Sunday, June 14, 2020

রুকু-সুকু

আজকে বাইরে একটা মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। এই বাংলো বাড়িটার সামনে একটা ছোট বাগান। বাগানের মধ্যে দিয়ে লাল সুড়কির রাস্তা। দু'ধারে ছোট ছোট গাছ করেছেন রুকুর মা সাধনাদেবী। বাগান শেষ হয় একটি বেড়ায়। বেড়ার মাঝে লোহার গেট। রুকুর ঐ গেটের বাইরে যাওয়া মানা। সুকুর সাথে খেলতে গিয়ে বলটা বাইরে চলে গেলেও রুকু বাইরে যেতে পারেনা। বাড়িতে মাকে গিয়ে বললে মা এনে দেন। আসলে বাইরে বড় রাস্তা। মাঝে মাঝেই সেখান দিয়ে বড় লরি যায়।

সুকু হল রুকুর পোষা ল্যাব্রাডর। রোজ বিকেলে শুকুর সাথে এখানে খেলতে আসে রুকু। এ অঞ্চলে ওর আর কোন বন্ধু নেই। ওদের এই বাংলো বাড়িটা খুব সুন্দর। ওপরে আবার একটা চিমনি আছে। ওটা যদিও মিছিমিছি। মানে কাজ হয়না ওতে। বাংলো বাড়ি থেকে একটু দূরেই ট্রেন লাইন। এই অঞ্চলে খুব বেশী ট্রেন আসেনা। তবে রাত্রে মাঝে মাঝে ট্রেন এলে এই বাড়ি থেকেই আওয়াজ শোনা যায়। এই পাহাড়ি অঞ্চলে লোকজন বেশী নেই। তাই রাতের দিকে ট্রেনের আওয়াজ বড় স্পষ্ট। মনে পড়ে বছর দুয়েক আগে এই ট্রেনের আওয়াজে মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙ্গে যেত রুকুর।

বলা হয়নি, ঐ বেড়ার পাশেই একটা বড় গাছ আছে। কি গাছ সেটা অবশ্য রুকু জানেনা। গরমের দিনে মাঝে মাঝে এর ছায়াতে বসে পড়ে সুকু। তখন ওর গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে গান করে রুকু। রুকুর মা খুব ভালো গান জানেন। উনি রুকুকে গান শেখান। সে কত গান। "ছোট পাখি চন্দনা", "আতা গাছে তোতা পাখি", আরো কত গান। সুকু  খুব আদর খেতে ভালোবাসে। আদর করলেই নিজের লেজ নাড়াতে থাকে।

বাংলো বাড়ির জানালা দিয়ে রুকুর মা সাধনাদেবী ওদের দেখছিলেন। ওনার দৃষ্টি একটু অদ্ভুত। কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে পড়েছেন মনে হবে। এক দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখছেন। যেন মেয়ের উপর থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। একটু বাদেই সূর্য ডুবল। তখন চাঁপা ফুলের গন্ধে, ট্রেনের আওয়াজে, ফড়িং-এর ভনভনানিতে, আকাশের লাল রঙে আর সদ্য ওঠা চাঁদের আলোয় বাংলো বাড়িটিকে এক রূপকথার পরিবেশে রুপান্তিরত করেছিল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। রুকু সুকুকে নিয়ে বাড়ি এল।

বাড়ি ফিরতেই মা বকলেন জামা নোংরা করেছে বলে। "যাও, এক্ষুনি নোংরা জামাটা পাল্টে কাপড় কাচার জায়গায় রেখে এসো। কাল লক্ষ্মী কেচে দেবে।"

রুকু ঘরে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সাধনাদেবী। মেয়েটার কি হয়েছে কে জানে? কতবার স্বামীকে বলেছেন কলকাতা নিয়ে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু তাঁর স্বামী চিত্তবাবু কিছুতেই রাজি হন না। উনি যেন বিশ্বাসই করেন না রুকুর অসুখ আছে। অথচ সাধনাদেবী পরিষ্কার বুঝতে পারেন। আজ থেকে দু'বছর আগে সুকু মারা গেছে। খেলতে খেলতে বল বড় রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। সুকু বেড়া ডিঙ্গিয়ে বল আনতে যায়। একটি লরি এসে চাপা দিয়ে যায় সুকুকে। অথচ রুকু রোজ বলে ও নাকি সুকুর সাথে বিকেলে খেলতে যায়। আর পেরে উঠছেন না সাধনাদেবী। ওনার স্বামী বা শাশুড়ি কারুরই যেন এতে কিছু যায় আসেনা।

আজকেও বাইরের ঘরে গিয়ে দেখলেন মা-ছেলে বসে আছে। তাঁর শাশুড়ি এক মনে উল বুনছেন। আর চিত্তবাবু পেপার পড়ছেন। সাধনাদেবী বললেন -- "রুকু আজকেও জামা নোংরা করে এসেছে। বলছে নাকি সুকুর সাথে খেলতে গিয়ে এই হয়েছে। তুমি কিছু বলবে না?"
"বাচ্চা মেয়ে, আদরের বন্ধুকে ছাড়তে পারছে না। তুমি এতো চিন্তা করোনা। তোমাকে তো বলেছি, বড় হলেই ঠিক হয়ে যাবে।"
"দেখ এভাবে বেশীদিন ফেলে রাখা ভালো না। আর কয়েক মাসের মধ্যে না কমলে কিন্তু যেতেই হবে। তুমি না গেলে আমি একা নিয়ে যাব।"
"আচ্ছা, বেশ। কয়েক মাস দেখতে দাও।"

সাধনাদেবী রান্নাঘরে যেতেই নিজের মায়ের দিকে চাইলেন চিত্তবাবু। ক্লান্ত চোখে হতাশ দৃষ্টি ফেলে বললেন -- "কি করি বলো তো মা? দু' বছর আগে রুকুটাও কুকুরটার সাথেই চলে গেল। অথচ আজকেও ও মেয়েটার জামা পালটায়।" 

Tuesday, June 9, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ৪ঃ প্রথম দিন

যদি কেউ আমাকে বলে একটা টাইম মেশিন দিয়ে আমার জীবনের কোন একদিন ফিরে যেতে, আমি ফিরব ১৪ই আগস্ট ২০০৭। জীবনে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু ঐ দিনটি বোধহয় আমার জীবনের শেষ স্টেবল পয়েন্ট। যেখানে ফিরে গেলে আমি জীবনটাকে নতুন করে লিখতে পারি।

যাই হোক, সেদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুত ঝাঁকুনিতে। যে দাদার বাড়ি উঠেছিলাম গেন্সভিলে, সেই দাদার দু'বছরের ছেলে আমার বিছানায় উঠে পড়ে লাফাচ্ছে। উঠে পড়লাম। স্নান করতে যাওয়ার আগে দাদা দেখিয়ে দিল। এখানে বালতি নেই। শাওয়ারে স্নান করতে হবে। আবার পর্দা টানা আছে। পর্দা ভিতর দিকে টানা। জল যেন বাইরে না পড়ে। এ ছাড়া গায়ে মাখার সাবানের জায়গায় বডি ওয়াশ।

