September 5, 2018

শেষ বেলার গোল

-- বিলু, তুই গোলটা বানা।
-- ওদের ইট নেব?
-- না, আমাদের গুলো কই?
-- আছে, কিন্তু দেখ ওদের নতুন ইট। ভালো হবে।
-- হোক, আমাদের গুলোই নে।
-- আজ কত পা?
-- আজ তো সবাই আছে, দশ পা কর।
-- করছি।

বিলু যে খুব একটা খুশী না বুঝতে পারলাম। কিন্তু শুভদার মুখের ওপর কথা বলার স্পর্ধা আমাদের নেই। আজ সবাই এসেছে মাঠে। কারণ আজকেই আমাদের এ মাঠে শেষ খেলা। আমাদের পাড়ার এই মাঠটায়  আমরা ছোটবেলা থেকে খেলে এসেছি। এই মাঠ কার, কেন এরকম খালি পড়ে আছে, কোনদিন মাথায় আসেনি। মাথায় এলো কয়েক সপ্তাহ আগে। এরকমই বিকেলে আমরা খেলছি এই সময় একদল লোক একটা জিপ গাড়ি করে এসে নামল।

-- এই যে খোকারা, এই মাঠে খেলা বন্ধ করতে হবে।
-- মানে?
-- এই মাঠ দত্তবাবুর। তিনি আমাদেরকে এই মাঠ বেচে দিয়েছেন, এখানে ফ্ল্যাটবাড়ি হবে।
-- বললেই হল?
-- আরে কাগজ আছে আমাদের। শোন, আজ থেকে এই মাঠে খেলা বন্ধ কর।

তারপর কয়েকদিন আমাদের সত্যি খেলা বন্ধ থাকল। আমাদের বাবারা কন্ট্রকটারের সঙ্গে কথা বোলে একটা মিটমাট করলেন। বাড়ি তৈরি শুরু হওয়ার আগেরদিন পর্যন্ত আমরা মাঠে খেলতে পারি। তাই আজকেই শেষ দিন।

খেলা শুরু হয়ে গেল। পিন্টু আমাদের গোলে। রানা ওদের। আজ সবাই আসায় বেশ জমজমাট খেলা চলল। সানির স্বভাব মেরে খেলা। আজো মারল আমায়। আমি "ফাউল" বোলে বসে পড়লাম। অন্যদিন হলে সানি চলে আসত ঝগড়া করতে; আজ কিছুই বলল না। মাঠের এক ধারে ইট ফেলা। শুভদা বোলে দিয়েছে, ওদের ইট ছোঁয়া যাবে না। তাই ওটাই আজ থ্রো লাইন।

এর মধ্যে কৌশিকের পাস থেকে ওদের হয়ে গোল করে দিল আকাশ। কিন্তু পিন্টু মানতে চায় না ওটা গোল। বল নাকি ইটের ওপর দিয়ে গেছে, তাই গোল না। আমাদের মাঠের এই সমস্যা। গোলপোস্ট নেই। তাই দু দিকে ইট দিয়ে গোল করে খেলা হয়। এইরকম গোল নাকচ লেগেই থাকে।

খেলা ড্রই চলল। একদম শেষদিকে শুভদার বাড়ানো বল আমি সোজা রানার পায়ের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিলাম। শুভদা অন্যদিন হলে হাত মেলাতে আসত। আজ এলোই না।

খেলা শেষ। সবাই মাঠে বসে আছে। রোজই এভাবে আমরা বসে থাকি খানিকক্ষণ খেলার পর। এমনি আড্ডা হয়। খেলা নিয়ে, স্কুল নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, কাকাবাবু না অর্জুন নিয়ে। আজ সেসব হল না। সবাই যেন কেমন ঝিম মেরে আছে। প্রথম কথা বলল শুভদা

-- আগেরদিন যখন খেলা বন্ধ করেছিল, তখন একটা চমক লেগেছিল। ভাবতেই পারিনি একদিন আমরা আর এই মাঠে খেলতে পারব না। আজকেরটা যেন আরও কষ্টের। তাই না?



