Friday, July 17, 2020

বহরমপুরের সুতপা

অফিসে কাজের ফাঁকে প্রায়ই অর্কুটটা চেক করে নেয় নিখিল। আর এখন তো বেশী করে করতে হয়। সুতপা মেসেজ করে এই সময়। রোজ বিকেলে এক ঘণ্টার জন্য সুতপা সাইবার ক্যাফে যায় শুধুমাত্র নিখিলের সঙ্গে দেখা করতে। কলেজ পাশ করে বহরমপুরে একটা স্কুলে পড়ায় সুতপা। বাবা নেই। বাড়িতে শুধু মা। হাল্কা শ্যামলা গায়ের রং, তন্বী। প্রথমবার ছবি দেখেই পছন্দ হয়েছিল নিখিলের। অর্কুটেই আলাপ সুতপার সঙ্গে। অনলাইনের মধ্য দিয়ে কলকাতার রাস্তার ভিড় আর বহরমপুরের লোডশেডিং যে কখন মিলেমিশে এক প্রেমকাহিনীর সূচনা করেছিল দু'জনে কেউই বোঝেনি। অনলাইনে এভাবে প্রেমে পড়া শুনলে লোকজন এই ২০০৬-এ অবাক হয় বইকি। তবে দুজনেই দুজনের ছবি দেখেছে। গলা শুনেছে। কাজেই একেবারে অচেনা নয়। সুতপা নতুন একটা মোবাইল ফোন নিয়েছে। তবে ওর বেশী টকটাইম নেই। তাই নিখিল-ই ফোন করে। সারা রাত্রি ধরে সুতপা বলে চলে তার স্কুলের খাতা দেখার গল্প, আর নিখিল তার অফিসের। নিখিলের গলায় সুর আছে। সুতপা বার বার বায়না করলে নিখিল গান শোনায়। কোনদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত, কোনদিন আধুনিক। সুতপা বলে নিখিলের গলা নাকি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত।

দু'মাস এভাবে অতিবহিত হওয়ার পর দুজনেরই মনে হল এবার সামনাসামনি দেখা হওয়া দরকার। সুতপা ঠিক করল কলকাতায় এসবে। কলকাতায় তার মাসীর বাড়ি। সেখানে উঠে নিখিলের সঙ্গে দেখা করবে। লালগোলা প্যসেঞ্জারে চেপে মাসীর বাড়ি এসে একদিন পর নিখিলের সঙ্গে দেখা করতে গেল সুতপা। ভিক্টোরিয়ার সামনে দেখা করার কথা। বাস থেকে নেমে সুতপা দেখল গেটের সামনে সাদার উপর লাল চেক জামা পরিহিত নিখিল। সুতপা নিজে পরেছে সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ। বেশী গয়না পছন্দ করেনা সুতপা। তাই সামান্য একটা গলায় হার আর কানে দুল। তাতেই নিখিল বলে উঠল -- "বিউটিফুল।"

সারাদিন ভিক্টোরিয়ায় ঘুরে, দুপুরে এক চাইনিজ দোকানে খেয়ে বিকেলবেলা নিখিলের নিউ আলিপুরের বাড়িতে এল সুতপা। ভিক্টোরিয়ার মাঠে সর্বসমক্ষে ঘনিষ্ট হতে আপত্তি ছিল সুতপার। নিখিল একাই থাকে। তাই ওর বাড়িতে আপত্তি নেই। নিখিলের বাড়িটা খুব একটা ছোট না। ওর বাবা বানিয়েছিলেন। বাবা মা দুজনেই এক এক্সিডেন্টে গত হন। তারপর থেকে একাই থাকে নিখিল। বাড়িতে ঢুকেই বাঁ দিকের বন্ধ ঘরটার দিকে এগোচ্ছিল সুতপা। নিখিল বারণ করে। ঐ ঘরটি নাকি নিখিলের বাবা মার। ঐ ঘরটি সে বন্ধই রাখে। নিখিলের লিভিং রুমের সোফায় বসতে যাচ্ছিল সে, এই সময় নিখিল তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মনে হল সুতপার গায়ে যেন শিহরন খেলে গেল। চকিতে নিখিলের দিকে ঘুরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আস্তে আস্তে নিখিলের ওষ্ট সুতপার অধর স্পর্শ করল। সুতপার হাট উঠে গেল নিখিলের কাঁধে। নিখিলের চোখ বন্ধ হল। সুতপারও।  নিখিল তৈরি ছিল। চট করে পকেট থেকে ইনজেকশনটা বার করে সুতপার হাতে তাক করল। এক মিনিটের মধ্যেই সোফায় অজ্ঞান হয়ে পরে গেল সুতপা। এবার নিখিল ফোন করল -- "আমি রেডি তন্ময়দা, আপনার নার্স নিয়ে চলে আসুন।"


