Wednesday, February 1, 2017

আহা আজি এ বসন্তে

অরিন্দমবাবুর যখন ঘুম ভাঙল ততক্ষণে শর্মিলাদেবীর সকালের জলখাবার বানানো হয়ে গেছে। অরিন্দমবাবুর বয়স বাড়ছে। তাই সকালে শুধু ওটস। নিজেও তাই খান শর্মিলাদেবী। ছেলের জন্য অবশ্য ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানিয়েছেন। একে তো আজ শনিবার। বনি সকালে ফ্রেঞ্চ টোস্ট খেতে ভালোবাসে। তার মধ্যে আজ সরস্বতী পুজো। দুপুরে খাওয়া কখন হবে তার ঠিক নেই। এখানে অবশ্য বাচ্চাদের জন্য পিতজা আসে। শর্মিলা শুনেছেন এটা নাকি আমেরিকাতে সব বাঙালিরাই করে। মানে নিজেরা পুজোর দিন দুপুরে খিচুরি, লাবড়া, ভাজা এসব খেলেও বাচ্চাদের এসব দেওয়া হয় না। তারা নাকি "স্পাইস সহ্য করতে পারবে না"। শর্মিলার এই যুক্তিটি খুব একটা মনে ধরেনি। তিনি নিজে অনেক ছোট বয়স থেকেই খিচুরি খেয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কি, আমেরিকা আসার আগে তিনি কোনদিন পিতজা খাননি। কিন্তু কি আর করা যাবে, সবাই যা করছে তাঁকেও তাই করতে হবে। তিনি মেনে নেন। সবই মেনে নেন।

     সরস্বতী পুজো ছিল বুধবার। পশ্চিমবঙ্গে সেই দিনেই পুজো হয়েছে। এই দেশে শনি-রবি দেখে পুজো হয়। সবার ছুটির ব্যাপারটাও দেখতে হবে তো। শর্মিলা থাকেন আমেরিকার মধ্যভাগের একটা মাঝারি মাপের শহরে। আগে কিন্তু এখানে এত ঘটা করে পুজো হত না। মাত্র ১০-২০ জন বাঙালি ছিল। কারুর নিজের বাড়িতে ইচ্ছে হল করত, বা বড় পুজো দেখতে হলে শিকাগো যেত। শহরে একটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। গত কয়েক বছরে প্রচুর বাঙালি ছেলে মেয়েরা সেখানে পড়তে আসতে শুরু করে। মূলত তাদেরই উদ্যোগে এই পুজো শুরু হয় বছর তিনেক আগে। পুজোর দুদিন আগে থেকেই এখানকার বাঙালিদের মধ্যে সাজো সাজো রব। একটা স্কুলের অডিটোরিয়াম ভাড়া করে পুজো হয়। সেই অডিটোরিয়াম সাজানো, সবজি বাজার করা, রান্নার যোগাড় করা, অনেক কাজ। কাল অনেক রাত অবধি সবজি কেটেছেন শর্মিলা। এ ছাড়াও তার কাঁধে আর এক গুরুদায়িত্ব আছে।

      সকালে পুজো হয়ে গেলে বিকেল থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতি বছরই ছোটদের অনুষ্ঠানের পরিচালনায় থাকেন শর্মিলা। একদম বাংলা না বলতে পারা বাচ্চাদের ধরে বীরপুরুষ আবৃতি করানো যে কি কঠিন কাজ, যারা করেনি তাদের ধারণাও নেই। শর্মিলা কিন্তু এই কাজে পটু। তাই প্রতিবার পুজোর আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে ধরে -- "কাকিমা, ছোটদেরটা আপনি সাম্লাবেন তো?"
এতেই শেষ নয়। তাঁদের এই ছোট শহরের সব বাঙালিরা তাঁর গানের অপেক্ষায় বসে থাকে। অসম্ভব ভালো গানের গলা শর্মিলার। অনেকে তো তাঁকে অনুরোধ করে কলকাতায় গিয়ে গানের সি ডি করাতে। তিনি শুধুই হাসেন। আজও তিনি জানেন, সব অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে শুরু হবে তাঁর গান। একটা দুটো নিজের পচ্ছন্দ মত গান করার পর আসবে অনুরোধ। "কাকিমা অন্তহীনের গানটা করুন না।"

শর্মিলা যখন স্কুলে পৌঁছালেন, তখনো অঞ্জলি শুরু হয়নি।

"এই শর্মিলাদি এস, এদিকে ফুল্গুলো দিয়ে দেবে। বনি কোথায়?"
"ঐ তো বাইরে, লিলিদের সঙ্গে খেলছে।"

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর একটু ছুটি থাকে সবার। সন্ধ্যা নাগাদ অনুষ্ঠান শুরু হয়। ছাত্র-ছাত্রীর দল চেয়ার টেবল পাততে শুরু করল। অরিন্দমবাবু বাকি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে লাগলেন। শর্মিলাদেবীর মনে হল এবার বলা যেতে পারে।

