Sunday, September 10, 2017

চ্যাট

-- কেমন আছ?
--আরে কি খবর? নতুন চাকরি কেমন লাগছে?
-- ভালো।
-- আর নতুন শহর?
-- ভালোই।
-- বাহ।
-- তোমার কি খবর?
-- এই চলে যাচ্ছে গো। বর, মা বাবা, শ্বশুর, শাশুড়ি, সব নিয়ে নাজেহাল। মায়ের চোখের সমস্যার জন্য মাঝে মাঝেই আমাকে বাড়ি যেতে হয়। তা হঠাত, কি মনে করে?
-- নাহ, একটা কথা বলার ছিল।
-- বল না।
-- কিছু মনে কর না প্লিজ, আজ ভাবলাম বলেই দিই। তোমাকে না আমার ভালো লাগত।
-- মানে?
-- মানে বোঝাতে পারব না। নিজে বুঝি না। ভালো লাগত। ভালবাসতাম না হয়ত, কিন্তু ভালো লাগত। হয়ত ...
-- তা এতদিন বলোনি কেন?
-- আরে এতদিন এক অফিসে ছিলাম তো।
-- তো?
-- না যদি তোমার আমাকে ভালো না লাগত, তাহলে হয়ত একসাথে কাজ করাই সমস্যা হয়ে যেত। আর ঐ যে তুমি রোজ সকালে এসে আমার সঙ্গে দেখা হলে হাসতে, সেটাও হয়ত মিস করতাম। এখন আলাদা অফিস, আলাদা শহর, সবই আলাদা।
-- তাই আজ বললে?
-- বলতে পারো। তাছাড়া, তোমার তখন বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য পাত্র দেখা চলছিল, যদি তোমার আমাকে পছন্দও হত, হয়ত বিয়ে করতে চাইতে। আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না একদমই।
-- বুঝেছি।
-- কিছু মনে করলে না তো?
-- নাহ। শুধু একটাই কথা বলার আছে।
-- কি?
-- তুমি তখনি বললে পারতে। হাসিটা মিস করতে না। 

Saturday, August 5, 2017

প্রথম উপার্জন

আজ সকাল থেকেই দিনটা খারাপ যাচ্ছে। সকালে ঘুম ভাঙল রঙ্গোলীর আওয়াজে। রবিবার সকালে দূরদর্শনে এই গানের অনুষ্ঠানটি হয়। বাড়িতে প্রতি রবিবার-ই এটি চলে টি ভিতে। বাবা সকাল সকাল টি ভি খুলে দেন। এই অনুষ্ঠানটির একটি বিশেষত্ব আছে। শুরুতে রাজ কাপুর, দেব আনন্দদের গান দেখায়, তারপর আস্তে আস্তে রাজেশ খান্না, অমিতাভ হয়ে হালের শাহ্রুখ খান, অক্ষয় কুমার। বাবা নিজে ঐ রাজেশ খান্না অবধি শোনেন। তারপর যা চলে তা সবিতাদির জন্য। সবিতাদি সকালে সবজি কাটে -- তাই তাকে খুশী রাখতে ওসব চালাতে হয়। নইলে বাবার ভাষায় ঐ গানগুলি "অপসংস্কৃতি"।

আজ যেই পরদেশ-এর গান শুরু হল, অর্ক ছুটে গিয়ে বাবাকে ধরল

-- এই ক্যাসেটটা কিনে দেবে?
-- কোন ক্যাসেট?
খবরের কাগজটা নামিয়ে রেখে জানতে চাইলেন কমলবাবু।
--এই যে পরদেশের। কুমার শানুর গানটা খুব ভালো।
-- না ভালো না। না দেবো না।
আবার কাগজে মুখ গুঁজলেন কমলবাবু।
-- কেন দেবে না?
-- আমার পয়সায় এই অপসংস্কৃতি কেনা যাবে না। নিজে উপার্জন করে কেন।
-- ঠিক আছে গত মাসে ছোটপিসি যে টাকাটা দিয়েছিল জন্মদিন বলে, সেটা দাও, সেটা থেকে কিনব।
এবার কাগজটা নামালেন কমলবাবু
-- ওটা উপহার, আমি বলেছি উপার্জন, তোদের স্কুলে কি বাংলা শেখানো হয়না? আর এই নিয়ে আমি কোন কথা বলতে চাই না।

সেই থেকেই মেজাজটা খিঁচড়ে আছে অর্কর। তার ওপর আজ দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে যাওয়ার কথা ছিল। ওমা, রাকেশ নিজের মা, বাবা, দাদার সঙ্গে কলকাতায় চিড়িয়াখানা দেখতে চলে গেছে। কাজেই পিকনিক-ও ক্যান্সেল। এখন ছাদে বসে বসে এক মনে দুটো এমব্যাসি ক্রিম বিস্কুট খাচ্ছিল অর্ক। নিচে মা বাসনওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করছে

