Friday, May 25, 2018

অভিশাপ

"তুমি এই প্রথম এলে গাঁয়ে দিদি?"
"হ্যাঁ রে, এই প্রথম।"
"থাকো কোথায়? দিল্লী না?"
"হ্যাঁ। তুই কোন কলেজে পড়িস?"
"ঐ জেলা শহরে রাজা রামমোহন কলেজে।"
"কি পড়িস?"
"বাংলা।"
"বাহ, প্রিয় লেখক কে বাংলায়?"
"আমার তো সুনীল গাঙ্গুলি, তোমার?"
"আমার সমরেশ বসু।"
"তুমি দিল্লীতে থেকে বাংলা পড়তে জানো ? আমি তো জানতাম ওখানকার ছেলে মেয়েরা বাংলা পড়তে পারে না।"
"একদম ভুল ধারণা, আমাদের ওখানে বাংলা স্কুল আছে জানিস?"
"তাই নাকি? তুমি কি কলেজে পড়?"
"এই শেষ হল কলেজ। এবার দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাব।"
"তোমার কি বিষয়?"
"আমার তো অঙ্ক।"
"তুমি অঙ্ক করতে ভালোবাসো? ওরে বাবা, আমি অঙ্ককে যা ভয় পাই।"
কথা হচ্ছিল পল্লবীর সঙ্গে। বাবার ছোটবেলার বন্ধু সুবলকাকার মেয়ে। এই প্রথম আমি আমাদের দেশের বাড়ি মনসাচরে এলাম। আমার জন্ম কলকাতায়। কিন্তু খুব ছোটবয়সে আমরা দিল্লী চলে যাই। বাবা ওখানেই চাকরি করেন। ছুটিছাটাতে আমরা কলকাতায় আসতাম। আমার কাকারা কোলকাতায় থাকেন। কিন্তু মনসাচরে এই প্রথম। তার কারণ আছে। আগে আমাদের বাড়ি সম্বন্ধে বলে নি। আমার বাবার দুই সন্তান। আমি আর আমার দিদি। দিদির বিয়ে হয়ে গেছে দুই বছর হল। এখন দিদি ইন্দোরে থাকে। আমার মা আমার জন্মের সময় মারা যান। মাকে আমি কোনদিন দেখিনি।
এই মনসাচরে আমাদের জমিদারী ছিল। সেই পূরানো জমিদারবাড়ি এখনো আছে। বংশপরম্পরায় রঘুদারা এর রক্ষণাবেক্ষণ করে। এই পরিবারে কিছু একটা অভিশাপ আছে। এই বাড়ির কোন মেয়ে নাকি বেঁচে থাকে না এই মনসাচরে। তাই আমাকে কোনদিন এখানে নিয়ে আসেনি বাবা। এবার আমি প্রায় জোর করে এসেছি। তাতেও চোখের আড়াল হতে দেয় না বাবা। আমার এসব অভিশাপে বিশ্বাস নেই। আমি এসেছি অন্য কারণে। অভিশাপটা কিসের সেটা জানতে। এ নাকি অনেক পুরনো অভিশাপ। কারুরই প্রায় মনে নেই কেন এটা শুরু হয়েছিল। এই পরিবারের শেষ মেয়ে মারা গেছে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে আমার এক পিসী। তারপর থেকে আর কোন মেয়েকে এই মনসাচরে আনা হয়নি। আমার কাকার এক ছেলে।
ভয় যে আমার একদম করেনা তা না। সর্বক্ষণ মনে হয় কেউ যেন আমাকে দেখছে। সেদিন রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘরটা কেমন যেন গুমোট হয়ে উঠেছে। জানালা খুলতেই দেখি এক জোড়া চোখ আমার দিকে তাকিয়ে। একটু পরেই বুঝলাম সেটা একটা প্যাঁচা। এখানে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা হয়। ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। তারপর বেশিরভাগ দিন লোডশেডিং। হ্যারিকেনের আলোয় এই জমিদারবাড়িটাই ভূতুরে লাগে। কাল ভাবছি রমেনদাদুর কাছে যাব। শুনেছি উনি অনেকদিন এখানে আছেন। উনি মনসাচরের ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনো করেছেন। যত তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর মেলে ভালো। প্রথম প্রথম দিল্লী ছেড়ে আসতে ভালো লাগলেও এখন যেন মন কেমন করছে।
"তা জানি বৈকি মা। তোমার পিসীকেও আমি দেখেছি। এক সময় তো তোমাদের বাড়িতে মেয়ে জন্মালে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ডুবিয়ে মেরে দেওয়া হত বা দামোদরে ভাসিয়ে দেওয়া হত। তারপর থেকে মেয়ে হলেই তাকে অন্য কেউ দত্তক নিয়ে নিত।"
"কিন্তু এই অভিশাপটা শুরু কিভাবে হল রমেনদাদু?"
"অনেক অনেক বছর আগের কথা মা। আমারও পুরোটাই শোনা গল্প। তখন সবে বিলেতে প্রিভি কাউন্সিলের কাছে লড়ে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদ করেছেন। কিন্তু তোমার এক পূর্বপুরুষ জমিদার ধীরাজ রায় এসব মানতেন না। এক ব্রাহ্ম এসে হিন্দু ধর্মের প্রথা পালটাবে এ তিনি হতে দেবেন না। তাই এই মনসাচরে রমরমিয়ে সতীদাহ চলত।"
"সে কি? সে তো বেয়াইনি?"
"আর জমিদারের কাছে আইন। ইংরেজ পুলিশ ছিল ধীরাজ রায়ের হাতের মধ্যে। তবে এক ঘটনায় সেটা বন্ধ হল।"
"এর সঙ্গে অভিশাপের কি সম্পর্ক?"
"আছে মা আছে। বলছি। একবার এক ইংরেজ গবেষক এই গাঁয়ে এল। সে যখন খবর পেল সতী হতে যাবে একটি মেয়ে, চলে গেল তাকে বাঁচাতে। ধীরাজ রায় সন্দেহ করেছিলেন এটা। তক্কে তক্কে ছিলেন। কিন্তু তাঁর বোঝার আগেই মেয়েটির বাপের কাছে পৌঁছে যায় সেই ইংরেজ ছেলেটি। বলে চিন্তা করবেন না, আপনার মেয়ের কিছু হবে না। সে ছেলে খবর দিল থানায়। কিন্তু থানার দারোগার কাছে সে খবর পৌঁছালো না। ধীরাজ রায়ের লেঠেল এসে জোর করে তুলে নিয়ে গেল মেয়েটিকে। ছেলেটির মাথায় মেরে তাকে ততক্ষণে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে। জ্বলন্ত চিতা থেকে মেয়েটি বাবা বাবা করে ডেকে উঠল। মেয়েটির বাবা সেই দৃশ্য দেখে অভিশাপ দিলেন ধীরাজ রায়কে যে তাঁর বংশেও কোন মেয়ে বেশিদিন বাঁচবে না এই ময়নাচরে। এই কথা শুনে রাগে ধীরাজ রায় বর্শা ঢুকিয়ে দিলেন মেয়েটর বাবার বুকে। ধীরাজ রায় যেটা ভুল করলেন সেটা হল ইংরেজ ছেলেটিকে না মারা। ছেলেটি কলকাতা ফিরে গিয়ে সব জায়গায় রটিয়ে দিল এ খবর। তারপর ইংরেজ সরকার পুলিশ এনে ধীরাজ রায়কে গ্রেফতার করল। যদিও কিছুদিন বাদেই ছাড়া পায়। তবে জেলে বসেই ধীরাজ রায় খবর পায় তার দশ বছরের মেয়ে সাপের কামড়ে মারা গেছে। তারপর থেকে এই মনসাচরেও সতীদাহ বন্ধ হয়।"
"তুমি কবে চলে যাবে?"
"এই তো পরশু সরস্বতী পুজো। তারপরের দিনই যাব। তুই বলছিলি না তোদের স্কুলে খুব ভালো পুজো হয়। আমি কোনদিন গাঁয়ের স্কুলে পুজো দেখিনি। যাব।"
"অবশ্যই এসো। আমি নিয়ে যাব তোমায়। দেখ সব ক্ষুদে ক্ষুদে মেয়েরা কেমন শাড়ি পরে যায়। আমি তো দু' বছর হল স্কুল ছেড়েছি। কিন্তু এখনো প্রতি বছর স্কুলের পুজোয় যাই।"
"ঠিক আছে পল্লবী, তাহলে ঐ কথাই রইল।"
দামোদারের এক পাড়ে একটা শ্মশান ছিল একসময়। এখন সেটা পোড়ো জমি। কেউ ব্যবহার করে না। সেই জমিটা পেরিয়ে পল্লবীদের স্কুল। একদিন নিয়ে গেছিল আমায়। শ্মশানটা পেরোতে একটু যেন কেমন কেমন লাগছিল আমার। কিন্তু সেই সময় পল্লবী গান ধরল। ওর এত ভালো গলা সব ভুলে গেলাম।
"তুই কে রে?"
"আমি ফুলি।"
"ফুলি তো বুঝলাম। কি চাই এখানে?"
"পল্লবীদি আলপনা দিতে চলে গেছে। আমাকে বলল তোমাকে নিয়ে যেতে।"
"তুই এইটুকু মেয়ে আমাকে নিয়ে যাবি?"
"আমি এইটুকু নই, আমার বারো বছর বয়স।"
"চল যাওয়া যাক।"
হলুদ রঙের লাল পাড় শাড়ি পরে আছে বাচ্চা মেয়েটি। আমার হাত ধরে নিয়ে চলল স্কুলের দিকে। আজ যেন এই এলাকাটা বেশি শুনশান লাগছে। সবাই কি স্কুলে গেছে?
শ্মশানের কাছে আসতেই ফুলি বলে উঠল -- "দিদি, আমার পা ব্যাথা করছে, আমাকে কোলে নেবে?"
আমি শাড়ি পরে আছি। এই অবস্থায় একটা বারো বছরের মেয়েকে কোলে নেব?
"দিদি নাও না, খুব পা ব্যাথা করছে।"
ফুলি যদিও বেশ রোগা, তাও!! দেখি চেষ্টা করে।
ও মা, বেশ হাল্কা তো, মনেই হচ্ছে না কিছু নিয়েছি।
"দিদি ঐ পাশেই আমার বাড়ি। একবার বাবার সঙ্গে দেখা করে যাই চল।"
"দেরি হয়ে যাচ্ছে ফুলি।"
"একটুখানি দিদি।"
শ্মশানের এ পাশে যে একটা ছোট কুঁড়ে আছে আগেরদিন খেয়াল করিনি। ফুলিকে নিয়ে ঢুকলাম। দরজা খোলাই ছিল। ঢুকে দেখি মেঝেতে একটা লোক পরে আছে। বুক থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কতদিনের মরা কে জানে? মাছি ঘুরছে। গা গুলিয়ে উঠল। দরজার দিকে এগোতে গিয়ে দেখি আমার পা নড়ছে না। ফুলিকে কোল থেকে নামাতে গেলাম। পারলাম না। এই কিছুক্ষণেই যেন ফুলির ওজন অনেক বেড়ে গেছে। এবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসল ফুলি।
"পারবে না, আমাকে নামাতে পারবে না। ধীরাজ রায় আমাকে এই ভাবে কোলে করে তুলে আগুনে ফেলে দিয়েছিল। তখন আমার বারো বছর বয়স। আর কেউ আমাকে নামাতে পারবে না।"
এই বলে ফুলি অদৃশ্য হয়ে গেল। একি ঘরটা এত গরম হয়ে উঠছে কেন? আমার মাথা ঘুরছে। পা চলছে না। ফুলির বাবার দেহের পাশে আমি লুটিয়ে পড়লাম।

