Wednesday, July 29, 2020

মফঃস্বলের প্রেমঃ ২

সকালবেলা হাওড়া যাওয়ার লোকাল ট্রেন যখন আওয়াজ করে রওয়ানা দেয়, কুসুম বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে শব্দ শোনে। তারপর ঘরে এসে পেপারে চোখ বোলাতে বোলাতে রত্না এসে যায়। রত্না তাদের বাড়ি কাজ করে। সকালটা রত্নার সঙ্গেই কেটে যায় কুসুমের। রত্নার বাসন মেজে, ঘর ঝাড় মোছ করে, কাপড় কেচে, ফার্নিচার মুছে যেতে যেতে প্রায় বেলা এগারোটা-বারোটা। কুসুম তার আগেই রান্না বসিয়ে দেয়।  রত্না আবার বিকেলে আসে। তার মাঝে তার গল্প চলতে থাকেই। আড়ালে রত্নাকে শেওড়াফুলি গেজেট বলে ডাকে পার্থ। রত্না গেলে স্নান খাওয়া করে পেপার নিয়ে বসে। কোন কোনদিন বাড়িতে মাকে চিঠি লেখে কুসুম। দুপুরে ঘুমোয় না। দুপুরে ঘুমোলে সকালে উঠতে দেরী হয়। পার্থর অফিস যাওয়ার আগে সকালের জলখাবার করে দেওয়া হয়না। লাঞ্চটা পার্থ অফিসেই খায়। বহুদিনের অভ্যাস। কুসুম যে সকালে উঠে রান্না করতে পারেনা তা নয়, কিন্তু পার্থর ঐ শক্তিদা, রঘুদাদের সঙ্গে অফিস ক্যান্টিনে বসে না খেলে নাকি হয়না।

সদ্য দু'মাস হল বিয়ে হয়েছে কুসুমের। তার বাড়ি অন্ডাল। বিয়ের পর পার্থর সঙ্গে সংসার করতে এই শেওড়াফুলিতে এসেছে কুসুম। স্টেশনের কাছে সরকারপাড়ায় বাড়ি। বাড়িটি তৈরি করেছিলেন পার্থর বাবা। ছোট একতলা বাড়ি। তিনটি ঘর। এ ছাড়া আছে একটি রান্নাঘর ও দুটি বাথরুম। হাল্কা গোলাপি রঙের বাড়ি। সামনে ছোট পাঁচিল (যার উপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পোস্টার পড়েছে)। হলুদ রঙের গেট। গেট থেকে একটা ছোট ইঁটের রাস্তা ঢুকে গেছে বাড়ির দিকে। রাস্তার দু'ধারে ফুলের বাগান ছিল একসময়। কুসুম সেগুলি ঠিক করবে ভেবেও করে ওঠা হয়নি। আসলে সত্যি কথা বলতে, কুসুমের সেরকম ফুলের শখ নেই। বাড়িতে ঢুকলেই এক ফালি বারান্দা। সেখানেই পার্থর সাইকেল থাকে। রোজ সকালে সাইকেল করে স্টেশন যায় পার্থ। স্টেশনে শঙ্করের দোকানে সাইকেল জমা রাখে। বারান্দায় দুটি বেতের মোড়া আছে। রোজ বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে পার্থ মুড়ি খায়। মুড়ির সঙ্গে কোনদিন তেলেভাজা, কোনদিন ঘুগনি বানায় কুসুম। মুড়ি খেয়ে একটু বাইরে এসে ঐ মোড়ায় বসে পার্থ আর কুসুম। ততক্ষণে গোধূলি লগ্ন। আকাশে একটা হাল্কা আলোর রেখা কুসুমের মনে এক প্রসন্ন ভাব এনে দেয়। সামনেই একটা পুকুর আছে। ভালো হাওয়া দেয়। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেরা ক্রিকেট খেলে বাড়ি ফেরে। পার্থ মাঝে মাঝে গুন গুন করে গান ধরে। নিজের বাড়িতে পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে মানুষ কুসুম যেন এই সময়টুকুর জন্য সারাদিন অপেক্ষা করে। এই সময়টুকু যেন তার জীবন থেকে কোনদিন না চলে যায়।

পাঠক নিশ্চয় খেয়াল করেছেন কুসুমের দিনের একটা সময়ের কথা আমি এখনও বলিনি। হ্যাঁ দুপুরে পেপার পড়া আর বিকেলবেলা পার্থ ফেরার আগে পর্যন্ত। এই সময়টুকুর মধ্যে হাজির হন পাড়ার দুই "দিদি"। বয়সে তাঁরা কুসুমের মায়ের চেয়ে কিছু ছোট হলেও তাঁদেরকে দিদি বলেই ডাকতে বলেছেন।  এনারা নাকি কুসুমের শাশুড়ির খুব কাছের মানুষ ছিলেন। আজ ওনার অভাব পূর্ণ করতেই বোধহয় এনারা রোজ কুসুমের খোঁজ নিতে আসেন। অবশ্য রোজ খোঁজ নেয়ার কিছু থাকেনা, মানে থাকা সম্ভব হয়না। যেটা চলে সেটা হল রত্নার শেওরাফুলি গেজেটের সরকারপাড়া ভার্সান।
"জানো তো, কবিতার সঙ্গে ওর ছেলের বউয়ের আবার ঝগড়া হয়েছে কাল।"
"রমার মেয়েটাকে দেখেছো, কি কালো। কে ওকে বিয়ে করবে বাবা?"
"ঘোষবাবুর ছেলে এবারো মাধ্যমিকে ফেল করেছে।"

তবে যেটা ভালো দিক হচ্ছে এনারা রোজ যাওয়ার সময় কুসুম কত ভালো, পাড়ার অন্য বউদের কুসুমের মত হওয়া উচিত, তাই বলে যান। প্রথম প্রথম এনারা পার্থ আসার আগেই চলে যেতেন। কখনো কখনো পার্থর সাইকেলের আওয়াজ শুনেই বেরিয়ে পরতেন। আজকাল সেটাও করেন না। এরকম অনেকদিন হয়েছে পার্থ এসে একা ঘরে বসে মুড়ি খেয়েছে। এনারা যেতে যেতে গোধূলি পেড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে। আর বারান্দায় গিয়ে বসা হয়নি। কুসুম মুখে কিছুই বলতে পারেনি। পার্থকেও বলেনি। সত্যি করে বলতে কি এই দুমাসে মানুষটিকে সেভাবে চিনে উঠতে পারেনি কুসুম। তাই এই কথাটা বললে পার্থর কেমন লাগবে বোঝেনি।

