Sunday, May 10, 2020

লবাব

এ অনেকদিনের পুরোন গল্প। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। আমি তখন সবে বর্ধমান মেডিকাল কলেজের থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমি তারাবাগে বাড়িতে থেকেই যাতায়াত করি। আমাদের বাড়ির পাশেই একটা গ্রাম, নাম গোদাগ্রাম। ঐ গ্রাম থেকে লোকজন এসে আমাদের পাড়ার সকলের বাড়িতে সাহায্য করতেন। আমাদের বাড়িতে যিনি আসতেন তাঁর নাম কমলাদি। কমলাদির মেয়ে ফুচি। বয়স বছর ৭-৮। স্কুলে টুলে যায় না। বাড়ির কাজকম্ম করে। কমলাদিকে বললে বলে -- "কি হবে বাবু পড়াশুনা করে? তার চেয়ে বাড়ির কাজটা শিখুক। বিয়ে দিতে পারব।"

আমরা কয়েকজন মেডিকাল কলেজের ছাত্র মিলে ঠিক করলাম ছুটির দিনে এরকম ফুচির মত ছেলে মেয়েদের পড়াব। কাউন্সিলার চয়নবাবুর সাহায্যে সে আয়োজনও হয়ে গেল সহজেই। সামান্য অঙ্ক, টাকা পয়সার হিসেব, বাংলা লেখা, ইংরেজি সংখ্যা চেনানো, এসব হত আর কি। ফুচির কিন্তু শেখার ভীষণ আগ্রহ ছিল। আমার মতে প্রচণ্ড শার্প মেয়ে। কমলাদির বড় ছেলে রতন বোধহয় বর্ধমানে রিক্সা চালাত। একদিন মাথায় ভুত চাপে, সব ছেড়ে কলকাতা চলে যায় সিনেমার হিরো হতে। কমলাদি দুঃখ করেন  -- "আমার কপাল, ছেলেটা জলে গেল।" ফুচির কিন্তু দাদাকে নিয়ে ভীষণ গর্ব। "দেখবেন কানুদা, আমার দাদা একদিন প্রসেঞ্জিতের মত হিরো হবে। আপনি আমাকে দাদার সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবেন তো?"

একদিন কমলাদি আমাদের বাড়ি এলেন একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে। তাতে গোটা চারেক ছানার কেক। মা জিজ্ঞেস করে -- "কি হল কমলা?"
"আর বৌদি, কি বলবো। আমার ছেলে সিনেমায় চান্স পেয়েছে। রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে। পরের বছর বেরোবে।"
"সেকি গো? দারুণ খবর তো।"

ফুচি আমাদের ছুটির ক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে গেল। "জানেন, আমার দাদার সাথে দেবশ্রী রায় সিনেমা করতে চায়, কিন্তু দাদার শতাব্দীকেই পছন্দ।"
"সেকি? কেন? দেবশ্রী খারাপ কি?"
"নাহ, আমার শতাব্দীকে ভালো লাগে। আপনার কাকে ভালো লাগে কানুদা?"
"মাধুরী।"
"যাহ, আপনি তো আবার শুধু হিন্দি সিনেমা দেখেন।"

ক'দিন যেতে না যেতেই শুরু হল
"আর কয়েক বছর যাক, দাদা এবার বম্বেও যাবে। দেখুন না, দাদা, মিঠুন আর মাধুরী মিলে সিনেমা করবে। আপনি আমায় দেখাবেন কানুদা?"
"ফুচি, অনেক বকেছিস। এবার হাতের লেখা দেখা।"

এরকম করে একদিন ফুচির দাদার সিনেমা বেরোল। নাম "নবাব"। কমলাদি আমাদের বাড়ি এসে বললেন -- "বৌদি, জানো রতনের সিনেমা বেরোচ্ছে শুক্রবার। লবাব। এস্টার-এ আসছে। আমরা তো গ্রাম থেকে সবাই মিলে যাবো। আমাকে শুক্রবার দিন ছুটি দেবে?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। ফুচিও যাবে?"
"না বৌদি, ওর ঐটুকু বয়স, যদি হলে ঢুকতে না দেয়। আমি ওকে এসে গল্প বলব। রঞ্জিত মল্লিক আছে, সন্ধ্যা রায় আছে।"

ফুচির পরের দু'দিন ক্লাসে ভীষণ মন খারাপ। আমি শেষকালে বললাম "দাঁড়া এবার পুজোয় যখন পাড়ায় পর্দা ফেলে সিনেমা দেখানো হবে, তখন আমি নবাব নিয়ে আসব।"
"সত্যি কানুদা? আপনি লবাব আনবেন তো?"
"আনব। তবে ওটা লবাব না ফুচি, ওটা নবাব।"

শনিবার দিন কমালাদি সিনেমা দেখে এলেন। মা প্রথমেই জানতে চাইল -- "কেমন ছিল সিনেমা?"
"ঐ একরকম। যা হয় বাংলা সিনেমায়। শুধু মারামারি। বাদ দাও বৌদি। বলছি আজকে আলুগুলো কি ডুম ডুম করে কাটব না সরু সরু করে?"
মা যা বোঝার বুঝে গেল। সমস্যা হচ্ছে, মা আমাকে বলেনি। বললে আমি আমিয়বাবুকে হাতে পায়ে ধরে পুজোর সময় নবাব আনতে বলতাম না।

পুজোর সময় আমাদের পাড়ায় মাঠে পর্দা ফেলে সিনেমা দেখানো হয়। একই দিনে দুটো সিনেমা। এবার প্রথমে ছিল সপ্তপদী। তারপর হবে নবাব। সিনেমা শুরুর আগেই ফুচি এসে হাজির। একটা ফাঁকা চেয়ার দেখে ওকে বসতে বললাম। ফেবেছিলাম ওর পাশে বসেই সিনেমা দেখব। কিন্তু তার আগেই আমার অন্য বন্ধুরা টেনে নিয়ে গেল। সিনেমা শুরু হল। রতনকে আমি চিনি। আগে দেখেছি। তাই মুখ জানি। একটু বাদেই রতনকে দেখতে পেলাম পর্দায়। সৌমিত্র ব্যানার্জি একটা চায়ের দোকানে বসে কিছু ছেলের সঙ্গে মাস্তানি করছি। একটি মেয়ের শাড়িতে চা ফেলে ইভ টিজিং করে। এই ইভ টিজারদের দলে ছিল রতন। লাল সাদা ডোরাকাটা একটা টার্টলনেক গেঞ্জি পরিহিত রতন কিছুক্ষণ বাদেই লবাবরুপি রঞ্জিত মল্লিকের হাতে বেধড়ক মার খেল। সে দৃশ্য দেখেই ফুচির জন্য মন কেমন করল। ওর চেয়ারের দিকে তাকাতেই দেখি ফুচি কাঁদতে কাঁদতে চেয়ার ছেড়ে ছুটে পালাল।

বেশ কিছুদিন ক্লাসে আর আসেনি ফুচি। তারপর একদিন এলো। আমার সঙ্গে চোখে চোখ রাখতে লজ্জা পাচ্ছিল। আমি কিছুই হয়নি এরকম ভাব করে, "ফুচি, ৫ এর নামতা বল" বলে শুরু করলাম।

ক্লাসের শেষে ফুচি আমাকে ডাকল - "কানুদা, দাদা হয়ত বম্বে যেতে পারবে না, কিন্তু শতাব্দীর সঙ্গে সিনেমা করবে বলুন?" 