রূপসাকে ডাকলেন। এই মেয়েটি বছর দুয়েক আগে বিয়ে করে তাঁদের শহরে এসেছে।

"শোন না, আমার একটু মাথাটা ধরেছে। তুই একবার বাচ্চাদের দেখে দিতে পারবি। আমি একটু বাড়ি হয়ে আসছি।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, পারব। কিন্তু তোমার কি খুব শরীর খারাপ?"
"না না সেরকম কিছু না। চিন্তা করিস না। আমি একটু এক ঘন্টা শুয়ে নিয়ে শাড়িটা পাল্টে আসছি। জানিসি তো আমার মাইগ্রেন।"
"কোন চিন্তা কর না। অরিন্দমদাকে ডেকে দেব?"
"দরকার নেই, আমি নিজেই ড্রাইভ করে নেব। আসি রে।"
"বিকেলে কটায় আসবে?"
"ছটার মধ্যে চলে আসব। তার আগে তো শুরু হবে না কিছু।"
"ঠিক আছে।"

বাড়ির পিছনের দরজা খুলে লনে চলে এলেন শর্মিলা। তাঁদের বাড়ির পিছনের এই লনটি তাঁর খুব প্রিয়। এখানে দুটি ইজি চেয়ার রাখা আছে। মাঝে মাঝে তিনি আর অরিন্দমবাবু এসে বসেন। লনের উল্টোদিকে একটা পুকুর, পাশে ফোয়ারা। রাত্রিবেলা দেখতে বেশ লাগে। আজ অবশ্য চেয়ারে না বসে ঘাসে বসলেন তিনি। একটা সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে রাখলেন। পুকুরটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন পূর্ণিমার কথা। পূর্ণিমা তাঁর বর্ধমানের সহপাঠি। দর্শনের ছাত্রী। তাঁরা একই হস্টেলে থাকতেন। এখন পূর্ণিমা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সরস্বতী পুজোর ছবি শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। তাঁদের হস্টেলের ছবিও। মাঝে মাঝে শর্মিলার মনে হয় ফেসবুক জিনিসটা না থাকলে কত ভালো হত। এই বার বার পিছন ফিরে তাকানো সবসময় ভালো লাগেনা।

 কিন্তু এখন সে আক্ষেপ করে লাভ নেই। পিছন ফিরেছেন যখন একবার তখন সেটা আর পাল্টানো যাবে না। সামনের পুকুরটার দিকে তাকিয়ে আর এক পুকুরের কথা মনে পড়ল তাঁর। লালদীঘি।


বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আবাসন তারাবাগের মধ্যেই অবস্তিত লেডিজ হস্টেলগুলি। ছেলেদের হস্টেল্গুলি বাইরে। নিবেদিতা হস্টেলের ছাত্রীরা সেদিন সকলে মিলে তাদের হস্টেলটি সাজিয়েছিল। টুনি বাতি আর রঙ বেরঙের কাগজের চেন। হস্টেলের সামনে মোরামের রাস্তা। রাস্তা ধরে বাঁদিকে হাঁটলে এক সরু পিচের রাস্তা যার পাশেই লালদীঘি। পিচের রাস্তা আর লালদীঘির মাঝে আক ফালি জমি। সেই জমির উপর সেদিন বসেছিল তারা দুজনে।  পিছনে স্ট্যান্ড করা ছিল একটি হিরো সাইকেল।

"মনে রেখ সরস্বতী পুজোর দিন আমি হ্যাঁ বলেছিলাম।"
"প্রত্যেক সরস্বতী পুজোতে মনে রাখব।"
"তোমাদের বাড়িতে তো পুজো হয়, গেলে না?"
"তুমি তো বলেছিলে দরকার আছে, তাই গেলাম না।"
"এ বাবা, বাড়িতে কি বললে?"
"ভোলা তো আমাদের পাড়াতেই থাকে, ও বলে দেবে আমার কিছু কাজ আছে কলেজের, তাই যাইনি।"
"কলেজের?"
"হ্যাঁ, বাড়িতে জানে আমি এম এস সি পাশ করেই কলেজে পড়াব।"
"অঙ্কের অধ্যাপক শ্রী সুজিত কুমার দেবনাথ। হা হা হা।"
"হাসছ কেন? হতে পারিনা?"
"না না হতে পারবে না কেন? আচ্ছা তোমার পি এইচ ডি করার ইচ্ছে নেই?"
"থাকবে না কেন? কিন্তু জানোই তো বহু বছর ধরে বাবার কারখানায় লক-আউট। আমাকে তো বাবা বলেছিল কলেজ পাশ করেই স্কুলে পড়াতে। এই দু' বছর কোন রকমে পেয়েছি। বাড়িতে ছোট ভাই আছে। এ অবস্থায় আমি পি এইচ ডি করতে ঢুকলে হয়? কলেজে পড়াতে পড়াতে পার্ট টাইমে করব ভেবেছি। তুমি?"
"আমার তো বাবা বলেইছে এম এস সির পর বিয়ে দিয়ে দেবে। এই সিগারেটটা নেভাও।"
"একটাই তো খাই সারাদিনে।"
"কি দুর্গন্ধ বাবা।"
"তুমি বিয়ে করে নেবে?"
"মাথা খারাপ? আমি বলে দিয়েছি ওসব হবে না।"
"আচ্ছা তোমার বাবা আমাকে মেনে নেবেন তো?"
"কেন?"
"তোমরা বামুন। আমরা নই। তুমি দূর্গাপুর শহরের মেয়ে। আমি রসুলপুরের গ্রামে থাকি। তোমার বাবা কি এরকম বাড়িতে মেয়েকে ছাড়বেন? হয়ত শহরের বা বিদেশে থাকা কোন ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দেবেন।"
"খালি বাজে কথা। বাবা বললেই হল, আমার মতের দাম নেই? এত কষ্ট করে পড়াশুনা করলাম কেন? বাবার পছন্দ করা ছেলেকেই যদি বিয়ে করি। এই তুমি সারাক্ষণ এরকম আজে বাজে চিন্তা কর কেন? একটু ভালো কিছু বলতে পারো না?"
"আচ্ছা বাবা। বলছি। তোমার কানের দুলটা বেশ সুন্দর।"
"কি ন্যাকামো!! আমি চলে যাচ্ছি।"
"আরে না থাকো না। একটা গান শোনাবে?"
"কি গান?"
আরে তুমি এতদিন ধরে দূর্গাপুরে গান শিখেছ, একটা গান গাইতে পারবে না?"