Sunday, July 1, 2018

ব্রেকপয়েন্ট

ঘুম ভাঙল। ঘেমে গেছি প্রায়। পরনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর পাজামা। ছোট একটা খাটিয়াতে শুয়ে আছি। একটা সাদা রঙের চাদর। ফ্যানটা বন্ধ হয়ে আছে। বোধহয় লোডশেডিং। এ পাড়ায় প্রায়ই হয়। আমার আবার জানালা খোলার উপায় নেই। তাই গরমেই বসে রইলাম। এই বাড়ির দেওয়ালে তেমন রং নেই। একসময় বোধহয় হলুদ রং করা হয়েছিল। তবে এখন তা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আসলে এই ঘরটা ছাদের লাগোয়া। তাই গরমটাও মারাত্মক বেশি। আর এবার যেন বেছে বেছে এত গরম পড়েছে।

আমার ঘরের পাশেই একটা ছোট বাথরুম। একেবারে স্নান করে নিলাম। এই গরমে দিনে ২-৩ বার স্নান না করলে হয় না!! কত শুনেছিলাম কলকাতা শহরে হাওয়া নেই, কিন্তু এসব জেলা শহরে নাকি প্রচুর হাওয়া। সব বাজে কথা!! এক ভ্যাপসা গরম। ঘরে ফিরে হাতঘড়িটা দেখলাম। সকাল সাতটা। আহ, বাড়িতে থাকলে এই সময় মায়ের হাতে এক কাপ চা খেতে খেতে আনন্দবাজার পড়তাম। কতদিন কাগজ পড়িনা। এ বাড়িতে চায়ের রেওয়াজ নেই। সকালে একটু বাদে ছেলেটা এক বাটি মুড়ি দিয়ে যাবে। খাওয়া হয়ে গেলে নিয়ে যায়।

আমার ঘরের একটাই জানালা। এটা সবসময় বন্ধ থাকে। মনে আছে প্রথমদিন যেদিন রাজু এসে আমাকে এখানে রেখে গিয়েছিল, বলেছিল -- "মনে রাখিস, কোনমতেই যেন জানালা খুলবি না। সব জায়গায় পুলিশের চর আছে। তুই যে এই বাড়িতে লুকিয়ে এটা যেন কেউ জানতে না পারে।" 

জানালার নিচেই রাখা আমার সুটকেস। খুলে একটা পাঞ্জাবী বার করতে গিয়ে আমার পিস্তলটা চোখে পড়ল। কে বলবে এটা দিয়ে দুটো খুন হয়েছে। মনে পড়ে ছোটবেলায় গোয়েন্দা গল্প পড়ার সময় ভাবতাম আমি যদি কোনদিন এরকম পিস্তল হাতে নিয়ে ঘুরতাম, কি মজাই না হত! কিন্তু আজ আমি গোয়েন্দা না, বরং যাদের গোয়েন্দারা খোঁজে তাদের একজন। বিশ্বাস করুন, আমার আর ভালো লাগে না। কিন্তু কি করি বলুন, এখান থেকে বেরোনো সম্ভব না। দল ভাঙলেই মৃত্যু।

এসবের শুরু ঐ ক্লাস ইলেভেনে । বাবার কাছে নতুন সাইকেল চেয়ে পাইনি। স্কুলের সিনিয়ার শান্তুদা আমাকে ধরল।

"কিরে ভাই, মুখ গোমড়া কেন?"
"আর এই বাবা একটু পয়সা দেয় না। একটা নতুন সাইকেল কিনব বললাম।"
"তো? তোকে নতুন সাইকেল আমি কিনে দেব।"
"তুমি কোথা থেকে দেবে?"
"আরে আমি না, আমাদের রঞ্জনবাবু দেবেন। রঞ্জনবাবুকে চিনিস তো?"
"কেন চিনব না। আমাদের কাউন্সিলার।"
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু উনি আমাকে কেন সাইকেল দেবেন?"
"দেবেন, দেবেন। তোকে ওনার হয়ে কিছু কাজ করতে হবে। তেমন কিছু না। এই ধর সপ্তাহে দু - তিন দিন স্কুলের পর তোকে একটু কাজে যেতে হবে। পারবি না?"
"স্কুলের পর তো আমি খেলতে যাই।"
"খেলবি না। খেলাও চাস, সাইকেলও চাস। সব তো একসাথে হয় না।"