আজও দিদিরা এসে হাজির হয়ে গল্প শুরু করলেন। সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ব্যানার্জিবাবুর মেয়ে কেন নিচু জাতে বিয়ে করল তাই নিয়ে আলোচনা শুরু হচ্ছিল, এই সময় বাইরে সাইকেলের শব্দ শুনে অবাক হয়ে বারান্দায় এল কুসুম। গেট দিয়ে সাইকেল ঢোকাচ্ছে পার্থ। চমকে গেল কুসুম। পার্থ যেন বুঝতে পেরেই বলল -- "আজ তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। তাই আগের ট্রেনেই চলে এলাম। শোন না, উদয়নে নবাব এসেছে। যাবে? তুমি তো সেদিন বলছিলে রঞ্জিত মল্লিককে তোমার ভালো লাগে। চলো না।"

ভিতরে যে দিদিরা বসে আছেন, সেটা কি খেয়াল করেনি পার্থ? লজ্জায় লাল হয়ে গেল কুসুম। দিদিরা শুনতে পেলেন পার্থর গলা। তাড়া আছে, পরে আসবেন ইত্যাদি বলে তখনি সেখান থেকে বিদায় নিলেন। "সত্যি যাবে?"
কুসুমের বিস্ময় কাটেই না। পার্থ স্রেফ মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।

সেই সময়, যখন পাড়ার ছেলেরা ব্যাট নিয়ে মাঠে যাচ্ছিল, যখন কলেজ ফেরতা মেয়েটি গাছের তলায় প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল, যখন ধর্মতলার অফিসে বসে কেউ কাজ শেষ করে হাওড়া স্টেশনে আসার পরিকল্পনা করছিল, যখন তার সাধের গোধূলি আসতে ঢের দেরী, তখন ঐ সাইকেল স্ট্যান্ড করানোর শব্দে, দেওয়ালের লাল সবুজ রাজনৈতিক দলের স্লোগানে, রাস্তায় একা ডাকতে থাকা আইসক্রিমওয়ালার ডাকের মধ্যে দিয়ে কুসুম বুঝতে পারল সে না চিনলেও পার্থ তাকে ঠিক চিনেছে।



Friday, July 17, 2020

বহরমপুরের সুতপা

অফিসে কাজের ফাঁকে প্রায়ই অর্কুটটা চেক করে নেয় নিখিল। আর এখন তো বেশী করে করতে হয়। সুতপা মেসেজ করে এই সময়। রোজ বিকেলে এক ঘণ্টার জন্য সুতপা সাইবার ক্যাফে যায় শুধুমাত্র নিখিলের সঙ্গে দেখা করতে। কলেজ পাশ করে বহরমপুরে একটা স্কুলে পড়ায় সুতপা। বাবা নেই। বাড়িতে শুধু মা। হাল্কা শ্যামলা গায়ের রং, তন্বী। প্রথমবার ছবি দেখেই পছন্দ হয়েছিল নিখিলের। অর্কুটেই আলাপ সুতপার সঙ্গে। অনলাইনের মধ্য দিয়ে কলকাতার রাস্তার ভিড় আর বহরমপুরের লোডশেডিং যে কখন মিলেমিশে এক প্রেমকাহিনীর সূচনা করেছিল দু'জনে কেউই বোঝেনি। অনলাইনে এভাবে প্রেমে পড়া শুনলে লোকজন এই ২০০৬-এ অবাক হয় বইকি। তবে দুজনেই দুজনের ছবি দেখেছে। গলা শুনেছে। কাজেই একেবারে অচেনা নয়। সুতপা নতুন একটা মোবাইল ফোন নিয়েছে। তবে ওর বেশী টকটাইম নেই। তাই নিখিল-ই ফোন করে। সারা রাত্রি ধরে সুতপা বলে চলে তার স্কুলের খাতা দেখার গল্প, আর নিখিল তার অফিসের। নিখিলের গলায় সুর আছে। সুতপা বার বার বায়না করলে নিখিল গান শোনায়। কোনদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত, কোনদিন আধুনিক। সুতপা বলে নিখিলের গলা নাকি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত।

দু'মাস এভাবে অতিবহিত হওয়ার পর দুজনেরই মনে হল এবার সামনাসামনি দেখা হওয়া দরকার। সুতপা ঠিক করল কলকাতায় এসবে। কলকাতায় তার মাসীর বাড়ি। সেখানে উঠে নিখিলের সঙ্গে দেখা করবে। লালগোলা প্যসেঞ্জারে চেপে মাসীর বাড়ি এসে একদিন পর নিখিলের সঙ্গে দেখা করতে গেল সুতপা। ভিক্টোরিয়ার সামনে দেখা করার কথা। বাস থেকে নেমে সুতপা দেখল গেটের সামনে সাদার উপর লাল চেক জামা পরিহিত নিখিল। সুতপা নিজে পরেছে সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ। বেশী গয়না পছন্দ করেনা সুতপা। তাই সামান্য একটা গলায় হার আর কানে দুল। তাতেই নিখিল বলে উঠল -- "বিউটিফুল।"

সারাদিন ভিক্টোরিয়ায় ঘুরে, দুপুরে এক চাইনিজ দোকানে খেয়ে বিকেলবেলা নিখিলের নিউ আলিপুরের বাড়িতে এল সুতপা। ভিক্টোরিয়ার মাঠে সর্বসমক্ষে ঘনিষ্ট হতে আপত্তি ছিল সুতপার। নিখিল একাই থাকে। তাই ওর বাড়িতে আপত্তি নেই। নিখিলের বাড়িটা খুব একটা ছোট না। ওর বাবা বানিয়েছিলেন। বাবা মা দুজনেই এক এক্সিডেন্টে গত হন। তারপর থেকে একাই থাকে নিখিল। বাড়িতে ঢুকেই বাঁ দিকের বন্ধ ঘরটার দিকে এগোচ্ছিল সুতপা। নিখিল বারণ করে। ঐ ঘরটি নাকি নিখিলের বাবা মার। ঐ ঘরটি সে বন্ধই রাখে। নিখিলের লিভিং রুমের সোফায় বসতে যাচ্ছিল সে, এই সময় নিখিল তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মনে হল সুতপার গায়ে যেন শিহরন খেলে গেল। চকিতে নিখিলের দিকে ঘুরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আস্তে আস্তে নিখিলের ওষ্ট সুতপার অধর স্পর্শ করল। সুতপার হাট উঠে গেল নিখিলের কাঁধে। নিখিলের চোখ বন্ধ হল। সুতপারও।  নিখিল তৈরি ছিল। চট করে পকেট থেকে ইনজেকশনটা বার করে সুতপার হাতে তাক করল। এক মিনিটের মধ্যেই সোফায় অজ্ঞান হয়ে পরে গেল সুতপা। এবার নিখিল ফোন করল -- "আমি রেডি তন্ময়দা, আপনার নার্স নিয়ে চলে আসুন।"


কসবা থেকে নিউ আলিপুর আসতে সময় লাগে বলেই চেতলাতে এক বন্ধুর বাড়ি ছিলেন ডাক্তার তন্ময় সেনগুপ্ত। ফোন পাওয়া মাত্রই নিজের নার্স রুমাকে নিয়ে চলে এলেন নিখিলের বাড়ি। নিখিল ততক্ষণে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে রেখেছে। সেটি যেন এক পুরোদস্তুর অপারেশন থিয়েটার। সুতপার অবচেতন দেহটা সবাই মিলে ধরে নিয়ে এল। শুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল নিখিল। বাইরের ঘরে বসে টিভিটা চালাল। সৌরভ বোধহয় আবার টিমে ফিরবে।