"শর্মিলাদি এলে? এখুনি বীরপুরুষ শুরু হবে।"
"হ্যাঁ চল চল। লিলি, বনি, বুবুনরা তৈরি তো?"
"একদম।"

সব অনুষ্ঠানের শেষে স্টেজে গান গাইতে উঠলেন শর্মিলা। সামনে রাখা হারমোনিয়ামটা নিয়ে একবার চোখ বন্ধ করলেন। তারপর সেই গানটাই ধরলেন যেটা গেয়েছিলেন আজ থেকে বহু বছর আগে, এক সরস্বতী পুজোর দিন, লালদীঘির পারে।


Friday, January 20, 2017

একটি গানের ইতিহাস

ধর্মতলা থেকে যখন বাসে উঠলাম তখন বাজে বেলা তিনটে। বাস বেশ ফাঁকা। বসার জায়গাও পেলাম। জানালার ধারেও। খানিকক্ষণ বাদে কন্ডাক্টার এসে টিকিট কেটে গেলেন। সবই ভালো, শুধু ঐ একটাই খিঁচ খিঁচ রয়ে গেল মনের ভিতর। ফোন বুথের সামনে বিশাল লাইন। তাই ফোন করা গেল না। তাও যদি এস টি ডি করতাম, হয়ত বুথের মালিক ব্যবস্থা করে দিতেন। লোকাল কলের খদ্দেরদের এরা পাত্তাই দেয়না। যাকগে, রাসবিহারীতে নেমে করব।
     পার্ক স্ট্রিট পার হয়ে বাস যখন এক্সাইডে দাঁড়াল, বাসে এক ভিখারি উঠল। আজ সব কিছুই ভালো যাচ্ছে আমার, মনটাও খুশী। পুরো এক টাকা ভিক্ষা দিলাম ব্যাটাকে। যা, ভালো করে খা আজ। ভিখা্রিটা বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে -- "ঈশ্বর আপনার ভালো করুন।" বলে চলে গেল। তা বটে, আজ বহুদিন বাদে ঈশ্বর আমার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন বটে।
    নাহ, এবার চেতলার ঐ মেসবাড়ি ছাড়তে হবে এবার। অনেক হল। আর ভালো লাগে না ঐ পোড়া রুটি খেতে রোজ রাত্রে। এবার ভাবছি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করব। এক কামরার হলেও নিজের বাড়ি তো। কোথায় ভাড়া নেওয়া যায় ভাবছি। বংশী বলছিল গত মাসে বোসপুকুরে নাকি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। বেশ সস্তা আর ওখান থেকে নাকি ধর্মতলা যাওয়ার বাসও অনেক। গিয়ে খোঁজ করতে হবে।
    এসব ভাবতে ভাবতে যে কখন রাসবিহারী এসে পড়েছি নিজেরই খেয়াল নেই। কন্ডাক্টারের ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নেমে পড়লাম। একটু হেঁটেই একটা এস টি ডি বুথ।

"একটা লোকাল কল করব।"
"যান, ঐ ঘরে।"

ঘর বলতে তিন দিকে কাঠের পাল্লা আর এক দিকে দেওয়াল দেওয়া এক মানুষ এক ফালি জায়গা। কাঠের পাল্লাগুলোর গায়ে বড় বড় কাঁচ লাগানো, যাতে বাইরে থেকে দেখা যায় খদ্দেরকে। ঘরের মধ্যে একটি অর্ধচন্দ্রাকার টেবিলের উপর একটা টেলিফোন। উপরে ডিজিটাল মিটার। কতক্ষণ কথা বলা হয়েছে আর কত টাকা বিল উঠছে দুই দেখা যায়।

ঘরে ঢুকে ডায়াল করলাম সেই নম্বর -- ২৪৪১১৩৯।

Friday, January 13, 2017

বিচ্ছেদ



মফঃস্বলের জন্য কেউ গান বা কবিতা লেখে না। নগরের কবিয়াল আছে; গ্রামে গেলে সবাই মুগ্ধ হয়ে কবিন্দ্রনাথ হয়ে যায়। কিন্তু মফঃস্বল যেন বড়ই একা, বড়ই অনাদরের। মফঃস্বলের কি কান্না পায়? পায় হয়ত, কিন্তু আপাতত ফটিকের পাচ্ছে না। 

