Wednesday, December 19, 2018

নয়ের দশকের গল্প

"দাদু, তুমি তাজমহল দেখেছো?"
"হ্যাঁ দাদু।"
"খুব সুন্দর ছিল তাই না?"
"হ্যাঁ দাদু, আমার  তখন  দশ বছর বয়স। মা-বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম।"
"তাজমহল ভেঙ্গে গেল কেন দাদু? স্কুলে বলেছে সাইবার যুদ্ধে। সাইবার যুদ্ধ কী দাদু?"
"তুমি বড়  হও তখন পড়বে।"
"না দাদু, তুমি বল।"
"না দাদু, তোমার স্কুলে পড়বে।"

সেদিন রাত্রে আর কথা বাড়াল না  মানিক। খেতে খেতে বার বার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন তুষারবাবু। সাইবার যুদ্ধ। এই খাওয়ার টেবিলে একমাত্র তিনি দেখেছেন সেই যুদ্ধ। তিনি জানেন ঐ দুঃস্বপ্নের  দিনগুলির কথা। এবং তিনি জানেন যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা। আজ এত বছর তিনি গৃহবন্দী।

পরদিন সকালে অভ্যাস মত বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন তুষারবাবু।  হাল্কা ঠাণ্ডা পড়েছে এই মফঃস্বল শহরে। তাই একটা শাল জড়িয়েছেন। "দুধ" ডাক শুনে বারান্দার দড়িটা টেনে দুধ তুলে নিলেন।

"বউমা, এই যে দুধ।"
"হ্যাঁ বাবা, টেবিলে রেখে দিন।"
"আজ কি তুহিনের অফিস নেই? এখনো বাড়িতে দেখছি। রোজ তো সকাল সাতটায় বেরিয়ে যায়।"
"না বাবা, আজ বাবুর স্কুলে  আমাদের ডেকেছে।"
"সেকি? বাবু কি কোন দুষ্টুমি করল নাকি? ও তো নিপাট ভালোছেলে।"
"তা  নয় বাবা,  আজ থেকে ওদের ইন্টারনেট পড়ানোর কথা ইতিহাস ক্লাসে।"
"ওহ।"
"বাবা, গত  সপ্তাহে প্রিন্সিপাল আমাকে ডেকেছিলেন। আমি স্কুলের শিক্ষিকা বলে আগে থেকেই বলে রেখেছেন।"
"কী?"
"আপনার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন।"
"আমার ব্যাপারে?" 
"হ্যাঁ বাবা, আপনার ব্যাপারে।  আপনি দয়া করে বাবুকে ইন্টারনেট নিয়ে ভুল কিছু শেখাবেন না।"
"ভুল?"
"হ্যাঁ বাবা, সারা দেশ জানে আপনি ইন্টারনেট বন্ধ করার বিরুদ্ধে ছিলেন। ভারতবর্ষের প্রো-ইন্টারনেট দলের সবচেয়ে বড় নেতা ছিলেন আপনি। "
"কিন্তু..."
"আপনি তো জানেন বাবা, কত কষ্ট করে আপনাকে জেল থেকে বার করে এনেছি আমরা। সেই কারণেই আপনি আজকেও গৃহবন্দী। "
"কিন্তু বউমা, আমি ভুল কি বলব?"
"ঐ  যে আপনার সে যুগের গল্প, ফেসবুক, গুগল আরও কিসব।" 
"কিন্তু সেগুলি  তো বাস্তব বউমা।  আমাদের সময় কিছু দরকার পড়লে এক সেকেন্ডে আমরা স্মার্টফোনে দেখে  নিতাম। কত বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকত..."
"তাতে লাভটা  কি হল বাবা? আপনার সেই বন্ধুদের কতজন বেঁচে?  আজ দিল্লী শহরটায় শুধু ভগ্নাবশেষ পড়ে আছে।  তাজমহল নেই। পৃথিবীর জনসংখ্যা  অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল সেই সাইবার যুদ্ধে। কি লাভ হল আপনাদের ফেসবুক আর ইমেলে।"
"তাই  বলে ওদের  স্কুলে শেখায় ইন্টারনেট কত খারাপ, মানুষ পাগল  হয়ে ইন্টারনেট আবিষ্কার করেছিল। এগুলি কি ঠিক বউমা?"
"হ্যাঁ বাবা, এগুলি ঠিক। ইতিহাস তাই  বলে। সেদিন ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছিল  বলেই  আমরা আজ সবাই  বেঁচে আছি।"
"তুমি যা বলবে বউমা, ইতিহাস শুধু বিজয়ীরাই লেখে।"



সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে  মানিক চলে এল দাদুর ঘরে।

"দাদু,  দাদু, তুমি ইন্টারনেট দেখেছ?"
"হ্যাঁ  দাদু, দেখেছি।"
"খুব খারাপ, তাই না দাদু?  ঐ ইন্টারনেটের জন্যই কত লোক মারা গেছে।"
"হ্যাঁ দাদু, খুব খারাপ।"




Friday, December 7, 2018

দন্ত চিকিৎসা

আজকাল কারুর সাথে কথা বলতেই ভয় করে। কে যে কী ভাবে বলা শক্ত। যেমন ক'দিন আগে দেখলাম তথাকথিত নাস্তিকরা রেগে গেছেন কেন কোন এক মন্দিরে  মেয়েদের ঢুকতে দেওয়া হবেনা। আরে এতে রেগে যাওয়ার কি  আছে? বরং মহিলাদের খুশী হওয়া উচিত। যদি বলত হাসপাতালে ঢুকতে দেবে না, স্কুলে ঢুকতে  দেবে না, সিনেমা হলে ঢুকতে দেবেনা, আই পি এলে ঢুকতে দেবে না,  কে হবে বাংলার কোটিপতিতে ঢুকতে দেবে না, তাহলে নাহয় রেগে যাওয়ার মানে আছে। যাই হোক, মেনে নিলাম আমি কিছুই বুঝিনা। আবার দেখলাম কয়েকদিন আগে তথাকথিত ফ্রি মার্কেটের প্রবক্তারা রেগে গেছেন কেন পুজোর সময় ব্যাঙ্গালোর কলিকাতা  প্লেন ভাড়া পনেরো হাজার টাকা। কে জানে বাপু, আমি বোধহয় এসব ফ্রি মার্কেট বুঝিনা।

এই  কারণে আজকাল কথা বলতে ভয় করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে লোকে কথা বলতে চায়। যেমন সেদিন গিয়েছি  আমার  দন্তচিকিৎসকের কাছে। তিনি জাতে পারস্যদেশের। অনর্গল বকে চলেন আমার  দাঁত পরিষ্কার করতে গিয়ে। এবার বেশিরভাগই  এরকম সব প্রসঙ্গ, যেগুলোর মানে আমি নিজেই  জানি না। আজকাল ঠিক করেছি তিনটি বিষয় আছে যা নিয়ে বললে সবাই একমত  হয়। খাওয়া, সিনেমা আর বেহালার জ্যাম। তবে পারস্যদেশের মানুষকে বেহালার জ্যাম নিয়ে বললে তিনি বোধহয় রেগেই যাবেন। তাই শুরু করলাম খাওয়া নিয়ে। তিনি তাতে উৎসাহ দেখালেন না। এবার চলে গেলাম সিনেমায় -- বললাম বেশ কিছু ভালো পারস্য সিনেমা দেখেছি। যেমন বাচ্চা-এ-আসমান, অফসাইড। ভদ্রলোক কি বুঝলেন জানি না, আমাকে বলে বসলেন "আমিও  অনেক ইন্ডিয়ান সিনেমা  দেখেছি।"

আমি  জানতে চাইলাম কি কি?

উত্তর  এলো  আওয়ারা, শোলে আর জিমি হাজা।

শেষেরটার নাম আমি শুনিনি বলায় ভদ্রলোক অবাক হলেন । ইংরেজিতে  বললেন -- "তুমি  জানোনা ভারতের  সবচেয়ে সুন্দর অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে? আমার বাড়িতে ওনার একটা পোস্টার আছে।"

ছয়মাস বাদে আবার দাঁত পরিষ্কার করাতে যাব। কি নিয়ে কথা বলব এবার সেটা ভাবতে হবে।  ভাবছি বলব তেহরানে কি জ্যাম হয়? 

