Tuesday, October 22, 2019

স্বাধীনতা দিবস

(ও' হেনরির একটা গল্প নিজের মত করে লিখলাম)


আজ ১৫ই অগস্ট। দুপুরে জম্পেশ খাওয়া হবে হরির। এমনিতে তার অবস্থা খুব একটা ভালো না। বেশিরভাগ দিন-ই দুবেলা খাওয়া জোটেনা। মাঝে মাঝেই রাত্রে ঐ হোটেলের কাঙালি ভোজনে পেট ভরায় হরি। তবে আজ ভালো খাওয়া হবে। পোলাও, পাঁঠার মাংস, পায়েস। এই দিনে প্রচুর ক্লাবে গরীবদের ডেকে খাওয়ায়। অনেকে ক্লাবের বাইরে  নিজের থেকে খাওয়ায়। হরি শুনেছে সামনের বছর স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি, হয়ত আরো ভালো খাওয়া হবে। আচ্ছা, এদেশের লোকেদের কেন মনে হয় যে গরীবদের শুধু স্বাধীনতা দিবসের দিন খিদে পায়?

তবে হরির আলাদা ব্যবস্থা আছে। হরি গত পাঁচ বছর ধরে পাড়ার নেতাজী মূর্তির নিচে বসে থাকে। অবিনাশবাবু আসেন। হরিকে নিয়ে যান "কালীমাতা ভোজনালয়"। তারপর পেট পুরে আহার। অবিনাশবাবু খান না কিছুই। পুরো পয়সা উনি দেন। গত পাঁচ বছর ধরে এই আয়োজন। হরি শুনেছে অবিনাশবাবু নাকি যুবা বয়সে স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। জেলেও গেছেন কয়েকবার।

আজ কিন্তু হরির অন্য মুশকিল। তরুণ সঙ্ঘ থেকে আজ বিরিয়ানি খাওয়ানো হচ্ছিল। হরি এই সুখাদ্যের নাম শুনেছে বহুবার। কিন্তু কোনদিন খায়নি। পয়সাই নেই তো খাবে কী। আজ তাই লোভ সামলাতে না পেরে সেখানে পেট ভরে খেয়ে এসেছে। মুস্কিল হচ্ছে একটু বাদেই অবিনাশবাবু আসবেন। ওনার সঙ্গে না খেলে যদি ওঁর মনে আঘাত লাগে? হরি কি করবে বুঝতে পারছে না। পেট একদম ভরা যে!!

অবিনাশবাবু এলেন। সেই এক পোশাক। সাদা পাঞ্জাবী আর পাজামা। যদিও প্রতিবারের মত এবার পরিষ্কার না। বেশ নোংরা। যেন অনেকদিন কাচা হয়নি। এসে হরিকে ডাকলেন। হরি না করতে পারলো না। কালীমাতা ভোজনালয়ের খাবার বেশ ভালো। হরি ভরপেটের উপর-ও ভরে যেতে লাগল। হরি যদি স্কুলে পড়ত কোনদিন জানত একে রসায়নে বলে super saturated. অবিনাশবাবু বললেন -- "পেট ভরেছে তো?"

হোটেল থেকে বেরিয়ে অবিনাশবাবুকে বিদায় জানিয়ে হরি দু পা হাঁটতে গিয়ে উল্টে পড়ল। ঐ অবস্থায় পড়ে আছে দেখে হরিকে পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা হাসপাতালে নিয়ে গেল ভ্যানে করে। সেদিন হাসপাতালে আরো একজন ভর্তি হলেন। অবিনাশবাবু। বিকেল বেলা অবিনাশবাবুর মৃত্যুর পর হাসপাতালের দুই ডাক্তারকে নিজেদের মধ্যে বলতে শোনা গেল --

"বুড়োটা কেন মরল জানো? তিনদিন কিছু খায়নি। শুনেছি নাকি হাতে একদম পয়সা ছিল না।" 

