Wednesday, October 28, 2020

একাকীত্ব আর মেঘলা আকাশ

 গত ক'দিন ধরে ডালাসের আকাশ মুখ গোমড়া করে আছে। তার মধ্যে বেশ ঠাণ্ডা আর সঙ্গে বৃষ্টি। গতকাল তো সকালে -১ সেলসিয়াস ছিল। দুপুরে মিটিঙের ফাঁকে কফি নিয়ে সোফায় বসে বাইরের দিকে চেয়ে থাকি। ঠাণ্ডায় বারান্দায় যেতে পারিনা। পর্দা সরানো থাকে। কাঁচের ফাঁক দিয়ে তাকাই। বৃষ্টি থেমে গেলে চারদিক কেমন যেন থম থম করে। বাড়ির সামনে লাল হয়ে যাওয়া পাতা যেন ভয়ে কাঁপছে। আশেপাশে লোকজন কম। শুধু কিছুই গাড়ি। তার মধ্যে আরোহীকে দেখা যায়না। তাই  মনে হয় যেন এক রোবট যুগে আছি, যেখানে শুধুই যন্ত্র। 

এই মেঘলা দিনে একাকীত্ব কিন্তু বেশী করে দানা বাঁধে। প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা সেই কষ্টকে বাড়িয়ে দেয়। কোথাও যেন ভালোবাসা আর অধিকার এক হয়ে যায়। পুরোন স্মৃতি, কিছু অনুশোচনা, আর বার বার ভুল শুধরে নেওয়ার ব্যর্থ ইচ্ছে। মায়া। ভালোবাসা, অধিকার না মায়া। ছোটবেলায় এক টাকার মৌরি লজেন্সের সঙ্গে পাওয়া প্লাস্টিকের স্কুটারের চাকা ভেঙ্গে গেলে কেঁদে ভাসাতাম। আজ হেলায় এক বছরের পুরনো দামী মোবাইল ফোন পাল্টে ফেলি। 

মেঘলা দিনে একা হতে চাওয়ার আকাঙ্কা সবার হয়না। কেউ কেউ আবার এর থেকে বেরোতে চায়। মন  খারাপ লাগলে চেষ্টা করে কীভাবে ভিড়ে মিশে যাওয়া যায়। নিজের অস্তিত্বের বৈধতা রক্ষার দায় এসে যায় মনের গভীরে। তাও ভালো এখন সোশাল নেটোয়ার্ক আছে। নিজেকে ভেঙ্গে, নতুন করে সংগঠন করে, একা না হতে চাওয়া, সবাইকে বলা "এই দেখো, আমি আছি, আমাকে দেখো"  -- নিজের জীবনের প্রতিপাদন দরকার পরে। 

তবু আমাদের মত লোকেরা বাঁচে, ভাবে কবে ঐ মেঘলা আকাশ এসবে। কারুর কাছে না, নিজের কাছে নিজের কষ্ট মেলে ধরবে। একা থাকবে। একাকীত্বের সুখ সকলে বোঝেনা। 

Tuesday, October 6, 2020

পাতাঝরা বিকেলবেলা

 ডালাস শহরে এক বছর হয়ে গেল। যা বুঝেছি, এই মরুভূমির দেশে মে আর অক্টোবার হচ্ছে সবচেয়ে বাসযোগ্য। এখানে গরমটা একটু দেরী করে আসে, তাই মে মাসটা বেশ সুন্দর। এদিকে মে মাসে নীল রঙের একটি ফুল হয় -- নাম ব্লুবনেট। অক্টোবারে গরমটা চলে যায়, কিন্তু শীত আসেনা। হাল্কা একটা ঠাণ্ডা হাওয়া দেয়। রাতে একটা হাল্কা চাদর গায়ে দিয়ে শুতে হয়। বেশ লাগে। 