Saturday, November 24, 2018

গুগাবাবা

-- কিন্তু বাঘাদা, এই মূর্তিটার কি দরকার?
--  আমি কি জানি? হীরক রাজার মূর্তি এটা।
-- সে তো বুঝলাম, কিন্তু যে দেশে কৃষক আত্মহত্যা করছে, পাঠশালা বন্ধ, সেখানে এই মূর্তি দেখে কি হবে?
-- আরে তখন ঐ সৈন্য কি বলছে শোননি? এই মূর্তি দেখে নাকি পর্যটন হবে।
-- পর্যটন? হীরক দেশের হীরার খনি, প্রতাপগড়ের জঙ্গল, চন্দীতলার শিবমন্দির, এগুলি কি কম পড়েছিল?
-- আরে গুপী ভাই, মজার ব্যাপারটা কি জানো? লোক হচ্ছে? কারা জানো?
-- কারা?
-- এই দেশের নাগরিকরা।
-- মানে? এরাই তো কর দিয়ে মুর্তিটা বানালো। আবার এরাই টাকা দিয়ে এটা  দেখতে আসছে?
-- হ্যাঁ। কি করবে বলো ? পণ্ডিতের হুকুম।
-- এই পণ্ডিতটা কে বলতো?
-- আছে একজন। রোজ রাত ন'টার সময় এসে সবার বিচার করে। যে রাজার বিরুদ্ধে বলে সে হয় দেশদ্রোহী। এই তো ক'দিন আগে এক শ্রমিক বলল  টাকা নেই তাই মূর্তি দেখতে পারবেনা। তো পণ্ডিত কি করল জানো? তার বাড়ি  থেকে খুঁজে কয়েকটা কড়ি বার করল। শ্রমিক যত বলে ওটা চাল কেনার টাকা, পণ্ডিত শোনেনা। শ্রমিক দেশদ্রোহী প্রমাণিত হল।
--  কি  শাস্তি হয় দেশদ্রোহীর?
-- সে তোমার শুনে কাম নাই। এবারে চলো পালাই।
-- আচ্ছা পণ্ডিতরা  এরকম  কেন হয় বাঘাদা?
-- আরে পড়োনি? টাকের 'পরে পণ্ডিতেরা ডাকের টিকিট মারে।
-- তা আমাদের প্রথম কর্তব্য কি  বাঘাদা?
-- প্রথম কি জানি না। শেষ কর্তব্য এই মূর্তিটা ভাঙা। 

Sunday, November 4, 2018

পুলিনবাবুর রাগ

-- না পুলিনবাবু, আপনাকে রাগ কমাতে হবে। নাহলে আপনার প্রেশার কমবে না।
-- কিন্তু আমি তো রাগ করিনা।
-- কেন মিছে কথা বলছেন বলুন তো? আপনার স্ত্রী, ছেলে, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই জানে আপনার রাগের কথা। আচ্ছা, শেষ কবে রেগেছিলেন বলুন।
-- শেষ কবে? এই ধরুন আজ সকালে ক্রিকেট দেখতে গিয়ে?
-- কেন? কারেন্ট গেছিল?
-- না না, এই দেখুন না শচীনটা ৯৩ এ ব্যাট করছিল, দিল ওকে রান আউট করে। রাগ হবে না বলুন?
-- না হবে না। আপনার কি মশাই শচীনের ১০০- র সাথে? ও ১০০ করলে কি আপনার আয়ু বাড়বে? দেখুন আপনার বয়স হয়েছে। রিটায়ার করেছেন। এবার এসব রাগ থামান। রাগ হলেই মনে করবেন এই রাগ করে কি আপনার আয়ু বাড়বে? বুঝেছেন?
-- হ্যাঁ ডাক্তারবাবু।

ডাক্তারখানা থেকে বেরিয়ে রিক্সা ধরলেন পুলিনবাবু।
-- কত ভাড়া নেবে?
-- সাড়ে ছয় টাকা দেবেন।
পুলিনবাবু জানেন পাঁচ টাকা ভাড়া। খানিকক্ষণ আগেও সেই ভাড়াতেই এসেছেন। তবে আজ তিনি রাগ করবেন না।
-- কেন বাবা, পাঁচ তাকাই তো ভাড়া।
-- সাড়ে ছয়ের নিচে যাব না। যেতে হলে উঠুন নইলে ছাড়ুন।
মনের মধ্যে রিক্সাওয়ালাকে দুটো গালাগাল দিলেন পুলিনবাবু। কিন্তু না, দেড় টাকার চেয়ে বেঁচে থাকা জরুরী।
-- ঠিক আছে চল।

পরদিন সকালে চা খেয়ে কাগজের জন্য অপেক্ষা করছেন পুলিনবাবু। কলকাতা থেকে কাগজ আসতে আসতে  সাতটা বেজে যায়।
-- কি গো। হাঁ করে বসে থাকবে নাকি? আমি কি আঙুল কেটে রান্না করব?

গিন্নীর ধমকে চমকে উঠলেন পুলিনবাবু। বলতে যাচ্ছিলেন তাই কর, কিন্তু না, রাগ করবেন না তিনি।

-- যাচ্ছি, যাচ্ছি, এই কাগজটা আসুক।
-- তাহলে কাগজই খেয়ো।

অগত্যা থলে নিয়ে বাজারে বেরোলেন। বাজারে হরেন মাছওয়ালা বরফের রুইকে "টাটকা, জ্যান্ত" বলে চালাচ্ছিল। অন্যদিন হলে মিনিট পাঁচেক ঝগড়া করে যান। আজ ও পথ মাড়ালেন না পুলিনবাবু। মাছ টাটকা থাকার চেয়ে তাঁর বেঁচে থাকা জরুরী।

বাড়ি ফেরার বেশ খানিকক্ষণ বাদে, সাড়ে আটটা নাগাদ কাগজ এলো। কাগজওয়ালাকে ডাকলেন পুলিনবাবু

-- কি রে আজ এত দেরী?
-- তো আমি কি প্রেসে গিয়ে কাগজ ছাপাব? 