Friday, October 18, 2019

শীতের বিকেল

ডালাস শহরে হাল্কা ঠাণ্ডা পড়েছে। আজ বিকেলে ডিপার্টমেন্ট থেকে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিচ্ছি, এমন সময় চোখে পড়ল সামনের গাছের উপর বিকেলের সূর্যর আলো। সবুজ পাতার উপর এক সোনালি রং। মনে পড়ে গেল আমার ছোটবেলার স্কুল জীবনের কথা। তারাবাগ বাস স্ট্যান্ড থেকে বাড়ি ফিরতাম তারাবাগ মাঠের উপর দিয়ে। সে জায়গাটা হেঁটে হেঁটে এক মেঠো পথে পরিণত হয়েছিল। শীতের দিনে বাড়ি ফেরার সময় চোখ থাকত ঐ গাছগুলির উপরে। যতক্ষণ আলো, ততক্ষণ খেলা হবে। ৫ ওভার, বা ৩ ওভারের দুটো ম্যাচ খেলা হত। কখনো লোক কম হলে ওয়ান ড্রপ ওয়ান হ্যান্ড। মনে আছে বাড়ি ফিরলেই মা কানে হাত দিয়ে বলত -- "কানটা ঠাণ্ডা, একটু আগে আসতে পারিস না?"

গেন্সভিলে যখন পড়তে যাই, তখনো শীতের বিকেল এক আলাদা আমেজ আনত। একেই গেন্সভিল প্রায় আমার দ্বিতীয় বাড়ি। মনে পড়ে গত বছর এক কাজে ওহায়োর এক শহরে গেছি। দেখি এক জায়গায় লেখা I-75. ম্যাপ খুলে দেখি এই সেই রাস্তা যা সোজা গেন্সভিল গেছে। কতবার গেন্সভিল থেকে অন্য কোথাও যেতে গেলে এই রাস্তা ধরে যেতাম। আজ সেই রাস্তাকে এত দূরে দেখে মনে হল যেন বাড়ি ফেরার রাস্তা দেখছি। যাই হোক, গেন্সভিলে যখন ল্যাব থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরতাম, তখনো এই গাছের পাতায় শেষ বিকেলের আলো দেখে মনে পড়ত তারাবাগের কথা। হাল্কা শীতে ঠোঁট ফাটে, একটু বেশি ঘুম পায়। আমাদের ডিপার্টমেন্টের পাশেই ছিল সেঞ্চুরি টাওয়ার। টাওয়ারের গাইয়ে সেই আলো পড়ত। পাশেই ছিল মিউজিক ডিপার্টমেন্ট। সেখানকার ছাত্রদের গানের প্র্যাকটিসের সময় তখন। পাতা ঝরানো সেই বিকেলে, ঐ গানের তালে, ঐ আলোর খেলায় বার বার বাড়ির জন্য মন খারাপ করত। আর কোনদিন কি তারাবাগের মাঠে খেলতে পারব?

আজও করল।


Friday, September 20, 2019

বিবর্তন

রামহরিপুর বাজারের "মা কালী মেডিকো"-র মালিক জীবনবাবু। মালিক বলতে ভাববেন না তাঁর নিজের বানানো ব্যবসা। দোকানটি আদপে জীবনবাবুর বাবা শ্যামল সেনগুপ্তর। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে দোকানের ভার জীবনবাবুর। তা দোকান মন্দ চলে না। এই অঞ্চলে সবচেয়ে নামকরা ওষুধের দোকান ঐটি। জীবনবাবু রোজ সকাল আটটার মধ্যে এসে দোকান খুলে দেন। দুপুরে ঘণ্টা খানেকের জন্য বাড়ি যান আহার করতে। আবার সন্ধ্যে সাত্টা বাজলেই দোকানের ঝাঁপ ফেলেন। তাঁর বাড়ি কাছেই। সাইকেলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যান। বাড়ি ফিরে সন্ধ্যে সাতটার খবরের খেলার অংশটুকু শুনতে পান। জীবনবাবুর সাদামাটা জীবন। এটি সাদামাটা যে রাতে স্বপ্নও দেখেন না।

একদম নিপাট ভালোমানুষ বলতে যা বোঝায় জীবনবাবু তাই। কারুর সঙ্গে ঝগড়া করেন না। কেউ খারাপ কথা বললে বা অপমান করলেও "থাক কী হবে ঝগড়া করে" ভেবে চুপ করে থাকেন। এমনকি হাতে কোন মশা এলেও তাকে না মেরে ফু দিয়ে ওড়ানোর চেষ্টা করেন। তাঁর স্ত্রী দীপা কিন্তু তাঁর এই চুপচাপ থাকা একেবারেই ভালোভাবে নেন না। হরদম বাড়িতেও কথা শুনতে হয় জীবনবাবুকে। তিনি যে অপদার্থ, তাঁর যে শিরদাঁড়া নেই,  তিনি ভিতু একথা শুনে শুনে কান পচে গেল। সোজা কথায় তাঁদের দাম্পত্য জীবন খুব একটা সুখের না। তাই সই।