-- এই গেঞ্জিটা কেন নেবে না?
-- না বউদি, এটা একদম ছিঁড়ে গেছে।
-- তা হলে ঐ পাঁচটা জামাতেই এই বালতিটা দাও।
-- না, আর একটা জামা দিন। ছ'টা না হলে হবে না।

এই সময় বাবানদার গলা শুনতে পেল

-- এই অর্ক, কি করছিস? নিচে আয়।
-- কি হয়েছে?
নিচে এসে দেখে বাবানদা আর রানা।
-- আর বলিস না, রাজেশ আর আমরা মিলে আজ বইমেলাতে কুইজে যাব বলেছিলাম, তো রাজেশ বেপাত্তা।
-- হ্যাঁ জানি, ওরা সবাই মিলে কলকাতায় বইমেলা গেছে।
-- রাজেশদা সবসময় এরকম করে। গেলবার মিঠাপুকুর বাপ্পা স্মৃতি কাপের সেমি ফাইনালের দিন পালিয়েছিল।
এবার রানার রাগের পালা।
-- তো আমি কি করব?
-- আরে তিনজনের টিম দরকার কুইজে, তুই চল।
-- আমি? ধুর, তুমি আর রানা কত ভালো কুইজ কর। আমি তো কিছুই জানি না। কোনদিন নামও দিইনি।
-- উফ, তোকে কিছু করতে হবে না। যা করার আমি আর রানাই করব। তুই শুধু টিমে থাক। বাড়ি বসে কি ভ্যারেন্ডা ভাজছিস?
-- চলো।

বইমেলা হয় টাউন হলের মাঠে। দুপুর ৩ টে থেকে কুইজ শুরু হল। প্রথমে রিটেন রাউন্ড আর সেমি ফাইনাল পেড়িয়ে অর্করা সহজে উঠে গেল ফাইনালে। আজ দারুণ ফর্মে বাবানদা। রানাও টপাটপ বলে দিচ্ছে। অর্ক যে কিছুই জানে না তা নয়, কিন্তু ও যেগুলো জানে, বাবানদারাও সেগুলো জানে, তাই অর্ককে কিছু করতে হচ্ছে না।

এবার ফাইনাল। পাঁচটা টিম ফাইনালে। তাদের মধ্যে আছে মিশন স্কুলের টিম। মিশন স্কুলের এই টিমটি খুবই স্ট্রং। গতবছর বইমেলাতেও ওরাই জিতেছিল। অর্ক ভাবছে আজ কি বাবানদা আর রানা পারবে এদের সাথে!

প্রথম দুটি রাউন্ড হাড্ডাহাড্ডি গেল। এখন মিশন স্কুল আর অর্করা -- দুটি টিম-ই ২৫ পয়েন্টে। এবার শুরু হল অডিও রাউন্ড। একটি গান বা কিছু আওয়াজ চালিয়ে প্রশ্ন করা হবে। অর্কদের প্রশ্নের উত্তর সহজেই দিল রানা। মিশন স্কুলের প্রশ্ন এল এবার। টেপে চালানো হল লতা মঙ্গেশকরের গান
"এ মেরে ওয়াতন কে লোগো"।
এবার প্রশ্ন করলেন কুইজমাস্টার
--বলো তো এটা কার লেখা?
মিশন স্কুলের মুখ দেখে বোঝা গেল তারা জানে না। অনেক ভেবে চিনতে তারা ভুল উত্তর দিল। বাবানদা এবার মুখ কাছে এনে বলল
--ইয়েস, ওরা পারেনি। আমি এটার উত্তর জানি না, তুই জানিস রানা।
--না, আমিও জানি না।
--এটা পারলে বোনাস আরো ৫ পয়েন্ট পেতাম। যাকগে।
এবার ভাবতে লাগল অর্ক। আচ্ছা এই ক্যাসেটটা বাবা এবার কিনেছিল না? স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে লতার গলায় এই ক্যাসেটটা বার করেছিল এইচ এম ভি। সেখানে একটা ছোট বই ছিল যাতে প্রতিটি গানের সম্বন্ধে লেখা ছিল। কার কথা, কার সুর, কবে রেকর্ড করা।
-- আমি জানি।
বলে উঠল অর্ক।
-- তুই? পারবি?
-- না পারলে ক্ষতি কি? বলুক।
এবার পাস হতে হতে মাইক চলে এসেছে অর্কদের কাছে। অর্ক আত্মবিশ্বাসের সাথে মাইক ধরে বলল
-- কবি প্রদীপ।
-- একদম সঠিক উত্তর টিম ২।
কুইজমাস্টারের গলা শুনে বাবানদা অর্কর কাঁধে হাত রাখল।
-- সাবাশ অর্ক।

এরপর আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি মিশন স্কুল। অর্করা বাকি রাউন্ডগুলো সহজেই পেড়িয়ে গেল। যদিও অর্ককে আর কোন উত্তর দিতে হয়নি। বাবানদা আর রানাই সব সামলাল।