নাহ,  জলদি কাগজ পড়ার চেয়ে বেঁচে থাকা জরুরী।

একটু বাদে ছেলে বান্টি তাঁর ঘরে এলো।

-- বাবা, গোটা পঞ্চাশেক টাকা দাও তো।
-- কেন? এই তো সেদিন একশ নিলি।
-- গিটারটা খারাপ হয়েছে। সারাব।
-- আর কতদিন গিটার নিয়ে চালাবি বাবা? এবার একটা চাকরি বাকরি দেখ।
-- উফ, বাবা, তোমার মত আমিও ঐ দশটা- পাঁচটার কেরানীগিরি করে চালাতে পারব না। আমি আর্টিস্ট। জলদি টাকাটা ছাড়ো। আজ জ্যাম আছে আমাদের।

এই কথাটা কদিন আগে বললে ছেলের গালে চড় পড়ত। আজ সামলে নিলেন। চড় মারার চেয়ে বেঁচে থাকা জরুরী।

-- আজ টাকা নেই। পরে আসিস।
-- তুমিও না বাবা। তোমার মত বাবা থাকলে ডিলান ডিলান হত না।

বিকেলে বাড়িতে হাজির হল পুলিনবাবুর মেয়ে শম্পা। সঙ্গে শম্পার ছেলে সানি। শম্পার শ্বশুরবাড়ি কলকাতায়। মাস দু-তিন অন্তর আসে বাবা মায়ের কাছে। অন্যসময় জামাই সত্যব্রতও আসে। এবার জামাই ছুটি পায়নি।

শম্পাদের দেখে খুশীতে ভরে উঠল পুলিনবাবুর মুখ। সানিকে কোলে নিয়ে বারান্দায় গেলেন খেলা করতে।

-- বল তো দাদুভাই, আমি কে?
-- দাদু রাগী।
-- ঠিক করে বল দাদুভাই, আমি কে?
-- তুমি রাগী দাদু।

আসলে হয়েছে কি সানি ভীষণ দুষ্টু। শম্পা তাই রাস্তায় বলতে বলতে এসেছে
-- দাদু কিন্তু ভীষণ রাগী। একদম দুষ্টু করবে না ওখানে গিয়ে।

এবার একটু বিরক্ত হয়ে পুলিনবাবু আবার বললেন
-- না দাদুভাই, আমি রাগী  নই। আমি তো তোমার দাদু।
-- না, তুমি রাগী। রাগী দাদু।

এভাবে বার দশেক চলার পর আর সহ্য  করতে পারলেন না পুলিনবাবু।
-- কি? আমি রাগী? সারাদিন রাগ চেপে আছি। আর আমি রাগী!!! 

তাঁর চিৎকারে  বারান্দায় ছুটে এল শম্পা।
-- সানি, আবার বাঁদরামো করেছিস? কতবার বলেছি দাদু রাগী, দুষ্টু করিস না।

Friday, November 2, 2018

সত্যসুন্দর

(ও হেনরির একটি গল্প নিজের মত করে লিখলাম।)

নাহ, এভাবে হবে না। এবার মোহনপুরে যা ঠাণ্ডা পড়েছে, তাতে এভাবে বেঞ্চে  শুয়ে চলবেনা। গতবছর অবধি এক বুড়ি পিসী ছিল হারুর। এবছর সেই পিসীও নেই। পিসতুতো ভাইরা জেল খাটা কয়েদিকে বাড়িতে আশ্রয় দিতে নারাজ। অগত্যা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই পার্কের বেঞ্চেই কাটাচ্ছে হারু। পুজো - কালীপুজো সব শেষ। এবার আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা পড়ছে। কলকাতায় লোকে বোধহয় এখনো ফ্যান চালাচ্ছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের এই ছোট জেলা শহরে এরমধ্যেই লোকের পরনে হাতকাটা সোয়েটার। কি করা যায় এই ঠাণ্ডায় ভাবতে ভাবতে হারু ঠিক করল -- নাহ, জেলেই ফিরে যাই। যে জেলে যাওয়ার জন্য তার এত বদনাম, সেই জেলই তাকে এই ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাবে। আর কিছু না হোক, দু'বেলা খাবার পাবে, এমনকি চাইলে হয়ত একটা কম্বলও দিতে পারে।

পার্কে এই বিকেলবেলা বেশ কিছু লোক ঘুরতে এসেছে। কয়েকজন বৃদ্ধ নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছেন। কিছু বাচ্চা বল নিয়ে খেলছে। মাঠে পাতা পড়ে আছে অনেক। হয়ত পরিষ্কার করার লোক আজ আসেনি। হয়ত বা লোকই নেই। আকাশের দিকে চেয়ে হারু দেখল সন্ধ্যা নামতে চলেছে। এইবেলা বেরিয়ে পড়া ভালো।