কসবা থেকে নিউ আলিপুর আসতে সময় লাগে বলেই চেতলাতে এক বন্ধুর বাড়ি ছিলেন ডাক্তার তন্ময় সেনগুপ্ত। ফোন পাওয়া মাত্রই নিজের নার্স রুমাকে নিয়ে চলে এলেন নিখিলের বাড়ি। নিখিল ততক্ষণে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে রেখেছে। সেটি যেন এক পুরোদস্তুর অপারেশন থিয়েটার। সুতপার অবচেতন দেহটা সবাই মিলে ধরে নিয়ে এল। শুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল নিখিল। বাইরের ঘরে বসে টিভিটা চালাল। সৌরভ বোধহয় আবার টিমে ফিরবে।

খানিকক্ষণ বাদেই বেরিয়ে এলেন ডাক্তার সেনগুপ্ত। "নিখিল, এই মেয়েটির তো কিডনি নেই!"
"কিডনি নেই মানে? এটা হয় নাকি?"
"আরে দেখে যাও।"
"খারাপ করছেন তন্ময়দা, আমাকে শেয়ার দেবেন না বলে কিডনি লুকিয়ে এখন এসব বলছেন।"
"আরে তুমি নিজেই দেখো না।"

ঘরের ভিতরে তখনো হাল্কা আলোটা জ্বলছে। বেডের পাশে বাকি সব আলো যেন সুতপার কাটা দেহটাকে ঝলসে দিচ্ছে। নার্সটিকে দেখা যাচ্ছেনা। নিখিল এসে কিছুই বুঝলো না। "কোথায় কিডনি নেই তন্ময়দা?"

ঘাড় ঘুরিয়ে নিখিল দেখল তন্ময়দা পাশে নেই। ঘরের দরজাটিও এবার বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে কেউ যেন তালাটা ঘোরাচ্ছে। নিখিল ছুটে গেল দরজার দিকে। দু'বার ধাক্কা দিতেও দরজা খুলল না। আবার পাশ ফিরতেই নিখিলের চোখ গেল ঘরের অন্য কোণে। হাল্কা আলোতে এতক্ষণ খেয়াল করেনি। পাশাপাশি পরে আছে তন্ময়দা আর রুমা। দুজনের কারুর জ্ঞান নেই মনে হচ্ছে। নিখিল অবাক হয়ে এগিয়ে গেল তন্ময়দার দিকে।
"তন্ময়দা, তন্ময়দা।"
"ওরা কেউ বেঁচে নেই নিখিল।"
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে বেডের দিকে ফিরে তাকাল নিখিল। এই সেই গলা, যা রাতের পর রাত নিখিলকে বহরমপুরের গল্প বলেছে, হাজারদুয়ারী বেড়াতে যাবার কথা বলেছে, বিধবা মায়ের কষ্টের কথা বলেছে, স্কুলের বাচ্চাদের বাঁদরামোর কথা বলেছে। নিখিল এতদিন এই গলা শুনে চমকাত না। আজ চমকাল। এখন চমকাল।

নিখিল এবার অবাক হয়ে দেখল সুতপার কাটা দেহটা বেড থেকে নেমে আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসছে। নিখিল ভয়ে নড়তেও পারল না। কাটা দেহে কিডনি আছে কিনা, সে বোঝার মত ক্ষমতাও তার নেই। এবার একদম কাছে এসে নিখিলের সামনে ফিসফিসিয়ে সুতপা বলল -- "আমাদের চুম্বন তো শেষ হয়নি নিখিল। আমাকে চুমু খাবে না?"

বলেই নিজের ঠাণ্ডা ওষ্ঠ এবার নিখিলের অধরের উপর চেপে ধরল সুতপা। নিখিল ঠাণ্ডায় ছটফট করতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে সুতপার দুই হাত এসে গেছে নিখিলের মাথার পিছনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখিলের ধরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শুধু সুতপার কাটা দেহের হাতে ধরা থাকল নিখিলের চুম্বনরত মস্তক। নিখিলের চোখ এবার সত্যি বন্ধ।


No comments:

Post a Comment