ফার্স্ট প্রাইজ ৬০০ টাকা হাতে পেয়ে দারুণ লাগল অর্কর। টাকাটা তিনজনে ভাগ করে নিল। বাড়ি ফেরার আগে টাউন হলের সামনের দোকান থেকে তিনজনে এগরোল খেল। বাড়ির রাস্তায় একটা ক্যাসেটের দোকান দেখে সাইকেল দাঁড় করাল অর্ক।

-- কি হল রে?
-- দাঁড়াও বাবানদা, আজ প্রথম উপার্জনের টাকা থেকে নিজেকে কিছু উপহার দিই।






Tuesday, August 1, 2017

মফঃস্বলের গল্প

-- এতক্ষণে বাড়ি আসার সময় হল?
জানি আমার দরজার কড়া নাড়ার আওয়াজ মা বুঝতে পারে। নইলে বাড়িতে সবিতাদি থাকলেও মা নিজেই দরজা খুলতে আসে। সবিতাদি দেখলাম টি ভির সামনে বসে লাউ কাটছে। টি ভিতে এখন কোলগেটের বিজ্ঞাপণ।
-- এই খেলা শেষ করেই এলাম।
-- বাজে বকিস না, কখন সন্ধ্যা নেমে গেছে!! অন্ধকারে কিভাবে ফুটবল খেলিস? নিশ্চয় আড্ডা দিচ্ছিলি?
-- না মা, আড্ডা না। এই একটু আর কি ...
-- আজ পায়ে লাগেনি তো?
-- না আজ ঠিক আছে
টি ভিতে গান শুরু হল -- "জন্মভূমি"...
-- যা বাথ্রুমে জল রাখা আছে, স্নান করে নে। প্যান্টটা তো কাদা ভর্তি, নামিয়ে দে। কাল সকালে ধুয়ে নিস।
-- না না, আমি এটা পরে কালকেও খেলতে যেতে পারব।
-- যা বলছি শোন। তোর ঐ কালো প্যান্টটা পরে যাস কাল। আমি এখন টি ভি দেখতে গেলাম।
-- জানো মা...
-- কী?
-- না কিছু না।
-- বল জলদি।
-- আজ যা একটা গোল দিয়েছি না, সবাই বলছে চিমা।
-- হয়েছে!! যাকগে শোন, সরকারদের বাড়ির মিতা এসেছিল। তোর টেস্ট পেপারটা চাইছিল। আমি তো জানি না কোথায় থাকে। কাল সকালে আসবে। দিয়ে দিস।
-- আচ্ছা।
--এবার স্নান করে পড়তে বস। কে বলবে কয়দিন বাদেই মাধ্যমিক?


স্নান করতে করতেই বাথ্রুমে অন্ধকার নেমে এল। বাইরে থেকে মায়ের গলা শোনা গেল --

"এই এক শুরু হয়েছে, রোজ জন্মভূমিটা শুধু দেখতে দেয়। তারপরেই এই এক ঘন্টার লোডশেডিং। সবিতা, সবজিগুলো রান্নাঘরে রেখে আয়। দাঁড়া, আগে একটা হ্যারিকেন জ্বালাই। বাবুর ঘরেও একটা হ্যারিকেন দিয়ে আসি। ছেলেটা পড়বে কি করে কে জানে এই গরমে?"




সন্ধ্যা সাতটায় হাওড়া বর্ধমান কর্ড লাইন সুপার এসে থামল বর্ধমান স্টেশনে। ট্রেন থেকে নেমে সামনের দিকে হাঁটা দিলেন কমলবাবু। আগে তিনি স্টেশনেই সাইকেল রাখতেন। একদিন হাওয়া খুলে যাওয়ার পর আর রাখেন না। জি টি রোডের ওপারে মদনের দোকানে রাখেন। মাসের হিসেবে টাকা পায় মদন। একদিকে সাইকেল সারানোর দোকান, আর একদিকে সাইকেল স্ট্যান্ড।

সাইকেল নিয়ে বি বি ঘোষ রোডের দিকে মোড় ঘুরতেই তাঁর চোখ গেল দুলালের চপের দোকানে। রাধা খুব ভালোবাসে এই গরম গরম চপ। বিয়ের পর অফিস থেকে ফেরার সময় প্রায়ই নিয়ে যেতেন কমলবাবু। অনেকদিন খাওয়া হয়না। অবাক কান্ড, দুলালের চেহারার তেমন পরিবর্তন হয়নি। সেই ঘামে ভেজা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে এক মনে ভেজে যাচ্ছে। মনে মনে ভেবে সাইকেলটা থামালেন কমলবাবু। রাধাকে চমকে দেবেন। যদিও মুখে বলবেন বাবুর জন্য এনেছেন। কিন্তু রাধা তো বুঝবেই। আপন মনেই হেসে ফেললেন কমলবাবু।


ঠিক সেই মুহুর্তে কমলবাবুর বাড়ির কোণার ঘরে হ্যারিকেনের আলোয় সাদা কাগজে লেখা একটা চিঠি পড়ছিল তাঁর ছেলে -- "... টেস্ট পেপারের মধ্যে রেখে দিও তোমার চিঠিটা।"