জেলে যাওয়ার জন্য প্রথমেই যেটা দরকার সেটা হল একটা গুণ্ডামি, বা চুরি, বা ডাকাতি, বা খুন। খুন অবশ্য হারু কোনদিন করেনি। ডাকাতিও না। ইচ্ছে আছে একবার ব্যাঙ্ক ডাকাতি করার। চুরি করতেই পারে। তবে আজ একদমই সেসব ইচ্ছে করল না। "যাই একটু হুজ্জুত করি, আমাকে জেলে ঢোকাবেই।"

প্রথমেই বাসে উঠল হারু। এই জেলা শহরে বাস বেশ কম। তাও আছে কতিপয়। বাস প্রায় ফাঁকাই ছিল। উঠেই একটা সিট পেয়ে গেল হারু। জানালার ধারে নয় অবশ্য। পাশে এক বয়স্কা মহিলা বসে ঢুলছিলেন। খানিকক্ষণ বাদেই কন্ডাক্টার এসে টিকিট চাইলেন। হারু "দিচ্ছি দিছি" বলায় এগিয়ে গেলেন কন্ডাক্টার।  এভাবে বেশ কয়েকবার হওয়ার পর কন্ডাক্টারবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন

"আর দাদা, অনেক তো দিচ্ছি দিচ্ছি করলেন, এবার দিন।"
"না আসলে, আমার কাছে টাকা নেই।"
"নেই মানে? তাহলে এতক্ষণ ধরে ভণ্ডামি করছিলেন। জানেন বাসের ভাড়া না দিলে জেল হতে পারে?"
"হোক না, মানে  ..."

এই সময় পাশের সিটের ঘুমন্ত মহিলা বলে উঠলেন -- "কত ভাড়া,  আমি দিচ্ছি।"

উনি যে কখন ঘুম ছেড়ে উঠেছেন হারু খেয়ালই  করেনি। বোধহয় কন্ডাক্টারের চেঁচামিচিতে।

"না,  না, আপনি কেন?" -- হারু জেলে যাওয়ার এরম সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ।

"তা কেন বাবা, তুমি তো আমার ছেলের বয়সী। জানো আমার ছেলে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আমায় ছেড়ে কোথায় চলে গেল, আর ফেরেনি..."

একেই টিকিট কেটে দেওয়ায় রাগ, তার উপর এই গল্প। হারু বাধ্য হয়ে পরের স্টপেজে নেমে পড়ল। নাহ, খিদে পেয়েছে। একটা কিছু খেতে হবে। হ্যাঁ, ভালো প্ল্যান এসেছে মাথায়। আগে খাওয়া যাক। তারপর নাহয় টাকা নেই বললে যদি জেলে দেয়।

প্রথমেই শহরের সবচেয়ে নামী রেস্তোরাঁতে গেল হারু। সেখানে অবশ্য তার ছেঁড়া কাপড় দেখে দারোয়ান তাড়িয়ে দিল। এবার পাশের একটা ভাতের হোটেলে গেল হারু। এখান থেকে জেলে যাওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু আগে খাওয়া তো যাক।

ঢুকে বেয়ারাকে জিজ্ঞেস  করল হারু -- "মাছ কি কি আছে?"

"আজ্ঞে, রুই, কাতলা, কই, ট্যাংরা, পাবদা।"

"যাও দেখি, ভাত আনো আর সঙ্গে এক প্লেট কই আর এক প্লেট ট্যাংরা।"

আহ, আজ ভালো করে খাওয়া যাবে। মালিকটা বেশ নাদুস নুদুস একটা  লোক। হয়ত একটু মারামারি করলে পুলিশ ডাকবে। টেলিফোনও আছে দেখছি দোকানে। মালিক কালো ফোন কানে নিয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে।

ভাত, আলুপোস্ত, ডাল, ঝিরঝিরে আলুভাজা আর দু প্লেট মাছ এল টেবিলে। সবে পোস্ত দিয়ে ভাত মাখতে যাবে হারু, এই সময় মালিক হঠাৎ ফোন রেখে তার দিকে এগিয়ে এলো। একিরে বাবা, এই লোকটা কি জানে হারু চোর?

"আপনি দাদা ঈশ্বর।" -- হারুর এঁটো  হাতদুটো জড়িয়ে ধরল  মালিক।

"সেকি? কেন?"