জীবনবাবুর জীবন হয়ত এভাবেই চলত যদি না সেদিন ভোলা ঐ মশাটাকে মারত। ভোলা দোকানে কর্মচারী। তখন সবে সন্ধ্যা হবে হবে। ভোলা কচ্ছপ ধূপ জ্বালায়নি। একটি মশা এসে জীবনবাবুর হাতে বসল। জীবনবাবু হয়ত ফু দিতেন, কিন্তু তার আগেই ভোলা এসে এক থাপ্পড়ে মশাটাকে মেরে ফেলল। মশাটি বোধহয় প্রচুর রক্ত খেয়েছিল। বেশ খানিকটা রক্ত জীবনবাবুর হাতে লেগে রইল।

এরপর পর পর দশদিন জীবনবাবু রোজ একটি করে মশা মারলেন। রামহরিপুরে মশার অভাব নেই। কাজেই এটা অসম্ভব কিছু না। জীবনবাবুর প্রথম প্রথম মনে খিঁচ খিঁচ করত। আহা কেন মারলেন! মশাই তো। প্রাণ আছে। কিন্তু এর সঙ্গে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে লাগল যা জীবনবাবুর মন পাল্টে দিল। রোজ মশা মারার পর তাঁর জীবনে ভালো কিছু ঘটতে লাগল। যেমন একদিন তার মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হল। জীবনবাবু বহুদিন লটারির টিকিট কাটেন। কোনদিন কিছু জোটে না কপালে। একদিন খবর পেলেন তিনি লটারিতে একটা হাতঘড়ি জিতেছেন। প্রথম প্রথম জীবনবাবু বুঝতে পারেননি। আস্তে আস্তে বুঝলেন, অবাক হলেন আর মেনে নিলেন।

এর মধ্যে এক কেলেঙ্কারি হল। রামহরিপুরের এম এল এ-র ছেলের গাড়ির আঘাতে মুদির দোকানি বিমলের পা ভাঙল। এম এল এ ফিরেও তাকালেন না। তখন রমহরিপুর ব্যবসায়ী সঙ্ঘের সকলে মিলে এর প্রতিবাদে আন্দোলন করলেন। আজকাল জীবনবাবুর মনে সাহস বেড়েছে। তিনি আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন। যদিও আন্দোলন করে বিমলের কোন লাভ হলনা। এম এল এ একই রকম নিঃস্পৃহ থাকলেন। ব্যবসায়ীরা আবার দোকান খুললেন। লাভ হল বিরোধীপক্ষের প্রধান শ্যামলবাবুর। পরের ইলেকশনে উনি রামহরিপুর থেকে জিতলেন।

ইদানীং পাড়ায় একটা বিড়ালের উৎপাত শুরু হয়েছে। রোজ ভোর রাতে বিড়ালটির চিৎকারে জীবনবাবুর ঘুম ভাঙ্গে। একদিন জীবনবাবু ঠিক করলেন এভাবে আর চলছে না। এর হেস্ত নেস্ত করতে হবে। ভোর রাতে এলার্ম দিয়ে ঘুম থেকে উঠলেন। তিনি আর দীপাদেবী আলাদা শোন বহুদিন থেকেই। কাজেই বাড়ির আর কেউ বুঝতেও পারলনা। ফ্রিজ থেকে এক টুকরো মাছ বের করলেন। কাল দোকান থেকে আনা শিশিটা পুরো খালি করে দিলেন। মাছ ভর্তি পাত্রটি রেখে এলেন বাড়ির বাইরে। আধ ঘণ্টা বাদে বাইরে এসে বিড়ালটির নিথর দেহ দেখে জীবনবাবুর মনে এক অদ্ভুত প্রশান্ত ভাব এল। জীবনবাবু একটি কালো থলেতে বিড়ালটিকে ভরে সাইকেলে করে রেল লাইনের ধারে বড় ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এলেন। সাইকেল স্ট্যান্ড করে যখন বাড়ি ঢুকলেন তখনও সুর্য ওঠেনি।

সেদিন দুপুরে দোকানে বসে আছেন জীবনবাবু। এই খানিকক্ষণ আগে খেয়ে এসেছেন। দোকানের ফোন বেজে উঠল।