   ফটিকের বয়স তেরো। মফঃস্বলের আর চার পাঁচটা তেরো বছরের ছেলের মতই। বিশেষত্ব কিছু নেই তেমন। দেখতেও সাদামাটা। কয়েক বছর বাদেই মাধ্যমিক। সবাই জানে ফটিক পাশ করে যাবে, সবাই জানে ফটিক স্ট্যান্ড করবে না। ফটিক যে খেলাধূলাতেও তেমন ভালো তা নয়। এই হয়ত দশ ওভারের খেলায় এক ওভার বল পায়। পাঁচ বা ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নামে। একেবারেই মধ্যমেধা বলতে যা বোঝায় আর কি। ক্লাশে স্যারেরাও জানেন ফটিক বলে একজন আছে। ব্যাস এইটুকুই। 

   তবে এসবের মধ্যেও ফটিককে ক্লাশের অনেকেই অন্য চোখে দেখে। তার কারণ একটাই -- ফটিকের একজন প্রেমিকা আছে। মানে আজ অবধি ছিল আর কি। ছিল কেন, এখনো আছে তো! ফটিকের এই প্রেমিকার নাম প্রিয়া। গার্লস স্কুলে পড়ত। আলাপ গত বছর অঙ্কর কোচিং-এ। ফটিকের কেন প্রিয়াকে ভালো লেগেছিল সে কথা কারো জানা নেই। প্রিয়ার মনেই যে কেন ফটিক দাগ কেটেছিল, তাও কেউ জানে না। সে না জানলেও এই একটি কারণে বন্ধুমহলে ফটিকের এক আলাদা সম্মান ছিল। ফটিকও যে মাঝে মাঝে বন্ধুদের এ ব্যাপারটা বোঝাত না তা নয়। 

"এই আজ কোচিং-এ যেতে দেরি হবে, প্রিয়ার সঙ্গে দেখা করা আছে।"

বন্ধুরা অবাক হয়ে তাকাত ফটিকের দিকে। মফঃস্বলের প্রেমিকা বলে কথা। কেউ কেউ তো জিজ্ঞেসও করত 

-- "হ্যাঁ রে, তোরা দেখা হলে কি করিস?" 
"তুই ওর হাত ধরেছিস?"
"চুমু খেলি?"

এসব প্রশ্ন করার একটাই কারণ, ফটিকরা কোথায় দেখা করত বন্ধুরা শত চেষ্টা করেও জানতে পারেনি।

আজ সেই রেললাইনের ধারে মাঠটায় বসে আছে ফটিক। একটু বাদেই প্রিয়াদের ট্রেন এখান দিয়ে যাবে। প্রিয়া কি খেয়াল করবে? নিশ্চয় করবে। বলে তো দিয়েছে ফটিক।

"সেখানেই থাকব।"
"তোমার মন খারাপ করবে না তো?"
"আমার ফোন নম্বর তো আছে তোমার কাছে, ওখানে পৌঁছে ফোন করো।"
"জানি না ফোন থাকবে কিনা। কলকাতা হলে তো চিন্তা করতাম না, যাচ্ছি সেই মালদা।"
"থাকবে নিশ্চয়। মাসিমা ফোন ছাড়া থাকবেন কি করে?"
"যাহ।"
"শোনো, করলে কিন্তু ঐ আটটার সময় করো। তার আগে করলে মা ধরবে।"
"বুঝেছি রে বাবা।"
"এই তুমি মালদা গিয়ে আমাকে ভুলে যাবে না তো?"
"তুমি আমাকে ভুলবে?"

শুরু হল দু'জনের মান অভিমানের পালা। প্রিয়ার ট্রেন একটু বাদেই এখান দিয়ে যাবে। প্রিয়া বলেছে জানালায় হাত নাড়বে। যদিও সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, গোলপোস্টের ক্রসবার পূর্ণিমার চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছে, তাও ফটিকের ধারণা সে প্রিয়াকে দেখতে পাবে। 

ফটিকের মূল সমস্যা হল ওর কান্না পাচ্ছে না। এই সময় সবারই কাঁদা উচিত। প্রিয়াও কাঁদছিল সকালে। কিন্তু ফটিক সারাদিন কাঁদেনি। অথচ এটা উচিত না। হয়ত ট্রেনে প্রিয়াকে দেখলে কাঁদবে।

ট্রেনটা যখন আর দেখা গেল না, প্যান্ট ঝেড়ে উঠে পড়ল ফটিক। সাইকেলটায় উঠতে গিয়ে বুঝল সামনের চাকাটা কখন যেন পাংচার হয়ে গেছে। কাছাকাছি কোন দোকান-ও নেই। সেই চন্ডীবাজারের কাছে একটা আছে। চাঁদের আলোয় সাইকেল হাঁটাতে থাকল ফটিক। নাহ, এখনো কান্না পাচ্ছে না। কিন্তু সহসা যেন ভীষণ ক্লান্ত লাগছে ফটিকের। 

রোলের দোকানের গন্ধ, ট্রেনের আওয়াজ, রিক্সার হর্ন, এস টি ডি বুথের আলো, "জন্মভূমি"-র গান, ভাতের দোকানের চীৎকার যেন মফঃস্বলের কান্না ঢেকে দিল ক্লান্তিতে। 