"আমার বউ পোয়াতি। কিন্তু কি এক অসুখের জন্য ডাক্তার  বলেছিল বাচ্চা নাও বাঁচতে পারে। এখনি আমার শালা ফোন করে জানাল আমার মেয়ে হয়েছে। বউ ভালো আছে। আমি তো দোকান ছেড়ে যেতে পারছি না। তাই ভীষণ চিন্তায় ছিলাম। আপনি এলেন আর শালার ফোন এল। ওরে, এই দাদার কাছ থেকে আর পয়সা নিস না। দাদা, শুধু মাছ খাচ্ছেন কেন? আমাদের এখানকার মাংস খেয়ে যান।"


রাতে এসে সেই পার্কের বেঞ্চে শুল হারু। দুনিয়াটাই শালা বেইমান। জেলে যাব, তাও যেতে দেবেনা। যাকগে ঘুম দি।

"সকালে ঘুম ভাঙল গানের আওয়াজে। পার্কের পাশেই মিশন স্কুল। সেখানে সকালবেলা প্রার্থনা সঙ্গীত হয়। গানটা চেনা চেনা না? হ্যাঁ এটা তো আনন্দলোকে, মঙ্গলালোকে। হারুর মা এই গানটা গাইতে ভীষণ ভালোবাসতেন। মায়ের একটা গানের স্কুল ছিল। বাবার ফ্যাক্টরি লক-আউট হওয়ায় বাবা যখন আত্মহত্যা করলেন, তখন মায়ের স্কুলটাও গেল, হারুর পড়াশুনাও। তাও পাড়ায় ছোটখাটো কাজ করে চলত হারুর। মা লোকের বাড়ি কাজ করতেন। কিন্তু এভাবে চলছিল না। তাই পাড়ার গুলেদার কাছে হারু  মহাবিদ্যার  ট্রেনিং নিল। প্রথমবার জেলে যাওয়ার সময় মায়ের সঙ্গে দেখা করেনি হারু। লজ্জায়। ফিরে এসে আর মায়ের  দেখা পায়নি হারু।

আজ এই পার্কের গেটে বসে মায়ের  কথা মনে পড়ে গেল হারুর। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল স্কুলের পাঁচিলের দিকে। মনটা আজ সকালে যেন কেমন শান্ত হয়ে পড়েছে। আচ্ছা, হারু কি সারাজীবন চোর হয়ে থাকবে? কেন, ভালো কিছু তো করতে পারে। শীত কাটানোর জন্য জেলে যাওয়ার কি দরকার? ঐ ভাতের হোটেলের মালিককে গিয়ে বললে হয় না বেয়ারার চাকরি দিতে। তেমন হলে রাতটা ঐ হোটেলের বেঞ্চিতেই কাটাবে হারু। মালিক তো কাল কত খাতির-যত্ন করলেন, হয়ত বললে এই চাকরিটায় দিয়ে দেবেন। বলেই দেখি না।

"কে  এখানে হারু চোর না?"

কখন পাশে এক পুলিশ এসে দাঁড়িয়েছে দেখতেই পায়নি হারু।

"কি করছিস স্কুলের গেটের বাইরে?"

"না, স্যার, মানে এই গান শুনছিলাম।"

"গান শুনছিলাম। গুল মারার আর জায়গা পাওনি। আজ স্কুলে রাজ্যপাল আসবেন শুনেই চলে এসেছ? ভিড়ের মধ্যে যদি কিছু গছানো যায়, তাই তো? চল, জেলে চল। ওটাই তোর যায়গা। ওখানে গিয়ে গান শুনিস। এই, কে আছিস, এটাকে গাড়িতে তুলে চালান দে।"


Wednesday, October 10, 2018

স্মৃতি

ট্রেনটা যখন হাওড়া স্টেশন থেকে গা ঝাড়া দিয়ে বেরোলো, তখন কামরায় রতনবাবু একা নন। তবে লোক খুব বেশি নেই। বেশ ফাঁকা ফাঁকা কামরা। তাঁর সিটের উল্টোদিকে এক বয়স্ক ব্যক্তি বসে। ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত। বেশ নোংরা জামাকাপড়। হয় ঠিক মত পরিষ্কার করেননা, অথবা সারাদিনের ধকল গেছে। ভদ্রলোকের সঙ্গে একটা চটের বড় থলে। তিনজনের সিটে তিনি একা। ওপাশের একদিকে এক মা-ছেলে বসে। ছেলেটির বয়স বড়জোর সাত-আট হবে। ছেলেটি বসে বসে এক মনে বই পড়ছে। কি বই কে জানে। তাঁদের উল্টোদিকে দুজন ছেলে। কলেজে পড়ে বোধহয়। ছুটিতে বাড়ি ফিরছে।

লোকাল ট্রেনের কামরা। বাদামী রঙের সিট। জানালার রেলিং-এ জং ধরেছে। দেওয়ালে লেখা "রেলের সম্পত্তি আপনার সম্পত্তি"। পড়ে হাসলেন রতনবাবু। তিনি যখন ছোট ছিলেন, প্রায়ই খবর আসত ট্রেনের পাখা, জানালার পাল্লা, এসব নাকি কেউ চুরি করেছে। একদিন তাঁর বাবা বলেছিলেন --