সকালে কর্ন ফ্লেক্স খেয়ে বেরোলাম। দাদা, বউদি, দাদার ছেলে আর আমি। দাদার ছেলেকে প্রথমে ডে কেয়ারে রাখা হবে। ডে কেয়ার জিনিসটা আমি আগে জানতাম না। দেখলাম প্রচুর বাচ্চারা রয়েছে। তাদের সকলের মা বাবারা বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। তাই তারা এখানে রয়েছে। দাদার ছেলেকে রেখে আমি বিশ্ববিদ্যালয় এলাম। এই প্রথম আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম। ইঁট বার করা বেশ কিছু বিল্ডিং। একটা বড় বাড়িতে দাদা গাড়ি রাখলেন। সেখানে দেখলাম শয়ে শয়ে গাড়ি। সেটি নাকি একটি পার্কিং স্ট্রাকচার। অর্থাৎ এখানে সবাই গাড়ি রাখে। অবশ্য সবাই না। ওখানে গাড়ি রাখতে একটা পারমিট লাগে। যেমন ছাত্র ছাত্রীরা ওখানে গাড়ি রাখতে পারেনা। বড় ক্যাম্পাসটা প্রথম দিন পুরো দেখতে পাইনি। চারদিকে বড় বড় গাছ যেগুলি থেকে একরকম অদ্ভুত তন্তর মত জিনিস ঝুলছে। পরে জেনেছিলাম ওগুলিকে স্প্যানিশ মস বলে। ওরকম গাছ নাকি ফ্লোরিডাতে পাওয়া যায়।

প্রথমেই আমার নিজের ডিপার্টমেন্টে গেলাম। সামনেই হলুদ রঙের বড় বড় আলুভাজার মত কিছু মূর্তি। পরে জানতে পেরেছি এই জেলাটির নাম এলাচুয়া, যেটির ইন্ডিয়ান ভাষায় মানে আলুভাজা। ডিপার্টমেন্টে আমাকে একটি চিঠি দিয়ে বলল ইন্টার্নেশনাল সেন্টারে যেতে। গেলাম। পাসপোর্ট, আই টুয়েন্টি, আর অন্যান্য সব কাগজপত্র দেখানোর পর ওরা আমাকে রেজিস্টার করল। তারপর কিছু বই আর একটা টি শার্ট দিয়েছিল। টি শার্টটি আমার খুব পছন্দের ছিল। ওর দু দিকে পৃথিবীর সকল দেশের পতাকা ছিল। এর পর গেলাম গেটর কার্ড বানাতে। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডেন্টিটি কার্ড। সব জায়গাতে এটি চলবে। মানে লাইব্রেরি থেকে বই ধার নিতে গেলে যাদবপুরের মত লাইব্রেরি কার্ড বানাতে হবেনা। এই আই ডি কার্ডেই সব কাজ হবে। ১৫ ডলার দিতে এক ভদ্রমহিলা ছবি তুলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাতে কার্ড দিয়ে দিলেন। তারপর বললেন -- "এই কার্ডটি তুমি এ টি এম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারো।" মানে বুঝলাম না। উনি হেসে বললেন -- "ব্যাঙ্কে যাও। বুঝিয়ে দেবে।"


এবার গেলাম ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলতে। এই প্রথম জীবনে ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলব। ব্যাঙ্কের নাম ওয়াকোভিয়া। পরে তা ওয়েলস ফারগো হয়ে গেছে। ব্যাঙ্কের লোক সব কাজ করে আমার আই ডি কার্ডটা নিয়ে কি একটা করে দিল। তারপর বলল "যতদিন না তোমার আসল কার্ড আসে, এটিকে এ টি এম কার্ড হিসেবে  ব্যবহার করতে পারো।" এবার খেয়াল করলাম আমার আই ডি কার্ডের পিছনে একটা ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ আছে।

দুপুরে আমার গাইডের সঙ্গে লাঞ্চে গেলাম। ওয়েন্ডিজ-এ বার্গার আর ফ্রাইস খেলাম। এই প্রথম জীবনে চৌকো প্যাটির বার্গার দেখলাম। দেশে মঞ্জিনিসে যেটা খেতাম সেটাও গোল হত। সেখানেই শুনলাম পরের সপ্তাহ থেকে নাকি কৃষ্ণ লাঞ্চ শুরু হবে। সেটা কি ভালো বুঝলাম না যদিও। দুপুরের দিকে প্রচণ্ড ঘুম পেল। তবু জেগে থাকলাম কষ্ট করে। এর মধ্যে গাইড একটা ল্যাপটপ দিয়েছেন। বিকেলবেলা দাদা বৌদি এলেন আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। দাদার ছেলেকে তুলে আমরা বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম। বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমলে বাঁচি। দাদারা কিন্তু বাড়ি গেলেন না। আমাকে নিয়ে গেলেন ওয়ালমার্ট বলে একটা দোকানে। কি বিশাল দোকান!! ঐ দেখেই আমার ঘুম গেল কেটে। কি না পাওয়া যায় সেখানে। জামা কাপড় থেকে শুরু করে বাড়ি সাজানোর জিনিস থেকে সাইকেল, ফুটবল, খাবার জিনিস, প্রায় সমস্ত কিছু। পরে জেনেছি দাদা ইচ্ছে করে আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। জানতেন ঐ দেখলে আমি জেগে থাকব। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হল। ফিরেই জলদি ডিনার করে শুয়ে পড়লাম।

সমস্যা হল তার পরের দিন। ঘুম ভাঙল সকাল সাড়ে চারটেয়। দাদারা তখন গভীর ঘুমে। আমেরিকাতে সূর্য ওঠে প্রায় সকাল ছ'টার পড়। অন্ধকারের মধ্যে কি করব বুঝে পেলাম না। ল্যাপটপ খুলে ইউটিউব চালিয়ে "শ্রীমান পৃথ্বিরাজ" দেখতে বসলাম।