Friday, December 30, 2016

তারাবাগ রহস্য

                                   ।।১।।
বাইরের ঘরের সোফাতে বসে একটা বই পড়ছিল অপু ডোরবেল বাজতে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে সামনে দাঁড়িয়ে সুভাষবাবু
আসুন এত দেরি হল আমি তো ভেবেছিলাম সন্ধ্যেবেলা আসবেন
সেরকমই তো ইচ্ছে ছিল হে অপু কিন্তু বুঝতেই পার, আমাদের কাজ যাকগে, টা বাজে তো? খেয়ে নেওয়া যাক নাকি?”
ঠিক আছে, তাই হবে আপনি বসুন, আমি ভাত বারি
বেশি কিছু রান্না করোনি তো?”
নাহ, তেমন কিছু না আপনি তো বলেছিলেন শুধু মাংস করতে
হ্যাঁ, পাঁঠা তো?”
নিশ্চয়
বেশ, চল খাওয়া যাক
এনারা যতক্ষণ খাওয়া দাওয়া করে, আমরা বরং এদের ব্যাপারে জেনে নিই
সুভাষবাবু বর্ধমানের এস আই আর পাঁচ বছর বাদে অবসর নেবেন সে তুলনায় অপু বাচ্চা ছেলে সত্যি কথা বলতে কি, সুভাষবাবুর মেয়ের চেয়ে অপু মাত্র ছয় বছরের বড় সুভাষবাবুর মেয়ে ছন্দা মার্কিন দেশে পড়তে গেছে সুভাষবাবু বিপত্নীক অপুর সঙ্গে সুভাষবাবুর আলাপ এক বছর আগে অপু বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীর অধ্যাপক বছর তিনেক আগে বিশ্বভারতী থেকে পড়াশুনা শেষ করে বর্ধমানে আসে অপু। গতবছর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি খুনের রহস্য উদ্ধার করতে সুভাষবাবুকে সাহায্য করে অপু সেই থেকে এই অসমবয়সের বন্ধুত্ব মাসে একবার করে অপুর বাড়িতে নৈশভোজে আসেন সুভাষবাবু। তার আর একটা কারণ অবশ্য অপুর রান্না। অকৃতদার অপু নিজেই রান্না করে খায়, এবং অসম্ভব ভালো রান্না করে। অপুর রান্নার লোভেই ইউরিক এসিডের আদেশ অমান্য করেও তাই আজ মাংস খেতে এসেছেন সুভাষবাবু।
“চলুন বারান্দায় বসা যাক।“
খাওয়া শেষ হলে সুভাষবাবুকে ডাকে অপু।
“না হে, আজ একটু হাঁটতে যাই চল।“
“হাঁটতে যাবেন?”
“হ্যাঁ, তোমার হাতের মাংস; লোভে পড়ে অনেকটাই খেয়ে ফেললাম। একটু হাঁটলে হজম হবে।“
“চলুন তাহলে। দাঁড়ান, চাবিটা নিয়ে নি।“
তারাবাগ শিক্ষক আবাসন অনেকগুলি ব্লকে বিভক্ত। প্রতিটি ব্লকে ছটি করে ফ্ল্যাট। এক একটি ব্লক তিন তলা, তাই প্রতি তলায় দুটি করে ফ্ল্যাট। অপু থাকে ডি ব্লকের ৪ নম্বর ফ্ল্যাটে। দোতলায় পুবদিক্মুখী এই ফ্ল্যাট। বারান্দায় বসলে সামনে তারাবাগ মাঠ পরিষ্কার দেখা যায়।
বাড়িতে তালা দিয়ে সুভাষবাবুর সঙ্গে নিচে এল অপু। ব্লকের সামনে লাল সুড়কির রাস্তা। রাত হয়েছে। ব্লকের গেটের বাইরের বাতি ছাড়া আর কোন আলো নেই। তাই সামনেটা অন্ধকার বলাই চলে। সুভাষবাবু টর্চ জ্বালালেন।
“সাবধানে এস অপু।“
সুড়কির রাস্তা দিয়ে কয়েক সেকেন্ড হাঁটলেই সামনে পিচের রাস্তা। রাস্তার উল্টোদিকে তারাবাগ মাঠ। মাঠের মাঝেই পাম্প হাউস। পাম্প হাউসটা যেন মাঠটাকে দু ভাগে ভাগ করে রেখেছে। পাম্প হাউসের বাঁ দিকে খোলা মাঠ, দু ধারে শুধু দুটি গোলপোস্ট। অবশ্য ক্রিকেট খেলে খেলে মাঠের মাঝে একটি ঘাস বিহিন পিচের উদয় হয়েছে। পাম্প হাউসের ডান দিকে দুটি কাঠের বেঞ্চি। লোহার বেস। তার সামনে বাচ্চাদের খেলার জায়গা। স্লিপ, ঢেঁকি, ইত্যাদি আছে। মাঠের একদম দক্ষিণপ্রান্তে কিছু গাছ ও তারাবাগের তারের বেড়া।
            পিচ রাস্তায় উঠে বাঁ দিকে হাঁটা শুরু করল অপু ও সুভাষবাবু। রাত হয়েছে, রাস্তার আলো জ্বললেও তারাবাগের মাঠটি যেন অন্ধকারে ঢাকা। এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
            “মাঠটা কেমন অন্ধকারে ঢেকে আছে দেখুন। কোন অপিরিচিত লোক এলে ভূতের ভয় পেতেই পারে।“
            “হুম। অন্ধকার ও রহস্য। এই তারাবাগের মাঠে কম রহস্য নেই অপু।“
            “মানে?”
            “আজ থেকে তিরিশ বছর আগে এই তারাবাগের মাঠে এক নৃশংস খুন হয়েছিল, যার খুনী কে আজও আমি জানি না।“
            “সেকি। এটা তো জানতাম না।“
            “তুমি আর কতটুকু জানো। ক’দিনই বা এসেছ এই পাড়ায়।“
            “বেশ। খুলে বলুন। হাঁটতে হাঁটতে শোনা যাক।“