Wednesday, May 9, 2018

উপহার

পার্ক স্ট্রিট থেকে যখন সি বাসে উঠলেন মলয়বাবু, তখন সবে বিকেল পড়ছে। আজ অফিস থেকে হাফ ছুটি নিয়েছিলেন। ভিড় বাসে বসার জায়গা পেলেন না মলয়বাবু। চিন্তায় ছিলেন ট্রেন না মিস করেন। ঘড়ি যে দেখবেন তারও উপায় নেই।  হাওড়া স্টেশনে নেমেই ছুটলেন সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে। কর্ড লাইন সুপার দাঁড়িয়ে আছে। এটা গ্যালোপিং লোকাল। বর্ধমান পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাতটা। জনাই-এ এক চা-ওলার কাছ থেকে চা কিনে ভাবতে লাগলেন আজকের দিনটার কথা।

হ্যাঁ, আজ তাঁর বিবাহবার্ষিকী। দু' বছর আগে এই দিনে পারমিতার সঙ্গে তিনি সংসার শুরু করেন। গত বছর এই দিনটাও কিন্তু বিশেষ কিছু ছিল না। কিছুদিন আগে পাশের বাড়ির ঘোষগিন্নী এসে বললেন --
"আর আমার ছেলের তো প্রথম বিবাহবার্ষিকী আজ। তাদের তো দিল্লী থেকে আসার সময়ই হবে না। তা শুনলাম ছেলে বউমাকে নতুন শাড়ী উপহার দিয়েছে। বউমাও অবশ্য ছেলেকে কি একটা নতুন প্যান্ট কিনে দিয়েছে। কি আজকাল জিন না কি হয় না তাই। আমরা বাবা বুড়ো মানুষ। এতবছর বিয়ে হয়েছে, তোমাদের কাকু কোনদিন আমাকে বিবাহবার্ষিকী বলে কিছুই দিলেন না... আর আজকালকার... "