"জীবনবাবু, ভালো আছেন? আমি শ্যামল চক্রবর্তী বলছি।"
"হ্যাঁ এম এল এ সাহেব, বলুন।"
"তেমন কিছু না, ঐ এবারের ব্যাবসায়ী সঙ্ঘের সভাপতি হিসেবে আমাদের পার্টি কিন্তু আপনাকেই ভাবছে।"
"আমি?"
"কেন নয়? যেভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাতে আমরা মনে করি আগামী দিনে আপনি আমাদের পার্টির একজন নামকরা নেতা হতে পারবেন। না করবেন না প্লিজ।"

সভাপতি হওয়ার পর ধীরে ধীরে পার্টি অফিসে যাতায়াত বাড়ল জীবনবাবুর। অবস্থাও ভালো হতে শুরু করল। বাড়িটা তিনতলা করলেন। একটা মারুতি গাড়িও কিনলেন। যা মনে হচ্ছে সামনের বছর মিউনিসিপালটি নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হলেও হতে পারেন। কিন্তু এর সঙ্গে পালটালো জীবনবাবুর জীবনযাপন। মদটা কোনদিন খেতেন না। আজকাল প্রায়ই শ্যামালবাবুর সঙ্গে সুরাপান করেন। পার্টির আর এক নেত্রী কমলিকাদেবীর সঞেও জীবনবাবুর ঘনিস্টতা বাড়ল। দুর্জনে নানান কথা বলতে লাগল। কিছু সত্যি, কিছু সত্যি হলে হয়ত ভালোই লাগত জীবনবাবুর।

এর মধ্যে এক সন্ধ্যায় জীবনবাবুকে একা ঘরে কিছু বললেন কমলিকাদেবী। জীবনবাবু উত্তর দিলেন -- "দেখি।"

এক সপ্তাহ বাদে গাড়ি করে বাপের বাড়ি শিউড়ি যাওয়ার পথে এক্সিডেন্টে প্রাণ হারালেন দীপাদেবী। দুর্জনে অনেক কিছু বললেও সুজনে বলল -- "জীবনবাবুর মত মানুষ হয়না। স্ত্রীকে কি ভালোবাসতেন ভাবো। কান্নায় ভেঙ্গে পড়া মানুষটা কিন্তু সবার কথা ভাবেন। ড্রাইভারের ছেলের সারা জীবনের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন। কজন হয় এরকম?"

সেদিন রাত্রে আবার ফোন এল শ্যামলবাবুর। মিউনিসিপালটি নির্বাচনে জীবনবাবু প্রার্থী। রাতে শুয়ে একটু অস্বস্তি লাগছিল জীবনবাবুর। আলাদা শুলেও বাড়িতে একটা লোক তো ছিল। আজ তিনি একা। অবশ্য এটা হয়ত সাময়িক।

সেদিন রাতে স্বপ্ন দেখলেন জীবনবাবু। স্বপ্নে দেখলেন মিউনিসিপালটির দরজার কাছে একটা মস্ত ডাস্টবিন। তার মধ্যে থেকে একটি বেড়াল তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছে। হেসেই চলেছে। হেসেই চলেছে।




Monday, August 19, 2019

সান ফ্রান্সিস্কো

অফিসের কাজে সান ফ্রান্সিস্কো এসেছি। চমৎকার শহর।  এক সঙ্গে পাহাড়, সমুদ্র, সবই আছে। যদিও  গরমকাল, একটু  একটু হাল্কা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। একটা ছাই  রঙের হুডি কিনে নিলাম। হোটেলে চেক ইন করেই বেড়িয়ে পড়েছি। পিয়ার ৩৯-এর দিকে হাঁটছি, এমন সময় এক বুড়ো ধরল আমাকে রাস্তায়।

"ম্যাজিক না দেখতে চাইলে  একটা ডলার দাও।"

এতো ভারী মজা। লোকে ম্যাজিক দেখিয়ে টাকা চায়।  এ ম্যাজিক না দেখিয়ে টাকা চাইছে?