Friday, October 14, 2016

শহীদ

কমলপুরে আজ সকালটা অনেক তাড়াতাড়ি হয়েছে। এমনি কেউ এই গ্রামের খোঁজ রাখে না। কিন্তু আজ সকাল সকাল একে একে টি ভি চ্যানেল আর পত্র-পত্রিকার সাংবাদিকরা এসে হাজির হয়েছে। এই গ্রামের ছেলে সুদেব পরশু কাশ্মীরে শহীদ হয়েছে।

ভারতীয় সেনায় সবে দু' বছর হল যোগদান করেছে সুদেব। এর মধ্যে একবারই বাড়ি এসেছিল। কাশ্মীরের অনেক গল্প করেছিল গ্রামের সকলের কাছে। ছোট থেকে খেলাধূলায় ভালো সুদেব সেনাবাহিনীতে চাকরি করতে যাওয়ায় গ্রামের লোকে খুব একটা অবাক হয়নি। তবে হ্যাঁ, এই প্রথম গ্রামের কেউ সৈনিক হল, তাই সুদেবকে সবাই আলাদা চোখে দেখত। গ্রামের ছোটদের কাছে সুদেবদা তো হিরো। সারাদিন শুধু সুদেবকের ধরে গল্প শোনাই নয়, সময়ে সময়ে তাকে দেখে কচিকাচার দল স্যালুট ও ঠুকত।

খবরটা পাওয়ার পর থেকে সুদেবের মা শুধু কেঁদেই গেছেন। এখনো কান্না থামেনি। কাল সারারাত গ্রামের কেউই প্রায় ঘুমোতে পারেনি। কেউ কেউ নিজের কান্নায়, আর কেউ কেউ সুদেবের মায়ের কান্নায়।

কর্নেল মুখার্জীর তত্ত্বাবধানে ট্রাকে করে সুদেবের শব এল গ্রামে। মিডিয়ার ভিড় উপেক্ষা করে কফিন আনা হল সুদেবের মায়ের কাছে। তেরঙ্গায় মোড়া সুদেবের দেহ দেখে যেন তার মায়ের কান্না থেমে গেল। হাঁ করে চেয়ে রইলেন সুদেবের মুখের দিকে।

গান স্যালুট হওয়ার পর কর্নেল মুখার্জী এবার নিজে এগোলেন সুদেবের মায়ের দিকে। চারিদিকে ক্যামেরাম্যান গিজ গিজ করছে। তার মধ্যেই আসতে করে গিয়ে বললেন
"আপনার ছেলে দেশের জন্য যে বলিদান দিয়েছে, তা কোনদিন দেশবাসী ভুলবে না। আপনি..."

লাল চোখে কর্নেলের দিকে তাকালেন সুদেবের মা। এক ঝটকায় সুদেবের দেহের থেকে তেরঙ্গা তুলে দিয়ে রেগে বললেন --

"দূর হ। ঝাঁটা মারি তোর দেশের মুখে। আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দে।"

Sunday, September 25, 2016

গেন্সভিল ডায়রিজঃ কাশফুল

পুজো মানেই কাশফুল। সেই কবে মানিকবাবু দেখিয়ে গিয়েছিলেন অপু-দূর্গা ট্রেনলাইনের পাশে কাশফুল দেখেছিল, তারপর থেকে বাঙালি কাশফুলের প্রতি এক অপত্য স্নেহ বয়ে চলেছে।

আমি ছোটবেলায় খুব একটা কাশফুল দেখিনি। জানতামও না এরকম একটি ফুল হয়। তারাবাগে কাশফুল হত না। হয়ত পাশের ফার্মটায় হত, কিন্তু সেখানে আমার যাওয়া বারণ ছিল, তাই দেখিনি।
ক্লাস ফোরে পড়তে স্কুল থেকে দেখানো হল "পথের পাঁচালী"। সেখানে প্রথম কাশফুল দেখলাম। মানে সেভাবে লক্ষ্য করিনি সত্যি কথা বলতে। লক্ষ্য করলাম যখন পরের সপ্তাহে ড্রয়িং ম্যাডাম এসে বললেন সবাইকে ঐ দৃশ্যটির ছবি বাড়ি থেকে এঁকে আনতে। হোম-ওয়ার্ক। বাড়ি ফিরে বাবাকে বলতে বাবা পুরোনো আনন্দমেলা খুলে ছবিটি বার করলেন। সেই প্রথম ঠিক ভাবে কাশফুল দেখা।

তার পরের বছর পুজোয় কলকাতা যাই। মামারবাড়ি। ট্রেনে করে যেতে যেতে রেল লাইনের ধারে কাশফুল দেখলাম এবার। মনে হল - বাহ, অপুর মত আমিও তাহলে রেললাইনের ধারেই প্রথম কাশফুল দেখলাম।