সেই থেকে শুরু। আজ মাঝে মাঝে মনে হয় কেন যে সেদিন মরতে শান্তুদার সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম।

"আপনাকে নিচে ডাকছে।" -- চাকর রঘু এসে বলে গেল।

গিয়ে দেখি রাজু দাঁড়িয়ে।

"সর্বনাশ হয়েছে, পুলিশ জানতে পেরেছে। চল পালাই।"

দুজন মিলে ছুটতে লাগলাম পিছনের দরজা দিয়ে। পাশের বাড়ি থেকে আতপ চাল আর বিউলীর ডালের গন্ধ এল। আহা, কতদিন খাইনা। কিন্তু এখন দাঁড়ানোর সময় নেই। বেঁচে থাকলে আবার বিউলীর ডাল খাব।

কয়েকটা বাড়ি পেড়িয়ে আমরা স্টেশনের কাছে চলে এলাম। এবার পিছনে পায়ের আওয়াজ।

"দাঁড়াও, নইলে গুলি চালাব।"

গুলিটা যখন আমার বুকে লাগল, তখন রাজুর হাত আর আমার হাতে নেই। স্টেশনে পড়ার সময় একটা পুরনো সাইকেল দেখলাম। আমার একটা এরকম হিরো জেট ছিল।


**************************

ঘুম ভাঙল। ঘেমে গেছি প্রায়। পরনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর পাজামা। আমার ঘরে শুয়ে আছি। নিজের বিছানায়। মশারিটা নামিয়ে নিচে নামলাম। আমাদের বাড়ির দেওয়াল হাল্কা গোলাপি রঙের। মেঝেটা লাল রঙের। কোনগুলো আবার সেমি-সার্কেল করা। কালো রঙের। আমার ঘরে ধারে আমার জামাকাপড়ের আলমারি। বাথরুমে যেতে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। একটু বাদেই মা বেরোল। মায়ের ভেজা পায়ের ছাপ মেঝের লাল রঙে ফুটে উঠল।

"যা, তাড়াতাড়ি চা খেতে আয়। বাবা অপেক্ষা করছে।"

থিন এরোরুট বিস্কুট আর চা খেতে খেতে বাবা প্রশ্ন করল

"তুমি নতুন সাইকেল চাইছিলে কেন? তোমার পুরনো সাইকেল কি খারাপ হয়ে গেছে?"
"না তা নয়, তবে এটা এতো পুরনো।"
"হোক। সোজা কথা শুনে রাখো। আমি নতুন সাইকেল কিনে দিতে পারব না।"

স্কুলে টিফিনের সময় বসে ছিলাম। শান্তুদা এল।

"কিরে মুখ গোমড়া কেন?"
"ঐ গত সপ্তাহে রসায়ন ল্যাবে টেস্ট টিউব ভাঙ্গায় স্যার খুব মেরেছেন। আজ আবার ল্যাব।"
"দুর এটা মন খারাপের কারণ হল। শোন না, তোর তো খুব নতুন সাইকেলের শখ। কাল দেখছিলাম আমিয়কে বলছিলি। একটা নতুন সাইকেল নিবি?"
"না শান্তুদা, বাবা বলেছে পরের মাসের মাইনে পেলে দেবে।"
"ওহ। আরে বাবার কি দরকার? নিজে রোজগার করবি?"
"না শান্তুদা, ঠিক আছে। বাবাই দিক।"
"ধুর শালা, তোদের মত ছেলেরা কোনদিন উপরে উঠতে পারে না। দেখে নিস। তোর কোন এম্বিশান-ই নেই।"