"আসলে কি বলতো, লেখা থাকে না, রেলের সম্পত্তি আপনার সম্পত্তি? লোকে ভাবে আমার সম্পত্তি তো এখানে কেন, বাড়ি নিয়ে যাই।"

হাওড়া পার করে ট্রেনটা কারশেডের পাশ দিয়ে চলল। এই ট্রেনের নিত্যযাত্রীরা এখানটাকে "হালুয়া" বলে -- মানে, হাওড়া আর লিলুয়ার মাঝে। অনেক আপ ট্রেনই এখানে থামে। কেউ কেউ এখানেই নেমে যান।

লিলুয়া এলে রতনবাবু এক কাপ চা কিনলেন। পার্স খুলে চায়ের দাম দিতে গিয়ে দেখলেন সেই ছোটবেলার একটা দুটাকার নোট। ভারতবর্ষের এক কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি দেওয়া।  ঐ নোটটা চাওলাকে দিয়ে চা খেতে লাগলেন। লিলুয়া থেকে একটি ছেলে উঠল। ছেলেটি তাঁর পাশেই বসল। পরনে স্কুল ইউনিফর্ম।

"কোন স্কুল তোমার?"
"ডন বস্কো, লিলুয়া।"
"কোন ক্লাস?"
"ক্লাস সেভেন।"
"বাড়ি কোথায়?"
"মধুসূদনপুর।"

ছেলেটার সঙ্গে আলাপ জমে গেল। ছেলেটির বাবা ডাক্তার। পড়াশুনোয় ভাল ছেলেটি। ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যেই থাকে নিয়মিত। বই পড়তে ভালোবাসে। প্রিয় লেখক অনিল ভৌমিক। শুকতারা নেয় প্রতি মাসে। গর্ব করে বলল

"জানেন, দাদুমনি আমার চিঠি ছেপেছিলেন।"
"বাহ, তুমি খেলাধুলা কর না?"
"করি তো। ক্রিকেট খেলি।"
"বাহ, ব্যাটসম্যান না বোলার?"
"বোলার। কপিল দেবের মত।"

রতনবাবু বুঝলেন ছেলেটির প্রিয় খেলোয়াড় কপিল।

"তোমার আর কি ভালো লাগে?"
 "আমার খুব ছবি আঁকতে ভালো লাগে।"
"কিসের ছবি?"
"এই জায়গার। পাহাড়, সমুদ্র, মাঠ।"
"তুমি সমুদ্র দেখেছ?"
"না, বাবা বলে প্রতিবার পুরী নিয়ে যাবে। যাওয়া আর হয়না। বইয়ে ছবি দেখেছি। আপনি দেখেছেন?"
"হ্যাঁ, তা দেখেছি।"
"ছবি এঁকেছেন?"
"না, আমি তো ভালো আঁকতে পারিনা।"

মধুসূদনপুরে ছেলেটি নামা অবধি রতনবাবু ওর সাথেই গল্প করে গেলেন। জনাই-এ এক ঝালমুড়ি ওয়ালা উঠেছিল। তিনি ছেলেটিকে ঝালমুড়ি কিনে দিলেন। নিজেও খেলেন। ছেলেটি খেতে চায়নি।

"বাবা বলেছেন, ট্রেনে অপরিচিত কারুর থেকে কিছু না খেতে।"
"সেটা তোমার বাবা ঠিকই বলেছেন। তবে কিনা, এটা তো কেনা ঝালমুড়ি। তুমি নিজেও পয়সা দিয়ে খেলে একই হত।"

ট্রেন নবগ্রাম পেরোতেই আকাশ অন্ধকার হতে শুরু করল। জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকলেন রতনবাবু। একটা ছেলে একদল গোরু চরিয়ে বাড়ি ফিরছে। ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে একটা লোক গান করতে করতে কোথায় হেঁটে গেল। বোধহয় আংটি চাটুজ্যের ভাই।

ওপাশের বাচ্চা ছেলেটার হাতের বই এবার দেখতে পেলেন রতনবাবু। গোলাপি মলাটের বই। "একের পিঠে দুই"। এখানেই "বোসপুকুরে খুনখারাপি" আছে, মনে পড়ল তাঁর। কলেজের ছেলে দুটো এক মনে কিসব বলে হাসছিল। উল্টোদিকের বয়স্ক মানুষটি ঘুমিয়ে কাদা।

শক্তিগড়ে ট্রেন থামতেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন রতনবাবু। নামবেন?