Friday, June 5, 2020

'মিট' দ্য পেরেন্টস

-- মেট্রোতে ভিড় ছিল?
-- সবসময় থাকে। এতো আর করোনাভাইরাসের সময় না, যে ফাঁকা থাকবে।
-- তা বটে। এদিকে আয়।
-- আর কতদূর রে? ঘেমে গেলাম তো?
-- দেখুন ম্যাডাম, ঘামের দোষ আমাকে দেবেন না। তাহলে কলকাতায় না থেকে আমাদের দার্জিলিং-এ থাকা উচিত।
-- সবসময় মজা তোর। এই তোর মায়ের আপত্তি ছিল না, ঠিক বলছিস তো?
-- হ্যাঁ রে। মা তোর ছবি দেখে বেশ ইম্প্রেসড। তার উপর আমার কাছে তোর বাকি গুন শুনে তো কথাই নেই।
-- আর তোর বাবা কিছু বলবেন না বল?
-- দেখ বাবার কথা তো তোকে বলেছি। মাথার গণ্ডগোলটা আজকাল ভীষণ বেড়ে গেছে। এই লকডাউনের সময় বাড়ি থেকে থেকে আরো বেড়েছে। আমরা চিন্তায় থাকি রে। বাবা কিছু ভুল ভাল বললে প্লিজ মাইন্ড করিসনা।
-- আরে না না। তুই সঙ্গে থাকিস প্লিজ।
-- আমৃত্যু থাকব।

বাড়ির সবুজ দরজায় টোকা দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দরজা খুললেন সমরের মা। সমরের মোবাইলে ওনার ছবি আগেই দেখেছিল অনন্যা। কাজেই চিনতে অসুবিধা হলনা। পরনে সবুজ রঙের তাঁতের শাড়ি। চোখে চশমা।

-- এসো এসো, আসতে কষ্ট হয়নি তো? এত দূর থেকে এলে।
-- না না।
এই বলেই ওনাকে প্রণাম করল অনন্যা।
-- আহা থাক থাক, কি লক্ষ্মী মেয়ে।
অনন্যার দু গালে হাত বুলিয়ে চিবুক ছুঁয়ে আদর করলেন সমরের মা। এত সহজে আপন করে নেবেন ভাবেনি অনন্যা। যেন কতদিনের চেনা। এত নরম করে গালে হাত বুলোলেন যে দূরত্ব বোধহয় এক মূহুর্তে ঘুচে গেল।
-- এসো এসো বসো এখানে।
বাইরে ঘরে দু' সেট সোফা। বাদামী রঙের। সামনে কাঠের সেন্টার টেবিল। ওপরটা  কাঁচের। টেবিলের নিচে কিছু ম্যাগাজিন রাখা। একটা সানন্দা চোখে পড়ল অনন্যার। সামনে টি ভি। বন্ধ ছিল। ঘরের একদিকে একটা বড় বইয়ের র‍্যাক। এটির কথাই বোধহয় সমর বলেছিল। সমর ভীষণ বই পড়তে ভালোবাসে। অনন্যাও। সেভাবেই ওদের আলাপ অবশ্য।

সোফায় অনন্যার পাশে বসলেন সমরের মা। শুরু হল গল্পগুজব। বাড়িতে কে কে আছে, বাবা কোথায় চাকরি করেন, এসব। ভদ্রমহিলাকে ভীষণ ভালো লাগছিল অনন্যার। কথা বলতে বলতে বার বার ওর হাতে, পায়ে হাত রাখছিলেন। যেন আজকের আলাপ না।

এর মধ্যে হঠাত পাঞ্জাবী পাজামা পরা এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। ভিতরের কোন ঘরে ছিলেন হয়ত। এসেই সবার দিকে একবার ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থেকে

-- খাবার কই, খাবার। বাবু খাবার আনিসনি?

বলে চেঁচালেন। অনন্যা বুঝতে পারল ইনি সমরের বাবা। প্রণাম করবে বলে উঠছিল, কিন্তু সমর তার আগেই ওনাকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল। ওর মা বলতে লাগলেন

-- কি বলি বলো, আগে তবু বেরোত, আজকাল বাড়িতে বন্ধ থেকে থেকে মাথাটা একেবারে গেছে।

এবার নিজে থেকেই ওনার হাত ধরল অনন্যা।

-- না না কাকিমা, কিচ্ছু ভাববেন না। আমি শিওর কাকু সুস্থ হয়ে উঠবেন শিগগিরি।

-- তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক মা। দাঁড়াও আমি চা নিয়ে আসি। সমরের কাছে শুনেছি তুমি বই পড়তে খুব ভালোবাসো। সমরের বই দেখবে? ঐ দেখো র‍্যাকটা।

-- হ্যাঁ কাকিমা, আমি দেখছি।

এবার আস্তে আস্তে উঠে বইয়ের র‍্যাকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো অনন্যা। কত বই। তার পড়া বই যেমন আছে, না পড়াও আছে। ওটা কি, হেনরি ফ্রেড্রিকের সংস অব সলিটিউড। দেখি।

বইটা হাতে নিয়ে দেখছিল অনন্যা যখন ওর মাথায় আঘাত হানা হল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। বইটি হাত থেকে ছিটকে পড়ল। আরো বার কয়েক আঘাত করে থেঁতলে দিয়ে থামল সমর। এর বেশী মারলে বোধহয় ঘিলু বেরিয়ে আসবে।

ভিতর থেকে সমরের বাবার গলা শোনা গেল
-- বাবু, খাবার এনেছিস? খাবার কই বাবু?

সমর এবার বিরক্ত গলায় বলল

-- দাঁড়াও মাকে রান্না করতে দাও। 

Sunday, May 31, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ৩ঃ যাত্রাপথে

ইমিগ্রেশন করে যখন গেটের দিকে এগোলাম, পিছন থেকে একটা ডাক শুনলাম

-- তুই কণাদ না?

তাকিয়ে দেখি প্রাঞ্জলদা। প্রাঞ্জলদা আমার সঙ্গে ফ্লোরিডা যাচ্ছে অঙ্কে পিএইচডি করতে। অর্কুটে আলাপ ছিল। সামনে প্রথম দেখা। প্রাঞ্জলদা সঙ্গে যাচ্ছে জেনে মন ভালো ছিল বটে, কিন্তু একটু বাদেই জানতে পারলাম ও অন্য প্লেনে যাবে। মানে ফ্রাঙ্কফুর্ট অবধি একসাথে। তারপর আমি ওয়াশিংটন ডি সি। ও মায়ামি। তবু দুজনে কলকাতা এয়ারপোর্টে গেটের সামনে বসে আড্ডা দিলাম। তখন এয়ারপোর্টে একটি ফ্রি ফোন থাকত। শুধু লোকাল কল করা যেত ২ মিনিটের জন্য। একবার গিয়ে মা বাবার সাথে কথা বলে এলাম।

খানিকক্ষণ বাদেই হাজির হল ত্রিশিখিদি। বলেছিলাম আগেই, ত্রিশিখিদি আমাদের তারাবাগের কণিকাকাকিমার ভাইয়ের শ্যালিকা। তখন রাখি ছিল। দিদি তাই আমার জন্য এক বাক্স ক্যাডবারি সেলিব্রেশন নিয়ে এসেছিল। সেটা যদিও পরে আমাদের বেশ কাজে দিয়েছিল। যাই হোক, সে গল্প পরে। এ ছাড়াও এয়ারপোর্টে আলাপ হল আমার যাদবপুরের সিনিয়ার সোমদত্তাদি আর ওর মায়ের সঙ্গে। সোমদত্তাদি ওহায়োতে পড়ে। ২০১০-এ সোমদত্তাদির বাড়ি গিয়েছিলাম ম্যাসাচুসেটসে। ততদিনে ওর বিয়ে হয়ে গেছে। ওর বর ম্যাসাচুসেটসে আর্মহার্স্ট শহরে পিএইচডি করে।