Thursday, May 7, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ২ঃ যাত্রা শুরু

টি ভি এফ-এর "ইয়ে মেরি ফ্যামিলি" সিরিজে একটি দামী কথা বলেছিলেন মোনা সিং। ছেলে কখন বাড়ি ছেড়ে চলে যায় বোঝাই যায় না। মনে হয় পড়তে গেছে, ক'দিন বাদেই ফিরবে। সেই ফেরাটা কোনদিনই আগের মত বাড়ি থাকা হয়না।

কলকাতা পৌঁছে আমি এরকম বাড়ি ছাড়ার জন্য তৈরি হতে লাগলাম। আমার জয় বাংলাটা এক-দু দিনের মধ্যেই সেরে গেল। তারপর একদিন আমরা গেলাম ব্যাগ কিনতে। এখন আমাদের পরিবারে আগে কেউ কোনদিন বিদেশ যায়নি। তাই চেক-ইন লাগেজ কি হতে পারে আমরা ভাবতে লাগলাম। কেউ কেউ বলল হার্ড লাগেজ নিতে, কেউ কেউ বলল সফট লাগেজ। একদিন আমার বড়মামার গাড়ি করে আমরা সকলে, মানে আমি, মা, বাবা, বড় মামা আর মামি মিলে প্যান্টালুন্সে গেলাম ব্যাগ কিনতে। সবাই বলেছিল ভালো ব্যাগ কিনতে -- এত বড় জার্নি, ব্যাগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অবশেষে আমেরিকান টুরিস্টারের একটা লাল সফট আর একটা নীল হার্ড লাগেজ কেনা হল। দুর্ভাগ্যের কথা, ঐ নীল ব্যাগটি আমেরিকা পৌঁছাতে পৌঁছাতেই ভেঙ্গে যায়। তাই ওটি আর কোনদিন ব্যবহার করতে পারিনি।

সেদিন ব্যাগ কিনে বাড়ি ফিরে বুঝতে পারলাম দাঁতে একটা অস্বস্তি হচ্ছে। পরেরদিন বেহালা চৌরাস্তায় ডাক্তারবাবুকে দেখালাম। উনি দেখে বললেন -- "সর্বনাশ করেছ। তোমার একটা আক্কেল দাঁত দুটো সুস্থ দাঁতের মধ্যে দিয়ে বেরোতে চাইছে; পারছে না। তাই এখানে ইনফেকশন  করেছে। দাঁত তুলতে হবে।"
"কিন্তু আমার যে আর ক'দিন বাদেই আমেরিকা যাওয়া।"
"অসম্ভব। তোমার সুস্থ হতে মিনিমাম এক সপ্তাহ লাগবে। টিকিট পাল্টাও।"

পাল্টানো হল। পার্ক স্ট্রিটের আল্পস ট্র্যাভেলসের মালকিন তাড়াহুড়ো করে একটা সস্তার টিকিট করে দিলেন বটে। কিন্তু আমার সব বন্ধুরা আলাদা চলে যাবে। আমি একা এত বড় যাত্রা করব। পাক্কা দু ঘণ্টা ধরে আমার দাঁতের উপর কসরত চালালেন ডাক্তার বর্মন। যার ফলে আমার নর্মাল খাওয়া দাওয়া পুরো বন্ধ হয়ে গেল ৪-৫ দিনের জন্য। আমি শুধু খেতে পেতাম আইসক্রিম আর রসগোল্লা। প্রথম প্রথম কথা বলাও বারণ ছিল। আসতে আসতে সেসব মিটল।

আমার বাবা কয়েক বছর আগে ইউ জি সির কাজে একবার প্লেনে দিল্লী গিয়েছিলেন। বাবা ফিরে এসে গল্প করেছিলেন। সিকিউরিটি চেকের পর একটা বড় ঘরে সবাইকে বসতে দেয়। তারপর একটা করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন প্লেনের ভেতরে ঢুকে পরা হয়।

১১ই আগস্ট ২০০৭ রাত্রে আমি মনে হয় এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমোতে গিয়েছিলাম। পরেরদিন বেলা করে উঠলাম। মা আমার জন্য দুপুরে আলুপোস্ত করে রেখেছিলেন। মাংস খাওয়ার মত দাঁতের অবস্থা নেই। রাত ১টায় প্লেন। আমাকে সবাই বলে দিয়েছিল -- বড় জার্নি, রেস্ট নে বাড়িতে, দুপুরে ঘুমিয়ে নিস। শুলাম। কিন্তু ঘুম এলো না। বাবা দেখি বাইরের ঘরে একা একা বসে আছে। বাবার কোলে মাথা দিয়ে শুলাম। টি ভি-তে "এই ঘর, এই সংসার" চলছিল। তাই দেখলাম দুজন মিলে। বিকেলবেলা তারাবাগ থেকে কণিকাকাকিমা ফোন করলেন। ওনার ভাইয়ের শালী, ত্রিশিখীদিও আমার সঙ্গে একই প্লেনে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট যাচ্ছে। তারপর উনি টরোন্টো যাবেন। ভালোই হল, চেনা জানা কেউ তো থাকল।

সন্ধ্যেবেলা গোপু মামা আর জয়া মাইমা এলেন আমাদের বাড়ি। ওনারা জানতেন না সেদিন আমাদের যাত্রা। গোপুমামা ঠিক করল রাত্রে এয়ারপোর্ট যাবেন আমাদের সাথে। রাত নটা নাগাদ আমরা বেরোলাম। বৃষ্টি পরছিল। প্রথমে গেলাম মামাবাড়ি। দিদাকে প্রণাম করলাম। দিদা জানতে চাইল পুজোতে আসব কিনা।

অবশেষে দুই গাড়ি ভর্তি বেহালাবাসী আমাকে সি অফ করতে দমদম ছুটল। এক গাড়িতে বাবা, গোপুমামা, আমার বড় মামা আর আমার সেজ মামা। অন্য গাড়িতে বড় মামি, ফুল মামির সঙ্গে মা আর আমি। মা পুরো সময়টা আমার হাত ধরে ছিলেন। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি তো বড় হয়ে গেছি। বাড়ির বাইরে, দেশের বাইরে পড়তে যাচ্ছি। দমদমে নেমে সব ব্যাগ গুছিয়ে আবার এক রাউন্ড প্রণাম সেরে আমি গেটম্যানকে টিকিট দেখিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সবাই বাইরে থেকে হাত নাড়ছিল। কথা দিয়েছিলাম আমার লাগেজ চেক ইন হয়ে গেলে আর একবার কাঁচের ভেতর থেকে হাত নেড়ে যাব। লাগেজের লাইনে আলাপ হল যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপিকা দেবশ্রী দত্তরায়ের সঙ্গে। লাগেজ চেক ইন করে যখন হাত নাড়লাম, সবাইকে দেখতে পেলাম। মায়ের চোখে জলটাও দেখতে ভুল করলাম না। আমার মোবাইল ফোনটা না আনার জন্য আক্ষেপ করলাম। অবশেষে আমি ইমিগ্রেশনের লাইনে অগ্রসর হলাম। 

Wednesday, April 29, 2020

প্রবাসীর ডায়রিঃ ১ঃ পরীক্ষা শেষ

এ এক অন্য সময়ের গল্প। সেই সময়, যখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়নি, যখন লিওনেল মেসি একটিও ব্যালন ডি-ওর জেতেননি, যখন সৃজিত মুখার্জি বা দীপিকা পাড়ুকোনকে কেউ সিনেমায় দেখেনি, যখন ইরফান খানের "রোগ"-এর গান লোকের মুখে মুখে ঘুরত। এটা সেই সময়ের গল্প যখন সারা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল হয়ে উঠেছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম নিয়ে, যখন  ভারতবর্ষ থমকে গিয়েছিল ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়ে, যখন লোকে মোবাইলে রিং টোন বানিয়ে বন্ধুদের পাঠাত।

এরকম সময় আমার বাইশ বছর জন্মদিনের দিন আমি সকালে উঠলাম খুশী মনে। গতকাল আমার যাদবপুরের শেষ পরীক্ষা হয়ে গেছে। এখন প্রায় আড়াই মাস ছুটি। তারপর আমার ফ্লোরিডা ভ্রমণ। সকাল থেকেই আত্মীয় স্বজনদের ফোন আসতে শুরু করল। আমাদের পরিবারে একটি কুসংস্কারের জন্য জন্মদিন পালন হয়না। আমি সকালে অন্যান্য দিনের মতই স্নান খাওয়া করে বেরিয়ে পড়লাম। কলেজে যাব। তবে অন্য কারণে। আমাদের বন্ধু আশিস গেটে ভালো র‍্যঙ্ক করেছে। তাই আজ খাওয়াবে। রোজকার মত অটো করে বেহালা চৌরাস্তা, তারপর বাসে করে যাদবপুর। বাওয়ারচিতে ভরপেট খেয়ে গাছতলায় বসে আড্ডা দিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন সন্ধ্যা হবে। ঠিক হল দু'দিন পর আমরা বর্ধমান যাব।

বাবা বর্ধমানে একাই থাকত। আমরা সকালের ট্রেন নিয়ে দুপুর নাগাদ বাড়ি পৌঁছালাম। ২০০৬ এ আমরা ফ্ল্যাট পালটেছিলাম। কিন্তু আমি তখন দিল্লীতে ইন্টার্নশিপ করছি। তারপর আর কাজের চাপে বর্ধমান যাওয়া হয়নি তেমন। নতুন ফ্ল্যাটের সবার সাথে সেভাবে আলাপ ছিল না। কয়েকজনকে চিনতাম, যেমন আমাদের প্রতিবেশী ছোটু। ছোটু আমার ছোটবেলার বন্ধু। একসাথে ক্রিকেট খেলেছি। আমাদের তারাবাগের এক একটা ব্লকে চারটি করে ফ্ল্যাট থাকত। আমরা আর ছোটুরা দোতলায় থাকতাম। একতলায় তুয়া-টুটু দুই ভাই বোন আর নন্দ জেঠুরা। তিনতলায় সায়নীরা আর শ্রাবণীদিরা। বাকিদের সবার সঙ্গে চেনা জানা থাকলেও একদম চিনতাম না শ্রাবনীদি দেবাঙ্গনদাকে। শ্রাবণীদি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সদ্য জয়েন করেছে, অধ্যাপক হিসেবে।

কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের একটা দারুণ দল হয়ে গেল। রোজ বিকেলে চা খেতে খেতে ছাদে আড্ডা। দেবাঙ্গনদা রসিয়ে গল্প করতে পারে। আমি কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে যাচ্ছি শুনে বলল -- "জানিস আমি সফটওয়ার শুনে খুব ঘাবড়ে যাই। ছোট থেকে হার্ডওয়ার বলতে বড় বড় দোকান দেখেছি। সফটওয়ার শুনে ভাবলাম এটা কি? হোসিয়ারি?" একদিন  তো ছাদে সবাই মিলে পিকনিক করলাম সন্ধ্যাবেলা। যারা সঞ্জীববাবুর শিউলি পড়েছেন, তারা জানবেন, আমরা প্রায় ওরকম জীবন কাটাতাম।

একদিনের কথা মনে পড়ে, সেদিন ছাদে তখনও কেউ আসেনি। আমি একা। চুপচাপ ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে মনে ভাবতাম আচ্ছা এরকম ভাবে তারাবাগে আমাদের ছাদে আবার কবে আমি এভাবে বসে থাকতে পারব। হয়ত কালকেই পারব। হয়ত এই পুরো সপ্তাহটা পারব। কিন্তু তারপর? একদিন এই বাড়িটা ছেড়ে আমি অনেক দূরে চলে যাব। তখন কি এটার কথা মনে পড়বে? মনে পড়েছিল। বার বার মনে পড়ত। তাই ২০১৭-এ যেদিন আমরা শেষবারের মত তারাবাগ ছাড়ি, যেদিন মিডলসবরোকে হারিয়ে লিভারপুল চ্যাম্পিয়ান্স লিগে থাকা নিশ্চিত করছে, সেদিনও আমি উঠে গেছিলাম ছাদে।

এর মধ্যে ফ্লোরিডা থেকে আমার  আই টুয়েন্টি চলে এল। যারা জানেন না তাদের জন্য বলি -- স্টুডেন্ট ভিসায় মার্কিন দেশে আসতে গেলে এই নথিটি লাগে। অনলাইনে ভিসার দিন ঠিক করলাম। আমার  স্কলারশিপ ছিল। তাও কেউ কেউ বলল বাড়ির দলিল, নথি দেখানো উচিত। যদি ঝামেলা করে। আমি আর বাবা বর্ধমানে এক উকিলের বাড়ি গেলাম। তিনি সমস্ত নথি বানিয়ে দিলেন। এরপর জুনের শেষ দিকে আমরা আবার কলকাতা ফিরলাম। ভিসার আগে সবাই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল। তখন স্টুডেন্ট ভিসা, বিশেষত যারা পি এইচ ডি করতে যাচ্ছে, তাদের একটি পিঙ্ক স্লিপ দিত মাঝে মাঝে। কিছুই না, ভিসা হয়ে যেত। কিন্তু দেরী হত কয়েক সপ্তাহ। যাই হোক, আমার ক্ষেত্রে সেসব হলনা। ভিসা অফিসার মহিলা বললেন "ভিসা ইজ এপ্রুভড।" কাউন্টারের বাঙালি মহিলা বললেন -- "আজ শুক্রবার তো? আজকেই পেয়ে যাবেন। বিকেলে আসুন।"

ইন্টার্ভিউ দিয়ে বাইরে বেরোতেই এক দল লোক ছেঁকে ধরল -- "লোন লাগবে?" না জানিয়ে বাবাকে বললাম যে আজকেই ভিসা পাবো। কি করবে? পার্ক স্ট্রিট থেকে আমাদের শকুন্তলা পার্কের বাড়িতে ফিরে আবার চারটের মধ্যে আসা সময়সাপেক্ষ। তাই আমরা ঐ অঞ্চলেই ঘুরে বেড়ালাম। দুপুরে ডমিনোজে পিতজা খেলাম। বাবা সেই প্রথম জীবনে পিতজা খেলেন। আমি এর আগে একবারই খেয়েছি দিল্লীতে। আজকাল হয়ত কলকাতায় কলেজে পড়া ছেলেদের কাছে পিতজাটা কোন বিলাসিতা না। কিন্তু সেই সময় আমাদের মত মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেদের কাছে তা ছিল বইকি।

ভিসা নিয়ে আবার বর্ধমান ফিরলাম। এবার আমি আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক শিশিরবাবুর কাছে ভর্তি হলাম জাভা শিখব বলে। আমার পুরনো এটলাস গোল্ডলাইন সুপারটা আবার ঝেড়ে বার করা হল। কতদিন বাদে সেই স্কুল জীবনের মত সাইকেল করে পড়তে যাচ্ছিলাম। একদিন আমরা তারাবাগের ব্লকের সবাই মিলে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে বেরোলাম। দামোদারের পার ঘুরে, শের আফগানের সমাধি ঘুরে, কঙ্কালিতলা হয়ে দারুণ এক সন্ধ্যা কাটালাম। এর মধ্যে আমার প্লেনের টিকিট কাটা হয়ে গেল। ঠিক হল ৬ আগস্ট ভোর একটার প্লেনে আমরা অনেকে মিলে একসাথে যাব। তখন কলকাতা থেকে লুফথান্সা চলত। সেই প্লেনে আমরা যাদবপুরের বন্ধুরা মিলে যাব ফ্র্যাঙ্কফুর্ট। সঙ্গে থাকবে আমার রুমমেট সায়ক। সেখান থেকে আমি আর সায়ক ওয়াশিংটন ডি সি হয়ে যাব ফ্লোরিডার ওরল্যান্ডো।

বলতে ভুলে গেছি এই ছুটিতেই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম ফ্লোরিডায় কে কে একসাথে থাকব। তখন ফেসবুকের এত রমরমা ছিল না। ফ্লোরিডার বাঙালি ছাত্র ছাত্রীদের একটা ইয়াহু মেলিং গ্রুপ ছিল। আমি এডমিশন পাওয়ার পর পর সেখানে ঢুকে পরেছিলাম। সায়কের সঙ্গে আলাপ আর এক পরিচিতর মাধ্যমে। একদিন সেই মেলিং গ্রুপে দেখলাম এক বাঙালি ছাত্র, নাম অনিরুদ্ধ, মেল করেছে তার দুটি রুমমেট লাগবে। মেল পড়েই আমরা উত্তর দিলাম আমরা রাজি। অনিরুদ্ধদা এর মধ্যে একদিন কলকাতা এলো। ওর বাড়ি বালিগঞ্জে। একদিন ওর বাড়িতে আমি আর সায়ক দুপুরে লাঞ্চের নেমন্তন্নে গেলাম। প্রচুর আড্ডা হল। অনিদা বলল ও ২০ আগস্ট নাগাদ ফ্লোরিডা ফিরবে। আমরা তার মধ্যে যেন লিজ সই করে বাড়িতে ঢুকে যাই। কিন্তু আমরা যেন বেশী আসবাব বা বাসনপত্র না কিনি। কারণ ওর সব আছে, ও সেগুলো নিয়ে আসবে।

এভাবে একদিন বর্ধমানের পাট শেষ হল ২২শে জুলাই। আর দু সপ্তাহ বাদে আমার যাত্রা। এবার কলকাতা ফিরতে হবে। ব্যাগ কিনতে হবে, ব্যাগ গোছাতে হবে। যেদিন তারাবাগ ছেড়ে এলাম সেদিন আমাদের রিক্সার পাশে ব্লকের ছটা ফ্ল্যাটের সবাই নেমে এসেছিল। কৃষ্ণাদি আমাদের বাড়িতে মাকে সাহায্য করত। আমি চলে যাচ্ছি বলে কেঁদে ফেলেছিল। সবাই বলল সাবধানে থাকিস, দেবাঙ্গনদা বলল চিঠি লিখিস। কথা দিলাম লিখব। কৃষ্ণাদির স্বামী শম্ভুদা আমাদের স্টেশনে নিয়ে এল রিক্সায়।  ট্রেনটা যখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, যখন হলুদ সাইনবোর্ডে বর্ধমান লেখাটা শেষবারের মত দেখলাম, আমার কান্না পাচ্ছিল।