কথা শুনতে শুনতেই মলয়বাবু মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলেন পারমিতাকে কিছু একটা কিনে দেবেন বিবাহবার্ষিকীতে। কি কিনবেন সেটাও ঠিক করে রেখেছিলেন। তাদের অভাবের সংসার। খাওয়া পরার খুব একটা অসুবিধা হয়না ঠিকই, কিন্তু একটু যে বিলাসিতা করবেন, সে জো নেই। বিয়ের পর থেকেই পারমিতা সেই এক হাতে একটি বালা পরে থাকেন। আর এক হাত খালি থাকে। কবে থেকে ভাবছেন আর এক হাতের আর একটি বালা কিনে দেবেন, কিন্তু সে আর হয়ে ওঠে না। এইবার বিবাহবার্ষিকীতে তাঁকে একটা বালা কিনে দেবেন বলে শ্যাকরার কাছে দাম জেনেও এসেছেন মলয়বাবু। কিঞ্চিৎ দামী। সে যাকগে, বিবাহবার্ষিকীর আগের মাসে একটা এরিয়ার পাওয়ার কথা। পেলে কেনাটা কোন ব্যাপার না।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কোন এক কারণে এরিয়ারটি ক্যান্সেল হয়ে গেল। মলয়বাবুর মাথায় হাত। জমানো টাকা সেরকম নেই যে বালাটা কিনতে পারবেন। বিয়ের এক বছর আগেই চাকরিটা পেয়েছেন। আর এত ধার দেনা করে বিয়ে করতে হয়েছে, যে জমানো শুরুই হয়েছে অনেক পরে। একদিন অফিসের ক্যান্টিনে বসে এসব ভাবছিলেন এই সময় সহকর্মী বিনয়বাবু তাঁকে ডাকেন --

"এই মলয়, কটা বাজে রে? আমার ঘড়িটা গেছে।"

ঘড়ি, তাই তো!! এটা তো ভেবে দেখেননি মলয়বাবু। তাঁর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া একটা দামী ঘড়ি আছে বটে। অফিসের রাকেশ তেওয়ারি এসব এন্টিক নিয়ে উৎসাহী। একদিন তাঁর ঘড়িটা দেখে বলেছিলেন  --

"এটা বেচে দিন মলয়বাবু, প্রচুর দাম পাবেন। কি হবে এই পুরনো ঘড়ি পরে? দেখতেও তো কেমন হয়ে গেছে? "

কথাটা যে মিথ্যা তাও না। ঘড়ির স্ট্র্যাপ্টা শতজীর্ণ। কবে থেকে ভাবছেন ওটা পালটাবেন, কিন্তু ঐ, পয়সা কোথায়? তবে পৈত্রিক স্মৃতি তাই ছাড়তে পারেননি। মনে আছে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর তাঁর বাবা নিজের হাত থেকে ঘড়িটি খুলে দেন।

ট্রেনের জানালা দিয়ে চায়ের ভাঁড়টা বাইরে ফেলে নিজের খালি হাতের দিকে তাকালেন মলয়বাবু। তারপরই ব্যাগের উপর দিয়ে শ্যাকরার দোকানের বাক্সটা অনুভব করলেন।

স্টেশন থেকে বেড়িয়ে নিজের সাইকেলটা স্ট্যান্ড থেকে নিলেন মলয়বাবু। এবার রওয়ানা হলেন বাড়ির দিকে। আজ যেন মনটা নিজের থেকেই ভালো লাগছে। জি টি রোড পার হয়ে নটরাজ সিনেমার সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে থামলেন একবার। সামনেই মিষ্টির দোকানে সিঙ্গারা ভাজছে। নিয়ে যাবেন? না থাক, বালাটা যদি কোন কারণে খোয়া যায় এই করতে গিয়ে। আবার সাইকেলের প্যাডেলে পা দিলেন।

যখন রোলের দোকানের চাটুতে প্রথম তেল পড়ল, তুলসীতলায় শঙ্খের ধ্বনি শোনা গেল, খেলা শেষে ছেলের দল মাঠ থেকে উইকেট তুলল,  মফঃস্বলে সন্ধ্যা নামল,  মলয়বাবু বাড়ি ফিরলেন। সাইকেলটা রেখে কলতলায় পা ধুয়ে নিলেন। পারমিতা গামছাটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন

-- "ট্রেন ঠিক ছিল? তুমি যাও আমি মুড়ি নিয়ে আসছি।"

ঘরে বসে ব্যাগ থেকে আস্তে আস্তে বাক্সটা বার করে সবে বালাটা দেখবেন, এই সময় লোডশেডিং। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। মলয়বাবু আলতো করে হাত বোলালেন বালাটার উপরে। এই সময় লণ্ঠন ও বাটি ভর্তি মুড়ি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন পারমিতা।

"দাঁড়াও চা বসাচ্ছি।"
"শোন না একবার, একটা জিনিস দেখাই।"
"ওহ, দাঁড়াও, তবে আমি আগে দেখাই।"

এক ছুটে বেরিয়ে গেলেন পারমিতা। একটু বাদেই ঘরে ঢুকলেন হাতে একটা ছোট বাক্স। বাক্স খুলতেই লণ্ঠনের আলোয় মলয়বাবু দেখতে পেলেন এক জোড়া ঘড়ির ব্যান্ড। বাদামী চামড়ার ব্যান্ড। উপরে কাটা-কাটা ডিজাইন করা। ধারে সেলাই। লণ্ঠনের  আলোতেও চকচক করছে। একটা অদ্ভুত নতুন রকমের গন্ধও পেলেন তিনি।

"দেখি তোমার ঘড়িটা দাও, আমি লাগিয়ে দি।"

এতক্ষণ বোধহয় অন্ধকারে বুঝতে পারেননি পারমিতা।

"একি, তোমার ঘড়ি কই?"

এবার বালার বাক্সটা এগিয়ে দিলেন মলয়বাবু। ততক্ষণ তিনি দেখে নিয়েছেন, পারমিতার দু হাত খালি। এই অন্ধকারের মধ্যে যে ক্ষুদ্র নাটিকাটি অভিনীত হল, তা যেন সেই আলতামিরার গুহামানবদের সময় থেকে যুগ যুগ ধরে হয়েই চলেছে। হয়ত একেই বলে ভালোবাসা। 

Thursday, April 19, 2018

আমার ছোটকা



আমার ছোটকা থাকত দোতলার ঘরে। একতলায় কোনদিন নামতে দেখিনি। শুনেছি কলেজে পড়তে ছোটকা নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশের মারে ছোটকা ঠিক মত কথা বলতেও পারত না। উঠে দাঁড়াতেও পারত না। ঠাম্মা যখন খাওয়াতে যেতেন, কোনরকমে বিছানায় ভর দিয়ে উঠে বসে খেত। তবে মাঝে মাঝে একটু একটু করে উঠে জানালার ধারে চেয়ারটায় গিয়ে বসত। বসে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে থাকত। ওহ, বলতে ভুলেই গেছি। ছোটকা কোন জামাকাপড় পরত না। সারা বছর উলংগ থাকত। আমাদের জেলা শহরে কিন্তু হালকা ঠান্ডা পড়ত। জানি না ছোটকার ঠান্ডা লাগত কিনা। আমি যখন বড় হচ্ছি, তখন ছোটকার ঘরে যেতে অস্বস্তি লাগত। সত্যি বলছি, এক এক সময় তো ভয়ই লাগত। শুনেছি ছোটকা নাকি পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল। স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হয়েছিল। কলেজে ফিজিক্স নিয়ে পড়ত। ঠাম্মা তো মাঝে মাঝেই বলে -- "তিন ছেলের মধ্যে ছোটটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান। কি যে হল!!"