খানিকক্ষণ বাদেই বেরিয়ে এলেন ডাক্তার সেনগুপ্ত। "নিখিল, এই মেয়েটির তো কিডনি নেই!"
"কিডনি নেই মানে? এটা হয় নাকি?"
"আরে দেখে যাও।"
"খারাপ করছেন তন্ময়দা, আমাকে শেয়ার দেবেন না বলে কিডনি লুকিয়ে এখন এসব বলছেন।"
"আরে তুমি নিজেই দেখো না।"

ঘরের ভিতরে তখনো হাল্কা আলোটা জ্বলছে। বেডের পাশে বাকি সব আলো যেন সুতপার কাটা দেহটাকে ঝলসে দিচ্ছে। নার্সটিকে দেখা যাচ্ছেনা। নিখিল এসে কিছুই বুঝলো না। "কোথায় কিডনি নেই তন্ময়দা?"

ঘাড় ঘুরিয়ে নিখিল দেখল তন্ময়দা পাশে নেই। ঘরের দরজাটিও এবার বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে কেউ যেন তালাটা ঘোরাচ্ছে। নিখিল ছুটে গেল দরজার দিকে। দু'বার ধাক্কা দিতেও দরজা খুলল না। আবার পাশ ফিরতেই নিখিলের চোখ গেল ঘরের অন্য কোণে। হাল্কা আলোতে এতক্ষণ খেয়াল করেনি। পাশাপাশি পরে আছে তন্ময়দা আর রুমা। দুজনের কারুর জ্ঞান নেই মনে হচ্ছে। নিখিল অবাক হয়ে এগিয়ে গেল তন্ময়দার দিকে।
"তন্ময়দা, তন্ময়দা।"
"ওরা কেউ বেঁচে নেই নিখিল।"
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে বেডের দিকে ফিরে তাকাল নিখিল। এই সেই গলা, যা রাতের পর রাত নিখিলকে বহরমপুরের গল্প বলেছে, হাজারদুয়ারী বেড়াতে যাবার কথা বলেছে, বিধবা মায়ের কষ্টের কথা বলেছে, স্কুলের বাচ্চাদের বাঁদরামোর কথা বলেছে। নিখিল এতদিন এই গলা শুনে চমকাত না। আজ চমকাল। এখন চমকাল।

নিখিল এবার অবাক হয়ে দেখল সুতপার কাটা দেহটা বেড থেকে নেমে আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসছে। নিখিল ভয়ে নড়তেও পারল না। কাটা দেহে কিডনি আছে কিনা, সে বোঝার মত ক্ষমতাও তার নেই। এবার একদম কাছে এসে নিখিলের সামনে ফিসফিসিয়ে সুতপা বলল -- "আমাদের চুম্বন তো শেষ হয়নি নিখিল। আমাকে চুমু খাবে না?"

বলেই নিজের ঠাণ্ডা ওষ্ঠ এবার নিখিলের অধরের উপর চেপে ধরল সুতপা। নিখিল ঠাণ্ডায় ছটফট করতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে সুতপার দুই হাত এসে গেছে নিখিলের মাথার পিছনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখিলের ধরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শুধু সুতপার কাটা দেহের হাতে ধরা থাকল নিখিলের চুম্বনরত মস্তক। নিখিলের চোখ এবার সত্যি বন্ধ।


Thursday, July 16, 2020

প্রশ্ন করা হয়নি

অফিসে বসে লেখাটা শেষ করছিলাম। এই সময় অফিসের পিওন রামদেব এসে জানাল আমার ফোন এসেছে। আমার ডেস্কে একটা বড় কাঁচের পেপারওয়েট থাকে। গোল, ভিতরে ডিজাইন। সেটা দিয়ে লেখাটা চাপা দিয়ে ফোন ধরতে এলাম। আমাদের অফিসে এখনো সেই মান্ধাতার আমলের কালো ফোন। গোল করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাম্বার ডায়াল করতে হয়। আমাদের বাড়িতেই এর চেয়ে আধুনিক ফোন আছে। এখন কি প্যাড লাগানো নতুন যে ফোন হয়, সেগুলি একটা কিনলে পারে অফিস।

"হ্যালো, অতনু বলছি।"
"চিনতে পারছিস?"
"না তো, কে?"
"আমি অসীম।"
"অসীম কে? অসীম বসাক?"
"ইয়েস স্যার।"
"আরে, কতদিন বাদে। কোথায় আছিস, আমার অফিসের নম্বর পেলি কোথায়?"
"আজ বিকেল পাঁচটায় কফি হাউসে আসবি? সব জবাব দেব।"
"ঠিক আছে, তবে তোকে চিনব কি করে?"
"ভাবিস না, ঠিক চিনতে পারবি। খুব একটা বদলাই নি।"

বিকেলে চিকেন স্যান্ডইউচ আর কফি খেতে খেতে আমি প্রশ্ন করলাম
"এবার বল, আমার অফিসের নম্বর পেলি কোথা থেকে?"
"খবর পেলাম তুই আজকের সংবাদে চাকরি করিস। ডিরেক্টরি থেকে নম্বর পেলাম।"
"তুই আছিস কোথায়?"
"আমি ব্যাঙ্গালোরে। ইসরোতে চাকরি করছি।"
"আইব্বাস। চাঁদে যাবি কবে?"
"এই তো কাল। চল তোকে নিয়ে যাই।"
"উফ, কতদিন বাদে তোর সাথে দেখা হল।"
"হ্যাঁ, প্রায় ১৫ বছর বাদে।"
"সত্যি। তুই তো মাধ্যমিকের পরই সুন্দরপুর ছেড়েছিলিস?"
"হ্যাঁ। বাবা তার আগের বছর চলে গেল।"
"হ্যাঁ রে, কাকুর কথা খুব মনে পড়ে। ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। কি ভালো ফুটবল খেলতেন! কীভাবে যে এমন ভাবে হার্ট এটাক হলো।"
"হুম। শোন না, তোর একটা সাহায্য দরকার।"
"বল।"
"তুই তো জানিস বাবা কিছুদিনের জন্য ইস্টবেঙ্গলে ট্রায়ালে গিয়েছিল।"
"হ্যাঁ, জানি তো।"
"হ্যাঁ, সেই সময় ইস্টবেঙ্গলের কোচ ছিলেন রবি সেন। এখন যিনি আবার ইস্টবেঙ্গলের কোচ হয়েছেন।"
"হ্যাঁ।"
"বাবা আমাকে বলেছিল উনি নাকি বাবাকে কিছু একটা বলেছিলেন যেটা বাবার সারাজীবন মনে থাকবে। আমি বড় হলে আমাকে বলবেন বলেছিলেন। কিন্তু আমি প্রশ্ন করার আগেই বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তো আমি ভাবছিলেন রবিবাবুকে জিজ্ঞেস করলে হয়না?"
"ওনার কি মনে থাকবে? এত ফুটবলার সামলেছেন।"
"জানি। তবুও। বলে দেখা যাক না। তুই তো ওনার সাক্ষাতকার নিয়েছিস নিশ্চয়। একবার আলাপ করাতে পারবি না?"
"তা আমি চিনি ওনাকে। ঠিক আছে দেখছি। ক'টা দিন সময় দে। সামনে ডার্বি। তুই লিগের খবর রাখিস?"
"না রে, আমি শধুই ক্রিকেট। এখন তো কলকাতার ছেলে ক্যাপ্টেন।"
"হ্যাঁ, সামনে ওয়ার্ল্ড কাপ। দেখা যাক। শচীন এবার জিততে চাইবে।"
"যাই বল, ভালো বোলার নেই। এই জাহির ছেলেটা খারাপ না..."