হাসলাম শুধু। শান্তুদা চলে গেল।

সেদিন বাড়ি ফিরে দেখি মা বিউলীর ডাল রেঁধেছে।


Friday, May 25, 2018

অভিশাপ

"তুমি এই প্রথম এলে গাঁয়ে দিদি?"
"হ্যাঁ রে, এই প্রথম।"
"থাকো কোথায়? দিল্লী না?"
"হ্যাঁ। তুই কোন কলেজে পড়িস?"
"ঐ জেলা শহরে রাজা রামমোহন কলেজে।"
"কি পড়িস?"
"বাংলা।"
"বাহ, প্রিয় লেখক কে বাংলায়?"
"আমার তো সুনীল গাঙ্গুলি, তোমার?"
"আমার সমরেশ বসু।"
"তুমি দিল্লীতে থেকে বাংলা পড়তে জানো ? আমি তো জানতাম ওখানকার ছেলে মেয়েরা বাংলা পড়তে পারে না।"
"একদম ভুল ধারণা, আমাদের ওখানে বাংলা স্কুল আছে জানিস?"
"তাই নাকি? তুমি কি কলেজে পড়?"
"এই শেষ হল কলেজ। এবার দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাব।"
"তোমার কি বিষয়?"
"আমার তো অঙ্ক।"
"তুমি অঙ্ক করতে ভালোবাসো? ওরে বাবা, আমি অঙ্ককে যা ভয় পাই।"
কথা হচ্ছিল পল্লবীর সঙ্গে। বাবার ছোটবেলার বন্ধু সুবলকাকার মেয়ে। এই প্রথম আমি আমাদের দেশের বাড়ি মনসাচরে এলাম। আমার জন্ম কলকাতায়। কিন্তু খুব ছোটবয়সে আমরা দিল্লী চলে যাই। বাবা ওখানেই চাকরি করেন। ছুটিছাটাতে আমরা কলকাতায় আসতাম। আমার কাকারা কোলকাতায় থাকেন। কিন্তু মনসাচরে এই প্রথম। তার কারণ আছে। আগে আমাদের বাড়ি সম্বন্ধে বলে নি। আমার বাবার দুই সন্তান। আমি আর আমার দিদি। দিদির বিয়ে হয়ে গেছে দুই বছর হল। এখন দিদি ইন্দোরে থাকে। আমার মা আমার জন্মের সময় মারা যান। মাকে আমি কোনদিন দেখিনি।
এই মনসাচরে আমাদের জমিদারী ছিল। সেই পূরানো জমিদারবাড়ি এখনো আছে। বংশপরম্পরায় রঘুদারা এর রক্ষণাবেক্ষণ করে। এই পরিবারে কিছু একটা অভিশাপ আছে। এই বাড়ির কোন মেয়ে নাকি বেঁচে থাকে না এই মনসাচরে। তাই আমাকে কোনদিন এখানে নিয়ে আসেনি বাবা। এবার আমি প্রায় জোর করে এসেছি। তাতেও চোখের আড়াল হতে দেয় না বাবা। আমার এসব অভিশাপে বিশ্বাস নেই। আমি এসেছি অন্য কারণে। অভিশাপটা কিসের সেটা জানতে। এ নাকি অনেক পুরনো অভিশাপ। কারুরই প্রায় মনে নেই কেন এটা শুরু হয়েছিল। এই পরিবারের শেষ মেয়ে মারা গেছে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে আমার এক পিসী। তারপর থেকে আর কোন মেয়েকে এই মনসাচরে আনা হয়নি। আমার কাকার এক ছেলে।