আমাদের পাড়াটা কেমন যেন। সবাই যেন ক্লান্ত, সবাই যেন ধুঁকছে। কারুর কোন শখ আলহাদ বলে কিছু নেই, সবাই যেন সারাদিন নালিশ করে চলেছে। পাড়ায় কারুর সঙ্গে কারুর সদ্ভাব নেই। কোন পুজোও হয়না। সবার কাছে সবাই খারাপ। কারুর দেমাক বেশি, কেউ বা হিংসা করে, কেউই যেন ভালো না। আমরা বন্ধুরা অবশ্য এসব ভাবতাম না। পাড়ায় মাঠ বলে কিছু ছিল না। ঐ পাম্প হাউসের পাশে ছোট এক ফালি জমি। তাতেই আমরা ক্রিকেট খেলতাম। ছয় মারলেই আউট।

আমাদের খেলা নিয়েও বড়দের সমস্যার শেষ নেই।
"পল্টুর বাবাকে দেখ, একটা ব্যাট কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তোর ব্যাট দিয়ে খেলে।"
"ওহ তুই সন্তুর সঙ্গে খেলিস? ওর মা তোদের সাথে ওকে খেলতে দেয়? যা দেমাক।"

কার ভালো লাগে এসব শুনতে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমাদের সবার বাড়িতে এই চলত। আমরা ভেবে দেখলাম এসবে পাত্তা দিলে ক্ষতি আমাদের। তাই, প্রত্যেকেই নিজের বাড়ির লোকজনের চেয়ে বন্ধুদের আপন মনে করলাম। শুধু আক্ষেপ একটাই। একটা ভালো মাঠ পেলে আজহারের মত ছয় মারতাম।

একদিন আমাদের পাড়ার কাউন্সিলার বদরুদ্দিনবাবু আমাদের বাড়িতে এলেন। আমাদের বাড়ির সামনেই একটা জলা জমি ছিল। সেটাকে বুজিয়ে একটা মাঠ বানাবেন। এই একটা ব্যাপারে পাড়ার সবাই দেখলাম রাজি। মাঠ হল। আমরাও খুশি। প্রথমদিন আমাদের সবাইকে ডেকে ম্যাচ খেলালেন বদরুবাবু। খেলার পর জলখাবার ছিল। সিংগারা, মন্ডা আর দরবেশ। আমি স্কুলের মাঠে হাত ঘুরিয়ে বল করতাম। পাড়ায় এতদিন করতে পারিনি। আজ করলাম। পর পর দু'বলে দুটো উইকেটও নিলাম। বদরুবাবু বাইরে থেকে হাততালি দিলেন --
"কানু তো এ পাড়ার কপিল।"

খেলতে খেলতে খেয়াল করলাম ছোটকা জানালা দিয়ে আমাকে দেখছে। পরেরদিন সকালে ঠাম্মা বলল ছোটকা নাকি আমাকে দেখতে চেয়েছে। গেলাম। ছোটকা জড়ানো জিভে বলল -- "তুই বল করিস? আমি বল করি।"

বুঝলাম ছোটকা বলতে চাইছে নিজে বল করত এক সময়। এর পর কোথা থেকে একটা ক্রিকেট বল নিয়ে আমাকে দেখাল বলের গ্রিপ। ছোটকার হাত কাঁপছিল। আমি বললাম -- "আমরা তো ক্যাম্বিস বলে খেলি ছোটকা?"
"তো কি ? এই বল, তোর বল।"

এরপর আমি আর ছোটকাকে দেখে ভয় পেতাম না। ছোটকা জামাকাপড় পরত না বলে অস্বস্তিটা ছিল, কিন্তু সেটাও আস্তে আস্তে চলে যেতে লাগল। রোজ খেলে এসে বাড়িতে ছোটকার সঙ্গে আমার গল্প চলত। আমিই বলতাম, ছোটকা মাঝে মাঝে এক-দু' টো শব্দ বলত। ছোটকার ঐ ভাঙ্গা ভাঙ্গা উচ্চারণ আমি সহজেই বুঝে যেতাম। মাঝে মাঝে ঠাম্মাও ছোটকার কথা বুঝত না, আমি বুঝিয়ে দিতাম।

একদিন ছোটকা আমার পড়াশুনা নিয়ে জানতে চাইল। আমি তখনো মন দিয়ে পড়াশুনা করতাম না। আমাদের পাড়াতে কেউই করে না। সবাই কোনরকমে কলেজ পাশ করে রেল বা ব্যাঙ্কের পরীক্ষা দিতে থাকে। দিতে দিতে একদিন না একদিন পেয়েই যায়। আমিও সেরকম ভেবে রেখেছিলাম।

"তুই পড়বি না?"

ছোটকার এই একটা কথা আমাকে মোচর দিয়েছিল। ভেবেছিলাম কি করি? একদিন ঠিক করলাম না, আমি ডাক্তার হব। ছোটকাকে সারিয়ে তুলতে হবে। ছোটকা কে জানাতেই ভীষণ খুশি। তারপর রোজ সন্ধ্যেবেলা আমার বিজ্ঞান আর অঙ্ক দেখতে লাগল ছোটকা। হাত কাঁপত, কথা পরিষ্কার আসত না, তাও ছোটকা খেয়াল রাখত আমি সব বুঝছি কিনা। "মুখস না, বোঝ।" -- মানে না বুঝে মুখস্ত করিস না। শুধু রসায়ন ল্যাবে এসিড নিয়ে কাজ করি শুনে ছোটকা যেন শিউড়ে উঠত। "সাবয়ানে"।

মা তো অবাক হয়ে যেত আমি এত ছোটকার ঘরে যাই দেখে। ঠাম্মা বোঝায়, যাক না, ক্ষতি কি। আর সত্যি বলতে আমার পড়াশুনা নিয়ে মা-বাবা কারুরই খুব একটা মাথা ব্যাথা ছিল না। বাড়ির ঐ দুঃসহ পরিবেশে ছোটকাই যেন ছিল আমার মরুদ্যান। মনে আছে তখন আমি ক্লাস ইলেভেনে। ছোটকা আমার জন্মদিনের দিন আমাকে একটা বই উপহার দিল। নিজের পুরোনো বই। আরণ্যক। আমাকে বলল -- "পড়িস, আমার সেরা।"

আমি যখন মেডিকাল কলেজে পড়ার অনুমতি পেলাম, বাবা অত্যন্ত বিস্মিত। আমি যে ডাক্তারি পড়ব, এরকম কথা বাড়িতে ছোটকাকা ছাড়া কেউ জানত না। মনে আছে যেদিন আমি কলকাতা গিয়েছিলাম প্রথমবার। ছোটকা হাত ধরে রেখেছিল বেশ কিছুক্ষণ।

আমার মেডিকাল পড়ার দ্বিতীয় বছরেই ছোটকা মারা যায়। আমার কথা নাকি সারাদিন বলত ঠাম্মাকে। শনি-রবিবার আমি বাড়ি এলে সারাদিন ছোটকার কাছেই কাটাতে হত। আমি শেষদিন হাসপাতালে থাকতে পারিনি। পরে শুনেছি আমার অভাবে নাকি ছোটকা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। তবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছোটকাকে কেউ জামাকাপড় পরাতে পারেনি।