"খুচরো নেই।"

এই অবস্থায় আমার প্রিয় ডায়লগটা আউড়ে নিলাম।

"বেশ তবে ম্যাজিক দেখ।"

বলে হাসতে হাসতে চলে গেল লোকটা। কোথায় ম্যাজিক? কিছুই দেখাল না। অদ্ভুত তো। যাকগে। আমি হাঁটতে  লাগলাম। পিয়ার ৩৯-এ পৌঁছে একটু সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে রইলাম। এখন সূর্যাস্ত হতে চলেছে। সেই আলোয় আলোকিত গোল্ডেন গেট ব্রিজ এক অপরূপ মায়াবী চিত্র উপহার দিচ্ছে। এই  দৃশ্য যেন ম্যাজিক।  আর সামনে দাঁড়িয়ে সেই আল্কাট্রাজ দ্বীপ। যেখান থেকে কোন কয়েদী পালাতে পারত না। সূর্যাস্ত  দেখে একটা ক্রেপের দোকান থেকে ডিম ও বেকন দেওয়া ক্রেপ খেলাম।

এবার হেঁটে চললাম আমার হোটেলের দিকে। কাল  সকালে অফিসে কাজ আছে। রাতে একটু পড়াশুনো করব। আমার হোটেলের নাম হোটেল  প্যাসিফিক  ওয়ে। হোটেলে ঢুকতে গিয়ে পকেটে হাট দিয়ে বুঝলাম ঘরের চাবি ঘরেই ফেলে এসেছি।  নিজের মনের ভুলে নিজেরই হাসি পেল। যাই রিসেপ্সনে বলি। ভাগ্যিস পাসপোর্টটা পকেটে আছে। রিসেপসনে বলতেই ছেলেটি এক গাল হেসে বলল  --

"সার্টেনলি স্যার। আপনার নাম আর রুম নাম্বারটা বলুন?"
"নাম প্রকাশ সেনগুপ্ত। রুম নাম্বার ৪৬৭।"
"না স্যার আপনার কিছু ভুল হচ্ছে। আমাদের হোটেলে ৪৬৭ নম্বর রুম নেই। প্রত্যেকটি ফ্লোরে ৫০টি করে ঘর।"
"আমার স্পষ্ট মনে আছে ৪৬৭।"
"স্যার, আপনি ভুল হোটেলে আসেননি তো?"
"না। এটা হোটেল প্যাসিফিক ওয়ে তো?"
"হ্যাঁ স্যার। আচ্ছা আপনার নামটা আবার বলুন।"
"প্রকাশ সেনগুপ্ত।"
"না স্যার, ঐ নামে আমাদের কোন গেস্ট নেই আজকে। আপনার স্যার হোটেল  ভুল হয়েছে। "
"কী যা তা বলছেন!! বলছি আমি এই ঘণ্টা খানেক আগেই এখানে চেক ইন করেছি। আমার  পাসপোর্ট আপনারা ফটোকপি করে রাখলেন"
"না স্যার,  আমাদের ডিরেক্টরি তে কিচ্ছু দেখাচ্ছে না। আচ্ছা, এক কাজ করুন, আপনার  পাসপোর্টটা একবার দেবেন? হয়ত আমি নামের বানান ভুল লিখছি।"
"হ্যাঁ এই নিন।"
"থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। হ্যাঁ স্যার, এবার পেয়েছি। আপনার রুম নাম্বার ২৩১। এই নিন স্যার রুমের  চাবি। আর আপনার নাম প্রকাশ সেনগুপ্ত বললেন কেন? আপনার নাম তো সুজয় সেন।"
"কী বলছেন!!! আমার নাম আমি ভুল বলব?"
"আপনার পাসপোর্ট দেখুন স্যার। গুড নাইট স্যার। ড্রিঙ্ক রেসপন্সিব্লি।"

পাসপোর্ট দেখে চক্ষু চড়কগাছ।  তাই তো। আমার পাসপোর্টে আমার নাম সুজয় সেন।  ছবিটাও আমার না। কিন্তু ততক্ষণে আমার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। ছেলেটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘরে এলাম। না এই ঘর আমার  চেনা না। ঘরের এক ধারে যা লাগেজ আছে সেগুলি আমি কোনদিন দেখিনি।  এক ছুটে বাথরুমে।  আলো  জ্বালিয়ে আয়নায় তাকালাম। হুবহু পাসপোর্টের চেহারা।

এক ডলার দিয়ে দিলেই হত।  

Friday, January 25, 2019

মেলার মজা

ছেলেটিকে অনেকক্ষণ ধরে দেখছিলাম। একা একা দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।  মানে জোরে চেঁচিয়ে কান্না নয়, ফুঁপিয়ে  কান্না।  বছর দশ-বারো বয়স। এই বয়সের ছেলেরা চট করে কাঁদে না। বিশেষ করে এইরকম মেলার মধ্যে, সবার সামনে। চারদিকে ভিড়, তাই কেউ পাত্তাও দিচ্ছে না। একটু ছোট ছেলে হলে নাহয় হারিয়ে গেছে সন্দেহ হত। কিন্তু এই বয়সের ছেলে হারিয়ে যাবে, এরকম সম্ভবনা কম। এগোলাম ছেলেটির দিকে।