আমাদের কমপ্লেক্সে একটা বড় হাঁটার জায়গা আছে -- যাকে এদেশে বলে ওয়াকিং ট্রেল। আমি রোজ বিকেলে সেখানে হাঁটতে যাই, মাস্ক পরে। আজ সকালে একটু সময় ছিল বলে গেলাম। হাল্কা মিঠে একটা রোদ ছিল। বেশ লাগছিল গায়ে রোদের আমেজ। ওদিকে একটি ডগ পার্ক আছে। এক ভদ্রলোক তাঁর পোষা কুকুরটাকে নিয়ে এসেছিলেন। কুকুরটি আমাকে দেখেই পার্কের ভিতর থেকে চেঁচিয়ে উঠল, আমার সঙ্গে খেলতে চায়। আমি হাঁটছি দেখে পার্কের ভিতরে দৌড়াতে আরম্ভ করল। 

পার্কের হাঁটার রাস্তাটা সোজা নয়। সর্পিল। পাশের মাঠে কিছু ছোট ছোট ফুল হয়েছে। কী ফুল নাম জানিনা। একটু দূরে একটা কাঠবেড়ালি ছুটে গেল। ক'দিন আগে হলে খরগোশ-ও দেখতাম। আজকাল ওগুলি আর আসেনা। ঠাণ্ডা পড়ছে বলে বোধহয়। উত্তরের মত এখানে পাতায় এখনো তেমন রং আসেনি। তাও কিছু কিছু পাতায় হাল্কা লাল আভা। আমাদের এই পার্কের পিছনে একটা রেললাইন। তেমন কোন ট্রেন যায়না, দিনে ১-২ বার শুধু মালগাড়ি যায়। আজকে আমি যখন হাঁটছিলাম, একটা মালগাড়ি গেল। মনে পড়ে গেল, বর্ধমানে দূর্গামাসিদের বাড়ি যখন যেতাম, আমি ট্রেন দেখার জন্য পাগল ছিলাম। ওনাদের বাড়ির খুব কাছেই ট্রেন লাইন। ছাদ থেকে পরিষ্কার দেখা যেত। একবার আমি মালগাড়ি দেখছি, মেসো বললেন -- "এটা তো শুধুই মালগাড়ি।" আমার তাতেই আনন্দ। কত বড় মালগাড়ি, শেষ আর হয়না। 

বিকেলবেলা পড়ার ফাঁকে একটু চা নিয়ে বারান্দায় গেলাম। পাতাঝরার দিনে আমাদের কমপ্লেক্সের যাঁরা মেন্টেনেন্সের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের কাজ বেড়ে যায়। রোজ বিকেলবেলা পাতা পরিষ্কার করেন। এই সময়টা সূর্য ঘুরে যায়। গাছের একদিকে আলো আসে, অন্যদিকে ছায়া। বেশ লাগে দেখতে। মনে আছে, এইরকম হাল্কা শীতের দুপুরে বর্ধমানে মা আমাকে কমলালেবু খেতে দিত। শীত পড়লেই বাড়িতে কমলা হাজির। যখন খুব ছোট মা একটা জুসারে কমলার জুস বানিয়ে দিত। তখনকার দিনে একটা ছোট টিফিন বক্সের মত জুসার পাওয়া যেত। উপরটা ত্রিকোণের মত। মাঝে খাঁজ। টক লেবু হলেই বলা হত ওগুলো নাগপুরের। আজও বুঝি না নাগপুরে কি শুধুই টক লেবু পাওয়া যায়? 

পরশু সুপারমার্কেট থেকে কিছু কমলা কিনেছিলাম। বলা বাহুল্য একটাও নাগপুরের না। একটা খেলাম। পোস্টম্যান ভদ্রলোক চলে গেলেন দেখে মাস্ক পরে লেটারবক্স থেকে চিঠি আনতে গেলাম। দেখি একটা ছেলে বেরোচ্ছে। আমাদের কমপ্লেক্সে অনেক ছাত্র ছাত্রীরাও থাকে। এই ছেলেটির মুখ দেখে মনে হল আমাদের দেশের কেউ। বাচ্চা ছেলে, হাল্কা হাল্কা দাড়ি মুখে। হাতে দেখলাম একটা নীল খাম। একবার চোখ যেতেই দেখি খামের উপর লেখা, "ফ্রম মধুছন্দা রায়।"