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি হেরে গেছি। যে ছোটকাকে সারিয়ে তোলার জন্য আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, সেই তো আর নেই। অবশ্য ভাবি, আমি ডাক্তার হই এটাই তো ছোটকা চেয়েছিল। আমার ঐ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি বছরে ছোটকাই তো আমার পাশে থেকেছে, আমাকে তৈরি করেছে। আমি হারিনি, ছোটকা জিতেছে।

Tuesday, March 20, 2018

চিকেন কবিরাজি

আজ শম্পাদির বিয়ে। গত দু'দিন আমাদের খেলা বন্ধ। পাড়ায় একটাই মাঠ। সেখানেই বিয়েবাড়ি হয়। তাই সে ক'দিন আমাদের খেলা বন্ধ থাকে। এতে অবশ্য আমরা কিছু মনে করিনা। কারণ আমরা কেউ খুব একটা বাইরে খাই না। মানে চপ, রোল, এসব খাই। কিন্তু ঐ বিয়েবাড়ির খাওয়া, মানে বাড়ির বাইরে রাতের খাওয়া -- না ওসব  হয়না আমাদের। তাই একটা বিয়েবাড়ি এলে আমরা সবাই খুশি। যদিও বিলুরা খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুশি না। তাপসদের বাড়ির সামনে যে এক ফালি জমি, সেখানেই ওরা চার-পাঁচজন মিলে ক্রিকেট খেলছে। আমরা, মানে আমি, সত্যেন, চন্দন, সুগত, রানা, আমরা যাই না। আমার আবার অন্য ব্যবস্থা আছে। ছোট থেকেই ক্যারামটা ভালো খেলি বলে এই সময় পাড়ার ক্লাবঘরে প্রবেশ করার অনুমতি পাই। রাজুদা, দেবুদা, শুভদারা আমায় খুবই ভালোবাসে। নিজেকে যেন কি'রম বড় বড় মনে হয়। মানে আমার বয়সী বাকিরা তো ক্লাবে ঢুকতে পারে না।

কোথা থেকে কোথায় চলে গেলাম। কথা হচ্ছিল আজকের বিয়েবাড়ি নিয়ে। আজকের বিয়েবাড়ির মূল আকর্ষণ সুরুচি ক্যাটারার। আমাদের এই ছোট জেলা শহরের প্রথম ক্যাটারার। শুনেছি কলকাতায় নাকি এখন সব বিয়েবাড়িতেই ক্যাটারার চলে। তবে কলকাতা বড় শহর, সাড়ে তিন ঘন্টা লাগে ট্রেনে। আমাদের এখানে এটাই প্রথম। বছর দুয়েক হল খুলেছে। আর আমাদের পাড়ায় এই প্রথম আসছে সুরুচি ক্যাটারার। এই দু' বছরেই কিন্তু বেশ নাম করে ফেলেছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ওদের চিকেন কবিরাজি। এই জিনিসটা আমদের জেলা শহরে কেউ খায়নি আগে। সুরুচি নাকি কলকাতা থেকে পাচক আনিয়েছে। মিঠাপুকুরের শ্যামল, আমার স্কুলের বন্ধু,  প্রথম এই দ্রব্যের কথা জানায় আমাদের। ওদের পাড়ায় কার বিয়েতে নাকি সুরুচি এসেছিল। এই চিকেন কবিরাজি করেছিল।

"সে কি খেতে রে!! মাংস, তার উপরে কিরকম যেন ভাজা চাউমিনের মত।"
"ভাজা চাউমিন? ধুর সে তো আমাদের সন্ধ্যা স্ন্যাক্স সেন্টারেই পাওয়া যায়।"
"আরে না রে, এটা সে জিনিস না। বলে বোঝাতে পারব না। খেলে বুঝবি।"
"এটা আর কেউ বানায় না?"
"না রে যা শুনেছি এটা আমাদের শহরে শুধু সুরুচি বানায়।"

বাড়ি ফিরে রাজুদাকে বলেছিলাম। ক'দিন বাদে রাজুদা জানাল কলকাতায় নাকি হামেশাই পাওয়া যায়।

"তুমি খেয়েছ?"
"না রে।"
"আমাকে খাওয়াবে একদিন?"
"হ্যাঁ, কিন্তু তার জন্য তো কলকাতা যেতে হবে।"
"ধুর, সে তো অনেক দূর।"
"দাঁড়া, একটা চাকরি পাই। একদিন তুই আর আমি মিলে কলকাতায় গিয়ে খেয়ে আসব।"

তো আজ শম্পাদির বিয়েতে সেই সুরুচি আসছে। অবশ্যই থাকছে চিকেন কবিরাজি। শম্পাদির বাবা ঘোষজেঠু নাকি নিজে বলেছেন সুগতর বাবাকে। বিকেলবেলা বসে বসে আনন্দমেলায় "পান্ডব গোয়েন্দা" পড়ছি। একটু বাদেই বেরোতে হবে। মা খানিকক্ষণ আগে ডেকে গেল -- "দিদার দেওয়া পাঞ্জাবীটা পরিস। আলমারি থেকে বার করে রেখেছি।" এই সময় বাইরে আমার নাম ধরে কে যেন ডাকল। দেখি রাজুদা।

"কানু, আছিস। বাঁচা গেল। শোন, খুব বিপদ ঘোষজেঠুর।"
"কি হল?"
"আর বলিস না, সুরুচির কি একটা গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়েছে। ওদের ২-৩ জন আহত। তাই ওরা সবাই হাসপাতালে গেছে। আসতে পারবে না। তবে ওরা পাচক ঠাকুর আর তাঁর সাগরেদদের পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন পরিবেশন করার লোক চাই। তো আমরা ক্লাবের ছেলেরাই করছি। কিন্তু আমাদেরও কেউ কেউ নেই আজ। তা তুই কি আসতে পারবি?"
"কেন পারব না। যাচ্ছি।"

মনে মনে ভয় পেলাম। কোনদিন তো করিনি। পারব? রাজুদারা তো বহু বছর করেছে। এতদিন তো ওরাই করত। এই প্রথম সুরুচিকে বলা হচ্ছে। চিকেন কবিরাজি ঠান্ডা হয়ে যাবে না তো? কিন্তু না বললে আবার প্রেস্টিজে লাগবে। এই এতদিন ক্লাবের দাদাদের সঙ্গে মিশি, নিজেকে বড় বড় ভাবি। নাহ, চলেই যাই।

দিদার পাঞ্জাবী পড়ে রইল। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

ও বাবা, প্রথমেই চিকেন কবিরাজি। তবে আমি না, দেবুদা দিতে গেল। আমাকে বলল স্যালাড দিতে। একটা করে কবিরাজি পড়ছে, আর একটু করে স্যালাড দিচ্ছি আমি। সেনগুপ্তকাকু আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন -- "ও বাবা, আমাদের কানুও আজকাল পরিবেশন করছে।"