বার বার চোখ মুছেও দেখলাম চোখের লাল ভাবটা যাচ্ছেনা। বাবা বলল কলকাতা গিয়ে তোর ডাক্তারমামাকে দেখাস। হয়ত জয় বাংলা। তখনো জানতাম না জয় বাংলায় শেষ না, কলকাতায় কি ভয়ানক ব্যাধি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।


Monday, March 30, 2020

তৃষ্ণা

মা বাবার সঙ্গে ক'দিন হল এই নতুন শহরে এসেছে রিঙ্কা। নামেই শহর। প্রায় গ্রাম বললেই চলে। পাহাড়ি জায়গা। বাবা এক টিম্বার কোম্পানিতে চাকরি করেন। তাই রিঙ্কারা এখানে এসেছে। কয়েকটা মাত্র কোয়ার্টার। রিঙ্কাদের পিছনে থাকেন  দে বাবুরা। এ ছাড়া হাসানবাবু, কোলেবাবু, শর্মাবাবু এনারা বাকি কয়েকটা বাড়িতে থাকেন। রিঙ্কাদের কলোনি থেকে বেরোলেই একটা ছোট গ্রাম। সেই গ্রামে একটাই স্কুল। রিঙ্কা অনেক ছোট, তাই ঐ স্কুলে যায়না। এখানে এক বছর থেকেই ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ার কথা রিঙ্কার বাবার। তাই রিঙ্কাকে স্কুলে ভর্তি করেননি।

এই জায়গাটা ভীষণ নিরিবিলি। সন্ধ্যা হলেই রাস্তায় তেমন লোকজন দেখা যায়না। রিঙ্কার বাবার যদিও সেটা ভালোই লাগে। মাঝে মাঝেই রাত্রিবেলা বারান্দায় বসে থাকেন একা একা। রিঙ্কাকেও ডাকেন। রিঙ্কা এলে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।  রিঙ্কার ভালো লাগেনা। রিঙ্কার বাবার সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বাবা কিছুতেই কথা বলতে চাননা। একটা দুটো হ্যাঁ হুঁ উত্তর দিয়ে থেমে যান। রিঙ্কার রাত্রে ভালো লাগেনা। কী সুন্দর কলকাতায় ছিল। রাত অবধি বাড়ির সামনে  রোলের দোকানটা খোলা থাকত। একটু দূরেই মদনকাকুর ওষুধের দোকান ছিল। সেখানেও আলো জ্বলত। আর রাস্তাতেও কত আলো। এখানে রাস্তায় আলো থাকেনা। সারা পাড়া নিঝুম ঘুমে থাকে। মাঝে মাঝে পাতার আওয়াজ শুনেই রিঙ্কার ভয় করে। মনে হয় কে যেন দেখছে থাকে। ছুটে চলে যায় মায়ের কাছে।

রিঙ্কার সবচেয়ে বড় কষ্ট এখানে তার বয়সী কোন বন্ধুবান্ধব নেই। এখানকার স্কুলটা বেশ বাজে বলে প্রায় সবার ছেলে মেয়েই বাইরে হস্টেলে থেকে পড়ে। বিকেলবেলা রিঙ্কা একা একাই পুতুল নিয়ে বা রান্নাবাটি খেলে। মা মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে ঘুরতে বেরোন। কিন্তু মায়ের সঙ্গে হাঁটতে কি ভালো লাগে।  একদিন বলটা নিয়ে বেরিয়েছিল। খানিকক্ষণ খেলার পর বলটা খাদের ধার দিয়ে পড়ে যায়। রিঙ্কাদের কলোনিটা পেরোলেই গভীর খাদ। তারপর থেকে রিঙ্কার মা আর বল নিয়ে বেরোতে দেন না। রিঙ্কা একা একা বারান্দায় বসে থাকে। 

একদিন বিকেলবেলা এরকম বারান্দায় বসে আছে রিঙ্কা। দেখে নিচ দিয়ে এক দিদা হেঁটে যাচ্ছেন। রিঙ্কাকে দেখেই তিনি এক গাল হেসে বললেন
-- কি নাম তোমার?
-- প্রিয়াঙ্কা সেন।
-- ডাক নাম কি?
-- রিঙ্কা।
-- তুমি এরকম একা একা বারান্দায় বসে আছো কেন?
--  আমার কোন বন্ধু নেই।
-- সেকি? কেউ নেই?
-- নাহ, কেউ নেই।
-- তাহলে তো আমাকেই তোমার সাথে খেলতে হয়।

এরকম সময় মা পাশ থেকে এসে গেলেন।

-- কার সাথে কথা বলছিস রিঙ্কা?
-- নমস্কার, আমার নাম পারমিতা রায়। আমি এখানকার স্কুলে আগে পড়াতাম। এখন অবসর নিয়েছি।
-- বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? আসুন না।

সেদিনকেই পারমিতা দিদার সঙ্গে আলাপ জমে গেল রিঙ্কার। ওনাকে মিতাদিদা বলে ডাকতে বললেন। কত গল্প জানেন মিতাদিদা। ব্যাঙ রাজপুত্রের গল্প, রাক্ষসের গল্প, ডাইনি বাবা-ইয়াগার গল্প, শুনতে শুনতে মন ভালো লাগছিল রিঙ্কার। মা এত গল্প জানেননা। মিতা দিদা যাওয়ার সময় ওনার বাড়ি যেতে বললেন। একাই থাকেন। রিঙ্কারা গেলে ওনার ভালোই লাগবে।

পরের রবিবার তিনজনে মিলে মিতাদিদার বাড়ি যাওয়া হল। ওদের কলোনি পেড়িয়ে, পাশের গ্রামের মধ্যে মিতাদিদার বাড়ি। বাবার স্কুটারে যেতে পাঁচ মিনিটও লাগল না। কিন্তু গিয়ে রিঙ্কার প্রথমে মন খারাপ হয়ে গেল। বড়রা তিনজন গল্প করতে লাগলেন। রিঙ্কাকে কেউ পাত্তাই দিলনা। সেটা বুঝতে পেরে মিতাদিদা বললেন

-- রিঙ্কা মুখ গোমড়া কেন? খেলার সাথি পাচ্ছনা? চল ভেতরে অনেক পুতুল আছে। তোমাকে দেখাচ্ছি।

মিতাদিদা রিঙ্কাকে ভিতরের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরে একটা পুরোন দিনের খাট, একটা আলমারি, আর একটা দেওয়াল আলমারি। সেই দেওয়াল আলমারিতে এক গাদা পুতুল দেখা গেল।

-- তুমি এগুলো নিয়ে খেল, আমরা গল্প করছি।

মিতাদিদা চলে গেলে রিঙ্কা খেলতে শুরু করল। পুতুলগুলো কি সুন্দর। কোনটা হাতি, কোনটা বাঁদর। তবে সবচেয়ে সুন্দর পুতুল হচ্ছে একটা বড় মেয়ে পুতুল। কোঁকড়া সোনালি চুল, পরনে হালকা নীল রঙের ফ্রক। হাতে বালা। পুতুলটার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে এক মিনিট অন্তর অন্তর চোখ পিট পিট করে। রিঙ্কা তাকে মেয়ে বানিয়ে খেলতে শুরু করল।

খেলতে খেলতে রিঙ্কার মনে হল কেউ যেন তাকে দেখছে। একটু ভয় পেল রিঙ্কা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। না, কেউ তো নেই। জানালার পরদা উড়ছে। বাইরে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। ঐ তো দূরে ধূলিয়া  নদী দেখা যাচ্ছে। নদী দেখেই রিঙ্কার মাথায় এল, আরে তার মেয়ের তো জল খাওয়া দরকার। তার মা তাকে প্রতি ঘণ্টায় জল খাওয়ায়। মেয়েকে সে খাওয়াবে। পাশেই বাথরুম ছিল। পুতুলগুলোর সঙ্গে যে রান্নাবাটির সরঞ্জাম ছিল, তার থেকে গ্লাস এনে তাতে জল ভরে মেয়েকে খাওয়াতে গেল রিঙ্কা। জল পুতুলের মুখ থেকে জামায় গিয়ে পড়ল।

-- এভাবে তো ও জল খাবে না রিঙ্কা।

মিতাদিদা কখন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন রিঙ্কা খেয়াল করেনি। চমকে উঠল সে।

-- আজ চল, তোমার মা বাবা অপেক্ষা করছেন। তোমাকে আর একদিন দেখাব ও কীভাবে গ্লাস থেকে খায়।

এরপর অনেকবারই রিঙ্কার মিতাদিদার বাড়ি যাতায়াত চলতে লাগল।  একদিন মা কোলে আন্টিদের বাড়ি পার্টিতে যাবে। রিঙ্কা একা বাড়ি থাকতে পারবেনা। তাই মা ঠিক করলেন ওকে মিতাদিদার বাড়ি রেখে আসবেন।

-- আপনার অসুবিধা হবে না তো?
-- একদম না। রিঙ্কা থাকলে আমার খুব ভালো লাগে। আপনার হয়ে গেলে এসে ওকে নিয়ে যাবেন।
-- রিঙ্কা বিস্কুট খাবে?