ডার্বির পরেরদিন অসীমকে ফোন করলাম। অসীম এখন কলকাতায় আছে ওর জ্যাঠার বাড়ি। সেখানে ফোন করে ডেকে দিতে বললাম
"কি রে, ব্যবস্থা হল? "
"তুই কি একদমই কাগজ পড়িসনা?"
"না মানে কি হয়েছে?"
"ডার্বি জিতে রাত্রে গাড়ির এক্সিডেন্টে রবিবাবু পরলোকগত।"
"যাহ।"
"হ্যাঁ, গতকাল।"
"বুঝলি, আমার প্রশ্নটা করাই হয়না কাউকে।"
"একজন জানতে পারে।"
"কে বলত?"
"লক্ষণদাকে তোর মনে আছে?"
"লক্ষণদা মানে যে মোহনবাগানে খেলত?"
"খেলত মানে দু'বছর খেলেছে। তারপর গোয়া গেল খেলতে। চোট পেয়ে আর খেলা বন্ধ। এখন বড়বাজারের পাশে একটা রোলের দোকান চালায়।"
"আচ্ছা। হ্যাঁ, ওনার সঙ্গে বাবার খুব ভাব ছিল। চল যাওয়া যাক সুন্দরপুর। কবে যাবি?"
"কাল চল?"

সুন্দরপুরে লক্ষণদার রোলের দোকানে একটা করে এগ চিকেন রোল খেতে খেতে আড্ডা হচ্ছিল। পাশে রেডিওতে "সেই যে হলুদ পাখি" গানটা বাজছিল। অসীম শোনেনি। ওকে জানালাম এটা ক্যাকটাস বলে একটা বাংলা ব্যান্ডের।
"লক্ষণদা, তোমার ফুটবল ছেড়ে ভালো লাগে?"
"কে বলল ছেড়েছি!"
"না তো, আজ তো রবিবার। চল একটু বাদে।"
"কোথায়?"
"মসজিদের পাশের মাঠে। আমরা বন্ধুরা মিলে রবিবার বিকেলে ফুটবল খেলি।"
"বন্ধুরা মানে? তোমার বয়সী সবাই?"
"ছোট বড় অনেকেই আছে। কলকাতায় অফিস করে। দুজনেই চলো আজ।"
এবার অসীম প্রশ্ন করল
"লক্ষণদা, তোমার সঙ্গে তো বাবা অনেক গল্প করতেন।"
"তা করতেন। তোমার বাবা এই সুন্দরপুরের একমাত্র স্পোর্টসম্যান ছিলেন, বুঝলে?"
"আচ্ছা বাবা কোনদিন তোমাকে বলেছেন ওনাকে ইস্টবেঙ্গল ট্রেনিং-এ রবি সেন কি বলেছিলেন?"
"না গো। মনে পড়ছে না। আমাকে এরকম কিছু বলেননি।"

অসীম আবার হতাশ হল। এবার লক্ষণদা বললেন
"চলো চলো খেলতে চলো। তোমার বাবা খুশী হবেন তুমি ফুটবল খেলছ দেখলে।"
"এই ফুল প্যান্টে?"
"আরে ধুর, প্যান্ট গুটিয়ে নিও।"

ভালোই খেলা হল। আমি যদিও বা একটু আধটু খেলালাম, অসীম একেবারেই পারল না। মিনিট দশেকের মধ্যেই হাঁপিয়ে বলল -- "আমি গোলকিপার হব।" তবে খেলা শেষের পর ওর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি দেখলাম।

মাসখানেক বাদে আবার কাজে সুন্দরপুর গিয়েছিলাম। লক্ষণদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল স্টেশনে। শুনলাম ব্যান্ডেল যাচ্ছেন বোনের সঙ্গে দেখা করতে। আমাকে দেখে একটু গল্প করে বললেন -- "জানো তোমার বন্ধু অসীমের বাবা আমাকে বলেছিলেন রবি সেনের কথা।"
"মানে আপনি জানতেন রবি সেন ওনাকে কী বলেছে?"
"হ্যাঁ।"
"অসীমকে বললেন না কেন?"
"ওর খারাপ লাগত।"
"কেন?"
"রবি সেন বলেছিলেন -- দেখ, তোমার ইস্টবেঙ্গল বা ময়দানের কোন বড় ক্লাবে তেমন ভবিষ্যৎ নেই। বরং ব্যাঙ্কে দেখ। ওখানে ভালো খেললে তোমার পাকা চাকরি হবে। সংসারে অসুবিধা হবে না।"
"সেকি।"
"সেই কথা শুনেই উনি ব্যাঙ্কে জয়েন করেন। পরে আক্ষেপ করতেন রবিবাবুর কথা না শুনে টিকে থাকলে হত। আমাকে বলতেন বার বার হাল না ছাড়তে। হয়ত অসীমকে ..."

Sunday, June 28, 2020

একবারই এসেছিল নীরবে

এটিএম থেকে টাকা তুলে ট্রেন স্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগল অর্ক। নিউ জার্সির জার্সি সিটিতে থাকে সে। ওদিককার বেশিরভাগ দোকানেই ক্যাশ ওনলি। তাই সপ্তাহান্তের বাজার করতে তাকে টাকা তুলতে হয়। টাকা মানে ডলার। তামাম মার্কিন দেশের বাঙালিরা ডলারকে টাকা বলে। তাই আমরাও তাই বলব। এভিনিউ এইচ ষ্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল অর্ক। ওপরে ডিজিটাল বোর্ডে দেখাচ্ছে আর চার মিনিট বাদে ট্রেন। ফোনে ওয়াটস্যাপটা চেক করে নিল। নাহ, কোন নতুন মেসেজ নেই। ভেবেছিল শাল্মলী মেসেজ করবে। মেয়েটি লন্ডনে পড়াশুনো করছে। কালকেই ফেসবুকে একটা গ্রুপে আলাপ। দুজনেই উডি এলেন ফ্যান। অর্ক নিউ ইয়র্কে থাকে শুনে শাল্মলী বলে "হাউ লাকি ইউ আর।" যদিও অর্ক সত্যি সত্যি নিউ ইয়র্কে থাকেনা। থাকে নদী পেড়িয়ে নিউ জার্সিতে। কিন্তু বলতে তো ক্ষতি নেই। কে আর লন্ডন থেকে এতদূর আসবে দেখতে। অর্ক অম্লানবদনে বলে দেয় সে ব্রুকলিনের পার্ক স্লোপ অঞ্চলে থাকে। গতবছর একবার ওখানকার একটা পাবে এসেছিল। তাই কিছুটা হলেও বলতে পারবে। শাল্মলীর সঙ্গে ফেসবুকে অনেকক্ষণ চ্যাটের পর তার ফোন নম্বর পাওয়া যায়। ওয়াটস্যাপে যোগ করে অর্ক।