মা, বাবা এসেছে দেখলাম। মাকে বেশ বড়দের মত বলে এলাম -- "তোমরা খেয়ে নাও। আমি দাদাদের সঙ্গে খাব।"

এই দেবুদাকে নিয়ে সমস্যা। লোককে যেচে বেশি বেশি করে কবিরাজি দিতে চাইছে। কেন বাবা!! শেষ হয়ে গেলে কে দেখবে? তখন তো আমাদেরই জুটবে না। বরং মাংসটা দিক না বেশি করে। আমাদের বাড়িতে প্রতি রবিবার মাংস হয়। তাই ওতে আমার লোভ নেই। এইসব ভাবছি এমন সময় শুভদার ডাক শুনলাম -- "কানু, লুচিগুলো নিয়ে আবার যা।"

যা ভয় পেয়েছিলাম। সব শেষে আমরা যখন খেতে বসলাম তখন পোলাও, মাংস আর রসগোল্লা ছাড়া কিছুই নেই। চোখ ফেটে জল এসে গেল। এত সাধের কবিরাজি, এক টুকরো পেলাম না। সব দোষ এই দেবুদার। রাজুদার পাশেই বসে খাচ্ছিলাম, একবার বললাম -- "কবিরাজি নেই না?"

"না রে, সবাই খুব ভালোবেসে  খেয়েছে ওটা।"
"ওহ।"
"তোর মন খারাপ হয়ে গেছে? ভাবিস না, আমি চাকরি পাই, তোকে কলকাতা থেকে এনে খাওয়াব।"
প্রচন্ড রাগের মাথায় বললাম
"তুমিও আর চাকরি পেয়েছ, আমারো আর কবিরাজি খাওয়া হয়েছে।"
রাজুদা দেখলাম চুপ করে গেল। পুরো সময়টা আর কথাই বলল না।

আমার গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেত। মানে এরপর এই গল্পে আর কিছুই হয়না। আমি পরেরদিন স্কুলে গিয়ে শ্যমলকে মিথ্যা বলি -- "কবিরাজি খেলাম। ভালো। তবে তুই যত ভালো বলেছিলিস, তত ভালো না।"

ও হ্যাঁ, পরের এক সপ্তাহ দেবুদার সঙ্গে কথা বলতাম না। এমনি দু'দিন বাদেই মাঠ থেকে প্যান্ডেল উঠে গিয়েছিল। কাজেই ক্লাবে না গিয়ে আমি মাঠে যেতাম।

গল্পটা শেষ হলনা বিয়েবাড়ির দু'সপ্তাহ পরের একটা ঘটনার জন্য। একদিন মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে দেখি ঘোষজেঠু বসে বাড়িতে। আমি যেতেই আমাকে বললেন

"কানু, তুই সেদিন আমার বিপদের দিনে যা করেছিস, আমি কোনদিন ভুলব না। তুই এইটুকু ছেলে হয়ে এত লোককে পরিবেশন করলি, ভাবাই যায় না। তোকে একটা প্রাইজ তো দিতেই হয়। দেখ তো, তোর পছন্দ হয় কিনা।"

মা হাসি মুখে ঘরে ঢুকল। হাতে প্লেট, তাতে দু' খানা চিকেন কবিরাজি, পাশে একটু সস।

আমি তখনো অবাক।

জেঠু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন। বিয়ে মিটে যাওয়ার ক'দিন বাদে রাজুদা নাকি ওনার বাড়ি গিয়ে বলে আমার চিকেন কবিরাজি খাওয়া হয়নি। কিছুভাবে যদি এর ব্যবস্থা করা যায়, ভালো হয়। পরেরদিন সুরুচির মালিক হিসেব করতে ওনার বাড়ি আসে। উনি প্রথমেই জেঠুর কাছে ক্ষমা চান। জেঠু বলেন উনি ক্ষমা করতে পারেন। একটাই শর্তে। পরের যেদিন কোন বিয়েবাড়িতে সুরুচি খাদ্য পরিবেশন করবে, সেদিন দু'খানা চিকেন কবিরাজি ওনাকে দিতে হবে। মালিক এক কথায় রাজি।