মফঃস্বল নিজের মত করেই ভালোবাসে।


Sunday, April 9, 2017

অকাল বোধন

-- কবে এল?
-- গতকাল রাত্রে।
-- তোমরা দমদম গিয়েছিলে আনতে?
-- নাহ, তবে রঘুকে পাঠিয়েছিলাম গাড়ি নিয়ে।
-- রঘু কিছু বলেনি?
-- সেরকম কিছু না। ও তো শান্তাকে ছোট থেকে দেখছে।
-- আচ্ছা। ঘুম ভেঙেছে?
-- নাহ, কাল অত রাতে এল। আমি আর ডাকিনি।
-- সেই ভালো। আমি আসি গো। বিকেলে আসব নাহয়।
-- তোমার আবার কিসের তাড়া? রান্নার লোক আছে তো! আমার মত নাকি?
-- আরে তা নয়, জানোই তো ওর বাবা ...
-- ধুর ছাড়ো।
-- তা কতদিন বাদে এল শান্তা? এক বছর না?
-- না না, তার বেশী। গত আগস্টে গিয়েছিল আর এই পুজোয়।
-- ওহ। জানো আমার রনির কিন্তু গুরুদেব এখনও শান্তা। বার বার বলে, কত ছেলে এলো গেলো, শান্তাদার মত কাউকে দেখলাম না। ভাবা যায়, আমাদের এই মফঃস্বল শহর থেকে আই আই টি?
-- না না, এই তো গতবছর কে একটা পেল শুনলাম?
-- আরে এখন তো সিট বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্তাদের সময় ছিল নাকি সেরকম!! মিশন বয়েজ স্কুলের ছোট ছোট ছেলেরা এখনও শান্তা দাশগুপ্ত-র নাম শুনলে অজ্ঞান। স্যারেরাও বলেন -- "ওর'ম ছেলে হয়না"।
--  তোমার রনিও তো ভালোই বাবা।
-- কি যে বল। কোথায় শান্তা আর কোথায় রনি। এখন বলছে আর পড়াশুনা করবে না, কিসব নাকি ব্যবসা করবে। ভাবো! তোমার মত ভাগ্য করে তো আর জন্মাইনি। আমার ছেলে উচ্চমাধ্যমিকেই ২ বার --
-- সেই। ভাগ্য। আমার ছেলেও ওরকম উচ্চমাধ্যমিক দু'বার দিলে বোধহয় ভালো হত।
-- কবে হল গো এসব?
-- ও যাওয়ার পর পরই। শুনেছি আগে থেকে ভেবেই গিয়েছিল।
-- তোমরা জানতে?
-- না না। ওর বাবা তো ইন্টারনেট পারেও না, তাই দেখিওনি। এই তো ক'দিন আগে আমাদের রুনুর ছেলে টি সি এস থেকে আমেরিকা গেল চাকরি করতে। ওরা তো দেখি কম্পিউটারে ভিডিও চ্যাট করে।
-- তো তোমরা কবে জানলে?
-- আসার এক মাস আগে বলল।
-- কাল দেখে কিছু বুঝতে পারলে?


-- মা, গুড মর্নিং, বাবা কই? আরে শুভ্রা কাকিমা না? কেমন আছেন? রনি ভালো?

(কালো টি শার্ট আর বারমুডা পরে ঘরে এল শান্তা)

-- আমি আসি দেবকীদি। ভালো আছি বাবা। বিকেলে আবার আসব। তোর কাকুর আসলে ... বিকেলে মন্ডপে আসবি তো?

-- নিশ্চয়। এতদিন বাবার ভালো পাঞ্জাবী পরে পুজোয় যেতাম। এবার থেকে মায়ের শাড়ী পরব। 

Wednesday, February 1, 2017

আহা আজি এ বসন্তে

অরিন্দমবাবুর যখন ঘুম ভাঙল ততক্ষণে শর্মিলাদেবীর সকালের জলখাবার বানানো হয়ে গেছে। অরিন্দমবাবুর বয়স বাড়ছে। তাই সকালে শুধু ওটস। নিজেও তাই খান শর্মিলাদেবী। ছেলের জন্য অবশ্য ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানিয়েছেন। একে তো আজ শনিবার। বনি সকালে ফ্রেঞ্চ টোস্ট খেতে ভালোবাসে। তার মধ্যে আজ সরস্বতী পুজো। দুপুরে খাওয়া কখন হবে তার ঠিক নেই। এখানে অবশ্য বাচ্চাদের জন্য পিতজা আসে। শর্মিলা শুনেছেন এটা নাকি আমেরিকাতে সব বাঙালিরাই করে। মানে নিজেরা পুজোর দিন দুপুরে খিচুরি, লাবড়া, ভাজা এসব খেলেও বাচ্চাদের এসব দেওয়া হয় না। তারা নাকি "স্পাইস সহ্য করতে পারবে না"। শর্মিলার এই যুক্তিটি খুব একটা মনে ধরেনি। তিনি নিজে অনেক ছোট বয়স থেকেই খিচুরি খেয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কি, আমেরিকা আসার আগে তিনি কোনদিন পিতজা খাননি। কিন্তু কি আর করা যাবে, সবাই যা করছে তাঁকেও তাই করতে হবে। তিনি মেনে নেন। সবই মেনে নেন।