এবার ট্রেন এসে যায়। ট্রেন ফাঁকা। অর্ক জানালার ধারে বসতে পারে। ব্যাগ খুলে কমলকুমার মজুমদারের বই বার করে পড়ার জন্য। তার পাশে এক মহিলা এসে বসেন। ঘাড়  ঘুরিয়ে দেখা খারাপ, তাই পড়তে পড়তে আড়চোখে দেখে অর্ক। ভারতীয়। অথবা বাংলাদেশীও হতে পারে। নিউ ইয়র্কে এখন প্রচুর বাংলাদেশী। সত্যি কথা বলতে কি, পশ্চিমবংগের বাইরে ভারতবর্ষের অন্য কোন জায়গার চেয়ে নিউ ইয়র্কেই অর্ক বেশি বাঙালি পায়। এভিনিউ এইচ পেরোতেই হাল্কা গলার আওয়াজ পাওয়া গেল -- "আপনি কি বাঙালি?"
"হ্যাঁ, অর্ক সেনগুপ্ত। আপনি?"
"আমি চৈতালি রায়।"
একটু অদ্ভুত গলার স্বর মহিলার।
"আপনি কলকাতার কোথায় থাকেন? আমি পাটুলি।"
"আমি কলকাতার না। আমি মিলওয়াকিতে বড় হয়েছি। আমার বাবা মা এখানেই থাকেন।"
ওহ প্রবাসী বাঙালি! তাই এরকমভাবে বাংলা বলছে। শুনতে একটু অসুবিধা হচ্ছিল।
"আপনি এখানে বড় হয়েছেন? ভাবাই যায়না। আপনার বাংলা ভীষণ পরিষ্কার।"
"থ্যাংকস। আমার পেরেন্টসরা ছোটবেলা থেকে আমার সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলতেন।"
"ওহ, তা আপনি বুঝলেন কি করে আমি বাঙালি?"
"আপনার হাতের বই দেখে।"
"আপনি বাংলা পড়তে পারেন?"
"হ্যাঁ, পারি তো। আমি ফেলুদা, টেনিদা, মিতিনমাসী পড়েছি।"
"আচ্ছা। কমলকুমার পড়েছেন?"
"না। আমার বাবা বলতেন উনি ছোটবেলায় স্বপনকুমার বলে একজনের বই পড়তেন। এটা কি তিনি?"
"না না, স্বপনকুমার খাজা, আই মিন, পাল্প লেখক। কমলকুমার আলাদা। মনে হবে ফরাসী সাহিত্য পড়ছেন।"
"ওহ, আমি ফরাসী সাহিত্য পড়িনা।"
"তা আপনি যাচ্ছেন কোথায়?"
"আমি, জার্সি সিটি। ওখানেই থাকি। আপনি?"
এক মুহুর্ত ভেবে নিল অর্ক। ব্রুকলিনের ঢপটা দেওয়া উচিত হবেনা। জার্সি সিটিতেই তাকে যখন, ট্রেনে দেখা হবেই।
"আমিও ওখানেই। তাহলে ভালোই হল, একসাথে যাওয়া যাবে। আপনি এখানে কি পড়ছেন না চাকরি করছেন?"
"আমি ব্রুকলিনে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকায় চাকরি করি। আপনি?"
"আমি ব্রুকলিন কলেজে পড়াই। আর কিউনিতে পি এইচ ডি করছি।"
"ওয়াও। কোন বিষয় আপনার?"
"আমার ইকোনমিক্স।"
"নো ওয়ে, আমার আন্ডারগ্র্যাড ইকোনমিক্স ছিল।"
"তাই? কোন কলেজ?"
"মিলোয়াকি কমিউনিটি কলেজ।"
"আচ্ছা। আপনি কতদিন আছেন নিউ ইয়র্কে?"
"আমি তো জার্সি সিটিতে থাকি। আমি এই তিন মাস হল এসেছি। আপনি?"
"আমার তিন বছর হল। তা আপনি উইকেন্ডে নিউ ইয়র্কে আসেন নিশ্চয়?"
"নাহ সারা সপ্তাহ ট্র্যাভেল করে ক্লান্ত থাকি। তখন শুধু বাড়ি বসে নেটফ্লিক্স। আপনি?"
"আমি আসি মাঝে মধ্যে। আপনিও তার মানে সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন?"
"হ্যাঁ ভীষণ। আপনারও?"
"হ্যাঁ। আপনার প্রিয় নায়ক কে?"
"টম ক্রুজ। আপনার?"
"ম্যাক্স ভন সিডো।"
"সেটি কে? নাম শুনিনি। কোন সিনেমা বলুন?"
"সেভেন্থ সিল।"
"না দেখিনি। কার সিনেমা?"
"বার্গম্যান। দেখেননি?"
"আমি ক্যাসাব্লাঙ্কা দেখেছি। আচ্ছা, এটলান্টিক এভিনিউ এসে গেছে। চলুন নামা যাক।"
"না না, পরেরটায় নামব। ডি ক্যাব। ওখানে পাশের প্ল্যাটফর্মেই আর আসবে। সোজা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার।"
"আচ্ছা।"

সিনেমায় মিল পাওয়া না গেলেও মিল পাওয়া গেল গানে। চৈতালি গান শুনতে ভালোবাসে। অর্ক বিটেলসের বেশিরভাগ গান বাজাতে জানে শুনে খুব উৎসাহিত হল। বাকি রাস্তাটা অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে পাথ ট্রেনে চেপে জার্নাল স্কোয়ার স্টেশন অবধি বিটলস, ডিলান, সিনাত্রা, রোলিং স্টোন্স সঙ্গ দিল। গানের মাঝে আপনি থেকে তুমিতে নামতে খুব একটা অসুবিধা হলনা।

জার্নাল স্কোয়ারে নেমে চৈতালি বলল ওর বাড়ি ডানদিকে। অর্ক বামদিকে থাকে। তাই এবার আলাদা হতেই হবে। অর্ক এবার সাহস করে বলল -- "চৈতালি, তোমার সঙ্গে গল্প করে খুব ভালো লাগল। যদি কিছু মনে না কর, তোমার নম্বরটা পেতে পারি?"
"নিশ্চয়। (২০৮)...। তোমারটা দাও।"