আজ পাওয়ার হাউস পাড়ায় দত্তদের ছোট ছেলের বউভাত।





Friday, March 9, 2018

সহযাত্রী

সহযাত্রী
************
বুধবারের বিকেল। বর্ষাকাল। হাওড়া স্টেশনে থিকথিকে ভিড়। তার মধ্যে জায়গায় জায়গায় জল পড়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। একটা কিরকম যেন গুমোট দম বন্ধ করা ভাব।
সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে পাঁচটা তেইশের বর্ধমান কর্ড লোকাল দাঁড়িয়ে। জানালার ধারে একটা সিট পেয়েছেন অলকবাবু। খানিক্ষণ আগে, মানে ট্রেনে উঠে ভীষণ ঘামছিলেন। এখন অনেকটা ঠিক ঠাক। আস্তে আস্তে ট্রেন ভর্তি হয়ে গেল। তিনজনের সিটে কোথাও চারজন, কোথাও বা পাঁচজন বসে। একদম নিত্যযাত্রী তাস খেলতে লাগলেন।
লিলুয়াতে ট্রেনে এক চা-ওলা উঠল। গলা শুকিয়ে কাঠ। একটা চা দিতে বললেন অলকবাবু। উল্টোদিকের ভদ্রলোক-ও তাই বললেন। উনিও হাওড়া থেকেই উঠেছেন। বয়স হয়ত অলকবাবুর চেয়ে একটু বেশি হবে। কাঁচা-পাকা চুল, যদিও পাকার ভাগটাই বেশি। পরনে হাফ হাতা চেক শার্ট, খয়েরি প্যান্ট ও চটি। কোন ব্যাগ চোখে পড়ল না যদিও।
-- দাদা কতদূর?
ভদ্রলোক নিজেই আলাপ করতে এলেন।
-- আমি এই গুড়াপ। আপনি?
-- আমি... দেখি, মানে আমি বর্ধমান।
-- ও তা আপনি সুপার নিলেন না কেন? এর চেয়ে জলদি পৌঁছাতেন।
-- হ্যাঁ নিতেই পারতাম, ঐ আর কি। সুপার মানে গ্যালোপিং-টা তো?
-- হ্যাঁ।
-- তা আপনার অফিস কি কলকাতাতেই?
-- হ্যাঁ, আমি ধর্মতলার মঞ্জুষাতে বসি।
নিজের তৈরী উত্তর বললেন অলকবাবু।
-- ওহ, মঞ্জুষা। ওখানে একবার গিয়েছিলাম মনে হয়। আপনাকে কি দেখেছি? মনে নেই যদিও।
-- হয়ত অফ ডে ছিল।
এবারো তৈরী উত্তর।
-- তা হবে। তা কতদিন আছেন ওখানে?
-- এই হল বেশ কয়েক বছর। আপনার অফিস কোথায়?
নিজের দিক থেকে আলোচোনাটা সরানো দরকার। গুড়াপ আসতে ঢের দেরী।
-- আমার পার্ক স্ট্রিটের কাছে। রয় এয়ান্ড সন্স চেনেন?
-- না, মানে আমি ঠিক ঐ দিকটা ...
একটু চমকালেন অলকবাবু।
-- বড় সওদাগরী অফিস। ওদের পাশেই আমার অফিস। বেঙ্গল এস্কপোর্টস কোম্পানি।
এবার আরো একটু বেশি চমকালেন অলকবাবু। একটু একটু ঘাম যেন আবার আসতে শুরু করল।
-- সেকি মশাই, ঘামছেন কেন? এত চমকাবার কি আছে?
-- না না চমকাচ্ছি কই? তা কতদিন আছেন আপনি ওখানে?
-- ১৪ বছর হল। রোজ এক রুটিন। সকাল বেলা বাড়ি থেকে বেরোই, অফিসে লাঞ্চ, তারপর বিকেলে একটা সিগারেট আর পাঁচটায় টা টা। হে হে ...
-- পাঁচটায়? তাহলে আজ নিশ্চয় আগে বেরিয়েছেন? পাঁচটায় বেরোলে তো এই ট্রেন ...
-- ধরতে পারতাম না তো। ঠিকি বলেছেন। আজ না কি হল জানেন, রুটিনটা একটু পাল্টে গেল। আমি আর আমার এক কলিগ সহদেব পাল, রোজ বিকেলে অফিসের সামনে সিগারেট খেতে যাই। তো আজ হয়েছে কি... একি মশাই এত ঘামছেন কেন?
-- কি কি নাম বললেন?
-- সহদেব পাল। চেনেন নাকি?
-- না আমি কিভাবে চিনব? আমি চিনি না।
-- তাই বলুন, তা আমরা সবে দু'টান মেরেছি কি মারিনি, হঠাত কি হল জানেন?
-- নাহ, আমার না শরীরটা ঠিক লাগছে না, পরে শুনছি। কেমন?
-- সে কি মশাই কি হল? শুয়ে পড়ুন। শুয়ে পড়ুন।
এবার পাশ ফিরে অলকবাবু দেখলেন কামরা পুরো ফাঁকা, শুধু তিনি আর সামনের ভদ্রলোক। এই যে খানিক্ষণ আগেও তাসের ডাক, চাওলার আওয়াজ ছিল, সব শুন শান। শুধু ট্রেন চলার শব্দ।
-- কি হল? সবাই গেল কোথায়?
-- আর কোথায় বলুন অলকবাবু? এত কাঁচা হাতের টিপ থাকলে কি হয়? মারতে গেলেন সহদেবকে আর গুলিটা খেলাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমি? একবার দেখলেন-ও না কাকে মেরেছেন? ক'দিন হল এই কাজে? একটা বডি পড়ছে দেখেই পালালেন?
-- না না আমি মানে...
-- আর মানে... যাকগে, একটা কথা। আমাদের না ঠিক মিথ্যা বলা সাজে না। আপনাকে একটা মিথ্যা বলতে হয়েছে। ঠিক করে যাই। আমার বাড়ি নাগেরবাজার।

Tuesday, February 13, 2018

মধুসূদনপুরের জমিদারবাড়ি


"যাহ, কি যে বলিস? ওমনি ভূত এসে গেল।"
"আরে বলছি ওখানে ভূত আছে।"
"তোরা শালা গাঁইয়াই রয়ে গেলি।"
"কি এমন তুই শহুরে রে, থাকিস তো বর্ধমানে?"
"তাও ভালো। তোদের এই মধুসূদনপুরের মত ভূতের গল্প বানাই না।"
পলাশের দিদির বিয়েতে আমরা এসেছি মধুসূদনপুরে। হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনে পরিচিত স্টেশন। আমরা মানে আমি, তন্ময় আর রজত। আমরা চারজন বর্ধমান রাজ কলেজে ফিজিক্স অনার্স পড়ি। আমার আর রজতের বাড়ি বর্ধমানে। তন্ময় থাকে গুসকরায়। আর পলাশ -- আগেই বলেছি। এই মধুসূদনপুরে। বিয়ে বাড়ি মিটে যাওয়ার পরও আমরা ঠিক করলাম ২-৩ দিন থেকে যাবো। এই সময় কলেজ বন্ধ। তাই আজ সন্ধ্যেবেলা পলাশদের বারান্দায় বসে মুড়ি চানাচুর খেতে খেতে আড্ডা হচ্ছিল।
"আরে বলছি শোন, জমিদারি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও জমিদারবাবুর বড় ছেলে সূর্যকান্তবাবু সপরিবারে ঐ বাড়িতে থাকত। একদিন সকালে তাঁকে সপরিবারে মৃত দেখা যায় ঐ বাড়ির মধ্যে।"
"সপরিবারে মৃত মানে?"
"মানে সূর্যকান্ত বাবু, তাঁর স্ত্রী রত্নাদেবী আর তঁদের ১০ বছরের মেয়েকে দেখা যায় বিষ খেয়ে মৃত।"
"আরে দেখা যায় মানে কি? কেউ বিষ খেতে দেখেছে?"
"না তা নয়, তবে পরে ময়না তদন্তে তাই বেরোয়। এই ঘটনার ক'দিন আগে থেকেই ঐ বাড়িতে এক তান্ত্রিক এসে থাকত। পুলিশ তাকেই সন্দেহ করে, কিন্তু তার খোঁজ পাওয়া যায়না।"
"কিছু চুরি গেছিল?"
"নাহ, সেটা অবশ্য আমি জানি না। আসলে এই সব ঘটনা তো বহু আগের। আমি বাবা কাকাদের মুখে যা শুনেছি।"
"তা ভূত এলো কোথা থেকে?"
"আরে ঐ বাড়িতে কেউ রাত কাটাতে পারে না। কতজন গেছে, কেউ ফেরেনি?"
"সবাই মারা গেছে?"
"আরে না, কারুর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।"
"মানে? ভ্যানিশ?"
"হ্যাঁ।"
জেদের মাথায় ঠিক করে ফেললাম পরেরদিন রাত্রে আমি একাই ঐ বাড়িতে কাটাবো। তন্ময় বা রজতের সাহস হল না। পলাশ তো বলাই বাহুল্য। ঠিক করা হল পলাশের মা-বাবাকে বলা হবে না। তাহলে ওঁরা হয়ত রাজি হবেন না।
সবাই শুয়ে পড়লে আমরা চুপি চুপি বেরোলাম। জমিদারবাড়ি সকালে একবার দেখে গেছি। পাঁচিল দেওয়া বিশাল জায়গা। মাঝে একটা দীঘিও আছে। যদিও পর্যবেক্ষণের অভাবে দীঘিটি পাঁকে ভর্তি। একটা পানকৌড়ি ছাড়া কিছুই দেখলাম না। ঘরগুলোতেও ধুলো ভর্তি। সকালেই আমরা একটা ঘর সাফ করে রেখেছি।
বিছানা তোষক পেতে, লন্ঠন জ্বালিয়ে পাশে জলের বোতল রাখল তন্ময়।
"এখনো ভেবে দেখ। থাকবি?"
"তুই থাক না একসাথে?"
"নাহ ভাই। কাল সকালে আসব আমরা।"
"হ্যাঁ কথা দিচ্ছি হারিয়ে যাব না, কিছু না হোক অনাথবাবুর মত দাঁতন করতে করতে আসব।"
ওরা চলে গেল। ব্যাগ থেকে একটা গল্পের বই বার করে পড়তে লাগলাম। খানিক্ষণ পড়তে পড়তেই চোখ জুড়িয়ে এল। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। ঘুম ভেঙ্গে গেল গরমে। এতো গরম কেন ঘরটা? আগুন জ্বলছে কোথাও? না তো। এটা ডিসেম্বর মাস, এত গরম তো হবে না। যখন ঘরে এসেছিলাম তখনো এত গরম ছিল না।
শালটা জড়িয়ে বাইরে বেরোলাম। দূরে একটা ট্রেন যাওয়ার আওয়াজ পেলাম। কোথাও একতা তক্ষক ডাকছে। একটা সিগারেট ধরালাম। ক'দিন পলাশদের বাড়িতে খাওয়া হয়নি।
ঘুমটা কেটে গেছে। এবার খেয়াল করলাম কেন আমার রাত থেকেই এই বাড়িটা অদ্ভুত লাগছে। সারা মধুসূদনপুরে যেখানে মশার দৌরাত্ম্য, এই বাড়িতে একটাও মশা নেই!!
এবার চোখ গেল দীঘিটার দিকে। একটা ঠান্ডা হাওয়া আসছে যেন। আরে এখন তো একটা না, দু-দুটো পানকৌড়ি। দীঘির জলটাও একটু পরিষ্কার লাগছে না? কাছে গেলাম। না, শ্যাওলা তো উল্টোদিকে, এই দিকটা একদমই পরিষ্কার। সিগারেটটা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। যাই একটু দীঘির ধারে গিয়ে বসি। আজকে আকাশটাও বেশ পরিষ্কার। প্রচুর তারা দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু এই বাড়ির চারপাশে কি গরম!! শুধু যে ঘরের মধ্যে তা নয়, বাইরেও বেশ গরম। দীঘির ঠান্ডা জলের হাওয়া ছাড়া তেমন হাওয়াও নেই। বাইরে গাছের পাতাও নড়ছে না। একটু পা ডোবালে কেমন হয়?
আহ কি আরাম, এই গরমে দীঘির জল পায়ে লাগতে যেন শান্তি হল। আচ্ছা সাঁতার কাটলে কেমন হয়? রাতে যদিও কোনদিন সাঁতার কাটিনি, কিন্তু এইটুকু তো দীঘি, কি আর হবে। একটা গামছাও ব্যাগে আছে।
জামাকাপড় ছেড়ে নেমে পড়লাম দীঘিতে। কি অসাধারণ ঠান্ডা, আরামের জল। এই জল গায়ে লাগতেই মনে হল প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল। উঠব? নাহ, উঠে কি হবে? এই আরাম কি আর পাব? আমি দীঘির জলে আরো তলিয়ে যেতে লাগলাম......