এবার ঘোষণা হল প্লেনে ওঠার জন্য। বাবা যেমন বলেছিল, সেরকম এয়ারব্রিজের ভিতর দিয়ে আমি প্লেনে উঠলাম। এই প্রথম প্লেনে উঠলাম। বসার ব্যবস্থা ছিল ২-৫-২। আমি দু'জনের সিটে ধারে বসেছিলাম। পরে জেনেছি ওটাকে আইল সিট বলে। আমার পাশে এক অসমীয়া ভদ্রলোক বসেছিলেন। বললেন মেয়ের কাছে যাচ্ছেন। পোর্টল্যান্ড। তখন জানতামই না পোর্টল্যান্ড কোথায়। কে জানত আর চার বছর বাদে আমি ৩ মাসের উপর পোর্টল্যান্ডে থাকব।

প্লেনে ওঠার খানিকক্ষণের মধ্যেই খেতে দিল। বেশ খিদে পেয়েছিল বটে। সেই কখন ডিনার করেছি বাড়িতে। তবে খেতে গিয়ে মুস্কিল। জার্মান রুটি কি শক্ত। দাঁত ফোটানো যায়না। আর তার ক'দিন আগেই আমার দাঁতের অপারেশন হয়েছিল। কষ্ট করে খেলাম। ড্রিকন্স দিতে এসেছিল। কোকা কোলা নিলাম। প্লেনে তখন প্রতি সিটের সামনে টি ভি হতনা। কয়েকটা সিট ছেড়ে ছেড়ে মাঝে একটা করে বড় টিভি। সেই টি ভিতে শ্রেক দিয়েছিল। খানিকক্ষণ দেখলাম। তারপর ঘুমাতে গেলাম। যদিও ভালো ঘুম এলোনা। বার বার চিন্তা হতে লাগল আমার ব্যাগটা কেউ চুরি করে নেবে না তো?

সকালবেলা যখন ফ্রাঙ্কফুর্টে নামলাম তখন সকাল। উপর থেকে জার্মানিকে অসাধারণ লাগছিল। আমার সেই প্রথম বিদেশ দর্শন। ছোট ছোট বাড়ি। আর রাস্তা দিয়ে ছোট ছোট গাড়ি যাচ্ছে। পুরো মনে হচ্ছিল আমার ছোটবেলার হট উইলসের গাড়ি। ফ্রাঙ্কফুর্টে আমার ৬ ঘণ্টা স্টপ। ত্রিশিখিদির সাড়ে ৬ ঘণ্টা। কলকাতায় আলাপ হয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা দেবশ্রীদির সঙ্গে। দেবশ্রীদির সাড়ে ৫ ঘণ্টা। তিনজন মিলে ফ্রাঙ্কফুর্টে একসঙ্গে বসে আড্ডা দিতে লাগলাম। তবে ত্রিশিখিদি খানিকক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়ল। তখন আমি আর দেবশ্রীদি মিলে এয়ারপোর্ট ঘুরতে লাগলাম। একটা পে ফোন বুথ দেখে দেবশ্রীদি বলল -- "কণাদ, ফোন করবে বাড়িতে?"

দেবশ্রীদির কলিং কার্ড দিয়ে ফোন করলাম। মার সঙ্গে কয়েক সেকেন্ড কথা হল। তখন আমি বুঝতে অস্বীকার করেছিলাম যে ১২ সেকেন্ড কথা বলা আর ৫২ সেকেন্ড কথা বলার মধ্যে কোন তফাত নেই। একই দাম কাটবে। ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টে আমি অনেক ইহুদি লোকজনকে দেখলাম তাদের নিজস্ব পোশাকে। ঘুরতে ঘুরতে আমরা ফিরে এলাম ত্রিশিখিদির কাছে। ত্রিশিখিদি তখন ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। সবার খিদে পেয়েছে হাল্কা। অতএব সেই ক্যাডবেরি সেলিব্রেশন খোলা হল। সবাই মনের আনন্দে তাই ভক্ষণ করলাম।

এবার বিদায় নেয়ার পালা। দেবশ্রীদি আগে বিদায় নিল। তারপর আমি।

এবার প্লেনে খুবই খারাপ সিট পেলাম। এবারে বসার ব্যবস্থা ছিল ৩-৪-৩। আমি একটি তিনের মাঝখানে বসেছিলাম। আমার এক ধারে একটি পোলিশ ছেলে। আমার অন্য পাশে একটি ভিয়েতনামি মেয়ে। বর্ধমানে ছোটবেলা থেকে ভিয়েতনাম নিয়ে এত কথা শুনেছি বলে উচ্ছ্বসিত ছিলাম, কিন্তু মেয়েটি  প্লেন চালু হতেই নাক ডাকিয়ে  ঘুমাল। পোলিশ ছেলেটি যদিও গপ্পে। জানতে পারলাম ছেলেটি নেভিতে কাজ করে। ভার্জিনিয়া যাচ্ছে। আমি জানতে চাইলাম এতদিন বাড়ির বাইরে থাকতে তার মন খারাপ করেনা। ছেলেটি বলল -- "বন্ধু, জাহাজই আমার বাড়ি।" একটি পোলিশ মুদ্রা দিয়েছিল। বহুদিন সেটি আমার সঙ্গে ছিল। এরপর কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল আর খুঁজে পাইনি।

ওয়াশিংটনে নেমে ইমিগ্রেশন করে লাগেজ আইডেন্টিফাই করতে হল। লাগেজ জমা দেওয়ার সময় এক ভদ্রলোক আমাকে "হাউ আর ইউ ডুইয়ং মাই ফ্রেন্ড?" বলায় আমি কি বলব বুঝিনি। এরকম অপরিচিত লোক কেমন আছি আগে কোনদিন জানতে চায়নি।

টার্মিনাল পাল্টে নতুন বোর্ডিং পাস নিয়ে আমি গেটের সামনে এলাম। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। একটা মেক্সিকান দোকান দেখে খেতে গেলাম। কিন্তু মুস্কিল হল কোন খাবারই তো আমি চিনিনা। তাই কিছুটা ন্যাচোস নিলাম। সমস্যা হল টাকা দিতে গিয়ে। আমি একটা দশ ডলারের নোট দিতে মেয়েটি কিছু খুচরো করে দিল। কিন্তু আমি তো মার্কিন মুদ্রা চিনিনা। এদিকে কেউ আমাকে ঠকাক সেটাও চাইব না। তাই মেয়েটিকে বললাম আমাকে বোঝাও কোনটি কি। ভাগ্যিস আসে পাশে আর কোন খদ্দের ছিলনা।