বিস্কুট খেয়ে মিতাদিদার কাছে দৈত্যের গল্প শুনে রিঙ্কা পুতুলঘরে খেলতে গেল। আজ মিতাদিদাও খেলতে এলেন। বেশ খানিকক্ষণ খেলার পর মিতাদিদার কাছে রিঙ্কা বায়না ধরল তার মেয়েকে জল খাওয়ানোর।

-- তোমার মেয়ের যেন কি নাম দিয়েছ?
-- আমার নাম রিঙ্কা, তাই ওর নাম পিঙ্কা।
-- বাহ ভালো নাম। কিন্তু ঐ নামে ডাকলে তো ও খাবে না। ওকে ডাকতে হবে সোনাই বলে।
-- আচ্ছা, সোনাই জল খা।
-- দাঁড়াও দাঁড়াও ঐ ভাবে বললে ও খাবেনা।
-- তাহলে?
-- ও তো জল খায়না।
-- তাহলে কি খায়?
-- ও একটা লাল শরবত খায়।
-- লাল শরবত?
-- হ্যাঁ।
-- কই দাও। আমি খাওয়াবো।
-- দিতে পারি। কিন্তু তোমার ভীষণ লাগবে।
-- লাগুক। আমি মেয়েকে শরবত খাওয়াবো।
-- তোমার যতই লাগুক তুমি চেঁচাবে না তো? তুমি চেঁচালে কিন্তু ও খাবে না।
-- না চেঁচাব না।
-- আর কাউকে বলতে পারবেনা ওকে তুমি খাইয়েছ? তোমার মা বাবাকেও না।
-- না বলব না।
-- বললে কিন্তু ও সারাজীবনের জন্য চলে যাবে, আর কোনদিন আসবেনা।
-- না দিদা, আমি বলব না।
-- দাঁড়াও, আমি আসছি।

এই বলে দিদা ভিতরে গেলেন । রিঙ্কা একা একা মেয়েকে ডাকল

-- এই সোনাই।

বলা মাত্র দেখল সোনাইয়ের চোখের পাতা পড়ল আবার। এবার দিদা ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা লম্বা গ্লাস, সঙ্গে একটা স্ট্র। আর সঙ্গে একটা ছোট বাক্স। বাক্স খুলে যে জিনিসটা বার করলেন দিদা সেটা রিঙ্কা চেনে; ওর নাম ইনজেকশন। কলকাতায় ডাক্তারকাকু প্রায় দিতেন এটা। খুব লাগে রিঙ্কার।

-- না...
রিঙ্কা কেঁদে উঠল।
-- ঠিক আছে তাহলে  সোনাই আজ খাবে না।
দিদা আবার বাক্স বন্ধ করলেন।
-- না না, সোনাই খাক। কিন্তু আমার ওতে ভয় করে।
-- ভয় করলে তো সোনাইকে খেতে দেখতে পারবেনা।

এবার রাজী হল রিঙ্কা। আস্তে আস্তে রিঙ্কার হাতে ইনজেকশন দিয়ে রক্ত নিলেন দিদা। ইনজেকশনের ভিতরটা লালচে কালো হয়ে গেল। সেটা এবার ঐ বড় গ্লাসে ঢেলে দিলেন। স্ট্রটা দিয়ে এবার গ্লাসটা রিঙ্কার হাতে দিলেন

-- তোমার মেয়েকে খাওয়াবে না রিঙ্কা?

সোনাইয়ের মুখের সামনে স্ট্রটা ধরতেই গেলাস খালি হতে লাগল। রিঙ্কা হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। প্রায় দু মিনিট সময় নিল সোনাই গ্লাসটা খালি করতে। এই দু মিনিটে একবারো কিন্তু সোনাই-এর চোখের পাতা পড়ল না। 

Wednesday, March 25, 2020

পিতৃ দায়িত্ব

"নতুন এলেন পাড়ায়?"
"হ্যাঁ এই তো কালকে।"
"নমস্কার, আমি সুবিমল সান্যাল।"
"আমি মলয় সেনগুপ্ত। এটি আমার মেয়ে রত্না।"
"নমস্কার কাকু।" -- মিষ্টি গলায় বলল রত্না।
"নমস্কার। কোথায় উঠেছেন?"
"আমরা লাহাবাবুর বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি।"
"ওহ, কোথা থেকে আসছেন?"
"কলকাতা।"
"তা ভালো, এখানে কোন কাজে?"
"নাহ সেরকম কিছু না। আসলে আমি বছর দুয়েক হল রিটায়ার করেছি। এখন আমি আর মেয়ে মিলে এই গাড়িটা করে ঘুরে বেড়াই। এই দেশের বিভিন্ন শহরে শহরে কয়েক মাস করে থাকি।"
"অবাক ব্যাপার মশাই। আপনি কোথায় চাকরি করতেন?"
"আমি রেলের ডাক্তার ছিলাম।"
"আরিব্বাস। ভালোই হল আমাদের বাড়ির কাছে একটা ডাক্তার পাওয়া গেল। গাড়িটা খাসা। কবেকার?"
"এটা যুদ্ধের পর পরই কেনা। অস্টিন।"
"বাহ বাহ বেশ। তো আপনার মেয়ে কি করে?"
"ও আমার সঙ্গেই থাকে, আমার দেখাশোনা করে।"
"সেকি? আপনার মেয়ের তো বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে মশাই। বিয়ে দিচ্ছেন না কেন?"
সুবিমলবাবু কথাটা বলেই লক্ষ্য করলেন রত্নার মুখটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। মলয়বাবু খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন
"ঐ আর কি?"

সুবিমলবাবু ধুরন্ধর লোক। বুঝে গেছেন এই নিয়ে কথা বলা পিতা পুত্রী কেউই পছন্দ করবেন না। তাই আর প্রশ্ন না করে বললেন

"চলি আজ। একদিন আসবেন দু'জনে আমাদের বাড়ি। আমার স্ত্রী খুশী হবে।"
"নিশ্চয়।"

সুবিমলবাবু লক্ষ্য করলেন যে মলয়বাবু কিন্তু তাঁকে নেমতন্ন করলেন না।

মলয়বাবুরা থাকতে শুরু করলেন পাড়ায়। খুব একটা কারুর সঙ্গে মিশতেন না। সুবিমলবাবুর বাড়ি আর যাননি তাঁরা। তাঁদের বাড়িও কেউ আসত না। কাজের লোক বীণা সকালে কাজ করে চলে যেত। মলয়বাবুর সঙ্গে সবার দেখা হত সকালবেলা বাজার করার সময়। নিজের গাড়ি নিজেই পরিষ্কার করতেন মলয়বাবু। কিন্তু যেটা সবচেয়ে অদ্ভুত হল রোজ সন্ধ্যেবেলা খানিকক্ষণের জন্য ওনাদের বাড়ি থেকে কান্না শোনা যেত। রত্না কোনদিন ফুঁপিয়ে কাঁদত, কোনদিন চেঁচিয়ে। লাহাবাবু একবার পরেরদিন জানতে চেয়েছিলেন

"কাল রত্না কাঁদছিল, ওর কি কিছু হয়েছে?"