     সরস্বতী পুজো ছিল বুধবার। পশ্চিমবঙ্গে সেই দিনেই পুজো হয়েছে। এই দেশে শনি-রবি দেখে পুজো হয়। সবার ছুটির ব্যাপারটাও দেখতে হবে তো। শর্মিলা থাকেন আমেরিকার মধ্যভাগের একটা মাঝারি মাপের শহরে। আগে কিন্তু এখানে এত ঘটা করে পুজো হত না। মাত্র ১০-২০ জন বাঙালি ছিল। কারুর নিজের বাড়িতে ইচ্ছে হল করত, বা বড় পুজো দেখতে হলে শিকাগো যেত। শহরে একটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। গত কয়েক বছরে প্রচুর বাঙালি ছেলে মেয়েরা সেখানে পড়তে আসতে শুরু করে। মূলত তাদেরই উদ্যোগে এই পুজো শুরু হয় বছর তিনেক আগে। পুজোর দুদিন আগে থেকেই এখানকার বাঙালিদের মধ্যে সাজো সাজো রব। একটা স্কুলের অডিটোরিয়াম ভাড়া করে পুজো হয়। সেই অডিটোরিয়াম সাজানো, সবজি বাজার করা, রান্নার যোগাড় করা, অনেক কাজ। কাল অনেক রাত অবধি সবজি কেটেছেন শর্মিলা। এ ছাড়াও তার কাঁধে আর এক গুরুদায়িত্ব আছে।

      সকালে পুজো হয়ে গেলে বিকেল থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতি বছরই ছোটদের অনুষ্ঠানের পরিচালনায় থাকেন শর্মিলা। একদম বাংলা না বলতে পারা বাচ্চাদের ধরে বীরপুরুষ আবৃতি করানো যে কি কঠিন কাজ, যারা করেনি তাদের ধারণাও নেই। শর্মিলা কিন্তু এই কাজে পটু। তাই প্রতিবার পুজোর আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে ধরে -- "কাকিমা, ছোটদেরটা আপনি সাম্লাবেন তো?"
এতেই শেষ নয়। তাঁদের এই ছোট শহরের সব বাঙালিরা তাঁর গানের অপেক্ষায় বসে থাকে। অসম্ভব ভালো গানের গলা শর্মিলার। অনেকে তো তাঁকে অনুরোধ করে কলকাতায় গিয়ে গানের সি ডি করাতে। তিনি শুধুই হাসেন। আজও তিনি জানেন, সব অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে শুরু হবে তাঁর গান। একটা দুটো নিজের পচ্ছন্দ মত গান করার পর আসবে অনুরোধ। "কাকিমা অন্তহীনের গানটা করুন না।"

শর্মিলা যখন স্কুলে পৌঁছালেন, তখনো অঞ্জলি শুরু হয়নি।

"এই শর্মিলাদি এস, এদিকে ফুল্গুলো দিয়ে দেবে। বনি কোথায়?"
"ঐ তো বাইরে, লিলিদের সঙ্গে খেলছে।"

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর একটু ছুটি থাকে সবার। সন্ধ্যা নাগাদ অনুষ্ঠান শুরু হয়। ছাত্র-ছাত্রীর দল চেয়ার টেবল পাততে শুরু করল। অরিন্দমবাবু বাকি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে লাগলেন। শর্মিলাদেবীর মনে হল এবার বলা যেতে পারে।

রূপসাকে ডাকলেন। এই মেয়েটি বছর দুয়েক আগে বিয়ে করে তাঁদের শহরে এসেছে।

"শোন না, আমার একটু মাথাটা ধরেছে। তুই একবার বাচ্চাদের দেখে দিতে পারবি। আমি একটু বাড়ি হয়ে আসছি।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, পারব। কিন্তু তোমার কি খুব শরীর খারাপ?"
"না না সেরকম কিছু না। চিন্তা করিস না। আমি একটু এক ঘন্টা শুয়ে নিয়ে শাড়িটা পাল্টে আসছি। জানিসি তো আমার মাইগ্রেন।"
"কোন চিন্তা কর না। অরিন্দমদাকে ডেকে দেব?"
"দরকার নেই, আমি নিজেই ড্রাইভ করে নেব। আসি রে।"
"বিকেলে কটায় আসবে?"
"ছটার মধ্যে চলে আসব। তার আগে তো শুরু হবে না কিছু।"
"ঠিক আছে।"