এই প্লেনে সবচেয়ে খারাপ জায়গায় বসলাম। মাঝের তিন জনের সিটের ঠিক মাঝে। ২ ঘণ্টার প্লেন যখন অরল্যান্ডো এয়ারপোর্টে পৌঁছাল, তখন রাত ১০টা। গেন্সভিলের এক সিনিয়ার দাদার বাড়িতে এক সপ্তাহ থাকব ঠিক ছিল। দাদা এয়ারপোর্টে এসেছিলেন আমাকে নিতে। দাদার বাড়ি যখন পৌঁছালাম তখন মধ্যরাত। কোনওরকমে রাতের ডিনার করে শুয়ে পড়লাম। মার্কিন মাটিতে প্রথম রাতে আমার চোখে, মাথায়, শরীরে, মানে অনুপামদার গানে যেখানে যেখানে "তুমি মেখে আছো" হয়, সেসব জায়গায় শুধুই ঘুম ছিল। 

Sunday, May 10, 2020

লবাব

এ অনেকদিনের পুরোন গল্প। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। আমি তখন সবে বর্ধমান মেডিকাল কলেজের থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমি তারাবাগে বাড়িতে থেকেই যাতায়াত করি। আমাদের বাড়ির পাশেই একটা গ্রাম, নাম গোদাগ্রাম। ঐ গ্রাম থেকে লোকজন এসে আমাদের পাড়ার সকলের বাড়িতে সাহায্য করতেন। আমাদের বাড়িতে যিনি আসতেন তাঁর নাম কমলাদি। কমলাদির মেয়ে ফুচি। বয়স বছর ৭-৮। স্কুলে টুলে যায় না। বাড়ির কাজকম্ম করে। কমলাদিকে বললে বলে -- "কি হবে বাবু পড়াশুনা করে? তার চেয়ে বাড়ির কাজটা শিখুক। বিয়ে দিতে পারব।"

আমরা কয়েকজন মেডিকাল কলেজের ছাত্র মিলে ঠিক করলাম ছুটির দিনে এরকম ফুচির মত ছেলে মেয়েদের পড়াব। কাউন্সিলার চয়নবাবুর সাহায্যে সে আয়োজনও হয়ে গেল সহজেই। সামান্য অঙ্ক, টাকা পয়সার হিসেব, বাংলা লেখা, ইংরেজি সংখ্যা চেনানো, এসব হত আর কি। ফুচির কিন্তু শেখার ভীষণ আগ্রহ ছিল। আমার মতে প্রচণ্ড শার্প মেয়ে। কমলাদির বড় ছেলে রতন বোধহয় বর্ধমানে রিক্সা চালাত। একদিন মাথায় ভুত চাপে, সব ছেড়ে কলকাতা চলে যায় সিনেমার হিরো হতে। কমলাদি দুঃখ করেন  -- "আমার কপাল, ছেলেটা জলে গেল।" ফুচির কিন্তু দাদাকে নিয়ে ভীষণ গর্ব। "দেখবেন কানুদা, আমার দাদা একদিন প্রসেঞ্জিতের মত হিরো হবে। আপনি আমাকে দাদার সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবেন তো?"

একদিন কমলাদি আমাদের বাড়ি এলেন একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে। তাতে গোটা চারেক ছানার কেক। মা জিজ্ঞেস করে -- "কি হল কমলা?"
"আর বৌদি, কি বলবো। আমার ছেলে সিনেমায় চান্স পেয়েছে। রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে। পরের বছর বেরোবে।"
"সেকি গো? দারুণ খবর তো।"

ফুচি আমাদের ছুটির ক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে গেল। "জানেন, আমার দাদার সাথে দেবশ্রী রায় সিনেমা করতে চায়, কিন্তু দাদার শতাব্দীকেই পছন্দ।"
"সেকি? কেন? দেবশ্রী খারাপ কি?"
"নাহ, আমার শতাব্দীকে ভালো লাগে। আপনার কাকে ভালো লাগে কানুদা?"
"মাধুরী।"
"যাহ, আপনি তো আবার শুধু হিন্দি সিনেমা দেখেন।"

ক'দিন যেতে না যেতেই শুরু হল
"আর কয়েক বছর যাক, দাদা এবার বম্বেও যাবে। দেখুন না, দাদা, মিঠুন আর মাধুরী মিলে সিনেমা করবে। আপনি আমায় দেখাবেন কানুদা?"
"ফুচি, অনেক বকেছিস। এবার হাতের লেখা দেখা।"

এরকম করে একদিন ফুচির দাদার সিনেমা বেরোল। নাম "নবাব"। কমলাদি আমাদের বাড়ি এসে বললেন -- "বৌদি, জানো রতনের সিনেমা বেরোচ্ছে শুক্রবার। লবাব। এস্টার-এ আসছে। আমরা তো গ্রাম থেকে সবাই মিলে যাবো। আমাকে শুক্রবার দিন ছুটি দেবে?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। ফুচিও যাবে?"
"না বৌদি, ওর ঐটুকু বয়স, যদি হলে ঢুকতে না দেয়। আমি ওকে এসে গল্প বলব। রঞ্জিত মল্লিক আছে, সন্ধ্যা রায় আছে।"

ফুচির পরের দু'দিন ক্লাসে ভীষণ মন খারাপ। আমি শেষকালে বললাম "দাঁড়া এবার পুজোয় যখন পাড়ায় পর্দা ফেলে সিনেমা দেখানো হবে, তখন আমি নবাব নিয়ে আসব।"
"সত্যি কানুদা? আপনি লবাব আনবেন তো?"
"আনব। তবে ওটা লবাব না ফুচি, ওটা নবাব।"

শনিবার দিন কমালাদি সিনেমা দেখে এলেন। মা প্রথমেই জানতে চাইল -- "কেমন ছিল সিনেমা?"
"ঐ একরকম। যা হয় বাংলা সিনেমায়। শুধু মারামারি। বাদ দাও বৌদি। বলছি আজকে আলুগুলো কি ডুম ডুম করে কাটব না সরু সরু করে?"
মা যা বোঝার বুঝে গেল। সমস্যা হচ্ছে, মা আমাকে বলেনি। বললে আমি আমিয়বাবুকে হাতে পায়ে ধরে পুজোর সময় নবাব আনতে বলতাম না।