ভয় যে আমার একদম করেনা তা না। সর্বক্ষণ মনে হয় কেউ যেন আমাকে দেখছে। সেদিন রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘরটা কেমন যেন গুমোট হয়ে উঠেছে। জানালা খুলতেই দেখি এক জোড়া চোখ আমার দিকে তাকিয়ে। একটু পরেই বুঝলাম সেটা একটা প্যাঁচা। এখানে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা হয়। ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। তারপর বেশিরভাগ দিন লোডশেডিং। হ্যারিকেনের আলোয় এই জমিদারবাড়িটাই ভূতুরে লাগে। কাল ভাবছি রমেনদাদুর কাছে যাব। শুনেছি উনি অনেকদিন এখানে আছেন। উনি মনসাচরের ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনো করেছেন। যত তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর মেলে ভালো। প্রথম প্রথম দিল্লী ছেড়ে আসতে ভালো লাগলেও এখন যেন মন কেমন করছে।
"তা জানি বৈকি মা। তোমার পিসীকেও আমি দেখেছি। এক সময় তো তোমাদের বাড়িতে মেয়ে জন্মালে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ডুবিয়ে মেরে দেওয়া হত বা দামোদরে ভাসিয়ে দেওয়া হত। তারপর থেকে মেয়ে হলেই তাকে অন্য কেউ দত্তক নিয়ে নিত।"
"কিন্তু এই অভিশাপটা শুরু কিভাবে হল রমেনদাদু?"
"অনেক অনেক বছর আগের কথা মা। আমারও পুরোটাই শোনা গল্প। তখন সবে বিলেতে প্রিভি কাউন্সিলের কাছে লড়ে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদ করেছেন। কিন্তু তোমার এক পূর্বপুরুষ জমিদার ধীরাজ রায় এসব মানতেন না। এক ব্রাহ্ম এসে হিন্দু ধর্মের প্রথা পালটাবে এ তিনি হতে দেবেন না। তাই এই মনসাচরে রমরমিয়ে সতীদাহ চলত।"
"সে কি? সে তো বেয়াইনি?"
"আর জমিদারের কাছে আইন। ইংরেজ পুলিশ ছিল ধীরাজ রায়ের হাতের মধ্যে। তবে এক ঘটনায় সেটা বন্ধ হল।"
"এর সঙ্গে অভিশাপের কি সম্পর্ক?"
"আছে মা আছে। বলছি। একবার এক ইংরেজ গবেষক এই গাঁয়ে এল। সে যখন খবর পেল সতী হতে যাবে একটি মেয়ে, চলে গেল তাকে বাঁচাতে। ধীরাজ রায় সন্দেহ করেছিলেন এটা। তক্কে তক্কে ছিলেন। কিন্তু তাঁর বোঝার আগেই মেয়েটির বাপের কাছে পৌঁছে যায় সেই ইংরেজ ছেলেটি। বলে চিন্তা করবেন না, আপনার মেয়ের কিছু হবে না। সে ছেলে খবর দিল থানায়। কিন্তু থানার দারোগার কাছে সে খবর পৌঁছালো না। ধীরাজ রায়ের লেঠেল এসে জোর করে তুলে নিয়ে গেল মেয়েটিকে। ছেলেটির মাথায় মেরে তাকে ততক্ষণে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে। জ্বলন্ত চিতা থেকে মেয়েটি বাবা বাবা করে ডেকে উঠল। মেয়েটির বাবা সেই দৃশ্য দেখে অভিশাপ দিলেন ধীরাজ রায়কে যে তাঁর বংশেও কোন মেয়ে বেশিদিন বাঁচবে না এই ময়নাচরে। এই কথা শুনে রাগে ধীরাজ রায় বর্শা ঢুকিয়ে দিলেন মেয়েটর বাবার বুকে। ধীরাজ রায় যেটা ভুল করলেন সেটা হল ইংরেজ ছেলেটিকে না মারা। ছেলেটি কলকাতা ফিরে গিয়ে সব জায়গায় রটিয়ে দিল এ খবর। তারপর ইংরেজ সরকার পুলিশ এনে ধীরাজ রায়কে গ্রেফতার করল। যদিও কিছুদিন বাদেই ছাড়া পায়। তবে জেলে বসেই ধীরাজ রায় খবর পায় তার দশ বছরের মেয়ে সাপের কামড়ে মারা গেছে। তারপর থেকে এই মনসাচরেও সতীদাহ বন্ধ হয়।"