--  কিরে কাঁদছিস কেন? 
-- আমার পকেটে কুড়ি টাকা ছিল, কোথায় হারিয়ে গেল, খুঁজে পাচ্ছি না।
-- এতে কাঁদার কী আছে? বাবা বকবে?
-- মোগলাই খেতে পারবনা।
-- মানে?
-- এই  দেখুন না, মেলায়  মোগলাইয়ের স্টল। রোজই আসি মেলায়,  কিন্তু  যা হাতখরচা পাই, দুবার নাগরদোলা চরলেই শেষ হয়ে যায়। আজ দিদু  বাড়িতে এসেছে। আমাকে মেলা দেখতে কুড়ি টাকা  দিল। ভাবলাম মোগলাই  খেয়ে তারপর আবার নাগরদোলা চরব। হল না।
--  তুই  মোগলাই খাওয়ার জন্য কাঁদছিস?
--  হ্যাঁ, আমি এর আগে মাত্র একবার খেয়েছি। গতবছরের মেলাতে। আমাদের বাড়ির কাছে কেউ  মোগলাই বানায় না।
--  তা এতদিন এলি খেলি না কেন?
-- আমি তো মেলার এইদিকটায় আসিনা। ওদিকে নাগরদোলা, বেলুন ফাটানো, রিং মাস্টার,  মরণকূপ এসব দেখি। গতকাল এদিকে আসতে গিয়ে এই দোকানটা দেখলাম।
-- হুম।
-- যাই বাড়ি যাই।
--  দাঁড়া। চল তোকে একটা মোগলাই কিনে দি।
-- এ মা, আপনি কেন দেবেন?  আপনাকে তো আমি চিনি না।
-- সে ঠিক আছে। কতই  বা দাম একটা মোগলাইয়ের? কত দাম?
-- সাত টাকা। কিন্তু  আপনি  কেন দেবেন? না না, এটা ঠিক না।
--  আরে আমিও তোর মত ছিলাম। মেলায়  এসে মোগলাই খাওয়ার  মজাই  আলাদা। চল।
-- বিশ্বাস করুন, আমার কিন্তু সত্যি টাকা হারিয়েছে। মিথ্যে করে মোগলাই খাওয়ার জন্য আপনার কাছে বলিনি।
-- জানি রে বাবা, তোর মত ছেলে এসবের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদবে না।
-- আপনি খাবেন না।
-- না  রে, আমার বাইরের খাবার সহ্য  হয়না। তুই খা।


যাক, ছেলেটার  পকেট মেরে যে কুড়ি টাকা পেয়েছিলাম, তার থেকে তের টাকা বাঁচল।  এটুকু ছেলেকে মোগলাই থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। যাই এবার মরণকূপের কাছে। ওখানে অনেক লোক ভিড় করে থাকে, পকেটের দিকে নজর  থাকে  না। 

Wednesday, January 2, 2019

নয়ের দশকের গল্পঃ ২

-- সরি রে, মন খারাপ তোর?
-- নাহ, আজ সন্ধ্যাবেলা আসবি র‍্যাকেট নিয়ে?
-- যাব। কিন্তু ম্যাডাম এরকম ক্লাসে সবার  মধ্যে তোর জেঠুর কথা বললেন?
-- তো কি করব বল?  তখনকার মানুষ বুঝত না ইন্টারনেট কত খারাপ। আমার জেঠুর অসুখটা তো প্রথম হয়নি। তখনকার দিনের অনেকেরই এই  ক্যানিংহ্যাম সিন্ড্রোম হয়। অত্যধিক ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে লোকে একা হয়ে যেত, আস্তে আস্তে কথা বলতে ভুলে যেত। আমার জেঠুর মাত্র আঠারো বছর বয়সে এটা  হয়। সারাদিন নাকি ফেসবুক আর টুইটার নিয়ে বসে থাকত। তার  ফল।
-- সেদিন ক্লাসে যখন ফেসবুক পড়ানো হল আমি তো  অবাক।  লোকে  এরকম  ছিল আগে?  ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাকি  ওভাবে গল্প করত অন্যদের সঙ্গে, যাদের চোখেও দেখতে পারছে না। আবার নাকি ঝগড়াও করত।
-- সত্যি। এইসব পাগলামি করার ফলেই  আজ এই  হাল।
--  না সেটা না, সাইবার যুদ্ধের সঙ্গে ফেসবুকের সম্পর্ক নেই।
-- তা ঠিক,  তবে ভেবে দেখ সাইবার যুদ্ধ কীভাবে শুরু হয়েছিল?
-- হুম। যাকগে, আসছি একটু বাদে। তুই ককটা  আনবি?
-- হ্যাঁ।