নম্বর নেয়ার পর দুজন চলে যাচ্ছিল। চৈতালি এগিয়ে এসে অর্ককে আলিঙ্গন করল। এদেশে এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। তাই অর্কর প্রথমে কিছু মনে হয়নি। তারপর বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মনে হতে লাগল, "মেয়েটি নিজে থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরল। নিশ্চয় আমাকে ভালো লেগেছে। উফ, আর লন্ডন নিয়ে মাথা ঘামাবো না। এই মেয়েটি আমার জন্য পারফেক্ট।"

বাড়ির দরজা অবধি পৌঁছাতে পৌঁছাতে অর্ক স্বপ্ন দেখে ফেলল ভবিষ্যতে সে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হয়েছে। সকালে ক্লাস নেয়ার পর সে আর চৈতালি ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যায়। সেখানে আজ অর্ককে বিশেষ অতিথি করে আনা হয়েছে মায়াকোভস্কির আত্মহত্যার উপর কবিতা পাঠ করার জন্য।

বাড়ি ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে গিটারটা নিয়ে বসল অর্ক। একটু বাদেই দরজায় ধাক্কা। অর্কর রুমমেট সুমন। নাহ, সুমনকে এখন কিছু বলার দরকার নেই। সুমন বলল -- "বস, দুটাকা খুচরো দিবি, সিগারেট কিনতে যাব।"

গিটার ছেড়ে জিনসের পকেটে হাত দিয়ে অর্ক বুঝতে পারল তার মানিব্যাগটা নেই। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু পেলনা। একটা সন্দেহ হতেই চৈতালির দেওয়া নম্বরটায় ফোন করল। ফোনের কলার আই দিতে দেখাল এটি আইডাহো রাজ্যের ফোন নম্বর। কিন্তু, মিলওয়াকি তো উইস্কন্সিনে, তাই না? এবার উল্টোদিকে একজনের গলা শোনা গেল

"হ্যালো, বয়সি পুলিশ স্টেশন।" 

Sunday, June 14, 2020

রুকু-সুকু

আজকে বাইরে একটা মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। এই বাংলো বাড়িটার সামনে একটা ছোট বাগান। বাগানের মধ্যে দিয়ে লাল সুড়কির রাস্তা। দু'ধারে ছোট ছোট গাছ করেছেন রুকুর মা সাধনাদেবী। বাগান শেষ হয় একটি বেড়ায়। বেড়ার মাঝে লোহার গেট। রুকুর ঐ গেটের বাইরে যাওয়া মানা। সুকুর সাথে খেলতে গিয়ে বলটা বাইরে চলে গেলেও রুকু বাইরে যেতে পারেনা। বাড়িতে মাকে গিয়ে বললে মা এনে দেন। আসলে বাইরে বড় রাস্তা। মাঝে মাঝেই সেখান দিয়ে বড় লরি যায়।

সুকু হল রুকুর পোষা ল্যাব্রাডর। রোজ বিকেলে শুকুর সাথে এখানে খেলতে আসে রুকু। এ অঞ্চলে ওর আর কোন বন্ধু নেই। ওদের এই বাংলো বাড়িটা খুব সুন্দর। ওপরে আবার একটা চিমনি আছে। ওটা যদিও মিছিমিছি। মানে কাজ হয়না ওতে। বাংলো বাড়ি থেকে একটু দূরেই ট্রেন লাইন। এই অঞ্চলে খুব বেশী ট্রেন আসেনা। তবে রাত্রে মাঝে মাঝে ট্রেন এলে এই বাড়ি থেকেই আওয়াজ শোনা যায়। এই পাহাড়ি অঞ্চলে লোকজন বেশী নেই। তাই রাতের দিকে ট্রেনের আওয়াজ বড় স্পষ্ট। মনে পড়ে বছর দুয়েক আগে এই ট্রেনের আওয়াজে মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙ্গে যেত রুকুর।

বলা হয়নি, ঐ বেড়ার পাশেই একটা বড় গাছ আছে। কি গাছ সেটা অবশ্য রুকু জানেনা। গরমের দিনে মাঝে মাঝে এর ছায়াতে বসে পড়ে সুকু। তখন ওর গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে গান করে রুকু। রুকুর মা খুব ভালো গান জানেন। উনি রুকুকে গান শেখান। সে কত গান। "ছোট পাখি চন্দনা", "আতা গাছে তোতা পাখি", আরো কত গান। সুকু  খুব আদর খেতে ভালোবাসে। আদর করলেই নিজের লেজ নাড়াতে থাকে।

বাংলো বাড়ির জানালা দিয়ে রুকুর মা সাধনাদেবী ওদের দেখছিলেন। ওনার দৃষ্টি একটু অদ্ভুত। কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে পড়েছেন মনে হবে। এক দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখছেন। যেন মেয়ের উপর থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। একটু বাদেই সূর্য ডুবল। তখন চাঁপা ফুলের গন্ধে, ট্রেনের আওয়াজে, ফড়িং-এর ভনভনানিতে, আকাশের লাল রঙে আর সদ্য ওঠা চাঁদের আলোয় বাংলো বাড়িটিকে এক রূপকথার পরিবেশে রুপান্তিরত করেছিল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। রুকু সুকুকে নিয়ে বাড়ি এল।

বাড়ি ফিরতেই মা বকলেন জামা নোংরা করেছে বলে। "যাও, এক্ষুনি নোংরা জামাটা পাল্টে কাপড় কাচার জায়গায় রেখে এসো। কাল লক্ষ্মী কেচে দেবে।"

রুকু ঘরে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সাধনাদেবী। মেয়েটার কি হয়েছে কে জানে? কতবার স্বামীকে বলেছেন কলকাতা নিয়ে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু তাঁর স্বামী চিত্তবাবু কিছুতেই রাজি হন না। উনি যেন বিশ্বাসই করেন না রুকুর অসুখ আছে। অথচ সাধনাদেবী পরিষ্কার বুঝতে পারেন। আজ থেকে দু'বছর আগে সুকু মারা গেছে। খেলতে খেলতে বল বড় রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। সুকু বেড়া ডিঙ্গিয়ে বল আনতে যায়। একটি লরি এসে চাপা দিয়ে যায় সুকুকে। অথচ রুকু রোজ বলে ও নাকি সুকুর সাথে বিকেলে খেলতে যায়। আর পেরে উঠছেন না সাধনাদেবী। ওনার স্বামী বা শাশুড়ি কারুরই যেন এতে কিছু যায় আসেনা।