এই সময় তাঁর কাঁধে একটা হাতের ছোঁয়া পেলেন।

"বাবা, অনেকক্ষণ হয়েছে। এবার শুতে যাও।"

চোখ খুলে বুঝতে পারলেন তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়ার মিলপিটাসে। ছেলের বাড়ি। মাথা থেকে যন্ত্রটি খুলে ফেললেন রতনবাবু। এই যন্ত্রটি তাঁর ছেলে কয়েক মাস হল কিনেছে। মাথায় পরলে এটি পুরনো স্মৃতি তুলে এনে নিজের মত গল্প বানিয়ে দেয়। মনে হয় যেন রতনবাবু নিজেই সেই যুগে ফিরে গেছেন। অথচ তাঁর বয়স এখনকার মত।

"চল শুতে যাই, কটা বাজে?"
"রাত বারোটা। তুমি তো খাওয়ার পর থেকেই এই নিয়ে আছো। তাই সময়ের খেয়াল নেই। তা আজ কোথায় গেলে? শক্তিগড় না মধুসূদনপুর?"




Wednesday, September 5, 2018

শেষ বেলার গোল

-- বিলু, তুই গোলটা বানা।
-- ওদের ইট নেব?
-- না, আমাদের গুলো কই?
-- আছে, কিন্তু দেখ ওদের নতুন ইট। ভালো হবে।
-- হোক, আমাদের গুলোই নে।
-- আজ কত পা?
-- আজ তো সবাই আছে, দশ পা কর।
-- করছি।

বিলু যে খুব একটা খুশী না বুঝতে পারলাম। কিন্তু শুভদার মুখের ওপর কথা বলার স্পর্ধা আমাদের নেই। আজ সবাই এসেছে মাঠে। কারণ আজকেই আমাদের এ মাঠে শেষ খেলা। আমাদের পাড়ার এই মাঠটায়  আমরা ছোটবেলা থেকে খেলে এসেছি। এই মাঠ কার, কেন এরকম খালি পড়ে আছে, কোনদিন মাথায় আসেনি। মাথায় এলো কয়েক সপ্তাহ আগে। এরকমই বিকেলে আমরা খেলছি এই সময় একদল লোক একটা জিপ গাড়ি করে এসে নামল।

-- এই যে খোকারা, এই মাঠে খেলা বন্ধ করতে হবে।
-- মানে?
-- এই মাঠ দত্তবাবুর। তিনি আমাদেরকে এই মাঠ বেচে দিয়েছেন, এখানে ফ্ল্যাটবাড়ি হবে।
-- বললেই হল?
-- আরে কাগজ আছে আমাদের। শোন, আজ থেকে এই মাঠে খেলা বন্ধ কর।

তারপর কয়েকদিন আমাদের সত্যি খেলা বন্ধ থাকল। আমাদের বাবারা কন্ট্রকটারের সঙ্গে কথা বোলে একটা মিটমাট করলেন। বাড়ি তৈরি শুরু হওয়ার আগেরদিন পর্যন্ত আমরা মাঠে খেলতে পারি। তাই আজকেই শেষ দিন।

খেলা শুরু হয়ে গেল। পিন্টু আমাদের গোলে। রানা ওদের। আজ সবাই আসায় বেশ জমজমাট খেলা চলল। সানির স্বভাব মেরে খেলা। আজো মারল আমায়। আমি "ফাউল" বোলে বসে পড়লাম। অন্যদিন হলে সানি চলে আসত ঝগড়া করতে; আজ কিছুই বলল না। মাঠের এক ধারে ইট ফেলা। শুভদা বোলে দিয়েছে, ওদের ইট ছোঁয়া যাবে না। তাই ওটাই আজ থ্রো লাইন।

এর মধ্যে কৌশিকের পাস থেকে ওদের হয়ে গোল করে দিল আকাশ। কিন্তু পিন্টু মানতে চায় না ওটা গোল। বল নাকি ইটের ওপর দিয়ে গেছে, তাই গোল না। আমাদের মাঠের এই সমস্যা। গোলপোস্ট নেই। তাই দু দিকে ইট দিয়ে গোল করে খেলা হয়। এইরকম গোল নাকচ লেগেই থাকে।

খেলা ড্রই চলল। একদম শেষদিকে শুভদার বাড়ানো বল আমি সোজা রানার পায়ের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিলাম। শুভদা অন্যদিন হলে হাত মেলাতে আসত। আজ এলোই না।

খেলা শেষ। সবাই মাঠে বসে আছে। রোজই এভাবে আমরা বসে থাকি খানিকক্ষণ খেলার পর। এমনি আড্ডা হয়। খেলা নিয়ে, স্কুল নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, কাকাবাবু না অর্জুন নিয়ে। আজ সেসব হল না। সবাই যেন কেমন ঝিম মেরে আছে। প্রথম কথা বলল শুভদা

-- আগেরদিন যখন খেলা বন্ধ করেছিল, তখন একটা চমক লেগেছিল। ভাবতেই পারিনি একদিন আমরা আর এই মাঠে খেলতে পারব না। আজকেরটা যেন আরও কষ্টের। তাই না?