বাড়ির পিছনের দরজা খুলে লনে চলে এলেন শর্মিলা। তাঁদের বাড়ির পিছনের এই লনটি তাঁর খুব প্রিয়। এখানে দুটি ইজি চেয়ার রাখা আছে। মাঝে মাঝে তিনি আর অরিন্দমবাবু এসে বসেন। লনের উল্টোদিকে একটা পুকুর, পাশে ফোয়ারা। রাত্রিবেলা দেখতে বেশ লাগে। আজ অবশ্য চেয়ারে না বসে ঘাসে বসলেন তিনি। একটা সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে রাখলেন। পুকুরটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন পূর্ণিমার কথা। পূর্ণিমা তাঁর বর্ধমানের সহপাঠি। দর্শনের ছাত্রী। তাঁরা একই হস্টেলে থাকতেন। এখন পূর্ণিমা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সরস্বতী পুজোর ছবি শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। তাঁদের হস্টেলের ছবিও। মাঝে মাঝে শর্মিলার মনে হয় ফেসবুক জিনিসটা না থাকলে কত ভালো হত। এই বার বার পিছন ফিরে তাকানো সবসময় ভালো লাগেনা।

 কিন্তু এখন সে আক্ষেপ করে লাভ নেই। পিছন ফিরেছেন যখন একবার তখন সেটা আর পাল্টানো যাবে না। সামনের পুকুরটার দিকে তাকিয়ে আর এক পুকুরের কথা মনে পড়ল তাঁর। লালদীঘি।


বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আবাসন তারাবাগের মধ্যেই অবস্তিত লেডিজ হস্টেলগুলি। ছেলেদের হস্টেল্গুলি বাইরে। নিবেদিতা হস্টেলের ছাত্রীরা সেদিন সকলে মিলে তাদের হস্টেলটি সাজিয়েছিল। টুনি বাতি আর রঙ বেরঙের কাগজের চেন। হস্টেলের সামনে মোরামের রাস্তা। রাস্তা ধরে বাঁদিকে হাঁটলে এক সরু পিচের রাস্তা যার পাশেই লালদীঘি। পিচের রাস্তা আর লালদীঘির মাঝে আক ফালি জমি। সেই জমির উপর সেদিন বসেছিল তারা দুজনে।  পিছনে স্ট্যান্ড করা ছিল একটি হিরো সাইকেল।

"মনে রেখ সরস্বতী পুজোর দিন আমি হ্যাঁ বলেছিলাম।"
"প্রত্যেক সরস্বতী পুজোতে মনে রাখব।"
"তোমাদের বাড়িতে তো পুজো হয়, গেলে না?"
"তুমি তো বলেছিলে দরকার আছে, তাই গেলাম না।"
"এ বাবা, বাড়িতে কি বললে?"
"ভোলা তো আমাদের পাড়াতেই থাকে, ও বলে দেবে আমার কিছু কাজ আছে কলেজের, তাই যাইনি।"
"কলেজের?"
"হ্যাঁ, বাড়িতে জানে আমি এম এস সি পাশ করেই কলেজে পড়াব।"
"অঙ্কের অধ্যাপক শ্রী সুজিত কুমার দেবনাথ। হা হা হা।"
"হাসছ কেন? হতে পারিনা?"
"না না হতে পারবে না কেন? আচ্ছা তোমার পি এইচ ডি করার ইচ্ছে নেই?"
"থাকবে না কেন? কিন্তু জানোই তো বহু বছর ধরে বাবার কারখানায় লক-আউট। আমাকে তো বাবা বলেছিল কলেজ পাশ করেই স্কুলে পড়াতে। এই দু' বছর কোন রকমে পেয়েছি। বাড়িতে ছোট ভাই আছে। এ অবস্থায় আমি পি এইচ ডি করতে ঢুকলে হয়? কলেজে পড়াতে পড়াতে পার্ট টাইমে করব ভেবেছি। তুমি?"
"আমার তো বাবা বলেইছে এম এস সির পর বিয়ে দিয়ে দেবে। এই সিগারেটটা নেভাও।"
"একটাই তো খাই সারাদিনে।"
"কি দুর্গন্ধ বাবা।"
"তুমি বিয়ে করে নেবে?"
"মাথা খারাপ? আমি বলে দিয়েছি ওসব হবে না।"
"আচ্ছা তোমার বাবা আমাকে মেনে নেবেন তো?"
"কেন?"
"তোমরা বামুন। আমরা নই। তুমি দূর্গাপুর শহরের মেয়ে। আমি রসুলপুরের গ্রামে থাকি। তোমার বাবা কি এরকম বাড়িতে মেয়েকে ছাড়বেন? হয়ত শহরের বা বিদেশে থাকা কোন ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দেবেন।"
"খালি বাজে কথা। বাবা বললেই হল, আমার মতের দাম নেই? এত কষ্ট করে পড়াশুনা করলাম কেন? বাবার পছন্দ করা ছেলেকেই যদি বিয়ে করি। এই তুমি সারাক্ষণ এরকম আজে বাজে চিন্তা কর কেন? একটু ভালো কিছু বলতে পারো না?"
"আচ্ছা বাবা। বলছি। তোমার কানের দুলটা বেশ সুন্দর।"
"কি ন্যাকামো!! আমি চলে যাচ্ছি।"
"আরে না থাকো না। একটা গান শোনাবে?"
"কি গান?"
আরে তুমি এতদিন ধরে দূর্গাপুরে গান শিখেছ, একটা গান গাইতে পারবে না?"