মলয়বাবু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন --
"না না, ওর আসলে মাঝে মাঝে পেটে ব্যাথা হয়। এটা একটা অদ্ভুত রোগ জানেন। এর কোন প্রতিকার নেই। হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে যায়। তখন ও কাঁদে।"

আসল ঘটনা কিন্তু অন্য। ঐ সময় কেউ সেনগুপ্ত বাড়ি গেলে দেখতে পারত রত্নার কান্নার কারণ কোন শারীরিক যন্ত্রণা না। রত্না  কাঁদতে কাঁদতে বলত --

"বাবা ওরা আমাকে এখানে মেরেছে, এখানে ব্যাথা দিয়েছে দেখো।" -- এই বলে নিজের শাড়ি টেনে তুলত।

আজকাল আর চোখ বন্ধ করেননা মলয়বাবু। বরং সে জায়গায় হাত বুলিয়ে বলেন

"না মা, কাঁদিস না। আমরা ওদের শাস্তি দেব।"
"কবে বাবা, পুলিশ তো ওদের ছেড়ে দিল।"
"দেব মা, ওদের দেব। তুই ওদের মারবি তো?"
"হ্যাঁ বাবা," -- এবার হাসি ফুটত রত্নার মুখে।
"কীভাবে মারবি বল?"
"ঐ বড় লাঠিটা দিয়ে মারব। মাথায় মারব। চোখে মারব। রক্ত বেরোবে বাবা?"
"অনেক অনেক রক্ত বেরোবে। তুই খুশী হবি তো?"
"হ্যাঁ বাবা। হব। কবে মারব বাবা?"
"হ্যাঁ এবার মারব আমরা একদিন।"

একদিন রত্না বারান্দা থেকে একটা ছেলেকে দেখাল। মলয়বাবু দেখে নিশ্বাস ফেললেন। একে তিনি চেনেন। পাশের পাড়ায় একটা ওষুধের দোকান আছে। নাম তমাল। দু'দিন বাদে ছেলেটিকে বাড়িতে নেমতন্ন করলেন তিনি। তার আগেরদিন বীণাকে মাইনে দিয়ে ছাড়িয়ে দিয়েছেন।

তমালের কিছুদিন ধরেই রত্নাকে ভালো লাগে। কোনদিন কথা বলেনি, তবে বলতে কতক্ষণ। আজ রত্নার বাবা তাকে নেমতন্ন করতে বেশ অবাক লেগেছিল তার।

বাড়ি ঢুকে তমাল দেখল বাড়ির বেশিরভাগ জানালা বন্ধ। বাড়িতে আসবাব পত্র বিশেষ নেই। সে বোধহয় এই পাড়ায় প্রথম যে এ বাড়িতে এল।

"বস তমাল, আছো কেমন?"

আড্ডা চলতে লাগল। তমালের অবাক লাগল সে রত্নাকে দেখতে পেল না। একটু বাদেই রত্না এল চা নিয়ে। চা খাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই গভীর ঘুমে ঢলে পরল তমাল। এবার মলয়বাবু ব্যাগ থেকে একটা ইনজেকশন বার করে তমালের হাতে দিলেন। মিনিট দুয়েক পর তমালের নাকের তলায় হাত রেখে বুঝলেন তমাল আর ইহলোকে নেই। তখন রত্নাকে ডাকলেন।

"মারবি? কীভাবে মারবি বল?"
"ঐ বড় লাঠিটা দিয়ে মারব। মাথায় মারব। চোখে মারব। রক্ত বেরোবে বাবা?"
"অনেক অনেক রক্ত বেরোবে। তুই খুশী হবি তো?"

রত্না প্রায় আধঘণ্টা ধরে তমালের মৃতদেহটাকে মারল। জায়গা জায়গা থেকে রক্ত বেরোল। পুরো মেঝে ভিজে গেল।

"রক্ত, বাবা রক্ত"
"হ্যাঁ মা, আস্তে কথা বল। কেউ শুনতে পারলে?"
"হে হে, আরো মারব বাবা?"
"মার মার"

এবার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে একটা সিগারেট ধরালেন মলয়বাবু। যেভাবে ছোটবেলায় মেয়ের পুতুলখেলা দেখতেন, আজ সেইভাবেই মেয়ের রক্তখেলা দেখছেন।

"বাবা একটু জল দেবে? হাঁফিয়ে উঠেছি।"
"ছেড়ে দে নাকি?"
"না বাবা, আর একটু ... "
"আচ্ছা"

আরো ঘণ্টা দুয়েক বাদে বাপ মেয়ে মিলে সব ব্যাগপত্র নিয়ে গাড়ির পেছনে তুললেন। এই শহরে রাত দশটা বাজলেই সব আলো নিভে যায়। শুধু জ্বলতে লাগল সেই যুদ্ধের পরের কেনা অস্টিনের আলো। মলয়বাবু মনে মনে ভাবছেন --
"দিনাজপুরের একটা শহরের দিকে গেলে হয়। এবার আমার নাম দেব ভাস্কর। আর ওর গৌরী।"

Friday, March 20, 2020

সব জ্যোতিষী ভণ্ড হয়না

ক্লাস সেভেন-এ পড়ে সুজয়। সুজয় তালুকদার। বাড়ি বেগমপুরে । বাবা সরকারি ব্যঙ্কে কর্মরত। মা গৃহবধূ। সুজয় স্কুলে ফার্স্ট হয়না বটে, তবে তেমন খারাপ কিছুও করেনা। মোটামুটি ক্লাসে প্রথম দশেই থাকে। খেলাধুলোতে মোটামুটি। মানে ১০০ মিটার দৌড়ে হিটে ওঠে, তবে মেডেল পায়না। ক্লাসের ফুটবল টিমে বেঞ্চে থাকে। অন্য সব বাড়ির বাবা-মায়ের মত সুজয়ের বাবা মা কিন্তু তেমন চাপ দেন না ছেলের উপর। শুধু অঙ্কে কম পেলে বাবা একটু রাগারাগি করেন। মোটকথা সুজয়ের জীবন ঝঞ্ঝাট শূন্য।

তবে সুজয়ের একটাই সমস্যা। বড্ড পেটের রোগে ভোগে। এই নিয়ে তার মা খুব চিন্তায় থাকেন। এই কয়েকদিন আগে পাড়ার রানিদির বিয়েতে খেয়ে সুজয় পরেরদিন স্কুল যেতে পারেনি। অথচ এমন কিছু বাড়াবাড়ি খায়নি সুজয়। কত ডাক্তার দেখিয়েছেন, কিছুই হয়নি। এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, এমনকি কয়েকদিন আগে এক কবিরাজের ওষুধও খাওয়ালেন, কোন লাভ হলনা।

গত মাসে পাড়ায় এক  নতুন ভদ্রলোক এসেছেন। নাম বলরাম মহাপাত্র। দুটো বাড়ি পরে অরূপদাদের বাড়িতে ভাড়া এসেছেন। একাই থাকেন। খুব একটা কারুর সঙ্গে মেশেন না। শুধু মৃণাল জেঠুর সঙ্গে যা আলাপ। মৃণাল জেঠু কলকাতার কোন এক কলেজে ফিজিক্স পড়াতেন। দু'বছর হল অবসর নিয়েছেন। বিপত্নীক। ওনার এক মেয়ে, দিল্লীতে থাকে। সুজয় শুনেছে বলরামবাবু নাকি প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা মৃণাল জেঠুর বাড়ি আড্ডা মারতে যান।

ঘটনাটা ঘটল গত শনিবার। সেদিন সন্ধ্যাবেলা ওয়ার্ল্ড কাপে আর্জেন্টিনা হল্যান্ডের খেলা ছিল। স্কোর ১-১, এই সময় সুজয়দের পাড়ায় লোডশেডিং। এরকম অবস্থা আগেও হয়েছে। হলেই সুজয়, রন্টু, সোমনাথ, এরা ছোটে মৃণাল জেঠুর বাড়ি। ওনার জেনেরেটার কানেকশন আছে। এবার গিয়ে দেখলেন ঘরে বলরামবাবু বসে আছেন। এক গাল চাপ দাড়ির মধ্যে দিয়ে ওদের দেখে উনি হাসলেন। মাথার পাকা চুল দেখে ওনার বয়স আন্দাজ করা শক্ত। টি ভি  চালিয়ে দিলেন জেঠু।  সোমনাথ আর রন্টু ঝগড়া শুরু করল 

-- বাতিস্তুতা আছে, আজ আর্জেন্টিনা জিতবে।
-- ক্লুইভার্ট আর একটা দেবে।

-- বার্গক্যাম্পকে দেখছি না?
এবার বলরামবাবুর গলা শুনল সুজয়রা।
-- ঐ তো দেখুন, ৮ নম্বর জার্সি।
-- হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছি। ওর দিকে নজর রেখ।

খেলার অন্তিম লগ্নে এক অসামান্য গোলে হল্যান্ডকে জেতাল ডেনিস বার্গক্যাম্প। গোলটা হতেই সবাই চমকে তাকাল বলরামবাবুর দিকে।
-- আপনি কি করে জানলেন?
-- না না, আন্দাজ আর কি।

কথা চাউর হতে  বেশিদিন  লাগলনা। পাড়ায় অনেকেই বলরামবাবুকে জ্যোতিষী ভাবতে লাগলেন। সবার আগে সুজয়কে নিয়ে এলেন ওর মা।

-- আপনি একবার ওর হাতটা দেখে দিন, দেখুন না করবেন না। কবে ওর এই পেটের সমস্যা মিটবে?
-- না না, আমি জ্যোতিষী নই। এরকম করবেন না।

সুজয়ের মা তবু নাছোড়বান্দা, বার বার ছেলেকে নিয়ে আসতে লাগলেন। একদিন হাল ছেড়ে দিলেন  বলরামবাবু।