"তুমি কবে চলে যাবে?"
"এই তো পরশু সরস্বতী পুজো। তারপরের দিনই যাব। তুই বলছিলি না তোদের স্কুলে খুব ভালো পুজো হয়। আমি কোনদিন গাঁয়ের স্কুলে পুজো দেখিনি। যাব।"
"অবশ্যই এসো। আমি নিয়ে যাব তোমায়। দেখ সব ক্ষুদে ক্ষুদে মেয়েরা কেমন শাড়ি পরে যায়। আমি তো দু' বছর হল স্কুল ছেড়েছি। কিন্তু এখনো প্রতি বছর স্কুলের পুজোয় যাই।"
"ঠিক আছে পল্লবী, তাহলে ঐ কথাই রইল।"
দামোদারের এক পাড়ে একটা শ্মশান ছিল একসময়। এখন সেটা পোড়ো জমি। কেউ ব্যবহার করে না। সেই জমিটা পেরিয়ে পল্লবীদের স্কুল। একদিন নিয়ে গেছিল আমায়। শ্মশানটা পেরোতে একটু যেন কেমন কেমন লাগছিল আমার। কিন্তু সেই সময় পল্লবী গান ধরল। ওর এত ভালো গলা সব ভুলে গেলাম।
"তুই কে রে?"
"আমি ফুলি।"
"ফুলি তো বুঝলাম। কি চাই এখানে?"
"পল্লবীদি আলপনা দিতে চলে গেছে। আমাকে বলল তোমাকে নিয়ে যেতে।"
"তুই এইটুকু মেয়ে আমাকে নিয়ে যাবি?"
"আমি এইটুকু নই, আমার বারো বছর বয়স।"
"চল যাওয়া যাক।"
হলুদ রঙের লাল পাড় শাড়ি পরে আছে বাচ্চা মেয়েটি। আমার হাত ধরে নিয়ে চলল স্কুলের দিকে। আজ যেন এই এলাকাটা বেশি শুনশান লাগছে। সবাই কি স্কুলে গেছে?
শ্মশানের কাছে আসতেই ফুলি বলে উঠল -- "দিদি, আমার পা ব্যাথা করছে, আমাকে কোলে নেবে?"
আমি শাড়ি পরে আছি। এই অবস্থায় একটা বারো বছরের মেয়েকে কোলে নেব?
"দিদি নাও না, খুব পা ব্যাথা করছে।"
ফুলি যদিও বেশ রোগা, তাও!! দেখি চেষ্টা করে।
ও মা, বেশ হাল্কা তো, মনেই হচ্ছে না কিছু নিয়েছি।
"দিদি ঐ পাশেই আমার বাড়ি। একবার বাবার সঙ্গে দেখা করে যাই চল।"
"দেরি হয়ে যাচ্ছে ফুলি।"
"একটুখানি দিদি।"
শ্মশানের এ পাশে যে একটা ছোট কুঁড়ে আছে আগেরদিন খেয়াল করিনি। ফুলিকে নিয়ে ঢুকলাম। দরজা খোলাই ছিল। ঢুকে দেখি মেঝেতে একটা লোক পরে আছে। বুক থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কতদিনের মরা কে জানে? মাছি ঘুরছে। গা গুলিয়ে উঠল। দরজার দিকে এগোতে গিয়ে দেখি আমার পা নড়ছে না। ফুলিকে কোল থেকে নামাতে গেলাম। পারলাম না। এই কিছুক্ষণেই যেন ফুলির ওজন অনেক বেড়ে গেছে। এবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসল ফুলি।
"পারবে না, আমাকে নামাতে পারবে না। ধীরাজ রায় আমাকে এই ভাবে কোলে করে তুলে আগুনে ফেলে দিয়েছিল। তখন আমার বারো বছর বয়স। আর কেউ আমাকে নামাতে পারবে না।"
এই বলে ফুলি অদৃশ্য হয়ে গেল। একি ঘরটা এত গরম হয়ে উঠছে কেন? আমার মাথা ঘুরছে। পা চলছে না। ফুলির বাবার দেহের পাশে আমি লুটিয়ে পড়লাম।