পুজোর সময় আমাদের পাড়ায় মাঠে পর্দা ফেলে সিনেমা দেখানো হয়। একই দিনে দুটো সিনেমা। এবার প্রথমে ছিল সপ্তপদী। তারপর হবে নবাব। সিনেমা শুরুর আগেই ফুচি এসে হাজির। একটা ফাঁকা চেয়ার দেখে ওকে বসতে বললাম। ফেবেছিলাম ওর পাশে বসেই সিনেমা দেখব। কিন্তু তার আগেই আমার অন্য বন্ধুরা টেনে নিয়ে গেল। সিনেমা শুরু হল। রতনকে আমি চিনি। আগে দেখেছি। তাই মুখ জানি। একটু বাদেই রতনকে দেখতে পেলাম পর্দায়। সৌমিত্র ব্যানার্জি একটা চায়ের দোকানে বসে কিছু ছেলের সঙ্গে মাস্তানি করছি। একটি মেয়ের শাড়িতে চা ফেলে ইভ টিজিং করে। এই ইভ টিজারদের দলে ছিল রতন। লাল সাদা ডোরাকাটা একটা টার্টলনেক গেঞ্জি পরিহিত রতন কিছুক্ষণ বাদেই লবাবরুপি রঞ্জিত মল্লিকের হাতে বেধড়ক মার খেল। সে দৃশ্য দেখেই ফুচির জন্য মন কেমন করল। ওর চেয়ারের দিকে তাকাতেই দেখি ফুচি কাঁদতে কাঁদতে চেয়ার ছেড়ে ছুটে পালাল।

বেশ কিছুদিন ক্লাসে আর আসেনি ফুচি। তারপর একদিন এলো। আমার সঙ্গে চোখে চোখ রাখতে লজ্জা পাচ্ছিল। আমি কিছুই হয়নি এরকম ভাব করে, "ফুচি, ৫ এর নামতা বল" বলে শুরু করলাম।

ক্লাসের শেষে ফুচি আমাকে ডাকল - "কানুদা, দাদা হয়ত বম্বে যেতে পারবে না, কিন্তু শতাব্দীর সঙ্গে সিনেমা করবে বলুন?" 

Thursday, May 7, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ২ঃ যাত্রা শুরু

টি ভি এফ-এর "ইয়ে মেরি ফ্যামিলি" সিরিজে একটি দামী কথা বলেছিলেন মোনা সিং। ছেলে কখন বাড়ি ছেড়ে চলে যায় বোঝাই যায় না। মনে হয় পড়তে গেছে, ক'দিন বাদেই ফিরবে। সেই ফেরাটা কোনদিনই আগের মত বাড়ি থাকা হয়না।

কলকাতা পৌঁছে আমি এরকম বাড়ি ছাড়ার জন্য তৈরি হতে লাগলাম। আমার জয় বাংলাটা এক-দু দিনের মধ্যেই সেরে গেল। তারপর একদিন আমরা গেলাম ব্যাগ কিনতে। এখন আমাদের পরিবারে আগে কেউ কোনদিন বিদেশ যায়নি। তাই চেক-ইন লাগেজ কি হতে পারে আমরা ভাবতে লাগলাম। কেউ কেউ বলল হার্ড লাগেজ নিতে, কেউ কেউ বলল সফট লাগেজ। একদিন আমার বড়মামার গাড়ি করে আমরা সকলে, মানে আমি, মা, বাবা, বড় মামা আর মামি মিলে প্যান্টালুন্সে গেলাম ব্যাগ কিনতে। সবাই বলেছিল ভালো ব্যাগ কিনতে -- এত বড় জার্নি, ব্যাগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অবশেষে আমেরিকান টুরিস্টারের একটা লাল সফট আর একটা নীল হার্ড লাগেজ কেনা হল। দুর্ভাগ্যের কথা, ঐ নীল ব্যাগটি আমেরিকা পৌঁছাতে পৌঁছাতেই ভেঙ্গে যায়। তাই ওটি আর কোনদিন ব্যবহার করতে পারিনি।

সেদিন ব্যাগ কিনে বাড়ি ফিরে বুঝতে পারলাম দাঁতে একটা অস্বস্তি হচ্ছে। পরেরদিন বেহালা চৌরাস্তায় ডাক্তারবাবুকে দেখালাম। উনি দেখে বললেন -- "সর্বনাশ করেছ। তোমার একটা আক্কেল দাঁত দুটো সুস্থ দাঁতের মধ্যে দিয়ে বেরোতে চাইছে; পারছে না। তাই এখানে ইনফেকশন  করেছে। দাঁত তুলতে হবে।"
"কিন্তু আমার যে আর ক'দিন বাদেই আমেরিকা যাওয়া।"
"অসম্ভব। তোমার সুস্থ হতে মিনিমাম এক সপ্তাহ লাগবে। টিকিট পাল্টাও।"

পাল্টানো হল। পার্ক স্ট্রিটের আল্পস ট্র্যাভেলসের মালকিন তাড়াহুড়ো করে একটা সস্তার টিকিট করে দিলেন বটে। কিন্তু আমার সব বন্ধুরা আলাদা চলে যাবে। আমি একা এত বড় যাত্রা করব। পাক্কা দু ঘণ্টা ধরে আমার দাঁতের উপর কসরত চালালেন ডাক্তার বর্মন। যার ফলে আমার নর্মাল খাওয়া দাওয়া পুরো বন্ধ হয়ে গেল ৪-৫ দিনের জন্য। আমি শুধু খেতে পেতাম আইসক্রিম আর রসগোল্লা। প্রথম প্রথম কথা বলাও বারণ ছিল। আসতে আসতে সেসব মিটল।

আমার বাবা কয়েক বছর আগে ইউ জি সির কাজে একবার প্লেনে দিল্লী গিয়েছিলেন। বাবা ফিরে এসে গল্প করেছিলেন। সিকিউরিটি চেকের পর একটা বড় ঘরে সবাইকে বসতে দেয়। তারপর একটা করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন প্লেনের ভেতরে ঢুকে পরা হয়।

১১ই আগস্ট ২০০৭ রাত্রে আমি মনে হয় এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমোতে গিয়েছিলাম। পরেরদিন বেলা করে উঠলাম। মা আমার জন্য দুপুরে আলুপোস্ত করে রেখেছিলেন। মাংস খাওয়ার মত দাঁতের অবস্থা নেই। রাত ১টায় প্লেন। আমাকে সবাই বলে দিয়েছিল -- বড় জার্নি, রেস্ট নে বাড়িতে, দুপুরে ঘুমিয়ে নিস। শুলাম। কিন্তু ঘুম এলো না। বাবা দেখি বাইরের ঘরে একা একা বসে আছে। বাবার কোলে মাথা দিয়ে শুলাম। টি ভি-তে "এই ঘর, এই সংসার" চলছিল। তাই দেখলাম দুজন মিলে। বিকেলবেলা তারাবাগ থেকে কণিকাকাকিমা ফোন করলেন। ওনার ভাইয়ের শালী, ত্রিশিখীদিও আমার সঙ্গে একই প্লেনে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট যাচ্ছে। তারপর উনি টরোন্টো যাবেন। ভালোই হল, চেনা জানা কেউ তো থাকল।