আজকেও বাইরের ঘরে গিয়ে দেখলেন মা-ছেলে বসে আছে। তাঁর শাশুড়ি এক মনে উল বুনছেন। আর চিত্তবাবু পেপার পড়ছেন। সাধনাদেবী বললেন -- "রুকু আজকেও জামা নোংরা করে এসেছে। বলছে নাকি সুকুর সাথে খেলতে গিয়ে এই হয়েছে। তুমি কিছু বলবে না?"
"বাচ্চা মেয়ে, আদরের বন্ধুকে ছাড়তে পারছে না। তুমি এতো চিন্তা করোনা। তোমাকে তো বলেছি, বড় হলেই ঠিক হয়ে যাবে।"
"দেখ এভাবে বেশীদিন ফেলে রাখা ভালো না। আর কয়েক মাসের মধ্যে না কমলে কিন্তু যেতেই হবে। তুমি না গেলে আমি একা নিয়ে যাব।"
"আচ্ছা, বেশ। কয়েক মাস দেখতে দাও।"

সাধনাদেবী রান্নাঘরে যেতেই নিজের মায়ের দিকে চাইলেন চিত্তবাবু। ক্লান্ত চোখে হতাশ দৃষ্টি ফেলে বললেন -- "কি করি বলো তো মা? দু' বছর আগে রুকুটাও কুকুরটার সাথেই চলে গেল। অথচ আজকেও ও মেয়েটার জামা পালটায়।" 

Tuesday, June 9, 2020

প্রবাসীর ডায়রি ৪ঃ প্রথম দিন

যদি কেউ আমাকে বলে একটা টাইম মেশিন দিয়ে আমার জীবনের কোন একদিন ফিরে যেতে, আমি ফিরব ১৪ই আগস্ট ২০০৭। জীবনে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু ঐ দিনটি বোধহয় আমার জীবনের শেষ স্টেবল পয়েন্ট। যেখানে ফিরে গেলে আমি জীবনটাকে নতুন করে লিখতে পারি।

যাই হোক, সেদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুত ঝাঁকুনিতে। যে দাদার বাড়ি উঠেছিলাম গেন্সভিলে, সেই দাদার দু'বছরের ছেলে আমার বিছানায় উঠে পড়ে লাফাচ্ছে। উঠে পড়লাম। স্নান করতে যাওয়ার আগে দাদা দেখিয়ে দিল। এখানে বালতি নেই। শাওয়ারে স্নান করতে হবে। আবার পর্দা টানা আছে। পর্দা ভিতর দিকে টানা। জল যেন বাইরে না পড়ে। এ ছাড়া গায়ে মাখার সাবানের জায়গায় বডি ওয়াশ।

সকালে কর্ন ফ্লেক্স খেয়ে বেরোলাম। দাদা, বউদি, দাদার ছেলে আর আমি। দাদার ছেলেকে প্রথমে ডে কেয়ারে রাখা হবে। ডে কেয়ার জিনিসটা আমি আগে জানতাম না। দেখলাম প্রচুর বাচ্চারা রয়েছে। তাদের সকলের মা বাবারা বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। তাই তারা এখানে রয়েছে। দাদার ছেলেকে রেখে আমি বিশ্ববিদ্যালয় এলাম। এই প্রথম আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম। ইঁট বার করা বেশ কিছু বিল্ডিং। একটা বড় বাড়িতে দাদা গাড়ি রাখলেন। সেখানে দেখলাম শয়ে শয়ে গাড়ি। সেটি নাকি একটি পার্কিং স্ট্রাকচার। অর্থাৎ এখানে সবাই গাড়ি রাখে। অবশ্য সবাই না। ওখানে গাড়ি রাখতে একটা পারমিট লাগে। যেমন ছাত্র ছাত্রীরা ওখানে গাড়ি রাখতে পারেনা। বড় ক্যাম্পাসটা প্রথম দিন পুরো দেখতে পাইনি। চারদিকে বড় বড় গাছ যেগুলি থেকে একরকম অদ্ভুত তন্তর মত জিনিস ঝুলছে। পরে জেনেছিলাম ওগুলিকে স্প্যানিশ মস বলে। ওরকম গাছ নাকি ফ্লোরিডাতে পাওয়া যায়।

প্রথমেই আমার নিজের ডিপার্টমেন্টে গেলাম। সামনেই হলুদ রঙের বড় বড় আলুভাজার মত কিছু মূর্তি। পরে জানতে পেরেছি এই জেলাটির নাম এলাচুয়া, যেটির ইন্ডিয়ান ভাষায় মানে আলুভাজা। ডিপার্টমেন্টে আমাকে একটি চিঠি দিয়ে বলল ইন্টার্নেশনাল সেন্টারে যেতে। গেলাম। পাসপোর্ট, আই টুয়েন্টি, আর অন্যান্য সব কাগজপত্র দেখানোর পর ওরা আমাকে রেজিস্টার করল। তারপর কিছু বই আর একটা টি শার্ট দিয়েছিল। টি শার্টটি আমার খুব পছন্দের ছিল। ওর দু দিকে পৃথিবীর সকল দেশের পতাকা ছিল। এর পর গেলাম গেটর কার্ড বানাতে। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডেন্টিটি কার্ড। সব জায়গাতে এটি চলবে। মানে লাইব্রেরি থেকে বই ধার নিতে গেলে যাদবপুরের মত লাইব্রেরি কার্ড বানাতে হবেনা। এই আই ডি কার্ডেই সব কাজ হবে। ১৫ ডলার দিতে এক ভদ্রমহিলা ছবি তুলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাতে কার্ড দিয়ে দিলেন। তারপর বললেন -- "এই কার্ডটি তুমি এ টি এম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারো।" মানে বুঝলাম না। উনি হেসে বললেন -- "ব্যাঙ্কে যাও। বুঝিয়ে দেবে।"


এবার গেলাম ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলতে। এই প্রথম জীবনে ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলব। ব্যাঙ্কের নাম ওয়াকোভিয়া। পরে তা ওয়েলস ফারগো হয়ে গেছে। ব্যাঙ্কের লোক সব কাজ করে আমার আই ডি কার্ডটা নিয়ে কি একটা করে দিল। তারপর বলল "যতদিন না তোমার আসল কার্ড আসে, এটিকে এ টি এম কার্ড হিসেবে  ব্যবহার করতে পারো।" এবার খেয়াল করলাম আমার আই ডি কার্ডের পিছনে একটা ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ আছে।