সন্ধ্যা সাতটার সময় পাড়ায় যখন রোলের দোকানে ভিড় জমতে শুরু করল, তখন ল্যাম্পপোস্টের আলোয় টেবিল টেনিস র‍্যাকেট আর শাটল কক নিয়ে মানিক আর তার বন্ধু তমাল খেলতে শুরু করল।  আধঘণ্টা খেলার পর খেলা  বন্ধ করতে হল।  কারণ সেখানে  এসে পড়েছে তাদের স্কুলের  বন্ধু  রোহণ। খুব  উত্তেজিত দেখাচ্ছিল রোহণকে।  এসেই  ওদের বলল

--  চল এখান থেকে, কথা  আছে।

-- কি   কথা, এখানেই বল না। খেলতে খেলতে শুনি। 

মানিকের  খেলা  ছেড়ে যাওয়ার কোন  শখ নেই।

-- না,  এখানে বলা যাবেনা। সাজগোজের গল্প। 

এখানে একটা কথা বলা দরকার। এই ২০৯৩ সালে সাইবার  যুদ্ধের কথা জনসমক্ষে বললে লোকে  সন্দেহ  করে। এখনো সাইবার যুদ্ধের ভীতি সবার মন থেকে যায়নি। তাই তমাল, মানিক  আর রোহণ সবার সামনে সাইবার যুদ্ধ না বলে  সাজগোজ বলে। প্রথমে সাযু বলত, কিন্তু একদিন মানিকের মা সেটা ধরে ফেলেন আর  প্রচণ্ড তিরস্কার করেন। তাই এই নাম।

খেলা  ছেড়ে তিনজন মিলে  হাজির হল মসজিদপাড়ার মাঠে। তখনও কয়েকটা গরু চরে বেরাচ্ছে। আসে পাশে রিকশার হর্ণ ছাড়া  আর কিছুই শোনা যায়না।

--  এই দেখ,  এটা  পেয়েছি।

--  কি এটা?

-- এটা আমার  দাদুর  ডায়রি।

-- তোর দাদু, মানে  সাইবার যুদ্ধে যিনি ভারতবর্ষের অন্যতম অপরাধী ছিলেন। যাঁকে যুদ্ধের পর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি?

--  আহ মানিক, ভুলে যাস না, তুই রোহণের দাদুর  সম্বন্ধে  বলছিস।

--  না না, ঠিক  আছে।  আমার দাদু অপরাধী ছিলেন আমাদের পুরো  পরিবার জানে। দাদুকে নিয়ে  আমার কোন  আলাদা সেন্টিমেন্ট  নেই।

-- তো কি আছে সেই  ডায়রিতে?

-- জানি  না, বাড়িতে বললে ঐ ডায়রি পুলিশকে দিয়ে  দিত। জানিস  তো সরকার নিয়ম করেছে সাইবার যুদ্ধের অপরাধীদের সব জিনিস বাজোয়াপ্ত  করার। আর  আমাদের পরিবারের উপর আলাদা  নজর থাকেই পুলিশের।

--  সেই ডায়রি কই?

-- এই যে। তুই  রাখবি?

-- আমি রাখলে আমার মা ধরে ফেলবে। তমাল  রাখ। তমালের বাড়িতে এত ঝামেলা নেই।

-- ঠিক  আছে। আমি রাখছি। এক কাজ কর। রোববার দুপুরে আমাদের বাড়ি চলে আয়। বাড়িতে  বলব আমরা ছাদে আড্ডা  দেব। তখন এটা পড়া যাবে। 

-- একদম।

Wednesday, December 19, 2018

নয়ের দশকের গল্প

"দাদু, তুমি তাজমহল দেখেছো?"
"হ্যাঁ দাদু।"
"খুব সুন্দর ছিল তাই না?"
"হ্যাঁ দাদু, আমার  তখন  দশ বছর বয়স। মা-বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম।"
"তাজমহল ভেঙ্গে গেল কেন দাদু? স্কুলে বলেছে সাইবার যুদ্ধে। সাইবার যুদ্ধ কী দাদু?"
"তুমি বড়  হও তখন পড়বে।"
"না দাদু, তুমি বল।"
"না দাদু, তোমার স্কুলে পড়বে।"