বহুবছর পরের কথা। ২০০৭। আমি তখন সবে গেন্সভিলে গিয়েছি। গেন্সভিলে পুজো হবে কিনা ভাবতে ভাবতে শুনি হবে। না, এটি গেন্সভিলের পুজোর গল্প না, সেই  গল্প পড়ে বলব। যাই হোক, পুজোর ক'দিন আগে ইস্কনে খেতে গেছি দুপুরে। অতনুদার সঙ্গে দেখা। খেতে খেতে অতনুদা বলল

"আমাদের ডিপার্ট্মেন্টের পাশে কিছু কাশফুল হয়েছে।"

বেশ অবাক হলাম। কাশফুল যে দেশের বাইরে হয়, তাই ধারণা ছিল না। খাওয়ার পর ছুটলাম সয়েল সায়েন্স ডিপার্ট্মেন্টের দিকে। অতনুদা ভুল বলেনি। দেখলাম ডিপার্ট্মেন্টের পাশেই এক দঙ্গল কাশফুল হাওয়ায় দুলছে। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে যেন মনে হল সত্যি এবার পুজো শুরু হবে। ঢাকিরা যেন ঢাক তুলছে বাদ্যি শুরু করার জন্য। পাড়ায় বাঁশ পড়ছে প্যান্ডেল তৈরীর জন্য। আসলে জানেন তো, মানুষ বাড়ির বাইরে বেরোলে
 বাড়িকে সবচেয়ে মিস করে। সবাই করে। প্রথম এক বছর এটা ভীষণ কষ্ট দেয়। তারপর আস্তে আস্তে মানিয়ে নেওয়ার সময়টা আসে। অনেকেই মানিয়ে নেয়, ভাবে "বাড়ি হলে ভালো হত, কিন্তু এটাই বা কম কি?"
কেউ কেউ পারে না, তারা হয়ত বাড়ি ফিরে যায়। সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে যারা মানিয়ে নিতে পারে না, অথচ পরিস্থিতির চাপে ফিরতেও পারে না।

আমি তখন সবে দু'মাস হল বাড়ি ছেড়েছি, কাজেই মন খারাপটা তুঙ্গে। কাশফুল দেখে ওর'ম আকাশপাতাল ভাবছি। হঠাৎ পাশে এক গলা

"Excuse me, can you tell me the way to Marston Science Library?"

ঢাকিরা বাদ্যি নামিয়ে রাখল, মুহূর্তটা নষ্ট হয়ে গেল।

২০১২ তে আমি গেন্সভিল ছাড়ি। ২০১১-র পুজোটা আমার গেন্সভিলে শেষ পুজো। ভেবেছিলাম খেয়াল রাখব সয়েল সায়েন্স ডিপার্ট্মেন্টের কাছে কাশফুল হয়েছে কিনা। নাহ, তালেগোলে ভুলেই গিয়েছিলাম। আর আমার কাশফুল দেখা হয়নি।

জানি না আর কোনদিন গেন্সভিল যেতে পারব কিনা, গেলেও সেখানে কাশফুল দেখব কিনা। হয়ত কাশফুল থাকবে, আমার পর নতুন কোন সদ্য বাড়ি ছাড়া বাঙালি ছাত্রের আবার সেই কাশফুল দেখে বাড়ির কথা মনে পড়বে। 