দুপুরে আমার গাইডের সঙ্গে লাঞ্চে গেলাম। ওয়েন্ডিজ-এ বার্গার আর ফ্রাইস খেলাম। এই প্রথম জীবনে চৌকো প্যাটির বার্গার দেখলাম। দেশে মঞ্জিনিসে যেটা খেতাম সেটাও গোল হত। সেখানেই শুনলাম পরের সপ্তাহ থেকে নাকি কৃষ্ণ লাঞ্চ শুরু হবে। সেটা কি ভালো বুঝলাম না যদিও। দুপুরের দিকে প্রচণ্ড ঘুম পেল। তবু জেগে থাকলাম কষ্ট করে। এর মধ্যে গাইড একটা ল্যাপটপ দিয়েছেন। বিকেলবেলা দাদা বৌদি এলেন আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। দাদার ছেলেকে তুলে আমরা বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম। বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমলে বাঁচি। দাদারা কিন্তু বাড়ি গেলেন না। আমাকে নিয়ে গেলেন ওয়ালমার্ট বলে একটা দোকানে। কি বিশাল দোকান!! ঐ দেখেই আমার ঘুম গেল কেটে। কি না পাওয়া যায় সেখানে। জামা কাপড় থেকে শুরু করে বাড়ি সাজানোর জিনিস থেকে সাইকেল, ফুটবল, খাবার জিনিস, প্রায় সমস্ত কিছু। পরে জেনেছি দাদা ইচ্ছে করে আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। জানতেন ঐ দেখলে আমি জেগে থাকব। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হল। ফিরেই জলদি ডিনার করে শুয়ে পড়লাম।

সমস্যা হল তার পরের দিন। ঘুম ভাঙল সকাল সাড়ে চারটেয়। দাদারা তখন গভীর ঘুমে। আমেরিকাতে সূর্য ওঠে প্রায় সকাল ছ'টার পড়। অন্ধকারের মধ্যে কি করব বুঝে পেলাম না। ল্যাপটপ খুলে ইউটিউব চালিয়ে "শ্রীমান পৃথ্বিরাজ" দেখতে বসলাম।


Friday, June 5, 2020

'মিট' দ্য পেরেন্টস

-- মেট্রোতে ভিড় ছিল?
-- সবসময় থাকে। এতো আর করোনাভাইরাসের সময় না, যে ফাঁকা থাকবে।
-- তা বটে। এদিকে আয়।
-- আর কতদূর রে? ঘেমে গেলাম তো?
-- দেখুন ম্যাডাম, ঘামের দোষ আমাকে দেবেন না। তাহলে কলকাতায় না থেকে আমাদের দার্জিলিং-এ থাকা উচিত।
-- সবসময় মজা তোর। এই তোর মায়ের আপত্তি ছিল না, ঠিক বলছিস তো?
-- হ্যাঁ রে। মা তোর ছবি দেখে বেশ ইম্প্রেসড। তার উপর আমার কাছে তোর বাকি গুন শুনে তো কথাই নেই।
-- আর তোর বাবা কিছু বলবেন না বল?
-- দেখ বাবার কথা তো তোকে বলেছি। মাথার গণ্ডগোলটা আজকাল ভীষণ বেড়ে গেছে। এই লকডাউনের সময় বাড়ি থেকে থেকে আরো বেড়েছে। আমরা চিন্তায় থাকি রে। বাবা কিছু ভুল ভাল বললে প্লিজ মাইন্ড করিসনা।
-- আরে না না। তুই সঙ্গে থাকিস প্লিজ।
-- আমৃত্যু থাকব।

বাড়ির সবুজ দরজায় টোকা দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দরজা খুললেন সমরের মা। সমরের মোবাইলে ওনার ছবি আগেই দেখেছিল অনন্যা। কাজেই চিনতে অসুবিধা হলনা। পরনে সবুজ রঙের তাঁতের শাড়ি। চোখে চশমা।

-- এসো এসো, আসতে কষ্ট হয়নি তো? এত দূর থেকে এলে।
-- না না।
এই বলেই ওনাকে প্রণাম করল অনন্যা।
-- আহা থাক থাক, কি লক্ষ্মী মেয়ে।
অনন্যার দু গালে হাত বুলিয়ে চিবুক ছুঁয়ে আদর করলেন সমরের মা। এত সহজে আপন করে নেবেন ভাবেনি অনন্যা। যেন কতদিনের চেনা। এত নরম করে গালে হাত বুলোলেন যে দূরত্ব বোধহয় এক মূহুর্তে ঘুচে গেল।
-- এসো এসো বসো এখানে।
বাইরে ঘরে দু' সেট সোফা। বাদামী রঙের। সামনে কাঠের সেন্টার টেবিল। ওপরটা  কাঁচের। টেবিলের নিচে কিছু ম্যাগাজিন রাখা। একটা সানন্দা চোখে পড়ল অনন্যার। সামনে টি ভি। বন্ধ ছিল। ঘরের একদিকে একটা বড় বইয়ের র‍্যাক। এটির কথাই বোধহয় সমর বলেছিল। সমর ভীষণ বই পড়তে ভালোবাসে। অনন্যাও। সেভাবেই ওদের আলাপ অবশ্য।

সোফায় অনন্যার পাশে বসলেন সমরের মা। শুরু হল গল্পগুজব। বাড়িতে কে কে আছে, বাবা কোথায় চাকরি করেন, এসব। ভদ্রমহিলাকে ভীষণ ভালো লাগছিল অনন্যার। কথা বলতে বলতে বার বার ওর হাতে, পায়ে হাত রাখছিলেন। যেন আজকের আলাপ না।

এর মধ্যে হঠাত পাঞ্জাবী পাজামা পরা এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। ভিতরের কোন ঘরে ছিলেন হয়ত। এসেই সবার দিকে একবার ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থেকে

-- খাবার কই, খাবার। বাবু খাবার আনিসনি?

বলে চেঁচালেন। অনন্যা বুঝতে পারল ইনি সমরের বাবা। প্রণাম করবে বলে উঠছিল, কিন্তু সমর তার আগেই ওনাকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল। ওর মা বলতে লাগলেন

-- কি বলি বলো, আগে তবু বেরোত, আজকাল বাড়িতে বন্ধ থেকে থেকে মাথাটা একেবারে গেছে।

এবার নিজে থেকেই ওনার হাত ধরল অনন্যা।

-- না না কাকিমা, কিচ্ছু ভাববেন না। আমি শিওর কাকু সুস্থ হয়ে উঠবেন শিগগিরি।

-- তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক মা। দাঁড়াও আমি চা নিয়ে আসি। সমরের কাছে শুনেছি তুমি বই পড়তে খুব ভালোবাসো। সমরের বই দেখবে? ঐ দেখো র‍্যাকটা।

-- হ্যাঁ কাকিমা, আমি দেখছি।

এবার আস্তে আস্তে উঠে বইয়ের র‍্যাকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো অনন্যা। কত বই। তার পড়া বই যেমন আছে, না পড়াও আছে। ওটা কি, হেনরি ফ্রেড্রিকের সংস অব সলিটিউড। দেখি।

বইটা হাতে নিয়ে দেখছিল অনন্যা যখন ওর মাথায় আঘাত হানা হল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। বইটি হাত থেকে ছিটকে পড়ল। আরো বার কয়েক আঘাত করে থেঁতলে দিয়ে থামল সমর। এর বেশী মারলে বোধহয় ঘিলু বেরিয়ে আসবে।

ভিতর থেকে সমরের বাবার গলা শোনা গেল
-- বাবু, খাবার এনেছিস? খাবার কই বাবু?

সমর এবার বিরক্ত গলায় বলল

-- দাঁড়াও মাকে রান্না করতে দাও।