সন্ধ্যেবেলা গোপু মামা আর জয়া মাইমা এলেন আমাদের বাড়ি। ওনারা জানতেন না সেদিন আমাদের যাত্রা। গোপুমামা ঠিক করল রাত্রে এয়ারপোর্ট যাবেন আমাদের সাথে। রাত নটা নাগাদ আমরা বেরোলাম। বৃষ্টি পরছিল। প্রথমে গেলাম মামাবাড়ি। দিদাকে প্রণাম করলাম। দিদা জানতে চাইল পুজোতে আসব কিনা।

অবশেষে দুই গাড়ি ভর্তি বেহালাবাসী আমাকে সি অফ করতে দমদম ছুটল। এক গাড়িতে বাবা, গোপুমামা, আমার বড় মামা আর আমার সেজ মামা। অন্য গাড়িতে বড় মামি, ফুল মামির সঙ্গে মা আর আমি। মা পুরো সময়টা আমার হাত ধরে ছিলেন। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি তো বড় হয়ে গেছি। বাড়ির বাইরে, দেশের বাইরে পড়তে যাচ্ছি। দমদমে নেমে সব ব্যাগ গুছিয়ে আবার এক রাউন্ড প্রণাম সেরে আমি গেটম্যানকে টিকিট দেখিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সবাই বাইরে থেকে হাত নাড়ছিল। কথা দিয়েছিলাম আমার লাগেজ চেক ইন হয়ে গেলে আর একবার কাঁচের ভেতর থেকে হাত নেড়ে যাব। লাগেজের লাইনে আলাপ হল যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপিকা দেবশ্রী দত্তরায়ের সঙ্গে। লাগেজ চেক ইন করে যখন হাত নাড়লাম, সবাইকে দেখতে পেলাম। মায়ের চোখে জলটাও দেখতে ভুল করলাম না। আমার মোবাইল ফোনটা না আনার জন্য আক্ষেপ করলাম। অবশেষে আমি ইমিগ্রেশনের লাইনে অগ্রসর হলাম। 

Wednesday, April 29, 2020

প্রবাসীর ডায়রিঃ ১ঃ পরীক্ষা শেষ

এ এক অন্য সময়ের গল্প। সেই সময়, যখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়নি, যখন লিওনেল মেসি একটিও ব্যালন ডি-ওর জেতেননি, যখন সৃজিত মুখার্জি বা দীপিকা পাড়ুকোনকে কেউ সিনেমায় দেখেনি, যখন ইরফান খানের "রোগ"-এর গান লোকের মুখে মুখে ঘুরত। এটা সেই সময়ের গল্প যখন সারা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল হয়ে উঠেছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম নিয়ে, যখন  ভারতবর্ষ থমকে গিয়েছিল ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়ে, যখন লোকে মোবাইলে রিং টোন বানিয়ে বন্ধুদের পাঠাত।

এরকম সময় আমার বাইশ বছর জন্মদিনের দিন আমি সকালে উঠলাম খুশী মনে। গতকাল আমার যাদবপুরের শেষ পরীক্ষা হয়ে গেছে। এখন প্রায় আড়াই মাস ছুটি। তারপর আমার ফ্লোরিডা ভ্রমণ। সকাল থেকেই আত্মীয় স্বজনদের ফোন আসতে শুরু করল। আমাদের পরিবারে একটি কুসংস্কারের জন্য জন্মদিন পালন হয়না। আমি সকালে অন্যান্য দিনের মতই স্নান খাওয়া করে বেরিয়ে পড়লাম। কলেজে যাব। তবে অন্য কারণে। আমাদের বন্ধু আশিস গেটে ভালো র‍্যঙ্ক করেছে। তাই আজ খাওয়াবে। রোজকার মত অটো করে বেহালা চৌরাস্তা, তারপর বাসে করে যাদবপুর। বাওয়ারচিতে ভরপেট খেয়ে গাছতলায় বসে আড্ডা দিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন সন্ধ্যা হবে। ঠিক হল দু'দিন পর আমরা বর্ধমান যাব।

বাবা বর্ধমানে একাই থাকত। আমরা সকালের ট্রেন নিয়ে দুপুর নাগাদ বাড়ি পৌঁছালাম। ২০০৬ এ আমরা ফ্ল্যাট পালটেছিলাম। কিন্তু আমি তখন দিল্লীতে ইন্টার্নশিপ করছি। তারপর আর কাজের চাপে বর্ধমান যাওয়া হয়নি তেমন। নতুন ফ্ল্যাটের সবার সাথে সেভাবে আলাপ ছিল না। কয়েকজনকে চিনতাম, যেমন আমাদের প্রতিবেশী ছোটু। ছোটু আমার ছোটবেলার বন্ধু। একসাথে ক্রিকেট খেলেছি। আমাদের তারাবাগের এক একটা ব্লকে চারটি করে ফ্ল্যাট থাকত। আমরা আর ছোটুরা দোতলায় থাকতাম। একতলায় তুয়া-টুটু দুই ভাই বোন আর নন্দ জেঠুরা। তিনতলায় সায়নীরা আর শ্রাবণীদিরা। বাকিদের সবার সঙ্গে চেনা জানা থাকলেও একদম চিনতাম না শ্রাবনীদি দেবাঙ্গনদাকে। শ্রাবণীদি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সদ্য জয়েন করেছে, অধ্যাপক হিসেবে।

কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের একটা দারুণ দল হয়ে গেল। রোজ বিকেলে চা খেতে খেতে ছাদে আড্ডা। দেবাঙ্গনদা রসিয়ে গল্প করতে পারে। আমি কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে যাচ্ছি শুনে বলল -- "জানিস আমি সফটওয়ার শুনে খুব ঘাবড়ে যাই। ছোট থেকে হার্ডওয়ার বলতে বড় বড় দোকান দেখেছি। সফটওয়ার শুনে ভাবলাম এটা কি? হোসিয়ারি?" একদিন  তো ছাদে সবাই মিলে পিকনিক করলাম সন্ধ্যাবেলা। যারা সঞ্জীববাবুর শিউলি পড়েছেন, তারা জানবেন, আমরা প্রায় ওরকম জীবন কাটাতাম।

একদিনের কথা মনে পড়ে, সেদিন ছাদে তখনও কেউ আসেনি। আমি একা। চুপচাপ ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে মনে ভাবতাম আচ্ছা এরকম ভাবে তারাবাগে আমাদের ছাদে আবার কবে আমি এভাবে বসে থাকতে পারব। হয়ত কালকেই পারব। হয়ত এই পুরো সপ্তাহটা পারব। কিন্তু তারপর? একদিন এই বাড়িটা ছেড়ে আমি অনেক দূরে চলে যাব। তখন কি এটার কথা মনে পড়বে? মনে পড়েছিল। বার বার মনে পড়ত। তাই ২০১৭-এ যেদিন আমরা শেষবারের মত তারাবাগ ছাড়ি, যেদিন মিডলসবরোকে হারিয়ে লিভারপুল চ্যাম্পিয়ান্স লিগে থাকা নিশ্চিত করছে, সেদিনও আমি উঠে গেছিলাম ছাদে।