Monday, August 29, 2016

তারাবাগ ডায়রিজঃ বাপিদা ও বুম্বাদা

আমার জন্ম বজবজে। এক বছর বয়সে তারাবাগে যে কোয়ার্টারে এসে উঠি সেটি ছিল বি- ওয়ান। বাবা বিয়ের পর থেকেই এখানে থাকতেন। ১৯৯১ সালে, মানে আমার যখন ৬ বছর বয়স তখন আমরা বি-ওয়ান ছেড়ে অন্য কোয়ার্টারে যাই। আমাদের ঠিক উপরের ফ্ল্যাটটাতে মানে বি-থ্রিতে থাকতেন শীল জেঠুরা। প্রফেসর বিজয় শীল আর বাবা দুজনেই রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন।
শীল জেঠুর দুই ছেলে, বাপি আর বুম্বা। বাপিদা আমার থেকে অনেকটাই বড়। বুম্বাদা বছর দশেকের। দুজনেই আমাকে ভীষণ ভালবাসত। বাপিদা রোজ বিকেলে পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলতে যেত। শুনেছি আমাকে নিয়ে মা ঘুরতে বেরোলে বাপিদা মাঠ থেকে ছুটে আসত আমাকে আদর করতে। জেঠিমা নাকি বারান্দা থেকে বাপিদাকে ধমক দিতেন যেন নোংরা হাতে আমাকে না ছোঁয়।
বুম্বাদা আবার সুযোগ পেলেই আমার জন্য চকলেট নিয়ে আসত। মনে আছে আমার পাঁচ বছরের জন্মদিনে বুম্বাদা একটা বই উপহার দিয়েছিল -- "মা দূর্গার কলকাতা ভ্রমণ।"
শীল জেঠুর কড়া শাসনে মানুষ হত দুই ভাই। একবার মনে আছে আমাদের বাড়ির সামনে নেট টাঙিয়ে দুই ভাই ব্যাডমিন্টন খেলছিল। প্রথম সেটটা বাপিদা একদম খাটেনি। বুম্বাদা কিন্তু প্রচণ্ড খেটে জিতল। পরের সেট খেলতে গিয়েই বুম্বাদা হাঁফিয়ে পড়ল। ব্যাস, বাপিদার সহজ জয়।
একদিন বাপিদা শুনলাম খড়গপুরে পড়তে গেল। জানতামও না সেটা কি। কয়েক বছর বাদে বাপিদা গেল আমেরিকা। এক বছর বাদে যখন বাড়ি ফিরল, আমার জন্য নিয়ে এল নীল-হলুদ এক ফেরারি গাড়ি। এখনও আছে সেটা। তারাবাগের বাকি সবাই আমাকে পিকো বলে ডাকলেও বাপিদা আর বুম্বাদা কিন্তু আমাকে "বাবাই" বলে ডাকত। এখনও ডাকে।
২০০৭-এ যখন আমি ফ্লোরিডা যাচ্ছি, জানতে পারলাম বাপিদাও ফ্লোরিডাতেই থাকে, তবে অন্য শহরে। তার মধ্যেও বাপিদা আমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে লাগল। বাপিদা থাকে অরল্যান্ডোতে। ওখানকার Material Science -এর নামকরা প্রফেসর। গেন্সভিল থেকে বার দু-তিন বাপিদার বাড়ি গেছি। বলা বাহুল্য, যা আতিথিয়তা পেয়েছি তা অতুলনীয়। বাপিদার স্ত্রী শান্তাদি লন্ডনের মেয়ে। আমাকে উইম্বিল্ডন দেখার গল্প বলে মুগ্ধ করে রাখতেন। বাপিদার মেয়ে লিলির মত মিষ্টি মেয়ে খুব কমই দেখেছি। সন্ধ্যে হলে বাপিদা আমার কাছে তারাবাগের গল্প শুনতে চাইত। সমস্যাটা হল বাপিদা আমার চেয়ে অনেকটাই বড়। তাই বাপিদা যাদের নাম বলত, আমি তাদের চিনতাম না। তাও কিছু কিছু চেনা জানা থাকত। বুঝতে পারতাম বাপিদা যেন অরল্যান্ডোতে বসেই তারাবাগকে ফেরত পেতে চাইছে।
বুম্বাদা থাকত ম্যাসেচুসেটসে। কথা ছিল দেখা হবে। ২০১২ তে আমি দেশে ফেরার আগে হয়ে উঠল না। এর মাঝে আমি একবার ছুটি কাটাতে বাড়ি এসেছি। যতদূর মনে পড়ছে সালটা ২০১০। দুপুরবেলা বেল বাজতে দরজা খুলে দেখি বাপিদা, শান্তাদি, লিলি আর শীল জেঠু। মা বাবাকে দেখে ভীষণ খুশি বাপিদা। তারাবাগের পুরানো গল্প শুরু হল।
"তারাবাগ কত পাল্টে গেছে কাকিমা, আর কাউকেই চিনি না আপনাদের ছাড়া।"
-- বাপিদার হতাশ উক্তি মনে পড়ে।
আবার ছোটবেলার কথা বলতেই বাপিদা বলে
"মনে পড়ে কাকিমা, বাবা আমাকে কি মারত?"
জেঠু মাথা নিচু করে বলেন --
"সেই, তোদের তো শুধু মেরেইছি!"
২০১২-এ আমি আমেরিকা ছাড়ার আগে আমার মা বাবা এসেছিলেন ফ্লোরিডায় আমার কনভকেশনে। একদিন বাপিদার বাড়িতে নিয়ে গেলাম ওদের। শান্তাদি সে সময় লন্ডনে। বাবা মাকে দেখে বাপিদা যে কি খুশি বলে বোঝানো যাবে না। অত বড় একজন অধ্যাপক, যার বিশ্বজোড়া নাম, তার মধ্যে এরকম ছেলেমানুষি আনন্দ দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। সারা সন্ধ্যে ধরে চলল ১৯৮০ র দশকের তারাবাগের গল্প যার আশি শতাংশ আমার অজানা। ফোনে বুম্বাদাদের সঙ্গেও কথা হল।
দু সপ্তাহ আগে জানতে পারলাম বুম্বাদা মাত্র ৪১ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আজ বাপিদার কাছে শুনলাম জেঠুও খুব অসুস্থ। সকাল থেকেই তাই মনটা বেশ খারাপ। এই লেখাটা সেই মন খারাপেরই বহিঃপ্রকাশ। হয়ত খুব বোর করলাম সবাইকে এতটা লিখে, কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই লেখাটা না লিখলে রাত্রে হয়ত ভালো ঘুম হত না।
লোকে বলে জীবন এগিয়ে যায়। আমাদের সকলেরই জীবন এগিয়ে যাবে। হয়ত কাল আমি আবার পাগলু নিয়ে ঠাট্টা করব, বা আমার স্কুল জীবনের কোন মজার গল্পের কথা লিখব। কিন্তু দিনের শেষে হয়ত আবার ফিরে যাব তারাবাগে; সেই তারাবাগ যাকে বাপিদা বার বার খুঁজে বেড়ায়, যা আমরা জানি আর কোনদিন পাওয়া যাবে না -- না, এখনকার তারাবাগে গিয়েও না, যার থেকে হয়ত একদিন আমি সম্পুর্নভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব; কিন্তু যে তারাবাগে আমি, বাপিদা, আমরা সবাই বার বার ফিরে যেতে চাইব।