-- দাঁড়ান দেখি, তবে হাত লাগবে না।

এই বলে সুজয়ের চোখের দিকে দেখলেন। দেখে কিছুক্ষণ খাতায় কিসব লিখে বললেন

-- দেখুন আপনার ছেলের তেমন কোন সমস্যা নেই। শুধু ওর ভাত হজম হয়না। আপনি ভাবেন ভাত খেলে ওর পেট ঠিক থাকবে, তা নয়। ওকে রুটি দিন দু'বেলা।
-- কিন্তু রুটি হজম করা তো আরো শক্ত।
-- সবার জন্য না। যেটা বললাম করুন, দেখুন কি হয়।

এক সপ্তাহ বাদে আবার এলেন সুজয়ের মা। এবার সুজয় না। সঙ্গে ওর বাবা।  এসেই প্রণাম করলেন বলরামবাবুকে।

-- আপনি সাক্ষাত ভগবান। আমার ছেলেটা একদম সুস্থ এখন। আপনার ফিজ কত বলুন।
-- না না, একদম না। একই, প্রণাম করছেন কেন? ছি ছি!! আমি এসব শখে করি। কোন ফিজ না।
-- আমার আর একটা প্রশ্ন আছে। আমার ছেলেটা খুবই সাধারণ। ও বড় হয়ে চাকরি পাবে তো?
-- কেন পাবে না!! আপনার ছেলে খুবই ভালো। চিন্তা করবেন না, ও খুব ভালো করবে পড়াশুনায়। শুধু ওকে জোর করে কিছু করাবেন না। ও যা করতে চায়, তাই করতে দিন।
-- আমাদের শখ ও ইঞ্জিনিয়ার হোক। এখন শুনছি ঐ লাইনে পড়লেই চাকরি।
-- ও ভুলটা করবেন না। ওর যেটা ইচ্ছে সেটা পড়তে দেবেন।
-- আচ্ছা। আপনি যা বলবেন সেরকমই হবে।
-- একটা কথা, প্লিজ কাউকে বলবেন না আমি আপনাকে সাহায্য করেছিলাম।
-- না না, আপনি ভাববেন না। আমি কথা দিলাম।

কথা দেওয়ার ফল হল পরের এক সপ্তাহের মধ্যে রোজ  সন্ধ্যেবেলা বলরামবাবুর বাড়ির সামনে লোকের ভিড়। টুকটুকিদির বিয়ে কবে হবে, তপনদা চাকরি কবে পাবে, এমনকি সামনের ইলেকসানে দত্তবাবু জিতবেন কিনা, সব জানতে ভিড় চলল। কিছু কিছু ভুল হলেও বলরামবাবু যা বলতেন বেশিরভাগই ফলত।

এইভাবে এক বছর প্রায় চলার পর একদিন বিকেলে যখন সুজয় স্কুল থেকে ফিরছে, বলরামবাবু বারান্দা থেকে ডাকলেন

-- সুজয় শোন।

সুজয় ব্যাগ নিয়ে ওনার বাড়ি ঢুকল।
-- কেমন আছেন কাকু?
-- ভালো। তুমি ভালো?
-- হ্যাঁ।
-- শোন তোমাকে যে কারণে ডাকলাম। আমি কাল এই পাড়া ছেড়ে চলে যাব।
-- সেকি? কেন?
-- সেটা বলার জন্যই তোমাকে ডাকলাম। বস। তুমি মাল্টিভার্স কাকে বলে জানো?
-- না।
-- আমাদের পৃথিবীতে অগুনতি সমান্তরাল জগত আছে। সেই সব জগতেই  তুমি আছো, তোমার মা আছেন, তোমার বাবা আছেন, শুধু জগতগুলো আলাদা। কিছু জগতে  তুমি হয়ত নামকরা ফুটবলার। কিছু জগতে তুমি হয়ত জেলের কয়েদী। এই জগতগুলি বিভিন্ন সময়ে চলে। এখানে এখন ১৯৯৯, অথচ কিছু জগতে এখন ২০০১, কোথাও এখন ২০২০।
-- এ তো প্রোফেসর শঙ্কুর গল্প লাগছে!!
-- হ্যাঁ, শুধু এটা সত্যি। আমি সেরকম এক জগত থেকে এসেছি। আমি এসেছি ২০২০ থেকে। ২০২০ তে পৃথিবীতে করোনাভাইরাস নামক এক ভাইরাস এসে মারাত্মক কোলাহল সৃষ্টি করে। আমি তখন সুইটজারল্যান্ডে সার্নে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করি। আমি এই দরজাটা বানাতে সক্ষম হই যা দিয়ে এক জগত থেকে আর এক জগতে যাতায়াত করা যাবে। সুইটজারল্যান্ডের অবস্থা ভয়ানক খারাপ হওয়ায় আমি পালিয়ে আসি। তবে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখতাম কি হয়েছে। এখন পুরোপুরি সুস্থ ওখানে সবাই। তাই কাল ফিরে যাব।
-- সেকি!! তাহলে আপনি আমাদের সকলের ব্যাপারে ঠিক বলতেন কি করে? ভবিষ্যৎ দেখে?
-- হ্যাঁ, কারণ আমি তোমাদের সবাইকেই চিনতাম। কাজেই তোমাদের ১৯৯৮-এ কি হবে সেটা আমি আগে জেনে গেছি। টুকটুকিদির বিয়ে, দুত্তবাবুর ভোট সবই আমি জানতাম। আমি তো সেই সময়টা তোমাদের মধ্যে কাটিয়েছি। যেমন মৃণাল জেঠু পরের বছর চলে যাবেন সবাইকে ছেড়ে। সেই কারণেই আমি গত এক বছর ওনার সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। উনি একমাত্র জানতেন আমার পরিচয়। আমাকে মারাত্মক স্নেহ করেন বলে কাউকে বলেননি আমার কথা।
-- মানে, জেঠু মারা যাবেন?
-- হ্যাঁ সুজয়, জানি কষ্ট হচ্ছে শুনতে, আমারো হয়েছিল ওনার মৃত্যুসংবাদ শুনে। কিন্তু এটা সত্যি।
-- এক মিনিট, আপনি যখন আমাদের সম্বন্ধে সব জানেন, তখন আপনি নিশ্চয় আমাদের মধ্যে কেউ। কে আপনি?

এবার নিজের পরচুলা আর দাড়ি খুলে ফেলল বলরামবাবু। সুজয়ের ওনার মুখটা মারাত্মক চেনা চেনা লাগল। কোথায় যেন দেখেছে। ও হ্যাঁ, তাই তো। সেকি!! বলরামবাবু এক গাল হেসে বললেন

-- আমার নাম সুজয় তালুকদার।

Sunday, March 1, 2020

অনন্ত স্যার

অনন্ত স্যারকে আমি প্রথম দেখি এক বুধবার। সেদিন দুপুরে টিফিন টাইমে আমরা বলটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে পাসিং করছিলাম। দেখতে পেলাম সাদা গোলাপি স্ট্রাইপ জামা পরে এক ভদ্রলোক স্কুলের গেট খুলে ঢুকলেন। ঘণ্টা কয়েক বাদে আমাদের যখন ইতিহাসের ক্লাস চলছিল, হেডস্যার মলয়বাবু ওনাকে নিয়ে ক্লাসে এলেন।

-- তোমাদের অঙ্কের স্যার রতনবাবু এক মাস থাকবেন না। তার বদলে ইনি তোমাদের অঙ্ক করাবেন। এনার নাম অনন্ত সরকার।

অনন্ত স্যার আমাদের স্কুলের বাকি স্যারদের মত অত বয়স্ক নন। বেশ কম বয়সী। প্রথমদিন ক্লাসে এসে অঙ্কের ফাঁকে গল্প করতে শুরু করলেন। একটু বাদেই চলে এল ফুটবল। অতঃপর শুরু হল ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান নিয়ে বাদানুবাদ। স্যার তাড়াতাড়ি সেটা থামালেন।
-- স্যার আপনি কার সাপোর্টার?
সেই উত্তর না দিয়ে স্যার চোখ টিপলেন।

বিকেলবেলা স্কুলের শেষে আমরা মসজিদের পাশের মাঠে বল নিয়ে নেমে পড়লাম। খেলে অনেকেই, কিন্তু আমরা চারজন, অর্থাৎ আমি, কুন্তল, রবি আর সরোজ রোজ খেলি। সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের চারজনের বন্ধুত্ব অনেকদিনের। কীভাবে এটা শুরু হয়েছিল, সে গল্প পরে বলব। কিন্তু আমাদের এই বিকেলের খেলাটা বহুদিন ধরে চলছে। বাকি লোকজন যাতায়াত করে, কিন্তু আমরা প্রায় রোজ খেলি। প্রায় রোজ।

সেদিন অনন্ত স্যারও আমাদের সাথে যোগ দিলেন। ভদ্রলোক বেশ ভালোই খেলেন। এমনি ব্যাকে খেলেন, আর দৌড়াতেও পারেন প্রচণ্ড। খেলার পর আমরা চারজন মাঠে বসে আড্ডা দি। অনন্ত স্যারও যোগ দিলেন। এমনি আড্ডা হল। স্যারের বাড়ি পলাশগ্রামে। এখানে একটা মেসবাড়িতে থাকেন। স্যারের বাবা নেই, মা আছেন। স্যারের দাদা কলকাতায় চাকরি করেন। স্যার কলকাতা গেছেন শুনে আমাদের হিংসা হল। কবে যে যেতে পারব?