"শর্মিলাদি এলে? এখুনি বীরপুরুষ শুরু হবে।"
"হ্যাঁ চল চল। লিলি, বনি, বুবুনরা তৈরি তো?"
"একদম।"

সব অনুষ্ঠানের শেষে স্টেজে গান গাইতে উঠলেন শর্মিলা। সামনে রাখা হারমোনিয়ামটা নিয়ে একবার চোখ বন্ধ করলেন। তারপর সেই গানটাই ধরলেন যেটা গেয়েছিলেন আজ থেকে বহু বছর আগে, এক সরস্বতী পুজোর দিন, লালদীঘির পারে।


Friday, January 20, 2017

একটি গানের ইতিহাস

ধর্মতলা থেকে যখন বাসে উঠলাম তখন বাজে বেলা তিনটে। বাস বেশ ফাঁকা। বসার জায়গাও পেলাম। জানালার ধারেও। খানিকক্ষণ বাদে কন্ডাক্টার এসে টিকিট কেটে গেলেন। সবই ভালো, শুধু ঐ একটাই খিঁচ খিঁচ রয়ে গেল মনের ভিতর। ফোন বুথের সামনে বিশাল লাইন। তাই ফোন করা গেল না। তাও যদি এস টি ডি করতাম, হয়ত বুথের মালিক ব্যবস্থা করে দিতেন। লোকাল কলের খদ্দেরদের এরা পাত্তাই দেয়না। যাকগে, রাসবিহারীতে নেমে করব।
     পার্ক স্ট্রিট পার হয়ে বাস যখন এক্সাইডে দাঁড়াল, বাসে এক ভিখারি উঠল। আজ সব কিছুই ভালো যাচ্ছে আমার, মনটাও খুশী। পুরো এক টাকা ভিক্ষা দিলাম ব্যাটাকে। যা, ভালো করে খা আজ। ভিখা্রিটা বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে -- "ঈশ্বর আপনার ভালো করুন।" বলে চলে গেল। তা বটে, আজ বহুদিন বাদে ঈশ্বর আমার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন বটে।
    নাহ, এবার চেতলার ঐ মেসবাড়ি ছাড়তে হবে এবার। অনেক হল। আর ভালো লাগে না ঐ পোড়া রুটি খেতে রোজ রাত্রে। এবার ভাবছি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করব। এক কামরার হলেও নিজের বাড়ি তো। কোথায় ভাড়া নেওয়া যায় ভাবছি। বংশী বলছিল গত মাসে বোসপুকুরে নাকি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। বেশ সস্তা আর ওখান থেকে নাকি ধর্মতলা যাওয়ার বাসও অনেক। গিয়ে খোঁজ করতে হবে।
    এসব ভাবতে ভাবতে যে কখন রাসবিহারী এসে পড়েছি নিজেরই খেয়াল নেই। কন্ডাক্টারের ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নেমে পড়লাম। একটু হেঁটেই একটা এস টি ডি বুথ।

"একটা লোকাল কল করব।"
"যান, ঐ ঘরে।"

ঘর বলতে তিন দিকে কাঠের পাল্লা আর এক দিকে দেওয়াল দেওয়া এক মানুষ এক ফালি জায়গা। কাঠের পাল্লাগুলোর গায়ে বড় বড় কাঁচ লাগানো, যাতে বাইরে থেকে দেখা যায় খদ্দেরকে। ঘরের মধ্যে একটি অর্ধচন্দ্রাকার টেবিলের উপর একটা টেলিফোন। উপরে ডিজিটাল মিটার। কতক্ষণ কথা বলা হয়েছে আর কত টাকা বিল উঠছে দুই দেখা যায়।

ঘরে ঢুকে ডায়াল করলাম সেই নম্বর -- ২৪৪১১৩৯।

Friday, January 13, 2017

বিচ্ছেদ



মফঃস্বলের জন্য কেউ গান বা কবিতা লেখে না। নগরের কবিয়াল আছে; গ্রামে গেলে সবাই মুগ্ধ হয়ে কবিন্দ্রনাথ হয়ে যায়। কিন্তু মফঃস্বল যেন বড়ই একা, বড়ই অনাদরের। মফঃস্বলের কি কান্না পায়? পায় হয়ত, কিন্তু আপাতত ফটিকের পাচ্ছে না। 