Monday, January 22, 2018

একটা আ-কারের জন্য


মহা ফাঁপড়ে পড়েছি। কখন যে এই ভুলটা করলাম নিজেও খেয়াল করিনি। "তোমার"-এর জায়গায় হয়ে গেছে "তেমার"। এবার কি করে ঠিক করি? আমার সাধের আর্টেক্স কলমটা চোখের সামনে, কিন্তু আমি হাত দিতে পারব না। সামনে মা, জেঠিমারা , কাকিমারা মিলিয়ে গোটা পাঁচেক লোক। তারপর মা সরস্বতী। মাঝে আমার বই ও কলম। মানে আমার একার না, এই গলির সবার।
এদিকে বাইরের ঘরে বসে বাবা-কাকা-জেঠুরা আড্ডা দিচ্ছে। মাঝে মাঝেই শুনছি "সিটু", "সোমেন মিত্র", "রাও" এসব শব্দ। বারান্দায় রাজুদা, সোনাদি , সোনাদির বর শুভদা, এরা সবাই। আমার বয়সী তো কেউ নেই যে আমি কথা বলব? মন্টিদি আছে, কিন্তু একে সে আমাকে একদমই পাত্তা দেয় না, আর তার দেখা পাওয়া শক্ত।
একটু বাদে গিয়ে দেখি সবাই ঠাকুরের সামনে থেকে সরে গেছে। একমাত্র রত্নাকাকিমা একটু দূরে বসে আছে। টুক করে কলমটা নিয়ে আসা যায় না?
-- কি রে পিকলু, ওখানে কি করছিস?
-- না আমার কলম...
-- হ্যাঁ, তোর কলম তো দেখতে পাচ্ছি ওখানে, ওটাকে কি করছিস?
-- এই কাকিমা, মানে পড়ে যাচ্ছিল, তাই তুলে দিলাম।
নাহ, আমার আর বানান ঠিক করা হবে না। এদিকে অঞ্জলী হলেই প্রসাদ। খাওয়া শেষ হতে না হতেই রতন, বিলুরা আসবে সাইকেল নিয়ে, পাড়ার ক্লাবে যাব। আর সেখানেই... ধুর বাবা। কেউ দেখছে না দেখে বিছানার পাশে এসে একবার চিঠিটা খুলে দেখলাম। না, ঠিক হয়নি বানানটা।
অঞ্জলীর ডাক পড়তেই সবাই এগিয়ে গেলো। শুভ্রা কাকিমা বারান্দা থেকে হাঁক দিয়ে মন্টিদিকে ডেকে আনলেন। এ বাড়ির জেঠু আর আমার বাবা, দুজনে ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস করেন না। তাই তাঁরা বাইরের ঘরেই রইলেন। আমি অঞ্জলী দিতে দিতে বার বার ঠাকুরকে বললাম,
"মা, দয়া করে বানানটা ঠিক করে দাও, কথা দিচ্ছি ফাইনালে ইতিহাসে আর টুকব না।"
অঞ্জলী শেষ। সবাই খেতে বসেছে। বাবার আর জেঠুর অঞ্জলী না দিলেও খেতে আপত্তি থাকে না। আমি খুব চিন্তায়। অল্প অল্প খাচ্ছি। এই সময়
-- পিকলু এদিকে আয় তো।
-- যাই জেঠু।
পড়ার ঘরে যেতেই জেঠু বলল
-- শোন বেশি সময় নেই। এই নে আমার উইং সাং কলম। আজই সকালে কালি ভরেছি। যা লেখার জলদি লেখ।
চোখ পড়ল টেবিলে রাখা ক্যামলিনের দোয়াত আর ড্রপারের দিকে। কিন্তু আমি জেঠুর কথা শুনে হতবাক। বুঝলেন কি করে?
-- তুই কি ভাবিস? আমি কিছু বুঝি না। বার বার তোর মূর্তির সামনে কলম হাতড়াতে যাওয়া, বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে বার করে চিঠি পড়া, সবই দেখেছি। শোন। তাড়াতাড়ি লেখ। নইলে লোকে সন্দেহ করবে। আর তোকে বার বার বলেছি পরীক্ষায় লেখার পর রিভাইজ করতে, আজ প্রমাণ পেলাম সেটা করিস না।