এরকম ভাবে কয়েকদিন চলার পর স্যার একদিন আড্ডায় বসে বললেন
-- শোন, তোদের একটা কথা বলি; কিন্তু সেটা যেন শুধু আমাদের মধ্যে থাকে।
-- নিশ্চয়।
-- আমি আসলে শিক্ষক নই, আমি পুলিশে কাজ করি।
-- পুলিশ?
-- হ্যাঁ, এই শহরে গত কয়েক মাসে একটা করে খুন হচ্ছে জানিস কি তোরা?
-- না তো।
-- না জানার কথা। কারণ ঘটনাটা এত ভয়াবহ যে আমরা কাউকে বলিনি।
-- কি হয়েছে স্যার?
-- হয়েছে কি, গত কয়েক মাস কিছু লোক অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কোন একটা নির্দিস্ট বয়সের না কিন্তু। এই যেমন ধর প্রাইমারী স্কুলের ছেলেও গায়েব হয়েছে, আবার অবসর নেওয়া বৃদ্ধও হয়েছে। থানায় এরকম নিরুদ্দেশদের নিয়ে ডায়রি থাকেই। কিন্তু দু সপ্তাহ আগে শহরের বাইরে যে জঙ্গলটা আছে, সেখানে আমরা কিছু কঙ্কাল পাই। টেস্ট করে দেখা গেছে ঐ কঙ্কালগুলি যারা নিরুদ্দেশ হয়েছে তাদের কঙ্কাল।
--  সেকি?
-- হ্যাঁ। আমি এই কেসটা দেখছি। তাই এই স্কুলে আসা।
-- কিন্তু তার সঙ্গে আপনার স্কুলে পড়ানোর কি সম্পর্ক?
-- বলছি। আমরা ঐ কঙ্কালগুলোর কাছে একটা এই স্কুলের ব্যাজ পেয়েছি। আমরা স্কুলের কোন শিক্ষককে সন্দেহ করছি। তাঁর পকেট থেকে এটা পড়েছে। এখন আমাদের দেখতে হবে কে?
রবি আমার দিকে আতঙ্কের চোখে তাকাল।
-- আমাদের স্কুলে?
-- হ্যাঁ।
-- আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?
-- হ্যাঁ, গত কয়েকদিনে আমি লক্ষ্য করছি কোন কোন শিক্ষক ব্যাজ ব্যবহার করেন। এনাদের মধ্যে কার কার ব্যাজ হারিয়েছে। যা বুঝছি সমীরবাবু আর অরবিন্দবাবু, এদের দুজনের অতি সম্প্রতি ব্যাজ হারিয়েছে।
-- কিন্তু স্যার, একটা কথা বলুন। এনারা ঐ নিরুদ্দেশ হওয়া ব্যাক্তিদের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে মারবে কেন?
-- তার চেয়েও বড় প্রশ্ন কি জানিস? ঐ ব্যাক্তিদের গায়ে এক ফোটা মাংস নেই।
-- সেকি? শেয়ালে খেয়েছে?
-- হতে পারে। আমরা বুঝছি না। যাই হোক, তোদের যে এসব বললাম, কাউকে বলিস না। এই কেসে তোদের সাহায্য লাগতে পারে।
-- নিশ্চয় স্যার। আপনি ফেলুদা,  আর আমরা সবাই তোপসে।


কয়েকদিন বাদে স্যার আবার বসলেন আমাদের সাথে।
-- কাল আবার একটা খুন হয়েছে।
-- কে?
-- রেলধারের বস্তির ছোটন।
-- কঙ্কাল পাওয়া গেছে?
-- হ্যাঁ, এবার চন্ডীতলার ছোট জঙ্গলে। সবচেয়ে আশ্চর্যের কি জানিস? এক দিনের মধ্যেই পাওয়া গেছে কঙ্কাল। কিন্তু এবারো কোন মাংস নেই।
-- সেকি?
-- হ্যাঁ, শেয়াল এরকম পরিপাটি করে খাবে না। আমার বস বললেন কেউ হয়ত মানুষের মাংস চুরি করছে। কিন্তু আমার তা মনে হয়না। আমার এক আলাদা সন্দেহ হয়।
-- কি স্যার?
-- বিশ্বাস করবি কিনা জানি না। গতকাল পূর্নিমা ছিল।
-- জানি তো স্যার।
-- গল্পে পড়েছি বিলেতে এক ধরণের জন্তু হয়। যারা পুর্নিমার রাতে মানুষ থেকে নেকড়ে হয়ে যায়। আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম প্রতিটা খুন হয়েছে কোন এক পুর্নিমার রাতে। কেউ মাংস চুরি করলে  কেন শুধু পুর্নিমার রাতে করবে বল?
-- মানে আপনি কি বলতে চাইছেন?
-- আমি বলছি যে এই শহরে একটা নেকড়ে-মানব আছে। এবং আমার ধারণা সেটা সমীরবাবু।
-- কেন স্যার?
-- সমীরবাবুকে ক'দিন ধরে স্টাফ রুমে দেখছি। ওনার দাঁত দেখবি, শ্বদন্ত আছে। এছাড়া উনি নাকি রোজ রাত্রে খেয়ে দেয়ে পাড়ায় হাঁটতে বেরোন। মর্নিং ওয়াক শুনেছিস, কোনদিন নাইট ওয়াক শুনেছিস?
-- তবে কি সমীরবাবু নেকড়ে মানব?
-- আমাদের পরের পুর্নিমা অবধি অপেক্ষা করতে হবে।


পরের মাসে  পূর্ণিমার আগের রাতে অনন্ত স্যার আমাদের ধরলেন।
-- শোন, কাল আমি সমীরবাবুর বাড়ির উপর নজর রাখব। তোরা  আসবি?
সরোজ ভয় পেল।

-- স্যার, উনি যদি সত্যি নেকড়ে মানব হন, আমরা কি করব?
-- চিন্তা করিস না, আমার সার্ভিস রিভল্বারটা থাকবে সঙ্গে।
আমরা তবুও কিন্তু কিন্তু করছিলাম। কিন্তু স্যারের তেজ দেখে আমরাও রাজি হলাম। এই প্রথম এরকম একটা কর্মকান্ডের অংশ হব আমরা।


পরেরদিন রাতে আমরা আস্তানা নিলাম সমীরবাবুর বাড়ির ঠিক পাশের গলিতে। আমাদের জেলা শহরে এই রাত্রে কাক পক্ষীটিও দেখা যায় না। চারদিক যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। সবাই মাথায় শাল জড়িয়ে আছি, তাই লোকে আমাদের পাড়ার রিক্সাওয়ালা ভাববে। স্যার আগে। আমরা পিছনে। একটু বাদে সমীরবাবু বাড়ি থেকে বেরোলেন। হেঁটে হেঁটে  সামনের গলি ঘুরে আবার এদিকে ফিরলেন। আমরা অপেক্ষা করছি। আকাশে পুর্নিমার চাঁদ। সমীরবাবু একটু বাদেই বাড়ি ঢুকে পড়লেন। আর বেরচ্ছেন না। আমাদের অপেক্ষা চলছে।

রাত তখন প্রায় বারোটা। পাশের গির্জার ঘড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। আমরা সকলেই খুব ভয়ে ভয়ে আছি। রবি দেখলাম চিন্তায় একবার কেশেও ফেলল। কিন্তু আর আটকাতে পারল না।

অনন্ত স্যার এবার বললেন -- "আমার কি তবে ভুল হল?"
এই বলে স্যার পিছন ফিরে আমাদের দেখে -- "একি তোরা..."

স্যার বন্দুকটা বার করার সময় পেলেন না।


স্যারের কঙ্কালটা  আমরা জংগলে ফেলে এসে কুন্তলদের আউট হাউসটায় উঠলাম। এভাবে মাসের পর মাস আমরা রাত্রে পড়াশুনো করব বলে এই আউট হাউসটায় রাত কাটাই পুর্নিমার রাতে। কতদিন এভাবে চলবে জানি না। কিন্তু  এ আমাদের হাতে নেই।