সেদিন রাত্রে আর কথা বাড়াল না  মানিক। খেতে খেতে বার বার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন তুষারবাবু। সাইবার যুদ্ধ। এই খাওয়ার টেবিলে একমাত্র তিনি দেখেছেন সেই যুদ্ধ। তিনি জানেন ঐ দুঃস্বপ্নের  দিনগুলির কথা। এবং তিনি জানেন যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা। আজ এত বছর তিনি গৃহবন্দী।

পরদিন সকালে অভ্যাস মত বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন তুষারবাবু।  হাল্কা ঠাণ্ডা পড়েছে এই মফঃস্বল শহরে। তাই একটা শাল জড়িয়েছেন। "দুধ" ডাক শুনে বারান্দার দড়িটা টেনে দুধ তুলে নিলেন।

"বউমা, এই যে দুধ।"
"হ্যাঁ বাবা, টেবিলে রেখে দিন।"
"আজ কি তুহিনের অফিস নেই? এখনো বাড়িতে দেখছি। রোজ তো সকাল সাতটায় বেরিয়ে যায়।"
"না বাবা, আজ বাবুর স্কুলে  আমাদের ডেকেছে।"
"সেকি? বাবু কি কোন দুষ্টুমি করল নাকি? ও তো নিপাট ভালোছেলে।"
"তা  নয় বাবা,  আজ থেকে ওদের ইন্টারনেট পড়ানোর কথা ইতিহাস ক্লাসে।"
"ওহ।"
"বাবা, গত  সপ্তাহে প্রিন্সিপাল আমাকে ডেকেছিলেন। আমি স্কুলের শিক্ষিকা বলে আগে থেকেই বলে রেখেছেন।"
"কী?"
"আপনার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন।"
"আমার ব্যাপারে?" 
"হ্যাঁ বাবা, আপনার ব্যাপারে।  আপনি দয়া করে বাবুকে ইন্টারনেট নিয়ে ভুল কিছু শেখাবেন না।"
"ভুল?"
"হ্যাঁ বাবা, সারা দেশ জানে আপনি ইন্টারনেট বন্ধ করার বিরুদ্ধে ছিলেন। ভারতবর্ষের প্রো-ইন্টারনেট দলের সবচেয়ে বড় নেতা ছিলেন আপনি। "
"কিন্তু..."
"আপনি তো জানেন বাবা, কত কষ্ট করে আপনাকে জেল থেকে বার করে এনেছি আমরা। সেই কারণেই আপনি আজকেও গৃহবন্দী। "
"কিন্তু বউমা, আমি ভুল কি বলব?"
"ঐ  যে আপনার সে যুগের গল্প, ফেসবুক, গুগল আরও কিসব।" 
"কিন্তু সেগুলি  তো বাস্তব বউমা।  আমাদের সময় কিছু দরকার পড়লে এক সেকেন্ডে আমরা স্মার্টফোনে দেখে  নিতাম। কত বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকত..."
"তাতে লাভটা  কি হল বাবা? আপনার সেই বন্ধুদের কতজন বেঁচে?  আজ দিল্লী শহরটায় শুধু ভগ্নাবশেষ পড়ে আছে।  তাজমহল নেই। পৃথিবীর জনসংখ্যা  অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল সেই সাইবার যুদ্ধে। কি লাভ হল আপনাদের ফেসবুক আর ইমেলে।"
"তাই  বলে ওদের  স্কুলে শেখায় ইন্টারনেট কত খারাপ, মানুষ পাগল  হয়ে ইন্টারনেট আবিষ্কার করেছিল। এগুলি কি ঠিক বউমা?"
"হ্যাঁ বাবা, এগুলি ঠিক। ইতিহাস তাই  বলে। সেদিন ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছিল  বলেই  আমরা আজ সবাই  বেঁচে আছি।"
"তুমি যা বলবে বউমা, ইতিহাস শুধু বিজয়ীরাই লেখে।"



সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে  মানিক চলে এল দাদুর ঘরে।

"দাদু,  দাদু, তুমি ইন্টারনেট দেখেছ?"
"হ্যাঁ  দাদু, দেখেছি।"
"খুব খারাপ, তাই না দাদু?  ঐ ইন্টারনেটের জন্যই কত লোক মারা গেছে।"
"হ্যাঁ দাদু, খুব খারাপ।"