এর মধ্যে ফ্লোরিডা থেকে আমার  আই টুয়েন্টি চলে এল। যারা জানেন না তাদের জন্য বলি -- স্টুডেন্ট ভিসায় মার্কিন দেশে আসতে গেলে এই নথিটি লাগে। অনলাইনে ভিসার দিন ঠিক করলাম। আমার  স্কলারশিপ ছিল। তাও কেউ কেউ বলল বাড়ির দলিল, নথি দেখানো উচিত। যদি ঝামেলা করে। আমি আর বাবা বর্ধমানে এক উকিলের বাড়ি গেলাম। তিনি সমস্ত নথি বানিয়ে দিলেন। এরপর জুনের শেষ দিকে আমরা আবার কলকাতা ফিরলাম। ভিসার আগে সবাই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল। তখন স্টুডেন্ট ভিসা, বিশেষত যারা পি এইচ ডি করতে যাচ্ছে, তাদের একটি পিঙ্ক স্লিপ দিত মাঝে মাঝে। কিছুই না, ভিসা হয়ে যেত। কিন্তু দেরী হত কয়েক সপ্তাহ। যাই হোক, আমার ক্ষেত্রে সেসব হলনা। ভিসা অফিসার মহিলা বললেন "ভিসা ইজ এপ্রুভড।" কাউন্টারের বাঙালি মহিলা বললেন -- "আজ শুক্রবার তো? আজকেই পেয়ে যাবেন। বিকেলে আসুন।"

ইন্টার্ভিউ দিয়ে বাইরে বেরোতেই এক দল লোক ছেঁকে ধরল -- "লোন লাগবে?" না জানিয়ে বাবাকে বললাম যে আজকেই ভিসা পাবো। কি করবে? পার্ক স্ট্রিট থেকে আমাদের শকুন্তলা পার্কের বাড়িতে ফিরে আবার চারটের মধ্যে আসা সময়সাপেক্ষ। তাই আমরা ঐ অঞ্চলেই ঘুরে বেড়ালাম। দুপুরে ডমিনোজে পিতজা খেলাম। বাবা সেই প্রথম জীবনে পিতজা খেলেন। আমি এর আগে একবারই খেয়েছি দিল্লীতে। আজকাল হয়ত কলকাতায় কলেজে পড়া ছেলেদের কাছে পিতজাটা কোন বিলাসিতা না। কিন্তু সেই সময় আমাদের মত মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেদের কাছে তা ছিল বইকি।

ভিসা নিয়ে আবার বর্ধমান ফিরলাম। এবার আমি আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক শিশিরবাবুর কাছে ভর্তি হলাম জাভা শিখব বলে। আমার পুরনো এটলাস গোল্ডলাইন সুপারটা আবার ঝেড়ে বার করা হল। কতদিন বাদে সেই স্কুল জীবনের মত সাইকেল করে পড়তে যাচ্ছিলাম। একদিন আমরা তারাবাগের ব্লকের সবাই মিলে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে বেরোলাম। দামোদারের পার ঘুরে, শের আফগানের সমাধি ঘুরে, কঙ্কালিতলা হয়ে দারুণ এক সন্ধ্যা কাটালাম। এর মধ্যে আমার প্লেনের টিকিট কাটা হয়ে গেল। ঠিক হল ৬ আগস্ট ভোর একটার প্লেনে আমরা অনেকে মিলে একসাথে যাব। তখন কলকাতা থেকে লুফথান্সা চলত। সেই প্লেনে আমরা যাদবপুরের বন্ধুরা মিলে যাব ফ্র্যাঙ্কফুর্ট। সঙ্গে থাকবে আমার রুমমেট সায়ক। সেখান থেকে আমি আর সায়ক ওয়াশিংটন ডি সি হয়ে যাব ফ্লোরিডার ওরল্যান্ডো।

বলতে ভুলে গেছি এই ছুটিতেই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম ফ্লোরিডায় কে কে একসাথে থাকব। তখন ফেসবুকের এত রমরমা ছিল না। ফ্লোরিডার বাঙালি ছাত্র ছাত্রীদের একটা ইয়াহু মেলিং গ্রুপ ছিল। আমি এডমিশন পাওয়ার পর পর সেখানে ঢুকে পরেছিলাম। সায়কের সঙ্গে আলাপ আর এক পরিচিতর মাধ্যমে। একদিন সেই মেলিং গ্রুপে দেখলাম এক বাঙালি ছাত্র, নাম অনিরুদ্ধ, মেল করেছে তার দুটি রুমমেট লাগবে। মেল পড়েই আমরা উত্তর দিলাম আমরা রাজি। অনিরুদ্ধদা এর মধ্যে একদিন কলকাতা এলো। ওর বাড়ি বালিগঞ্জে। একদিন ওর বাড়িতে আমি আর সায়ক দুপুরে লাঞ্চের নেমন্তন্নে গেলাম। প্রচুর আড্ডা হল। অনিদা বলল ও ২০ আগস্ট নাগাদ ফ্লোরিডা ফিরবে। আমরা তার মধ্যে যেন লিজ সই করে বাড়িতে ঢুকে যাই। কিন্তু আমরা যেন বেশী আসবাব বা বাসনপত্র না কিনি। কারণ ওর সব আছে, ও সেগুলো নিয়ে আসবে।

এভাবে একদিন বর্ধমানের পাট শেষ হল ২২শে জুলাই। আর দু সপ্তাহ বাদে আমার যাত্রা। এবার কলকাতা ফিরতে হবে। ব্যাগ কিনতে হবে, ব্যাগ গোছাতে হবে। যেদিন তারাবাগ ছেড়ে এলাম সেদিন আমাদের রিক্সার পাশে ব্লকের ছটা ফ্ল্যাটের সবাই নেমে এসেছিল। কৃষ্ণাদি আমাদের বাড়িতে মাকে সাহায্য করত। আমি চলে যাচ্ছি বলে কেঁদে ফেলেছিল। সবাই বলল সাবধানে থাকিস, দেবাঙ্গনদা বলল চিঠি লিখিস। কথা দিলাম লিখব। কৃষ্ণাদির স্বামী শম্ভুদা আমাদের স্টেশনে নিয়ে এল রিক্সায়।  ট্রেনটা যখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, যখন হলুদ সাইনবোর্ডে বর্ধমান লেখাটা শেষবারের মত দেখলাম, আমার কান্না পাচ্ছিল।

বার বার চোখ মুছেও দেখলাম চোখের লাল ভাবটা যাচ্ছেনা। বাবা বলল কলকাতা গিয়ে তোর ডাক্তারমামাকে দেখাস। হয়ত জয় বাংলা। তখনো জানতাম না জয় বাংলায় শেষ না, কলকাতায় কি ভয়ানক ব্যাধি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।