   ফটিকের বয়স তেরো। মফঃস্বলের আর চার পাঁচটা তেরো বছরের ছেলের মতই। বিশেষত্ব কিছু নেই তেমন। দেখতেও সাদামাটা। কয়েক বছর বাদেই মাধ্যমিক। সবাই জানে ফটিক পাশ করে যাবে, সবাই জানে ফটিক স্ট্যান্ড করবে না। ফটিক যে খেলাধূলাতেও তেমন ভালো তা নয়। এই হয়ত দশ ওভারের খেলায় এক ওভার বল পায়। পাঁচ বা ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নামে। একেবারেই মধ্যমেধা বলতে যা বোঝায় আর কি। ক্লাশে স্যারেরাও জানেন ফটিক বলে একজন আছে। ব্যাস এইটুকুই। 

   তবে এসবের মধ্যেও ফটিককে ক্লাশের অনেকেই অন্য চোখে দেখে। তার কারণ একটাই -- ফটিকের একজন প্রেমিকা আছে। মানে আজ অবধি ছিল আর কি। ছিল কেন, এখনো আছে তো! ফটিকের এই প্রেমিকার নাম প্রিয়া। গার্লস স্কুলে পড়ত। আলাপ গত বছর অঙ্কর কোচিং-এ। ফটিকের কেন প্রিয়াকে ভালো লেগেছিল সে কথা কারো জানা নেই। প্রিয়ার মনেই যে কেন ফটিক দাগ কেটেছিল, তাও কেউ জানে না। সে না জানলেও এই একটি কারণে বন্ধুমহলে ফটিকের এক আলাদা সম্মান ছিল। ফটিকও যে মাঝে মাঝে বন্ধুদের এ ব্যাপারটা বোঝাত না তা নয়। 

"এই আজ কোচিং-এ যেতে দেরি হবে, প্রিয়ার সঙ্গে দেখা করা আছে।"

বন্ধুরা অবাক হয়ে তাকাত ফটিকের দিকে। মফঃস্বলের প্রেমিকা বলে কথা। কেউ কেউ তো জিজ্ঞেসও করত 

-- "হ্যাঁ রে, তোরা দেখা হলে কি করিস?" 
"তুই ওর হাত ধরেছিস?"
"চুমু খেলি?"

এসব প্রশ্ন করার একটাই কারণ, ফটিকরা কোথায় দেখা করত বন্ধুরা শত চেষ্টা করেও জানতে পারেনি।

আজ সেই রেললাইনের ধারে মাঠটায় বসে আছে ফটিক। একটু বাদেই প্রিয়াদের ট্রেন এখান দিয়ে যাবে। প্রিয়া কি খেয়াল করবে? নিশ্চয় করবে। বলে তো দিয়েছে ফটিক।

"সেখানেই থাকব।"
"তোমার মন খারাপ করবে না তো?"
"আমার ফোন নম্বর তো আছে তোমার কাছে, ওখানে পৌঁছে ফোন করো।"
"জানি না ফোন থাকবে কিনা। কলকাতা হলে তো চিন্তা করতাম না, যাচ্ছি সেই মালদা।"
"থাকবে নিশ্চয়। মাসিমা ফোন ছাড়া থাকবেন কি করে?"
"যাহ।"
"শোনো, করলে কিন্তু ঐ আটটার সময় করো। তার আগে করলে মা ধরবে।"
"বুঝেছি রে বাবা।"
"এই তুমি মালদা গিয়ে আমাকে ভুলে যাবে না তো?"
"তুমি আমাকে ভুলবে?"

শুরু হল দু'জনের মান অভিমানের পালা। প্রিয়ার ট্রেন একটু বাদেই এখান দিয়ে যাবে। প্রিয়া বলেছে জানালায় হাত নাড়বে। যদিও সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, গোলপোস্টের ক্রসবার পূর্ণিমার চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছে, তাও ফটিকের ধারণা সে প্রিয়াকে দেখতে পাবে। 

ফটিকের মূল সমস্যা হল ওর কান্না পাচ্ছে না। এই সময় সবারই কাঁদা উচিত। প্রিয়াও কাঁদছিল সকালে। কিন্তু ফটিক সারাদিন কাঁদেনি। অথচ এটা উচিত না। হয়ত ট্রেনে প্রিয়াকে দেখলে কাঁদবে।

ট্রেনটা যখন আর দেখা গেল না, প্যান্ট ঝেড়ে উঠে পড়ল ফটিক। সাইকেলটায় উঠতে গিয়ে বুঝল সামনের চাকাটা কখন যেন পাংচার হয়ে গেছে। কাছাকাছি কোন দোকান-ও নেই। সেই চন্ডীবাজারের কাছে একটা আছে। চাঁদের আলোয় সাইকেল হাঁটাতে থাকল ফটিক। নাহ, এখনো কান্না পাচ্ছে না। কিন্তু সহসা যেন ভীষণ ক্লান্ত লাগছে ফটিকের। 

রোলের দোকানের গন্ধ, ট্রেনের আওয়াজ, রিক্সার হর্ন, এস টি ডি বুথের আলো, "জন্মভূমি"-র গান, ভাতের দোকানের চীৎকার যেন মফঃস্বলের কান্না ঢেকে দিল ক্লান্তিতে।