Wednesday, May 9, 2018

উপহার

পার্ক স্ট্রিট থেকে যখন সি বাসে উঠলেন মলয়বাবু, তখন সবে বিকেল পড়ছে। আজ অফিস থেকে হাফ ছুটি নিয়েছিলেন। ভিড় বাসে বসার জায়গা পেলেন না মলয়বাবু। চিন্তায় ছিলেন ট্রেন না মিস করেন। ঘড়ি যে দেখবেন তারও উপায় নেই।  হাওড়া স্টেশনে নেমেই ছুটলেন সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে। কর্ড লাইন সুপার দাঁড়িয়ে আছে। এটা গ্যালোপিং লোকাল। বর্ধমান পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাতটা। জনাই-এ এক চা-ওলার কাছ থেকে চা কিনে ভাবতে লাগলেন আজকের দিনটার কথা।

হ্যাঁ, আজ তাঁর বিবাহবার্ষিকী। দু' বছর আগে এই দিনে পারমিতার সঙ্গে তিনি সংসার শুরু করেন। গত বছর এই দিনটাও কিন্তু বিশেষ কিছু ছিল না। কিছুদিন আগে পাশের বাড়ির ঘোষগিন্নী এসে বললেন --
"আর আমার ছেলের তো প্রথম বিবাহবার্ষিকী আজ। তাদের তো দিল্লী থেকে আসার সময়ই হবে না। তা শুনলাম ছেলে বউমাকে নতুন শাড়ী উপহার দিয়েছে। বউমাও অবশ্য ছেলেকে কি একটা নতুন প্যান্ট কিনে দিয়েছে। কি আজকাল জিন না কি হয় না তাই। আমরা বাবা বুড়ো মানুষ। এতবছর বিয়ে হয়েছে, তোমাদের কাকু কোনদিন আমাকে বিবাহবার্ষিকী বলে কিছুই দিলেন না... আর আজকালকার... "

কথা শুনতে শুনতেই মলয়বাবু মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলেন পারমিতাকে কিছু একটা কিনে দেবেন বিবাহবার্ষিকীতে। কি কিনবেন সেটাও ঠিক করে রেখেছিলেন। তাদের অভাবের সংসার। খাওয়া পরার খুব একটা অসুবিধা হয়না ঠিকই, কিন্তু একটু যে বিলাসিতা করবেন, সে জো নেই। বিয়ের পর থেকেই পারমিতা সেই এক হাতে একটি বালা পরে থাকেন। আর এক হাত খালি থাকে। কবে থেকে ভাবছেন আর এক হাতের আর একটি বালা কিনে দেবেন, কিন্তু সে আর হয়ে ওঠে না। এইবার বিবাহবার্ষিকীতে তাঁকে একটা বালা কিনে দেবেন বলে শ্যাকরার কাছে দাম জেনেও এসেছেন মলয়বাবু। কিঞ্চিৎ দামী। সে যাকগে, বিবাহবার্ষিকীর আগের মাসে একটা এরিয়ার পাওয়ার কথা। পেলে কেনাটা কোন ব্যাপার না।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কোন এক কারণে এরিয়ারটি ক্যান্সেল হয়ে গেল। মলয়বাবুর মাথায় হাত। জমানো টাকা সেরকম নেই যে বালাটা কিনতে পারবেন। বিয়ের এক বছর আগেই চাকরিটা পেয়েছেন। আর এত ধার দেনা করে বিয়ে করতে হয়েছে, যে জমানো শুরুই হয়েছে অনেক পরে। একদিন অফিসের ক্যান্টিনে বসে এসব ভাবছিলেন এই সময় সহকর্মী বিনয়বাবু তাঁকে ডাকেন --

"এই মলয়, কটা বাজে রে? আমার ঘড়িটা গেছে।"

ঘড়ি, তাই তো!! এটা তো ভেবে দেখেননি মলয়বাবু। তাঁর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া একটা দামী ঘড়ি আছে বটে। অফিসের রাকেশ তেওয়ারি এসব এন্টিক নিয়ে উৎসাহী। একদিন তাঁর ঘড়িটা দেখে বলেছিলেন  --

"এটা বেচে দিন মলয়বাবু, প্রচুর দাম পাবেন। কি হবে এই পুরনো ঘড়ি পরে? দেখতেও তো কেমন হয়ে গেছে? "

কথাটা যে মিথ্যা তাও না। ঘড়ির স্ট্র্যাপ্টা শতজীর্ণ। কবে থেকে ভাবছেন ওটা পালটাবেন, কিন্তু ঐ, পয়সা কোথায়? তবে পৈত্রিক স্মৃতি তাই ছাড়তে পারেননি। মনে আছে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর তাঁর বাবা নিজের হাত থেকে ঘড়িটি খুলে দেন।

ট্রেনের জানালা দিয়ে চায়ের ভাঁড়টা বাইরে ফেলে নিজের খালি হাতের দিকে তাকালেন মলয়বাবু। তারপরই ব্যাগের উপর দিয়ে শ্যাকরার দোকানের বাক্সটা অনুভব করলেন।

স্টেশন থেকে বেড়িয়ে নিজের সাইকেলটা স্ট্যান্ড থেকে নিলেন মলয়বাবু। এবার রওয়ানা হলেন বাড়ির দিকে। আজ যেন মনটা নিজের থেকেই ভালো লাগছে। জি টি রোড পার হয়ে নটরাজ সিনেমার সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে থামলেন একবার। সামনেই মিষ্টির দোকানে সিঙ্গারা ভাজছে। নিয়ে যাবেন? না থাক, বালাটা যদি কোন কারণে খোয়া যায় এই করতে গিয়ে। আবার সাইকেলের প্যাডেলে পা দিলেন।

যখন রোলের দোকানের চাটুতে প্রথম তেল পড়ল, তুলসীতলায় শঙ্খের ধ্বনি শোনা গেল, খেলা শেষে ছেলের দল মাঠ থেকে উইকেট তুলল,  মফঃস্বলে সন্ধ্যা নামল,  মলয়বাবু বাড়ি ফিরলেন। সাইকেলটা রেখে কলতলায় পা ধুয়ে নিলেন। পারমিতা গামছাটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন

-- "ট্রেন ঠিক ছিল? তুমি যাও আমি মুড়ি নিয়ে আসছি।"

ঘরে বসে ব্যাগ থেকে আস্তে আস্তে বাক্সটা বার করে সবে বালাটা দেখবেন, এই সময় লোডশেডিং। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। মলয়বাবু আলতো করে হাত বোলালেন বালাটার উপরে। এই সময় লণ্ঠন ও বাটি ভর্তি মুড়ি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন পারমিতা।

"দাঁড়াও চা বসাচ্ছি।"
"শোন না একবার, একটা জিনিস দেখাই।"
"ওহ, দাঁড়াও, তবে আমি আগে দেখাই।"

এক ছুটে বেরিয়ে গেলেন পারমিতা। একটু বাদেই ঘরে ঢুকলেন হাতে একটা ছোট বাক্স। বাক্স খুলতেই লণ্ঠনের আলোয় মলয়বাবু দেখতে পেলেন এক জোড়া ঘড়ির ব্যান্ড। বাদামী চামড়ার ব্যান্ড। উপরে কাটা-কাটা ডিজাইন করা। ধারে সেলাই। লণ্ঠনের  আলোতেও চকচক করছে। একটা অদ্ভুত নতুন রকমের গন্ধও পেলেন তিনি।

"দেখি তোমার ঘড়িটা দাও, আমি লাগিয়ে দি।"

এতক্ষণ বোধহয় অন্ধকারে বুঝতে পারেননি পারমিতা।

"একি, তোমার ঘড়ি কই?"

এবার বালার বাক্সটা এগিয়ে দিলেন মলয়বাবু। ততক্ষণ তিনি দেখে নিয়েছেন, পারমিতার দু হাত খালি। এই অন্ধকারের মধ্যে যে ক্ষুদ্র নাটিকাটি অভিনীত হল, তা যেন সেই আলতামিরার গুহামানবদের সময় থেকে যুগ যুগ ধরে হয়েই চলেছে। হয়ত একেই বলে ভালোবাসা।